অরুণাচলের পথে

অরুণাচলের পথে

 শুনছ, এবারে পুজোয় অরুণাচল যাবে? উত্তর এল : গেলেই হয়। আন্দামান থেকে সবে ফ্লাইট রওনা দিয়েছে কলকাতার উদ্দেশ্যে, একটা ট্রিপ শেষ হতে না হতেই আরেকটা ট্রিপের প্ল্যান শুরু হয়ে গেল। এটাই ছিল শুরু। মে (যাত্রা শুরুর চারমাস আগে): টিকিট কাটা হয়ে গেল। জুলাই-আগস্ট: হোটেল বুকিং হয়ে গেল। সেপ্টেম্বর (যাত্রা শুরুর একমাস আগে) : আসাম, অরুণাচল এবং সমগ্র নর্থ বেঙ্গল জুড়ে প্রবল বর্ষণ, ফলস্বরূপ ভয়াবহ বন্যা ও ট্রেন লাইন ভেঙে যাওয়া। সেপ্টেম্বর (যাত্রা শুরুর দশ দিন আগে): সবে মাত্র ট্রেন চলাচল শুরু। আপ-ডাউনে 7-14 ঘন্টা লেট। সেপ্টেম্বর (যাত্রা শুরুর একদিন আগে): ডাউন ট্রেনটা রাইট টাইমে গুয়াহাটি ছাড়লো। আপ ট্রেন এখনো 7ঘন্টা দেরিতে চলছে। সেপ্টেম্বর: সকাল থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি, দুপুর দুপুর বৃষ্টি মাথায় নিয়েই হাওড়া স্টেশনে পৌঁছলাম, বাড়ির সবাই একত্রিত মিলিত হয়ে যথা সময়ে সারাইঘাট এক্সপ্রেস এ চেপে বসলাম। ট্রেন অন টাইম ছাড়লো। সারারাত বৃষ্টির টুপটাপ আর কু ঝিক ঝিক শব্দের কোলাজ শুনতে শুনতে সকালে অন টাইমে গুয়াহাটি পৌঁছলাম। গাড়ি আগে থেকেই বুক করা ছিল,মালপত্র সব সেট করে সোজা রওনা দিলাম ভালুকপঙ এর উদ্দেশ্যে। গুয়াহাটি থেকে তেজপুর হয়ে কালীভোমরা ব্রীজ পেরিয়ে ভালুকপঙ পৌঁছতে হয়, সময় লাগে প্রায় 6-7 ঘন্টা। তেজপুর আসামের সুন্দর একটি শহর। এখানে এয়ারপোর্ট ও আছে। কালীভোমরা ব্রিজের নিচদিয়ে বয়ে গেছে ব্রহ্মাপুত্র নদ, যেমনি তার রূপ,তেমনি কলেবর। এরপর কিছুটা এগিয়েই নামেরি অভয়ারণ্য। আবার বৃষ্টি শুরু হল। জঙ্গলের প্রতিটা পাতা যেন চির যৌবন পেয়েছে, চরাচর যেন সবুজ রং মেখে নিয়েছে, দূরে নীলচে পাহাড়ের কোলে সাদা মেঘ আদর খাচ্ছে। মোহময়ী জিয়াভরলি যেন অষ্টাদশী যুবতী। পৌঁছলাম অরুনাচলের চেকপোস্ট এ। কলকাতা থেকে প্রিন্ট করে আনা ইনার লাইন পারমিট ও পরিচয় পত্র দেখিয়ে অরুনাচলে ঢোকার অনুমতি মিলল। বৃষ্টিটা ধরে এসেছে, আমরা হোটেল এ ঢুকলাম। ঘরের কাঁচের জানালা দিয়ে পাহাড় ও জিয়াভরলি দেখা যাচ্ছে, এযেন...
পাংথাং : অফবিট ডেস্টিনেশন

পাংথাং : অফবিট ডেস্টিনেশন

          এই লেখার বিষয় একটা সেমি অফবিট জায়গা. কিরকম সেটা। সেই বর্ননাতেই আসছি। জায়গাটাকে খুজে পাওয়া আমার একটা অসাধারন আবিষ্কার বলেই আমি মনে করি। এখানে একটু বিস্তারিত ভাবে শেয়ার করি… যদি কারো ভালো লাগে।         জায়গাটার নাম পাংথাং। গ্যাঙ্গটকের থেকে বড়জোর দশ কিলোমিটার এগিয়ে। গ্যাঙ্গটকে যখন সবাই ঘামে, পাংথাঙে তখন হালকা চাদর লাগে. তাও ট্যুরিষ্ট স্পট হিসাবে খুব একটা পরিচিত নয়। কেউই আপনাকে ওখানে থাকার কথা বলবে না। তবে স্থানিয় লোকজন বা ড্রাইভারেরা চেনে। ড্রাইভারকে ওখানে থাকব বললে, সে কিছুক্ষন আপনাকে দেখে নিয়ে তারপর বলবে ব্যাঠিয়ে. উধার কাঁহা র‍্যাহ্না হ্যায়? সঙ্গত প্রশ্ন। কারন ওখানে হোটেল হোমষ্টে সেরকম নেই। তাই কোথায়, কিভাবে, কি ফিকিরে আপনি আস্তানা জুটিয়েছেন সেটা ড্রাইভারের মনে আসাটা স্বাভাবিক। তাকে উত্তরে বলতে হবে “সিকিম আর্মড ফোর্স ট্রেনিং সেন্টার কি বগোল মে জানা হ্যায়”. শুনেই সে জিজি বলে গাড়ি স্টার্ট করবে।       সে নাহয় হল। কিন্তু পাংথাঙে আছে টা কি যার জন্য আপনি যাবেন? কি বলি বলুন তো? আচ্ছা উল্টো করে বলি। পাংথাঙে কি কি নেই সেই হিসাবটা আগে দি। পাংথাঙে হোটেল নেই, হোমষ্টে নেই, মার্কেটিং করার দোকান বাজার নেই, গাড়ি ঘোড়ার উৎপাত নেই, আদেখলে সেলফিতোলা ট্যুরিষ্ট নেই, থেকে থেকে কারেন্ট বা নেটওয়ার্কও নেই হয়ে যায়. এমন কি যে বাড়িটাতে আপনি থাকবেন সেখানেও কেউ নেই। তিনতলা বাড়ির তিননম্বর তলাতেই আপনার থাকার ব্যবস্থা। বাকি দুটো তলা খাদের ভেতর. বাড়ি মালিক গ্যাংটকে থাকে। বাগনানে তার আদি বাড়ি। আপনার জন্য তিনি একটা ডবল বেড রুম, একটা লিভিং রুম, এট্যাচ খাদে ঝোলা ব্যাল্কনি এবং লাগোয়া বাথরুম সহ একটা কমপ্লিট সেটাপ দিয়ে দেবেন মাত্রই দিনপ্রতি পাঁচশ টাকা হিসাবে। নিজে চাবি নিয়ে ঢুকবেন, চাবি দিয়ে বেরোবেন. আপনিই মালিক। সুতরাং ওখানে আপনাকে ঘাঁটানোরও কেউ নেই। দুপুরে আর...
হিমাচলের কয়েকদিন

হিমাচলের কয়েকদিন

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (প্রথম পর্ব) ১লা মার্চ, ২০১৮। আজ দোল। নেট ঘেঁটে ঘেঁটে সিমলা মানালি চণ্ডীগড়ের লেখা পড়ে আর ছবি দেখে চোখে ছানি পড়ে গেছিলো। এদিকে গাদাখানেক লোকজন কোত্থেকে জানতে পেরে ফোন লাগিয়েছে, দাদা গাড়ি লাগেগা, হোটেল লাগেগা, এইসব। আমি আমার বিখ্যাত হিন্দিতে তাদের যথাসম্ভব নিরস্ত করছি। একজন তো বিরক্ত হয়ে বলেই বসল হোটেল লাগবে না তো কি গাছতলায় থাকবেন? সেই কবে টিকিট কাটা হয়েছে, সিমলার ঘর বুক করা হয়েছে। ব্যাস, তারপর দিন যেন আর কাটছেই না। শেষে কাল অফিসে সবাইকে টা টা করে বেরিয়ে মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল। সত্যি বলছি ফেব্রুয়ারির আঠাশ তারিখ, সবে মাইনে ঢুকেছে অ্যাকাউন্টে, অফিসে জেলাস পার্টি গুম হয়ে বসে আছে যেই শুনেছে দেড় সপ্তাহের ছুটিতে সিমলা মানালি বেড়াতে যাচ্ছি। এদিকে আমিও হ্যাপ্পি হোলি ইন অ্যাডভান্স বলে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছি।আজ রাতের ঘুমটা খুব জরুরি। কারণ কালকে রাতটা ট্রেনে জেগে কাটাবো। গড প্রমিস, একটুও ঘুমোবো না। ট্রেনে ঘুম আসে না তা নয়, ছোটবেলায় দোলনায় দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়ানো হত, ধেড়ে হয়ে যাওয়ার পরে একমাত্র ট্রেনেই দুলে দুলে ঘুমোনো যায়। কিন্তু কাল তো পূর্ণিমা, চারদিকে চাঁদের আলো পড়বে, আর আমি ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোবো এমন বেরসিক আমি নই। তাই বলে যে দাঁতে কলম আটকে কবিতা লিখব তাও নয়। শুধু বাইরের দিকে তাকিয়ে মোবাইলে খুব প্রিয় কিছু গান শুনব এরকম ইচ্ছে আছে। সক্কাল বেলা বাইরে চেঁচামেচি। পিচ্চি পিচ্চি সব বাচ্চাগুলো রং খেলতে বেরিয়ে পড়েছে। ধেড়েরা বারোটার পর বেরোবে, কারণ ওদের বারোটা অনেক আগেই বেজে গেছে। এমন ছুঁচো, কি একটা কিনতে একটু বেরিয়েছিলাম, বাঁদুরে রং লাগিয়ে দিলো। আমিও আচ্ছা করে কথা শুনিয়ে দিয়েছি ওর বাবা না কাকা কে একটা দাঁড়িয়েছিল ভুত হয়ে, তাকে। বুঝলাম, সাতটা চল্লিশে হাওড়া থেকে ট্রেন, যদি সুস্থভাবে যেতে হয়, তবে পাঁচটায় বেরোতে...
শিবখোলা-অহলদাঁড়া ভ্রমণকাহিনী

শিবখোলা-অহলদাঁড়া ভ্রমণকাহিনী

শিবখোলা-অহলদাঁড়া ভ্রমণকাহিনী : শীতের সন্ধ্যার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকে ভেদ করে যখন পূর্ণ-চন্দ্র তার অপরুপ রুপ-মাধুর্যের ডালি নিয়ে অহলদাঁড়ার পাহাড়ে উদ্ভাসিত হল তখন অপেক্ষমান বঙ্গকূলবর্গের আকর্ণরঞ্জিত হাস্যধারা এবং সম্মিলিত কলতান বৃক্ষকোটরে সুখনিদ্রামগ্ন বিহঙ্গকূলকেও জানান দিয়ে গেল “শহুরে অভ্যাসের দাসত্ব ধ্যানমগ্ন পাহাড়েও জলজ্যান্ত রুপে প্রতীয়মান” । চন্দ্রালোকিত অহলদাড়ার শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে দুরের কাঞ্চনজঙ্ঘার আবছা অবয়ব মনের ক্যানভাস রাঙিয়ে দিয়ে গেল, কিন্ত্তু ইঁট-কংক্রীটের জঙ্গল থেকে পালিয়ে এসেও রেহাই পেলাম কই? অপরাধ মার্জনা করবেন, অকস্মাৎ রবি ঠাকুরের প্রতি একটু জেলাস হয়ে পড়লাম, আমসত্ত্ব-দুধকলার কম্বিনেশনে হাপুস-হুপুস শব্দের মাঝেও একমাত্র তাঁর মতো মহামানব-ই পারেন চারপাশের লুকিয়ে থাকা নিস্তব্ধতাকে খুঁজে নিতে । ঘড়িতে সাড়ে ৮টা বাজার ইঙ্গিত মিলতেই পাহাড়ী দাজু এসে রাতের আহার শেষ করে ওদের তাড়াতাড়ি ছুটি দেবার মিনতি জানিয়ে গেল । কিন্তু মনে হলনা তা আদৌ কারোর ‘কর্ণ বেয়ে মর্মে পশিল’ । আরো আধঘন্টা জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহের পাহাড়ী ঠান্ডাটা উপেক্ষা করে কাটিয়ে দিলাম । শীতটা জাঁকিয়ে পড়ার উপক্রম হতেই ধীরলয়ে চন্দ্রশোভা অবলোকন করার লোকের সংখ্যাও কমতে থাকল । ঘড়ির কাঁটা ৯টা পেরোতেই রাতের রুটি-মাংসের বরাদ্দ উদরস্হ করে, গরম পানীয় জলের বোতল কব্জা করে যখন কোয়েচা কোম্পানী-নির্মিত তাঁবুর সামনে এসে দু-দন্ড দাঁড়ালাম, তখনও দুই বীরপুঙ্গব তাৎক্ষনিক স্বর্গসুখ লাভের আশায় কিংবা শীতজয়ের দুরন্ত প্রয়াসে নিভন্ত বনফায়ারের সামনে ঈশ্বরীয়(?) বোতলে স্বেচ্ছাবন্দী । তাঁবুর উষ্ণতায় নিজেকে সেঁকে নিতে নিতে তিন বান্ধব নিজেদের অস্হি-মজ্জা-চর্মকে শ্লিপিংব্যাগরূপী শীতবর্মের মাঝে সমর্পণ করলাম । ‘অদ্যই শেষ রজনী’, কাল ফিরতে হবে শহুরে কোলাহলমুখর কংক্রীটের জঙ্গলে যেখানে প্রচলিত প্রফেশনাল ইঁদুর-দৌড়ে আমিও এক অদক্ষ প্রতিযোগী । প্রকৃতি মায়ের কাছে প্রার্থণা করলাম এই ভ্রমণকে আবার রিওয়াইন্ড করে দেবার জন্য । বাস্তবে যদি নাও বা হয়, অন্ততঃ সুখস্বপ্নে… । ওয়েলস সাহেব কেন যে শুধু টাইমমেশিনের গল্পটা লিখেই ক্ষান্ত হলেন; ফরমূলাটা একবার হাতে পেলে লড়ে যেতাম । অতএব “মন চলো নিজ...
“দেবভূমি” – চতুর্থ পর্ব (মানা গ্রাম)

“দেবভূমি” – চতুর্থ পর্ব (মানা গ্রাম)

“দেবভূমি” – চতুর্থ পর্ব (মানা গ্রাম) কাল এসে পৌঁছেছি বদ্রীনাথ। বিকেলেই মন্দির দর্শন হয়ে গেছে। আজ সকালে আরেকবার মন্দির দেখে গাড়িতে উঠলুম, গন্তব্য ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’। কলকাতায় আজ বিজয়া দশমী। এখানে তার লেশমাত্র বোঝার উপায় নেই। মন্দিরের দিকে চেয়ে দেখি, চূড়ার স্বর্ণকলসগুলো কাঁচা রোদের আলোয় ঝকঝক করছে। সকাল ১০টা বাজে, আমরা রওনা দিলাম তিন কিমি দূরে মানাগ্রামের দিকে। বদ্রীনাথ থেকে মানা যাবার রাস্তার হাল খুবই খারাপ। ধস পড়ে বিপর্যস্ত রাস্তা, কিন্তু সমানে সারাইয়ের কাজ চলছে, তবু প্রকৃতির সাথে কি আর মানুষ পারে? চার-পাঁচদিন লড়াই করে যে জায়গাটা গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে, সেটাই পাঁচ সেকেন্ডের ধস এসে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। তবু কাজ চলছেই, একমনে। এখানকার মানুষদের ধৈর্য আর পরিশ্রম দেখে অবাক হতে হয়। পেল্লাই পেল্লাই পাথরগুলোকে একটা ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে টুকরো করছে। কাজ চলছে একটানা, যাতে ট্যুরিস্টদের কোনো অসুবিধে না হয়। মাঝে মাঝে পাহাড়ি ঝোড়ার জলে টায়ার ভিজিয়ে গাড়ি চলছে, কখনো খোলা কাঁচের মধ্যে দিয়ে ছুটে আসছে হিমশীতল ঝর্ণার জল। দেখতে দেখতে কখন যে পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। ঝকঝকে আবহাওয়া, পাশে পাশে চলছে নীলকণ্ঠ, নর-নারায়ণ আরো কত নাম না জানা হিমগিরি। তাদের গায়ের হিমবাহগুলো যেন শিরা-উপশিরার মত নামছে নদী হয়ে। হরিদ্বার থেকে বদ্রীনাথ হয়ে মানাগ্রাম অবধি পুরোটা একটিই জাতীয় সড়ক। কিন্তু এখানে এসে এই রাস্তার শেষ, এবার গ্রামের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি পথ ধরতে হবে। স্বাগত জানাচ্ছে একটা বোর্ড, তাতে লেখা, ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’য় আপনাকে স্বাগত। গাড়ি পার্ক করে গেট পেরিয়ে ঢুকলাম মানাগ্রামে। দেখতে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই, তাহলে এতো এতো লোক ছুটে আসে কেন? শুধু গ্রাম দেখতে? না, এই মানাগ্রাম শুধু ভারতের শেষ গ্রামই নয়, মহাভারতের মহাপ্রস্থানিক পর্বে আছে যে, এই মানা গ্রাম থেকেই শুরু হয়েছে স্বর্গের পথ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পরাজিত করে পাণ্ডবরা...