বাবার সঙ্গে পাহাড় চড়ার গল্প : তুঙ্গনাথ ও দেওরিয়া তাল

বাবার সঙ্গে পাহাড় চড়ার গল্প : তুঙ্গনাথ ও দেওরিয়া তাল

যাত্রা সময়কাল : ০১-১০-২০১৮ – ০৭-১০-২০১৮

 

যাত্রা শুরুর আগের পর্ব :

গল্পটা আমার থেকেও বেশি আমার বাবার। মানুষটার ভ্রমণের প্রচুর গল্প শুনে বড় হয়েছি। না সেরকম অর্গানাইসড্ বেড়ানো নয়। কখনও কাজের সূত্রে, কখনও চাকরির পরীক্ষা দেওয়ার সূত্রে, কখনও কোন কারণ ছাড়াই এমনিতেই হঠাৎ বেরিয়ে পড়া। স্বাভাবিক ভাবেই তাই মনে করা হয় আমার এই ভ্রমণ পাগলামোর পিছনে বাবার দায় সর্বাধিক। না বাবা আমাদের নিয়ে ছোটবেলায় কোনদিন সেই অর্থে বেড়াতে নিয়ে যাননি, আত্মীয় স্বজনের বাড়ি ছাড়া। বলা ভালো নিয়ে যেতে পারেননি। আর্থিক অবস্থাই এর মূল কারন। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর অবস্থা না হলেও কোনরকম বিলাসিতার ধার দিয়ে যাইনি ছোটবেলায়। তাই অভিযোগ করার জায়গাও ছিলনা তেমন। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে সম্পর্কটা ছিল আতঙ্কের। সেই দূরত্বটা তাই আজও বজায় আছে। কোনদিনই কাছের হয়ে উঠতে পারিনি বাবার। আগে ছিল আতঙ্ক এখন তা সসম্ভ্রম দূরত্ব। বাবার সাথে বেড়াতে যাওয়াটা তাই আমার জীবনের বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।




কিন্তু একসঙ্গে বেড়ানোর আবশ্যিক শর্ত তখনই লঙ্ঘিত হল যখন জানা গেল কেউই অন্যজনের শর্তে ঘুরতে রাজি নয়। আমার মতে বাবার প্ল্যান একটু গোলমেলে এবং অহেতুক জটিল। আবার বাবার মতে আমারটা বড্ড সাদামাটা আর কমন। যাই হোক অবশেষে সাদামাটা কমন প্ল্যান ১-০ গোলে জিতল এবং আমাদের যাত্রা শুরু হল দুন এক্সপ্রেসে বর্ধমান জংশন থেকে।

আমি মোটামুটি বছরে তিন-চারটে বেড়ানোর চেষ্টা করি ছোট বড় মিশিয়ে। বাবা সেভাবে বেড়ানো শুরু করেছে রিটায়ার করার পর। মোটামুটি একটা-দুটো ঘোরে বছরে মায়ের সাথে। মায়ের গতবছর হাঁটু ভাঙার পর এখন তা আরও কমেছে সংখ‍্যায়। ফলে বাবার সঙ্গী নেই বিশেষ। বহুদিনের পরম অভীষ্ট তুঙ্গনাথ ও চন্দ্রশীলা তাই হওয়ার উপায়ও ছিলনা বাবার। একদিন তাই একটু সঙ্কোচ করে আমাকে কথাটা পেড়েই ফেলল বাবা। আমি জানতাম বাবার সাথে কোথাও বেড়াতে গেলে পদে পদে মতবিরোধ হবেই। কিন্তু না বলার ইচ্ছাও আমার ছিলনা কারন আমি বুঝেছিলাম বাবা নিতান্তই অনন্যোপায় হয়ে আমার সঙ্গ চেয়েছে। কারন একার পক্ষে বাবার তুঙ্গনাথ ঘোরা সম্ভব নয়।

তুঙ্গনাথ মন্দির। ৫০০০ বছরের ইতিহাস

যাত্রা শুরুর প্রথম দিন :

যাইহোক দুন এক্সপ্রেস মাত্র দু’ঘন্টা লেট করে হরিদ্বারে পৌঁছালো। স্টেশনের বাইরে এসে বাসস্ট্যান্ড থেকে পরদিন সকালের উখিমঠের বাসের টিকিট কেটে চললাম হর-কি-পৌড়ির উদ্দেশ্যে। যদিও আমরা ছিলাম বিষ্ণু ঘাটে গঙ্গার একদম পাড়ের একটি হোটেলে। বিকেলে হেঁটে বেরোলাম মনসা মন্দির ও হর-কি-পৌড়ির বিখ্যাত আরতি দেখব বলে। ভাবলাম হেঁটে উঠি মনসা মন্দিরে তাতে আগামী কয়েকদিনের জন্য একটু নেট প্রাকটিসও হয়ে যাবে। কিন্তু অর্ধেকের আগেই বাবা হাল ছেড়ে দিল। আমি পড়লাম চিন্তায় কারন এই মানুষটাকে তুঙ্গনাথ, দেওরিয়া তাল ট্রেক করাবো বলে আমি নিজে মেডিক্যাল লিভ নিয়ে এসেছি।




যাই হোক বাবার জিম্মায় ব্যাকপ্যাক ও জলের বোতল রেখে আমি উঠতে থাকলাম। পাহাড়ের উপর অবস্থিত মন্দিরের প্রতি বিশেষ মোহ আমার ছিলনা কিন্তু নিজেকে বাজিয়ে দেখার উদ্দেশ্যেই আমি গেলাম কারন আমার কোন ট্রেকের অভিজ্ঞতা ছিলোনা। সবমিলিয়ে দেড় ঘন্টার মধ্যেই নেমে এলাম। এবং তার পর গেলাম হর-কি-পৌড়ির বিখ্যাত গঙ্গারতির উদ্দেশ্যে। আরতির স্থানে জনসমাগম দেখে বুঝলাম অন্তত এক-দেড় ঘন্টা আগেই সামনের স্থান দখল হয়ে যায়। বেশ কিছুটা পেছন থেকেই দেখলাম এবং  মোটামুটি ভালোই দেখতে পেলাম। কিন্তু মন মতো ছবি তুলতে পারলাম না।

গঙ্গারতি

হর কি পৌরি ঘাটে

হাঁটা শুরু :

পরদিন বাস ছাড়ল সকাল সাড়ে দশটায়। দেবপ্রয়াগ, শ্রীনগর ও রুদ্রপ্রয়াগ পার করে বাস উখিমঠ পৌঁছাতে সন্ধ্যে নেমে গেল। ভারত সেবাশ্রমে সংঘে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালের বাসে চোপতা পৌঁছালাম। চোপতা যাবার রাস্তাটি ভীষণ মনোরম। শেষের প্রায় সবটাই রডোডেনড্রন গাছ ঘেরা। চোপতা পৌঁছে আগে থেকে যোগাযোগ করে রাখা বুগিয়াল হোটেলে লাগেজ ব্যাগ জমা রেখে দুজনে দুটো রুকস্যাক নিয়ে তুঙ্গনাথের প্রবেশ দ্বারের ঘন্টা জোরসে বাজিয়ে যাত্রা শুরু করলাম। একটা শক্তপোক্ত লাঠিও ভাড়া নেওয়া হল বাবার জন্য কুড়ি টাকার বিনিময়ে। হাঁটা শুরু করার সময়েই আমাদের নাম এন্ট্রি করা হল।

তুঙ্গনাথের পথে

হাঁটা কুড়ি মিনিটও হয়নি, আমার ক্যামেরাও বার করা হয়নি এমন সময় বাবা বেজায় হাঁফাতে হাঁফাতে একটা পাথরের বেঞ্চে বসে পড়ল। বাবার বয়স ৭১। সহজ কথা নয় প্রায় পৌনে চার কিলোমিটার খাড়াই পাথর বাঁধানো রাস্তায় রুকস্যাক নিয়ে ওঠা। আমি খানিক ভয় পেয়ে গেলাম। মনে পড়ে গেল বাবা বলেছিল যে তুঙ্গনাথ উঠতে যদি না পারি তাহলে যেন আমি একাই যাই। কিন্তু একা যাবার জন্য তো আসিনি। একটু পর বাবাও খানিক সুস্থির হয়ে এগোতে রাজি হল। বললাম যতটা পারি যাই না পারলে ফিরে আসবো। এবার একটু কম কম হেঁটে রেস্ট নিতে শুরু করেছি। তাতে কাজ ভালই হল। বাবার কষ্ট হচ্ছে বলে বাবার ব্যাগটাও আমি নিয়েছি। ফলে দুটো ব্যাগসমেত আমি আর বাবার হাঁটার স্পিডে তফাৎ বিশেষ নেই। খানিক পরে রডোডেনড্রনের জঙ্গল পার করে একটি সুন্দর ঘাসে মোড়া জায়গায় এসে পড়লাম। জায়গাটার নাম ভূজগলি বুগিয়াল।



মেষপালকদের অস্থায়ী বাড়িগুলো বুগিয়ালের সৌন্দর্য অনেকখানি বিনষ্ট করেছে। বুগিয়ালের ঠিক পেছনে অনেকক্ষণ থেকেই তুষারধবল চৌখাম্বা ও অন্যান্যরা বিরাজ করছে। একটা রডোডেনড্রন গাছের ছায়ায় কিছু জলখাবার খেয়ে ফের হাঁটা শুরু হল। ভার্সে আমি এখনও যাইনি। রডোডেনড্রন গাছ বলতে নর্থ ও ইষ্ট সিকিমের গুল্মজাতীয় কনসেপ্টই মাথায় ছিল। এই গাছ যে এত বড় হতে পারে, বৃক্ষ হতে পারে, এমন সুবিশাল হতে পারে তা চাক্ষুষ না করলে জানতেই পারতাম না। পিছনের সবাই আমাদের টপকে এগিয়ে গেল। আমি টেনশন করলাম না। কারন আমাদের সারাদিন পড়ে ছিল এবং আমাদের তুঙ্গনাথে রাত্রিবাস ছিল তাই ফেরার তাড়াও ছিলনা।

ভূজগলি বুগিয়াল

তুঙ্গনাথের পথে :

রাস্তায় গোটা চার-পাঁচেক জলখাবারের দোকান আছে। একদম শেষেরটা তে চা খাবার জন্য দাঁড়ালাম। এখান থেকে বাকি পথ প্রায় পুরোটাই দেখা যায় যদিও তা অনেকখানি। এই দোকানের স্থানটি এত সুন্দর যে আপনার মন চাইবেই এখানে কিছুক্ষণ বসতে। বাঁদিকে নিচে রডোডেনড্রনের ঘন জঙ্গল। সোজা রাস্তা এঁকেবেঁকে উঠে গেছে তুঙ্গনাথের দিকে। এমন অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ সমন্বিত চায়ের দোকান আগে কোথায় দেখেছি মনে করতে পারলাম না। জানতে পারলাম নিচের জঙ্গলে নাকি সকালে বিকেলে মোনাল দেখা যায় প্রায় দিনই। পনের টাকার বিনিময়ে ছোট স্টিলের গ্লাসে লাল চা খেয়ে ফের হাঁটতে শুরু করলাম। ইতিমধ্যে আকাশে ইতিউতি মেঘের আনাগোনা শুরু হয়েছে। পথমধ্যে কোন শেড নেই। ইচ্ছা থাকলেও হাঁটার গতি বাড়ানো সম্ভব নয়। ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু বারিকণা ভূপতিত হবার আগেই জমাট বেঁধে অদ্ভুত রূপধারণ করছে। শেষের পনের মিনিট ছাতা খুলতেই হল।

তুঙ্গনাথ পৌঁছে :

তুঙ্গনাথ মন্দিরের প্রবেশদ্বার

তুঙ্গনাথ মন্দির ওঠার শেষ বাঁকে ছিল গণেশ হোটেল যেখানে আমাদের থাকার কথা। অদক্ষ হাতে বাংলা হরফে লেখা হোটেলের নাম দেখে একটু অবাকই হলাম। হোটেলের দেওয়ালে ততোধিক কষ্টে লেখা “এখানে থাকা ও খাওয়ার সু বন্দোবস্ত আছে”। ভাবলাম বেশ ডাল, ভাত, আলুপোস্ত পাওয়া যাবে কিন্তু বিধি বাম। একমাত্র কর্মচারিটি বাংলার কিছুই বোঝেনা। নাম ভগবতী নেগি। যদিও সে গরম গরম খাবারের প্রতিশ্রুতি দিল। এরপর আমাদের জন্য বরাদ্দ ঘরে ঢুকলাম। ব্যবস্থা খুবই সামান্য ও সাধারণ। এর থেকে বেশি এ স্থানে আশা করাও অন্যায়।



কি পরিমাণ কষ্ট করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপকরণ এখানে আনা হয় তা তো হাতেগরম টের পেয়েছি সকাল থেকে। ঘরটিতে দুটো বড় চৌকি জোড়া দিয়ে পাঁচজনের শোয়ার ব্যবস্থা করা। আরেকটি ছিল সিঙ্গেল চৌকি।
বুঝলাম রাতের সাংঘাতিক ঠান্ডা মোকাবিলা করার জন্য আমাদের এই ছটা মোটা মোটা কম্বল খুব কাজে দেবে। ঘরের মধ্যে এটাচ্ টয়লেট ছিল ইন্ডিয়ান স্টাইলের কিন্তু ইলেকট্রিসিটি নেই। ঘরে অন্য আলোর ব্যবস্থাও নেই। জানা গেল এক রাতের জন্য দুটো মোমবাতি বরাদ্দ। আমাদের ইচ্ছামত সময়ে জ্বালানো যেতে পারে। কষ্টে ও প্রবল ঠান্ডায় কাহিল হয়ে বাবা দুটো কম্বলের তলায় চলে গেল। আমি ঘন্টাখানেক পর বেরোলাম চরতে।

মন্দিরের সামনে বন্য সভ্যতা

প্রথমেই গেলাম মন্দির দর্শনে। তখনও সামান্য বরফ বৃষ্টি হয়ে চলেছে। প্রাঙ্গণের বাইরে জুতো খুলে খালি পায়ে মন্দিরের পাথুর বাঁধানো চত্বরে প্রবেশ করতেই সারা শরীরে ঠান্ডার ঝলকানি দিল। পূজারীজির কাছে মন্দিরের ইতিহাস শোনার পর মন্দিরের গর্ভগৃহ দর্শন ক‍রলাম। এটি নাকি পান্ডবদের হাতে গড়া ও পাঁচ হাজার বছর পুরানো। ইতস্ততঃ কিছু ছবি তুলে দেখলাম মন্দিরের পশ্চিম দিকে খুব সুন্দর একটি বুগিয়াল। ওখানে অনেকক্ষণ সময় কাটালাম একাকী। দিগন্ত বিস্তৃত পর্বতরাজি ও মোহময়ী চৌখাম্বার সান্নিধ্য পেলাম বহুক্ষণ ধরে।



পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে এমন সুন্দর জায়গা আমি আগে দেখিনি এমন নয় কিন্তু এমনভাবে একটি পড়ন্ত বিকেল আগে কখনোই একা কাটাইনি। খুব মনে পড়তে লাগলো প্রিয়জনের কথা। বিয়ের পর প্রথমবার ওকে ছাড়া কোথাও বেড়াতে এসেছি। না ঠিক বেড়াতে এসেছি বলা যায়না। বাবাকে বেড়াতে নিয়ে এসেছি, যেমন করে বাবারা সন্তানদের নিয়ে যায়। সাধ্যমতো চেষ্টা করে চলেছি যাতে বাবার কাঙ্খিত স্বপ্নপূরণ হয়। সূর্য অপার লালিমা নিঃসরণ করে দিগন্তে বিলীন হচ্ছে। জাগতিক লীলা আজকের মত সাঙ্গ হতে চলেছে। হঠাৎ করে চিন্তাটা ঘুরপাক দিয়ে উঠল। তুঙ্গনাথের উচ্চতা যথেষ্ট। রাত্রে শ্বাসকষ্টজনিত কোন সমস্যা বাবার হলে কোন উপায় নেই এখানে। মনে হল কাজটা ঠিক হলো কি।

মন্দিরের গর্ভগৃহ

এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখ পড়ল বাঁদিকের পাথরের খাঁজে কি যেন একটা পাখি খুঁটে খুঁটে খাবার খাচ্ছে। সেকেন্ডের মধ্যে বুজলাম এটা মোনাল ছাড়া আর কিছু নয়। গলায় ক্যামেরা ঝোলানোই ছিল। শুরু করলাম ফায়ারিং। এবছরের গোড়ায় সিল্করুটে দেখেছিলাম। ভাগ্যদেবীর কৃপায় আবার দেখা পেলাম হিমালয়ান মোনালের। নিচের চোখে এর সৌন্দর্য দেখলেই বোঝা যায় কেন এটি উত্ত‍রাখন্ড, হিমাচলের স্টেট বার্ড ও নেপালের ন্যাশনাল বার্ড। এমন কোন রং নেই যা নেই তার গায়ে। পেখমছাড়া ময়ূরের ছোট ভার্সন যেন। প্রায় সতের মিনিট ধরে আমাকে নানান ভাবে পোজ্ দিয়ে বিদায় নিল সে। কিন্তু আমার ক্যামেরা ও লেন্সের জুমের সীমাবদ্ধতার কারনে ছবির গুনগতমানে সন্তুষ্ট হতে পারলাম না।

হিমালয়ান মোনাল

রাতের আকাশে আকাশগঙ্গা :

জমে যাওয়ার মত ঠান্ডা অক্টোবরের প্রথমেই তার দোসর হাড়কাঁপানো হাওয়া। ফলে গিয়ে ঘরবন্দি হলাম। বাবা তখন সজোরে নাক ডেকে চলেছে। ঘন্টাখানেক পর উঠতেই হল রাতের খাবারের জন্য তাগাদা দেবার জন্য। ঘরের বাইরে খোলা আকাশের নীচে বেরিয়ে প্রথমেই চোখ গেল আকাশের দিকে। পরিষ্কার সুদৃশ্য নক্ষত্ররাজি দেখে চোখ আটকে গেল। খালি চোখে একি দেখছি ! এতো আকাশগঙ্গা ছাড়া আর কিছু নয়। ধারনা নিশ্চিত করার জন্য মোবাইলের কম্পাস খুলে দিকনির্ণয় করে মিল্কি ওয়ের অবস্থান নিশ্চিত করলাম সঠিক ভাবে। হোটেলের রান্নাঘরের পিছনদিকে ছিল সেটি। কিন্তু আমি অ্যাস্ট্রোফটোগ্ৰাফি করিনি আগে। কোন উপকরণও নেই তেমন। আবশ্যিক উপকরণ ট্রাইপডও নেই তাই মনটা দমে গেল। ভাবলাম কোন শক্তপোক্ত কিছু একটার উপর ক্যামেরা মাউন্ট করে চেষ্টা করবো। ক্যামেরা সেটিংসটা মোটামুটি জানা ছিল। রাতের খাওয়া মিটিয়ে বাবাকে ঘরে পাঠিয়ে নেগিজি কে জানিয়ে বুগিয়ালে এলাম। দেখলাম রাস্তায় পাথর বাধাঁনোর জন্য একপাশে বিরাট বিরাট লোহার খাঁচার মত নেট রাখা আছে। প্রয়োজনীয় সেটিংস করে একটা টাওয়েল ও একটা পাপোশের সাহায্যে ক্যামেরা তাক করলাম। ঘন্টাখানেক ধরে বেশ কিছু ছবির তোলার পর কয়েকটি মোটামুটি ভালোই এল। রাত বেশি না মাত্র দশটা বাজে। কি যে অপরিসীম ঠান্ডা বাইরে কল্পনা করার নয়। পরেরদিন চন্দ্রশীলা যেতে হবে ভোর চারটেয় উঠে সূর্যোদয়ের জন্য। প্রয়োজন পড়েনা তাও একজন গাইড নিয়েছি বাবার জন্য। কিন্তু আমার ঘুম আসছেনা। মোনাল, মিল্কি ওয়ে, সূর্যোদয় সবমিলিয়ে উত্তেজনা হচ্ছে।

মিল্কিওয়ে

মিল্কিওয়ে

হঠাৎ আশঙ্কা :

ঘুম ভাঙল একটার দিকে। যাবতীয় আশঙ্কাকে সত্যি করে বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়েছে। বন্ধ ঘরে অস্বাভাবিক ভাবে দ্রুত ব্রিদিং হচ্ছে বাবার। একটা মোমবাতি তখনও জ্বলছে। পলকেই মোমবাতি নিভিয়ে জানালা খুলে দিলাম। যদি কিছু লাভ হয়। আমি জানালা দিয়ে আসা তীব্র কনকনে হাওয়ায় ও ততোধিক ভয়ে সিঁটিয়ে গেছি। বাবা কিন্তু বেশি চিন্তিত হলনা। ব্যাগ থেকে হোমিওপ্যাথি ওষুধ বের করে খেয়ে নিল আর একবার টয়লেটে গিয়ে ফের এসে স্বভাবমত কম্বলমুড়ি দিয়ে শুয়ে গেল। কিন্তু আমার আর ঘুম এলোনা। আমি কান খাড়া করে বাবার ব্রিদিং ফ্রিকোয়েন্সি শুনতে থাকলাম। খানিক পরে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল কিন্তু খোলা জানালা আর বন্ধ করার সাহস দেখালাম না। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কখন জানিনা চারটের এলার্মে ঘুম ভেঙে গেল। বাবা বললো যাবেনা কারন চশমার কাঁচ সবসময় ঠাণ্ডায় জমে থাকছে তাই অন্ধকারে রাস্তা দেখতে পাবেনা। আর গতরাতের পর আমিও চাইছিলাম আরও উঁচুতে বাবা না যাক।

চন্দ্রশীলাতে সুর্যোদয় :

সূর্যোদয়ের প্রাকমুহূর্ত

চন্দ্রশীলা যাওয়ার রাস্তা বলে কিছু নেই। শুরুতে দশ মিনিট খাদের গা দিয়ে পাথ‍র ও বোল্ডার ডিঙিয়ে তারপর পাহাড়ের গা বেয়ে এঁকেবেঁকে উঠে যাওয়া রাস্তা। ইমার্জেন্সি লাইট ও টর্চের আলোর পথ চলছি। তার থেকেও বেশি আলো ক্ষীণ চাঁদ ও নক্ষত্রদের। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট পরে চন্দ্রশীলা টপে পৌঁছালাম। ৩৬০ ডিগ্ৰি ভিউ এখনকার। কনকনে হাওয়া থেকে বাঁচার কোন আশ্রয় নেই। একখানা বড় মাপের পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়লাম। পূর্ব দিক সাদা হয়ে উঠছে আস্তে আস্তে। আর রাত থাকতেই চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, কেদার, ত্রিশূল, বান্দরপুচ্ছ সাদা ঝকঝকে।



পাহাড়ের নিচে বসতির আলো তখনও উজ্জ্বল হয়ে আছে। ক্রমে সাদা থেকে কমলা হয়ে লাল হতে শুরু করল পুব দিক। উল্টো দিকের আকাশ রঙিন হল হলুদ, ম্যাজেন্টা রঙে। দু’পা নিচে লাল পতাকা দেওয়া একটি স্থান যেখানে রাবণ বধের পর মানসিক শান্তির জন্য রামচন্দ্র ধ্যান করেছিলেন। ধ্যান ক‍রার জন্য কেন এই স্থান নির্বাচন তা খুব সহজেই বোঝা যায়। জলের বোতলের গায়ে মোবাইল সেট করে সূর্যোদয় বন্দি করলাম টাইমল্যাপ্স ভিডিওর মাধ্যমে। আরও আধঘণ্টা অহেতুক বসে থাকার পর ধীরে ধীরে নেমে এলাম তুঙ্গনাথে। ব্রেকফাস্ট করে বিল মিটিয়ে চোপতা নামতে সময় লেগেছিল ওঠার সময়ের ঠিক অর্ধেক।

চন্দ্রশীলা থেকে সুর্যোদয়

চন্দ্রশীলাতে

দেওরিয়া তালের পথে :

পথ চলে গেছে চোপতা

চোপতায় ফিরে পড়লাম মহাবিপদে। গাড়ির স্ট্রাইক চলছিলই, তার উপর সারি পর্যন্ত বাসটিও ক্যান্সেল ছিল সেদিন। অগত্যা মাত্র ২৪ কিলোমিটার রাস্তা প্রাইভেট গাড়ি (সাদা নম্বর প্লেট) বেশি টাকায় ভাড়া করে গাড়ি ইউনিয়নের লোকেদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলে সারিগ্ৰাম পৌঁছাতে বেলা হয়ে গেল। সারিগ্ৰাম পৌঁছে দেওরিয়া তালের সবচেয়ে কাছের টেন্টটি ভাড়া করে স্থানীয় দোকানে ক্যামেরা চার্জ করে দেওরিয়া তালের উদ্দেশ্যে চড়াই ভাঙা শুরু করলাম। দেওরিয়ার রাস্তা খুবই এবড়ো-খেবড়ো ও খাড়াই। আড়াই কিলোমিটারের একটু বেশি রাস্তা পুরোটাই রডোডেনড্রনের দখলে। আমি পাখি চিনিনা তাই নাম বলতে পারলাম না। নানা আকারের ও  নানা রঙের হাজারো পাখির সমাবেশে পথটি খুবই উপভোগ্য হয়ে উঠল। পৌঁছানোর পর তুমুল শিলাবৃষ্টিতে পুরো এলাকা সাদা হয়ে গেল। ডোম টেন্টে স্লিপিং ব্যাগের মধ্যে জঙ্গলের ধারে রাত কাটানোয় এত যে রোমাঞ্চ থাকতে পারে আগে ভাবিনি।

দেওরিতালের সাথে চৌখাম্বার লুকোচুরি

সকালে সূর্যোদয়ের আগেই পৌঁছে গেলাম লেকের পাড়ে জলের ধারে। পছন্দসই জায়গা বেছে অপেক্ষা করে রইলাম তালের জলে চৌখাম্বার রাজকীয় প্রতিবিম্ব বন্দি করব বলে। প্রায় ঘন্টাখানেক পর ছবিপর্ব মিটলে হেঁটে লেকের পাড় দিয়ে ওয়াচ টাওয়ার পর্যন্ত গেলাম। বিদেশি কলাকুশলীদের নিয়ে লেকের পাড়ে শ্যুটিং হচ্ছিল। তারপর আরও ঘন্টাখানেক পরে টেন্টে ফিরে ব্রেকফাস্ট করে নিচে নেমে এলাম। যথারীতি বাস নেই। এক স্থানীয় হোটেল মালিক ২০০ টাকার বিনিময়ে নিজের গাড়ি করে আমাদের পাঁচ কিলোমিটার দূরে তালা/তালাব নামক স্থানে উখিমঠ গামী বাস ধরিয়ে দিলেন। উখিমঠ পৌঁছে বাসের অপ্রতুলতার কারনে আমরা রুদ্রপ্রয়াগের বেশি আর এদিন এগোতে পারলাম না। আর অন্ধকার হয়ে যাওয়ার জন্য অলকানন্দা ও মন্দাকিনীর সঙ্গমও দেখতে পেলাম না। হয়তো ইচ্ছে করেই কিছু জায়গা অদেখা থেকে যায় পরে আবার কখনও আমাদের টেনে আনবে বলে।

চৌখাম্বার প্রতিফলন দেওরিতালে

দেবভূমিকে বিদায় জানানোর পালা :

পরদিন সকাল ছ’টার ঋষিকেশ গামী বাসে চেপে দুপুরে ঋষিকেশ পৌঁছালাম। ঋষিকেশের গঙ্গার পুণ্য পবিত্র রূপ প্রত্যক্ষ করে নিজেদের ধন্য করলাম। সময়ের অভাবে কার্তিকস্বামী মন্দির আর যাওয়া হয়ে উঠল না। কিন্তু প্রথমবার দেবতাদের বাসভূমি উত্তরাখণ্ডে এসে, দেবতাদের বহু বিচিত্র রূপকে এত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করে যে স্বর্গীয় প্রাপ্তিতে অন্তর পূর্ণ হয়েছিল, তাতে কী দেখলাম না তার অভাব মনে প্রায় ছিল না বললেই চলে। বরং যা কিছু পেলাম, যা কিছু দেখলাম, তার রেশ মন জুড়ে রইল‌। আর সবকিছুর উপর আমার বাড়তি পাওনা হল, প্রকৃতির এই উদার সান্নিধ্যে এসে আমার পরম আপনার জন, আমার জন্মদাতাকে নতুন করে অনুভব করতে পারা। প্রথম অভিজ্ঞতার আনন্দে তাঁর শিশুসুলভ সরল উচ্ছ্বাস ভরিয়ে দিল আমাকে, পরিতৃপ্তির সুখ ভিজিয়ে দিল মন। বড়োই আশঙ্কা নিয়ে এসেছিলাম এখানে, বাবার ইচ্ছে পূরণ হবে তো! তখনও বুঝিনি বাবার সে ইচ্ছে পূরণের মধ্যে দিয়ে আমার ইচ্ছেটুকু এইভাবে সার্থকতা লাভ করবে। তাই আমার  বহুদিনের সেই সাধকে রূপায়িত করে তোলার জন্য মনের আনন্দে দেবভূমির সকল দেবতাদের উদ্দেশ্য আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও প্রণাম জানিয়ে, মনে মনে আবার কখনও ফিরে আসার প্রার্থনা জানিয়ে বিদায় নিলাম।

দেওরিতালের পাশে বুগিয়ালে

কিছু তথ্য :

#পুরো ট্রিপের মোট খরচ ১২৩৯০ টাকা দুজনের। বর্ধমান থেকে বর্ধমান পর্যন্ত সব সমেত।
# তুঙ্গনাথে গণেশ হোটেল : ৯৪১২৯৪৮৬২৭
# দেওরিয়া তালের জন্য লাখপত্ সিং নেগি ৮৪৪৯২১৭৭৪১



#কিছু খুচরো খরচের বিবরণ :

* হরিদ্বার থেকে উখিমঠ বাস ভাড়া ৩০০ টাকা।
* উখিমঠ থেকে চোপতা ৩০ টাকা।
* তুঙ্গনাথে একরাত থাকা,খাওয়া ও পরের দিন ব্রেকফাস্ট পর্যন্ত মোট খরচ ১১০০ টাকা।
* চোপতা থেকে সারিগ্ৰাম গাড়ি ভাড়া ১৫০০।
* দেওরিয়া তালে টেন্টে একরাত থাকা খাওয়া এন্ট্রি ফি ও ব্রেকফাস্ট সমেত মোট খরচ ১২৫০ টাকা।
* রুদ্রপ্রয়াগ থেকে ঋষিকেশ বাস ভাড়া ২০০ টাকা।
* ঋষিকেশ থেকে হরিদ্বার অটো ভাড়া ৭০ টাকা।


This content has been written by Mr. Avijit Goldar. The beautiful pictures of this route has also been clicked by the writer.





1 Comment

  1. Awesome…splendid….
    Your description excellent and lots more…heartfelt thanx

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement