TRAVEL GUIDE ON KINNAUR VALLEY

TRAVEL GUIDE ON KINNAUR VALLEY

TRAVEL GUIDE ON KINNAUR VALLEY – হিমাচলের বিস্ময় : কিন্নর – অভিজিৎ গোলদারের কলমে

Kalpa in Kinnaur Valley

Kalpa in Kinnaur Valley

কিন্নর শব্দটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় কোন এক কৈশোর বেলায় প্রিয় লেখক বিভূতিভূষণের হাত ধরে। ঝিনুকের ভিতরে মুক্তোর মতোই রংচটা এক প্রচ্ছদের মধ্যে পেয়েছিলাম কিন্নরদল গল্পটির সন্ধান। গল্পের রেশ হয়তো কেটে গিয়েছিল কিন্তু চলচ্চিত্রায়নের সুবাদে পুরোনো ভালোলাগা আবার ফিরে এসেছিল কলেজে পড়ার সময়। তখনই আবার কিন্নর নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা অনুষঙ্গ মনে ঢেউয়ের মত দোলা দিয়ে গেল। কারা সেই অপরূপ কিন্নর-কিন্নরীর দল যারা দেবসভায় নৃত্যশিল্পের উৎকর্ষে মনভোলায় দেবতাদের। কেমন সেই কিন্নর দেশ যেখানে বিহার করে সেই সুন্দরেরা। জানিনা কখনও এসব প্রশ্নে অজান্তে আনমনা হয়েছি কিনা তবে বেড়ানোর নেশাটা পেয়ে বসার সঙ্গে সঙ্গে কিন্নরদের দেশ দেখার শখটা মাথায় ঘুরপাক খেতো বারবার। তাই এবারের পুজোয় গন্তব্য ঠিক হয়েছিল দেবভূমি হিমাচলের গৌরবান্বিত সৌন্দর্য স্থল কিন্নরভূমি। হেমন্তের সেই অপূর্ব রঙের শোভা, বিচিত্র স্বাদেগন্ধে অতুলনীয় আপেল বাগিচা, তুষারধবল পর্বতচূড়া, উচ্ছ্বসিত স্রোতস্বিনীর মোহময়ী রূপ-এভাবে কিন্নরদের দেশ আমায় জয় করে নেবে যাওয়ার আগে ভাবিনি।

Ceader tree - Enroute to Shimla Mall

Ceader tree – Enroute to Shimla Mall

দেবভূমি হিমাচলে এই নিয়ে তৃতীয়বার আগমন। কিন্ত এবারেও টয়ট্রেনে চাপার সৌভাগ্য হয়ে উঠলো না। আমাদের টিকিট ও লাস্ট কনফার্ম টিকিটের মাঝে সামান্য কয়েক ধাপ বাকি রেখে শিবালিক এক্সপ্রেস ক্ষান্ত হল। বেজার মুখে গাড়িবন্দি হয়ে হরিয়ানা সীমান্ত পার করে দেবভূমি হিমাচলে আবারও প্রবেশ করলাম। সিমলার যে হোটেলে আছি সেটা এত সুন্দর জায়গায় যে বলে বোঝানো যাবেনা। হোটেলের মান একদম সাধারণ, বাকি পরিসেবাও যথেষ্ট নয় কিন্তু অবস্থানগত কারণে বা গুণে তা হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে অনন্য। জাখু টেম্পলের কাছাকাছি এর অবস্থান। ঠাস বুনোট সিডারের জঙ্গলের মাঝে একাকী নিঃসঙ্গ এই হোটেল। সিমলা ম্যালের মাত্র দেড় কিলোমিটারের মধ্যেই এমন সুন্দর প্রকৃতির সান্নিধ্য আপ্লুত করবেই। লাঞ্চের পর হোটেলের ছাদে একপ্রস্থ রোদ পোহানোর পর বেরিয়ে পড়েছি সিমলা ম্যালের উদ্দেশ্যে। গাড়ির সুবিধা থাকলেও ঘন জঙ্গলের মাঝ বরাবর পায়ে হেঁটে যাবার লোভ সামলাতেই পারিনি। সুন্দর ঝকঝকে চড়াই উৎরাই রাস্তা তবে গাড়ির ভিড় একদমই নেই। সিমলায় প্রথমবার এলাম কিন্তু হাজারো শোনা সেই গিজগিজে ভিড় বা নোংরার চিহ্নমাত্র কোথাও নেই এই পথের কোথাও। বেশ খানিকটা ক্যালোরি ঝরিয়ে ম্যালে পৌঁছালাম ঘন্টাখানেক পর। না একঘন্টা দূরত্বের রাস্তা একদমই নয়, বড়জোর কিলোমিটার দেড়েক। ল্যাদ খেতে খেতে চলায় বেশীক্ষণ সময় লেগে গেল। ম্যালে এসে সেই গিজগিজে ভিড় উপলব্ধি করলাম। সিমলায় প্রথমবার এলাম তাই আগে কি ছিল আর এখন কি নষ্ট হয়েছে সে সম্বন্ধে ধারনা একদমই ছিলনা। আমার দেখা এই সিমলা খুব সুন্দর করে সাজানো, গোছানো। অনেকে বলেন মানুষের ভিড় সিমলা ম্যালে বড্ড বেশি কিন্তু মানুষগুলোই তো আমরা। আমরা নিজেরাই ভিড় করবো আর নিজেরাই দোষারোপ করবো সেটা সবসময় ঠিক নয়। যাইহোক বেশ কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক উদ্দেশ্যহীন ভাবে হাঁটাহাঁটি করে কফি, সফ্টি ও বেশ কিছু খুচরো খাবার খেয়ে আবারো হাঁটাপথেই হোটেলে ফিরলাম। অন্ধকার পাহাড়ি রাস্তা বেশ আলসে আমেজ তৈরি করে দিয়ে গেল প্রথমদিন। আগামীকাল আমরা প্রবেশ কিন্নরের অন্দরে।

Shimla Mall

Shimla Mall

Evening view from Shimla Mall

Evening view from Shimla Mall

সকাল সকাল একদম রেডি হয়ে বসে আছি কিন্তু ড্রাইভারের দেখা নেই। আমরা হলাম সেই সব মানুষজনের প্রতিনিধি যারা প্লেন ছাড়তে আধঘণ্টা দেরি হলে হাসিমুখে রানওয়ের বাকিদের টেক-ওফ দেখবে বা লোকাল ট্রেনের বগিতে বসে এক্সপ্রেস ট্রেনকে আরামসে পাস করিয়ে দেবে কিন্তু বেড়াতে গিয়ে ড্রাইভারের পাঁচমিনিট দেরি বরদাস্ত করবেনা। বেড়ানোর দিনগুলোতে বিড়ম্বনা কেই বা চায়। যাইহোক পুরো আধঘণ্টা দেরিতে গাড়ি ছাড়লো সাংলার উদ্দেশ্যে। শুরুতে ড্রাইভারের দেরি ও শহরের জ্যাম আমাদের একটু বিরক্তি দিলেও খানিক পরেই শহর ছাড়াতেই তা ভ্যানিশ হয়ে গেল। সিমলা থেকে কুফরি পর্যন্ত পুরোটাই পড়ে সিমলা রিজার্ভ ফরেস্ট স্যাংচুয়ারির মধ্যে। তাই স্বভাবতই পুরোটাই ‘ছায়া সুনিবিড় শান্তির নীড়’।

Night view of Mall

Night view of Mall

একদিনে সিমলা থেকে সাংলা পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করার জন্য আমাদের কুফরি যাওয়া সম্ভব হয়নি। পরিবর্তে আমরা গিয়েছিলাম নারকান্ডার হাটু পিক ও হাটু মাতার মন্দির। হাটু মাতা মা কালীর অন্যতম রূপ। জৈষ্ঠ্য মাসের প্রথম রবিবার এখানে মহা সমারোহে পুজো হয়। আশেপাশের গ্ৰাম থেকে প্রচুর পূণ্যার্থির আগমন ঘটে ঐসময়। মন্দিরের পাশে প্রায় স্টোভের মত দেখতে পাথরের একটি ভাঙা স্তুপ আছে। স্থানীয় বিশ্বাস মতে অজ্ঞাতবাসের সময় পান্ডবরা এখানে রান্না করে খেয়েছিলেন কিছুদিন। মন্দির ও তার মহিমার পাশাপাশি হাটু পিক যাওয়ার রাস্তাটাও অসম্ভব সুন্দর। এই রাস্তার বেশ কয়েকটি বাঁক আপনাকে কাশ্মীরের কথা মনে করাবে। মাঝে একটা কালো জলের ছোট্ট ডোবা সদৃশ লেকে খুব সুন্দর বরফঢাকা পাহাড়ের প্রতিবিম্ব দেখা যায়। আট কিলোমিটার রাস্তার প্রায় পুরোটাই পিচের তবে অত্যন্ত সরু। মোটর সাইকেলে বা হেঁটে ওঠা খুবই রোমাঞ্চকর হতে পারে যদি আপনার কাছে সময় ও উপায় থাকে।

Hatu Peak temple

Hatu Peak temple

এরপর ক্রমে ক্রমে পেরিয়ে এলাম রামপুর, সারাহান ও করছাম। করছাম থেকে বাঁদিকে কল্পার রাস্তা রেখে ডানদিকে ব্রিজ পেরিয়ে সাংলার রাস্তা ধরলাম। সাংলা পৌঁছানোর পর হোমস্টে খুঁজতে গিয়ে ড্রাইভার পথ হারাল। একবার নয় দুইবার ফেল করার পর অগতির গতি সেই গুগল্ ম্যাপ আমাদের উদ্ধার করে। যে শতদ্রু নদী (Sutlej) কিঙ্গল থেকে করছাম পর্যন্ত আমাদের সঙ্গ দিয়ে নিয়ে এলো সে এখান থেকে অপেক্ষাকৃত ক্ষীণকটি হয়ে বসপা নামধারণ করে ভারতবর্ষের শেষ গ্ৰাম ছিটকুল পর্যন্ত গেছে। হোমস্টে-র রাস্তার শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর বেশ খানিকটা এবড়ো থেবড়ো অন্ধকার রাস্তায় চলতে বাধ্য হলাম। ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে নিজের ভাগ‍্যকে দোষারোপ করতে করতে একটু দুরেই হোমস্টে দেখতে পেলাম।

কিন্তু যাবতীয় মনখারাপ অচিরেই হাওয়া হল যখন অনুভব করলাম আমরা অন্ধকারে হেঁটে চলেছি আপেল বাগানের মধ্যে দিয়ে। শেষ অক্টোবরের অবশিষ্ট নধর আপেলগুলো গাছের ভিতর থেকেই স্বাগত জানাচ্ছিল আমাদের। সারাদিনের লম্বা জার্নি আর প্রচন্ড ঠান্ডার মধ্যেও আমরা লাগেজ রেখে হোমস্টের বাইরে বেরিয়ে এলাম। একটু আপেলের সান্নিধ্যে আসার আশা নিয়ে। সামনে পুরোটা আপেল বাগান। খানিকটা নীচ দিয়ে বয়ে যাওয়া বসপা নদীর কলরব ও আকাশে অসম্পূর্ণ অথচ প্রবলভাবে হাজির চাঁদের নীচে দাঁড়িয়ে মনে হল কোন রূপকথার দেশে এসে পড়েছি। অনেকক্ষণ পর্যন্ত বাইরের ঠান্ডায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হল জাগতিক সবকিছু মিথ্যে, এটিই একমাত্র সত্য। এই সত্যের অন্বেষণেই তো ভ্রমণ পিপাসুরা আসে যুগে যুগে। প্রকৃতিকে গ্ৰহণ করার স্বল্প ক্ষমতা হয়তো ঈশ্বর আমায় দিয়েছেন তাই হয়তো উনি আমায় কখনো খালি হাতে ফেরাননা। অনেক ভ্রমণের অনেক স্মরণীয় মূহুর্তের মধ্যে এটিও তাই নিজ দাবিতে ঢুকে পড়লো অচিরেই।

Apple tree in Kalpa

Apple tree in Kalpa

সাংলা ভ্যালিতে প্রকৃতির একদম কোলে এই অপূর্ব সুন্দর ভান্ডারি হোমস্টে। একটাই অসুবিধা, সেটা নন অ্যাটাচ বাথ। একরাতের আস্তানা তাই এটা নিয়ে বেশি মাথা ঘামাইনি। আমাদের আজকের গন্তব্য রকছাম হয়ে চীন সীমান্তের দিকের শেষ গ্ৰাম ছিটকুল। আমার মতে হিমাচল প্রদেশের মধ্যে সম্ভবত সবথেকে আন-এক্সপ্লোর্ড এরিয়া এই কিন্নর। সেই কারণেই প্রকৃতি একদম অটুট। রকছাম পৌছে স্রোতস্বিনী বসপা-র কাছে না গিয়ে পারা যায় ! কি যে সুন্দর সেই বসপা সমন্বিত রকছাম ভ্যালি তা বলে বোঝানো দায়। দু’দন্ড তার পাড়ে না বসলে তাকে নিবিড় করে পাওয়া কঠিন, হয়তো বা সেও দেয়না ধরা ক্ষণস্থায়ী পথিক কে। আমরাও হতভাগ্য সেই না পাওয়ারই দলে। কি আর করা যাবে মন যে পড়ে আমার সেই ছিটকুলে। কিন্নর আসার আগে মোটামুটি বুঝেছিলাম অন‍্যতম সেরা বা হয়তো সেরাই এই ছিটকুল স্থানটি। শেষ দু’চারটে বাঁক নিয়ে হোটেলগুলো পার করে নদীর পাড় পর্যন্ত গাড়ি পৌঁছালে দেখতে পেলাম সেখানে একটি গভর্নমেন্ট হাই স্কুল। হায় ঈশ্বর ! এখানে কারা পড়াশোনা করে আর কারাই বা পড়ায়! পড়াশোনা কি আদৌ করা সম্ভব এখানে। প্রকৃতির এই মুক্তমঞ্চের রসাস্বাদনকারী সেই সৌভাগ্যবানদের প্রতি একরাশ হিংসা অনুভূত হল মনের অগোচরে।

Sangla Valley

Sangla Valley

বসপা নদীর একদম পাড়ে পৌঁছে চোখে একদম ঘোর লেগে যায় সৌন্দর্যের। একটু শখ হয়েছিল নদীর জলে পা ডোবানোর। পা ডোবাতেই নিমেষে অবশ হয়ে গেল, এমনকি পা আছে না নেই তাও বুঝতে পারছিলাম না। অনেকখানি ইচ্ছামত সময় কাটালাম যে যার মতন ছড়িয়ে ছিটিয়ে। উপলব্ধি করলাম প্রকৃতিকে পেতে চাইলে বাহুল্য ত্যাগ করতে হয়, মনের সংকীর্ণতা দূর করতে হয়। খুব কম জায়গাতেই গিয়ে এরকম দর্শন উপচে ওঠে মনে। ছিটকুলের সৌন্দর্য গুটিকতক শব্দের মাধ্যমে ধরার মত ক্ষমতা আমার একদমই নেই। তাই আর বিবরণে গেলাম না। ওখান থেকে আসতেই চাইছিল না মন। কিন্তু ফিরতেই হবে, কারণ আবার আসতে হবে তাই। কাল যেতে হবে আপেল ভ্যালি কল্পায়।

Sangla Valley

Sangla Valley

সকাল হল একটু দেরি করেই। আজ আমরা ছিলাম অন্য একটি দুর্দান্ত হোটেলে নাম তার উত্তরায়ণ। হোটেলের অনুমতি নিয়ে আমরা ছাদে ব্রেকফাস্ট করলাম। চারপাশের সৌন্দর্য বলার নয়। কিন্তু সময় বড় বালাই। অপ্রতুলতার কারণে সব জায়গায় ইচ্ছামত সময় কাটানো যায়না। এবং প্রত‍্যেকবারের মতোই নিজমনে ঠিক করলাম যে পরেরবার আরেকটু বেশি সময় নিয়ে আসবো এখানে। আমি জানি এটা কখনোই সম্ভব হয়না, তাও করলাম। এরপর পাততাড়ি গুটিয়ে চললাম কল্পার পথে। ছিটকুলের একটি বাঙালি হোটেলে কনকনে ঠান্ডায় আমরা আগেরদিন রোদে বসে ডাল, আলুপোস্ত ও চিকেন খেয়েছিলাম। অমৃত ছিল সে সুখাদ‍্য। এমনটা নয় যে এর থেকে সুখাদ‍্য কখনোই খাইনি। কিন্তু স্থান ও কাল ভেদে তা ছিল অদ্বিতীয়। এরপর করছাম ড্যামের কাছে আমরা একটু দাঁড়ালাম ছোট ব্রেক নিতে। মনুষ্যসৃষ্ট হলেও আলাদা করে করছাম ড্যাম কিন্তু যথেষ্ট আবেদন রাখে ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে। পান্না সবুজ তার জলের রং। রং দেখে লাগে রীতিমতো বিস্ময়।

Karcham Dam - Enroute to Kalpa

Karcham Dam – Enroute to Kalpa

ড্যাম ছাড়িয়ে এগিয়ে চললাম। সঙ্গী এবার শতদ্রু নদী। সমতলের মানুষ বলেই হয়তো একই ধরনের নানান পাহাড়ি নদী দেখেও আদিখ্যেতা দূর হয়না। এক্ষেত্রেও তাই শতদ্রু তার স্বভাবসিদ্ধ ভাবেই আমাদের মন জয় করে নিল অক্লেশে। পোয়ারি পৌঁছে আমরা আঁকাবাঁকা পথে বাঁদিক ধরে উঠতে শুরু করলাম আর সোজা মসৃণ রাস্তাটা চলে গেল স্পিতি অভিমুখে। রোঘি গ্ৰামে ঢোকার কয়েক কিলোমিটার আগে থেকেই শুরু হয়ে গেল আপেল সাম্রাজ্য। এত গাছভর্তি আপেল কোন জায়গায় দেখিনি আজ পর্যন্ত। কাশ্মীরের কথা মাথায় রেখেই বলছি। অক্টোবরের শেষ হবার মুখে তাই প্রায় সব বাগানেই আপেল পাড়া শেষ পর্যায়ে চলছে। রয়্যাল আপেল, গোল্ডেন আপেল আরও না জানি কত ধরনের আপেল আছে এই কল্পায়। এরকমই একটি ফলন্ত বাগানে বাগান মালিকের অনুপস্থিতিতে আপেল পাড়ার কাজে নিযুক্ত শ্রমিকদের অনুমতিতে আপেলে হাত না দেবার শর্তে ঢুকতে পেলাম। না ছিঁড়লেও হাত না দেবার প্রতিশ্রুতি রাখতে পারলাম না মানবগুণে। কেমন যেন পাগল পাগল লাগছিল ওই আপেল রাজত্বে। শুনলাম সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে ওদের সারাদিন আপেল পাড়ার বৃত্তান্ত। ওরা মালিকের চোখরাঙানোর ভয় উপেক্ষা করে আমাদের অল্প সময়ের জন্য বাগানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় আমরা পেয়েছিলাম হাতে স্বর্গ। কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তাই দুশো টাকা হাতে দিতে গেলে তারা কিছুতেই নিতে চায়নি প্রথমে। পরে জোরাজুরি করাতে টাকাটা নিলেও মাথাপিছু চার-পাঁচটা করে লাল টুকটুকে রসালো আপেল ছুঁড়ে দিয়েছিল গাছ থেকেই। হিসেব করে দেখা গেল দুশো টাকার বেশিই ওরা ফেরত দিয়েছে আমাদের। আপেল বাগিচায় দাড়িয়ে গাছের সদ্য ছেঁড়া নধর আপেল যে খেয়েছে সেই জানে কি তার স্বাদ। তার প্রতিটা কামড়ে থুতনি বেয়ে রস গড়ায়।

Chitkul

Chitkul

এরপর চিনি গ্ৰামের রাস্তায় পড়ল কল্পার বিখ্যাত সুইসাইড পয়েন্ট। আলাদা করে সৌন্দর্য কিছুই নেই। শুধু একটাই কথা মনে এল এখানে পৌঁছে কারও মরার সাধ হয় কি করে! ওখান থেকে পিঁপড়ের থেকেও ছোট লাগছিল নিচের রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোকে। নিচ তাকালেই মাথা ঘোরে। এগিয়ে চললাম আজকের গন্তব্যের দিকে। আজ আস্তানা চিনি গ্ৰামের নারায়ন-নাগিনী মন্দিরের কাছে হোটেল ব্লু লোটাস। এটি একজন বাঙালি ভদ্রলোকের হোটেল। যদিও পরিষেবা সাধারণ মানের তবে যেটা সব ভুলিয়ে দেয় সেটা হল হোটেলের ভিউ। ব্যালকনিতে দাঁড়ালে পুরো রেঞ্জ ধরা দেয় চোখের সামনে। ডিনারে বেগুন ভাজা, আলুপোস্ত আর স্থানীয় চিকেন কারি খেতে খেতে মনে হচ্ছিল বেড়ানো তো শেষ এবার বাড়ি ফেরার আগে পরের ট্যুরটা ফিক্স করে ফেলতে হবে। বেড়ানো ফু্রিয়ে এলে এই ভাবনাটা প্রতিবারই হয়। এত আগাম পরিকল্পনায় আগামী গন্তব্য সম্পূর্ণ নির্দিষ্ট করা না গেলেও এতে ট্যুর শেষের মনখারাপটা খানিকটা কমে। এবার ফিরতে হবে কিন্নরভূমি থেকে মনুষ্য অধ্যুষিত ভূমিতে। বা বলা ভালো স্বর্গ থেকে মর্ত‍্যে। সঙ্গী হবে এই মায়ানগরীর মনোমুগ্ধকর অভিজ্ঞতা। কিন্নরদেশের প্রকৃতির বিচিত্র বর্ণশোভা, কিন্নর-কিন্নরীদের সুমিষ্ট গন্ধবাহী বাতাস মনে যে মাদকতাময় অনুভূতির রেশ ছড়িয়ে দিল, তাকে পরম আনন্দে হৃদয়ে মেখে রওনা হলাম চেনা আকাশ বাতাসের অভিমুখে।

Chitkul, this picture is taken from a restaurant named 'Hindusthan ka aakhri dhaaba'

Chitkul, this picture is taken from a restaurant named ‘Hindusthan ka aakhri dhaaba’

Evening snacks

Evening snacks

কোথায় থাকবেন

সিমলা – হোটেল সিডার ট্রি – 09816076457
সাংলা – ভান্ডারি হোমস্টে – 09888897989 ,
হোটেল উত্তরায়ন – 09805214007
কল্পা – হোটেল ব্লু লোটাস – 09816188658

গাড়ি ওমপ্রকাশ (ওমি), স্করপিও
ভাড়া ৪০০০ টাকা প্রতিদিন (দরদাম আবশ্যক)

কি দেখবেন

সিমলা থেকে – সিমলা ম্যাল, জাখু মন্দির, সিমলা কালিবাড়ি, নালদেরা, কুফরি, চেইল, মাশোবরা।

সাংলা থেকে – সাংলা ভ্যালি, রকছাম, ছিটকুল, করছাম ড্যাম, কামরু ফোর্ট, বাতসেরি গ্ৰাম।

কল্পা থেকে – কিন্নর কৈলাশ শৃঙ্গ, রোঘি গ্ৰাম, সুইসাইড পয়েন্ট, চিনি গ্ৰাম, নারায়ন-নাগিনী মন্দির, কোঠি।

Colorful Kalpa

Colorful Kalpa

কীভাবে যাবেন

** কলকাতা থেকে ট্রেনে কালকা, কালকা থেকে টয়ট্রেনে সিমলা অথবা কলকাতা থেকে প্লেনে দিল্লি/ চন্ডিগড়। ওখান থেকে গাড়িতে সিমলা।

** সিমলা থেকে সারাহান, সারাহান থেকে সাংলা, সাংলা থেকে ছিটকুল ঘুরে সাংলা অথবা সরাসরি কল্পা। কল্পায় সাইটসিয়িং করে সিমলা ফেরত।

** এছাড়াও হিমাচল পরিবহনের বাস চলে চন্ডিগড় ও সিমলা থেকে। বাসে যেতে পারবেন কিন্নরের হেড কোয়ার্টার রেকংপিও ও চাইলে কাজ়া পর্যন্ত।

** কিন্নর ভ্রমণের সেরা সময় এপ্রিল-মে, অক্টোবর-নভেম্বর। বরফের জন্য ডিসেম্বর-মার্চ।

From Hotel Balcony, Kalpa

From Hotel Balcony, Kalpa

দেখে রাখুন

* কালকা থেকে সিমলা ৮৭ কিলোমিটার।
* চন্ডিগড় থেকে সিমলা ১০৭ কিলোমিটার।
* সিমলা থেকে সারাহান ১৬৩ কিলোমিটার।
* সারাহান থেকে সাংলা ৮৩ কিলোমিটার।
* সাংলা থেকে ছিটকুল ২৪ কিলোমিটার।
* সাংলা থেকে কল্পা ৪৯ কিলোমিটার।

** যদি স্পিতি যান তাহলে…
* কল্পা থেকে নাকো ১০৯ কিলোমিটার।
* নাকো থেকে টাবো ৬৪ কিলোমিটার।
* টাবো থেকে কাজ়া ৪৮ কিলোমিটার।

From a restaurant enroute to Sangla

From a restaurant enroute to Sangla

খেয়াল রাখুন

** গোটা কিন্নরে মোবাইল নেটওয়ার্ক ভালো, শুধু ছিটকুলে নেটওয়ার্ক পাবেন না। এছাড়া কল্পা থেকে স্পিতি যদি যান তাহলে নাকোর আগে স্পিলো নামক জায়গায় শেষবার ভালো নেটওয়ার্ক পাবেন। তারপর মোবাইল নেটওয়ার্কের আশা না রাখাই ভালো। বি.এস.এন.এল মাঝেমাঝে পাওয়া যাবে তবে অনিশ্চিত।

Reckong Peo

Reckong Peo

অনুরোধ :

স্থানীয় সংস্কৃতি বোঝার চেষ্টা করুন। স্থানীয় খাবার অবশ্যই ট্রাই করুন। স্থানীয় লোকজনের ছবি অনুমতি নিয়ে তবেই তুলুন। পাহাড়ের নির্মলতা রক্ষা করুন। প্লাস্টিক কাগজ ব্যবহারের পর ফেলবেন না। একটা বড় প্যাকেটে সব জমা করুন এবং পারলে রেল স্টেশন ও এয়ারপোর্টের ডাস্টবিন পর্যন্ত নিয়ে আসুন।

Narkanda, enroute to Hatu Peak temple

Narkanda, enroute to Hatu Peak temple


This content is written by Mr. Avijit Goldar. The beautiful pictures are also clicked by him.

 


 

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement