TREK TO NEORA VALLEY NATIONAL PARK

TREK TO NEORA VALLEY NATIONAL PARK


জঙ্গলে মঙ্গল?
ওহ, সে এক কান্ড হয়েছিল সেবার; বড়ো বাঁচা বেঁচেছিলাম I যেবার আয়লার দাপটে পশ্চিমবঙ্গে বিপর্যয় নেমে এসেছিলো, তখন তো ট্রেক করবো বলে আমরা লাভায় I ২০০৯ এর মে মাসের ২৪ তারিখ পারমিশন নিয়ে ২৫ এ রওনা হওয়ার কথা; তো ২৪ এ ফরেস্ট রেঞ্জ অফিসে গিয়ে শুনলাম রেঞ্জারবাবু বাইরে থেকে ফিরতে পারেননি, তাই পরদিন পারমিশন পাওয়া যাবে I মন খারাপ নিয়ে ফিরলাম হোটেলে, সাথে সাথেই বাড়ি থেকে ফোন, আবহাওয়া অফিস বলেছে কাল, অর্থাৎ ২৫ এ দুপুরে আয়লার ঝড় আছড়ে পড়বে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে I খুব একটা পাত্তা না দিলেও সবাই ঠিক করলাম যে ট্রেক ক্যানসেল করবো, কারণ যেটুকুই ঝড় হোক, জঙ্গলের ভেতরে থাকবো আমরা, সেটা ভীষণ ই বিপদজনক হয়ে যাবে I 
সেই ভেবে ট্রেক মুলতুবি রেখে ২৫ তারিখ সকালে খুব মন খারাপ নিয়ে হেঁটে হেঁটে রিশপ চলে গেলাম I পৌঁছলাম রিশপ, যখন বাড়ি থেকে ফোনে জানলাম কলকাতায় দুপুরে আয়লার তান্ডব চলছে, তখন রিশপে মেঘের ঘনঘটা; অল্প ঝড় শুরু, আমরা বুঝলাম বিপদে পড়েছি I কিন্তু লাভা ফেরার কোনো গাড়ি পেলামনা সেই সন্ধ্যায়; বাধ্য হয়ে রিশপেই একটা ছোট্ট হোমস্টেতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম I রাত বাড়তে থাকলো, বাড়তে লাগলো ঝড়ের প্রকোপ, বারান্দায় বসে; সামনে রাস্তা, ওপারেই খাদ, গাছপালা জঙ্গলে ভর্তি; পশুপাখির ভয়ার্ত আওয়াজে চারিদিকে আরো ভয়ের আবহ I বসে বসে দেখছি আমার নিচে খাদের ভেতর থেকে বিদ্যুৎঝলক I রাতটা কাটলো প্রবল উৎকণ্ঠায়, বাড়ির ফোনে জানলাম ওদিকে ঝড়ের প্রকোপ কমেছে, আর এদিকে তখন দামাল হাতির আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঝড়; পাহাড়ে ধাক্কা খেয়ে শক্তি বেড়েছে আরো I খুব ভোরে জেগে গেলাম, ঝড় চলছে তখনো, বারান্দায় বসে দেখি দুটো রেড পান্ডা খাদ থেকে উঠে ছুট্টে আমাদের ঘরের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেলো, জানিনা কি হোলো তাদের I সিন্ডিকেট থেকে একটা গাড়ি পাওয়া গেলো লাভা যাওয়ার; আমরা রওনা হলাম, হেল্পার রাস্তায় পড়ে থাকা গাছের ডাল কাটতে কাটতে চললো, হঠাৎ ঠিক সামনেই পড়লো এক বিশাল গাছ, বাইরে ঝড়, সাথে তুমুল বৃষ্টি; আমাদের পঞ্চকোটও ঠেকাতে পারছেনা I বেশ খানিকক্ষণ অপেক্ষার পর লাভা থেকে আসা একটি গাড়িও আটকে পড়লো, প্যাসেঞ্জার বদল হোলো, আমরা ওদিকের গাড়িতে উঠলাম, আমি বসলাম একদম পেছনে, গাড়ি ঘোরানোর জায়গা নেই; হঠাৎ দেখলাম গাড়ি খাদে ঝুলছে, মানে আমার নিচে মাটি নেই!!! আর সামনে থেকে আমার বন্ধু বলছে জীবনের শেষ সিগারেট টা খেয়েই ফেলি; আমি চিৎকার করে ওকে বললাম তার মানে? বললো দেখ ড্রাইভারকে…. ঐরকম ঝুলন্ত অবস্থায় কোনোরকমে ঘুরে তাকিয়ে দেখি ড্রাইভার বাবু ব্যাক গিয়ার্ মেরে ফ্রন্ট গিয়ার্ মারার মাঝখানে কনুই দিয়ে স্টিয়ারিং ধরে দুহাতে মোবাইলে মেসেজ করছে !!! যাক, মানে মানে তারপর ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে এলাম I সাংঘাতিক বাঁচা বেঁচেছিলাম, যদি রেঞ্জারসাহেব থাকতেন, আমরা পরদিন আয়লার সময় ওই গহন জঙ্গলের ভেতরে…… I যাক, এটাই জীবন I 
এ তো গেলো যেতে না পারার গল্প; তাহলে কি যেতে পারলামনা আর? তাই কখনো হয়? তাহলে কি আর লিখতে বসি? ২০০৯ এ আমরা সময় বাছার ক্ষেত্রে বড়ো ভুল করেছিলাম, নেওড়া ভ্যালির জঙ্গলে ট্রেক করা যায় একমাত্র শীতকালে, মে মাসেও ভেতরে ঢোকা মুশকিল, এতই ঘন আর গাছপালার বাড়বাড়ন্ত যে যেটুকু রাস্তা শীতে তৈরী হয়, আবার সব ঝোপে ঢেকে যায় I অদ্ভুত এই জঙ্গলটির অবস্থান, একদিকে ডুয়ার্স এর তামটা বা তাঙতে ভ্যালি, মানে আমাদের পরিচিত ঝালং, বিন্দুর কাছ থেকে শুরু করে ভুটান সীমা ধরে একসময় সিকিম, ভুটান আর বাংলা তিনটির সংযোগস্থল হয়ে লাভা পর্যন্ত বিস্তৃত I খুবই ইউনিক এর ইকো-সিস্টেম, যেখানে ট্রপিকাল, সাব-ট্রপিকাল, টেম্পারেট সব ধরণের গাছপালা দেখা যায়; রডোডেনড্রন, বাঁশ, শাল, ওক, ফার্ন সব ই আছে, আর আছে প্রচুর অর্কিড I প্রায় ১৬০ কিমি বিস্তৃত এ জঙ্গল পাখিদের স্বর্গরাজ্য, এছাড়া ভাল্লুক, সিভেট, ফ্লাইং স্কুইরেল আরো অনেক প্রজাতির প্রাণীর বাস এখানে, সবথেকে উল্লেখযোগ্য হলো রেড পান্ডা, যা এই জঙ্গলে বেশ কিছু আছে I এই ট্রেকটি রাচেলা ট্রেক নামেও বিখ্যাত, কারণ এর উচ্চতম জায়গা হলো রাচেলা দাঁড়া, প্রায় ১০,৬০০ ফিট; ওই জায়গাটি ই হলো বাংলা, সিকিম আর ভুটানের সংযোগস্থল I
যাক, ৪ বছর ধরে এসব অনেক কিছু জানাজানি করে আমরা ২০১৩ র জানুয়ারী মাসে আরো আঁটঘাট বেঁধে চললাম নেওড়া ট্রেকে I উঠলাম লাভায় নরবুর ওখানে, অর্কিড হোটেলে, ডরমেটরি তে; যারা সহযাত্রী, তাদের মধ্যে দুজনের একেবারে প্রথম ট্রেক; বাকি তিনজন আমরা পুরোনো পাপী I
জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ, বিকেলে লাভাতেই হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে; ফরেস্ট অফিস গিয়ে পারমিট করলাম I এখানে নিয়ম হচ্ছে সাথে গাইড অবশ্যই থাকতে হবে; ভালো গাইড না হলে একদম ই যাওয়া উচিত নয়, আমরা অনুরোধ করে একজন ফরেস্ট গার্ডকেই পেলাম গাইড হিসেবে, যোসেফ তার নাম I গাইড ও পারমিটের টাকা কত লেগেছিলো, তা আজ আর খেয়াল নেই, তবে একেবারেই সাধ্যের মধ্যে; আরেকজন পোর্টারও নিলাম, যোসেফ ই জোগাড় করলো I
সেই সন্ধ্যেটা মনে আছে, শনশন করে হাওয়া দিচ্ছে, অর্কিডের পেছনের বারান্দা থেকে মনাস্ট্রি দেখা যাচ্ছে, দাঁড়িয়ে আছি, এক অদ্ভুত গম্ভীর একটানা সুরে মন্ত্রোচ্চারণ I হোলোফিল জ্যাকেট পড়েও কাঁপছি, ডানদিকে দূরে আবছা পাহাড়, কাল যেখান থেকে হাঁটা শুরু করবো, ক্রমে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে……
ক্রমশ:  

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement