শিবখোলা-অহলদাঁড়া ভ্রমণকাহিনী

শিবখোলা-অহলদাঁড়া ভ্রমণকাহিনী

শিবখোলা-অহলদাঁড়া ভ্রমণকাহিনী :

শীতের সন্ধ্যার নিশ্ছিদ্র অন্ধকারকে ভেদ করে যখন পূর্ণ-চন্দ্র তার অপরুপ রুপ-মাধুর্যের ডালি নিয়ে অহলদাঁড়ার পাহাড়ে উদ্ভাসিত হল তখন অপেক্ষমান বঙ্গকূলবর্গের আকর্ণরঞ্জিত হাস্যধারা এবং সম্মিলিত কলতান বৃক্ষকোটরে সুখনিদ্রামগ্ন বিহঙ্গকূলকেও জানান দিয়ে গেল “শহুরে অভ্যাসের দাসত্ব ধ্যানমগ্ন পাহাড়েও জলজ্যান্ত রুপে প্রতীয়মান” ।

চন্দ্রালোকিত অহলদাড়ার শীর্ষদেশে দাঁড়িয়ে দুরের কাঞ্চনজঙ্ঘার আবছা অবয়ব মনের ক্যানভাস রাঙিয়ে দিয়ে গেল, কিন্ত্তু ইঁট-কংক্রীটের জঙ্গল থেকে পালিয়ে এসেও রেহাই পেলাম কই? অপরাধ মার্জনা করবেন, অকস্মাৎ রবি ঠাকুরের প্রতি একটু জেলাস হয়ে পড়লাম, আমসত্ত্ব-দুধকলার কম্বিনেশনে হাপুস-হুপুস শব্দের মাঝেও একমাত্র তাঁর মতো মহামানব-ই পারেন চারপাশের লুকিয়ে থাকা নিস্তব্ধতাকে খুঁজে নিতে । ঘড়িতে সাড়ে ৮টা বাজার ইঙ্গিত মিলতেই পাহাড়ী দাজু এসে রাতের আহার শেষ করে ওদের তাড়াতাড়ি ছুটি দেবার মিনতি জানিয়ে গেল । কিন্তু মনে হলনা তা আদৌ কারোর ‘কর্ণ বেয়ে মর্মে পশিল’ । আরো আধঘন্টা জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহের পাহাড়ী ঠান্ডাটা উপেক্ষা করে কাটিয়ে দিলাম । শীতটা জাঁকিয়ে পড়ার উপক্রম হতেই ধীরলয়ে চন্দ্রশোভা অবলোকন করার লোকের সংখ্যাও কমতে থাকল । ঘড়ির কাঁটা ৯টা পেরোতেই রাতের রুটি-মাংসের বরাদ্দ উদরস্হ করে, গরম পানীয় জলের বোতল কব্জা করে যখন কোয়েচা কোম্পানী-নির্মিত তাঁবুর সামনে এসে দু-দন্ড দাঁড়ালাম, তখনও দুই বীরপুঙ্গব তাৎক্ষনিক স্বর্গসুখ লাভের আশায় কিংবা শীতজয়ের দুরন্ত প্রয়াসে নিভন্ত বনফায়ারের সামনে ঈশ্বরীয়(?) বোতলে স্বেচ্ছাবন্দী । তাঁবুর উষ্ণতায় নিজেকে সেঁকে নিতে নিতে তিন বান্ধব নিজেদের অস্হি-মজ্জা-চর্মকে শ্লিপিংব্যাগরূপী শীতবর্মের মাঝে সমর্পণ করলাম । ‘অদ্যই শেষ রজনী’, কাল ফিরতে হবে শহুরে কোলাহলমুখর কংক্রীটের জঙ্গলে যেখানে প্রচলিত প্রফেশনাল ইঁদুর-দৌড়ে আমিও এক অদক্ষ প্রতিযোগী । প্রকৃতি মায়ের কাছে প্রার্থণা করলাম এই ভ্রমণকে আবার রিওয়াইন্ড করে দেবার জন্য । বাস্তবে যদি নাও বা হয়, অন্ততঃ সুখস্বপ্নে… । ওয়েলস সাহেব কেন যে শুধু টাইমমেশিনের গল্পটা লিখেই ক্ষান্ত হলেন; ফরমূলাটা একবার হাতে পেলে লড়ে যেতাম । অতএব “মন চলো নিজ নিকেতনে……………………”

নভেম্বরের এক সান্ধ্য-আড্ডায় আমিই অহলদাঁড়ার অপরূপ সূর্যাস্তের গল্পটা ফাঁদতেই বান্ধবকূলের এই স্বর্গীয় সুষমা নিজেদের চোখে অবলোকন করার সাধ জাগ্রত হল । ঠিক করলাম জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহেই পূর্ণিমার রাতকে সঙ্গিনী করে শিবখোলা এবং অহলদাঁড়া যাব । শিলিগুড়ি শহর থেকে হিলকার্ট রোড বেয়ে, সুকনায় চা-পানের বিরতি দিয়ে অনাঘ্রাত জঙ্গলাব্রৃত শিবখোলা মাত্র ২৭ কিমি । শিবখোলা থেকে মালদিরাম পয়েন্ট হয়ে অহলদাঁড়া আরো ২২ কিমি, আরো ৫ কিমি এগোলেই লাটপাঞ্চার । অহলদাঁড়া যেতে হলে সেবক-কালিঝোড়া হয়েও যাওয়া যায়, তবে পুরো গাড়ী ভাড়া করে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ । পুরোটাই মহানন্দা অভয়ারণ্যের মধ্যে দেশী-বিদেশী পক্ষীবিশারদদের অকৃত্রিম চারনভূমি । থাকার সবচেয়ে ভালো ব্যাবস্হা শিবাখোলার পাড়ে প্রধান সাহেবের নেচার ক্যাম্প এবং অহলদাড়াঁয় গুরুং দাজুর ৩টি ছোট কটেজ এবং টেন্ট । তবে আগে থেকে ব্যাবস্হা করে, অগ্রিম অর্থ পাঠিয়ে যাওয়াই ভালো, নাহলে রাত্রিবাসের জন্য তাঁবুই ভরসা । জানুয়ারীর ৩ তারিখ রাতে আমরা ৬ বান্ধব প্রসন্নচিত্তে প্রফুল্লবদনে পদাতিকে চেপে বসলাম । মনের উদগ্র বাসনা পূর্ণিমারাতে কাঞ্চনজঙ্ঘার পরিপূর্ণ রুপের দর্শন……..

পদাতিক কোন ভনিতা না করে সঠিক সময়ে দৌড় লাগাল । আমরাও দেরী না করে বরাদ্দ স্লিপারে লম্বমান হলাম । আভ্যন্তরীণ কথোপকথন, আলাপনপর্ব সাঙ্গ হতে বেশী বিলম্ব হল না । কিন্তু ঘন্টাখানেক পরে, নিজেকে সুন্দরবনের গভীর জঙ্গলের মধ্যে অসংখ্য ছোট-বড় শ্বাপদকুলের রাগ-রাগিনীর মধ্যে আবিষ্কার করলাম । দুরন্ত গতিতে তমষা ভেদ করে ধাবমান পদাতিকের এস-১ খোলসে নিরুপায় আমি নিদ্রার বৃথা চেষ্টায় ব্রতী হলাম । বেশ শীত লাগছিল; সাথে বহনকরা পাতলা চাদর যখন অসম দ্বন্দ্বে হার মানল তখন এপাশ-ওপাশ করেই রজনী পোহানোর পরিকল্পণা ছকে ফেললাম । কখন নিদ্রাদেবীর স্নেহধন্য হয়েছিলাম স্মরণ করতে পারি না, কিন্ত্ত নিদ্রাভঙ্গ হতেই অনুভব করলাম বাষ্প-শকট তার ‘পদাতিক’ নামের পরিপূর্ণ মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে ঘন্টা দুয়েক দেরীতে দৌড়ে (?)জংশনে দাঁড়িয়ে ভোরের নির্মল অক্সিজেন সেবনের শুভকর্ম সম্পাদনে ব্যস্ত । দেরী না করে এক কাপ ধূমায়িত চা সাথী করে আমিও তার পদাঙ্কঅনুসরণ করলাম । এরপর কতবার যে সে নিজ মরজিমতো চলল তার হিসাব কে রাখে ? শেষ পর্যন্ত সুবিখ্যাত রঙ্গাপানী-তে অনন্তকালের জন্যই বোধহয় সে আরামকেদারায় উপবিষ্ঠ হল । নিউজলপাইগুড়ি স্টেশনে যখন নামলাম তখন পেটে ছুঁচো ডনবৈঠকে ব্যাস্ত ।

একমূহুর্ত দেরী না করে, রাস্তায় কোথাও ক্ষুন্নিবৃত্তির পরিকল্পনা নিয়ে শিবখোলার প্রধান সাহেব প্রেরিত বাহনে উপবিষ্ঠ হলাম । শিলিগুড়ি শহরের কোলাহল পেড়িয়ে সুকনার দিকে এগোতেই হিলকার্ট রোড তার মায়াবী সৌন্দর্য আমাদের সামনে মেলে ধরল । ছোট্ট টয়ট্রেনের লাইনের পাশে পাশে সবুজের আঙ্গিনায় চলতে চলতে মনটা নস্টালজিক হয়ে পড়ল । সুকনার ছোট স্টেশনটা পার হয়ে ক্ষনিকের চা বিরতি । পরবর্ত্তী আঁকাবাঁকা পাহাড়ী রাস্তাটা তার নাতিদীর্ঘ ঝোড়া, মিষ্টি বুনো ফুল, সবুজ চাবাগানের ক্যানভাস নিয়ে আমাদের তুলতে লাগল আরো উপরের দিকে । ঘন্টাখানেক বাদে সুন্দরী পাহাড়ী খোলার বুকের উপর দিয়ে জল ছিটিয়ে-গা ভিজিয়ে বাহন থেমে গেল শিবখোলার নেচার ক্যাম্পের দোরগোড়ায় ।

প্রধান সাহেব না থাকলেও লামা দাজুর তদারকিতে প্রাথমিক আতিথেয়তার কোন ত্রুটি ঘটল না । চটপট স্নান সেরে (দু-একজন শিবখোলার হিমশীতল জলে), দুপুরের ধূমায়িত ভাত আর মাছের ঝোলের পূর্ণ সদব্যাবহার করে ক্যামেরা কাঁধে বেড়িয়ে পড়লাম সামনের দিকে উন্নীত পাহাড়ের ঢালে উঁকি মারতে থাকা চা-বাগানের দিকে ।

ভাঙ্গাচোরা অপ্রচলিত রাস্তা ধরে ধীরে ধীরে উঠে এলাম বেশ খানিকটা উপরের দিকে । নীচের শিবখোলা আর তার পাশে চা-বাগানকে সঙ্গী করে বেড়ে ওঠা গ্রামখানির নিটোল রুপ আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখল বেশ কিছুটা ক্ষন ।

হেঁটে চললাম আরো বেশ খানিকটা পাহাড়ী পথ । দুরের সবুজ ভরা পাহাড়ের ঢালে বড় অযত্নে বেড়ে ওঠা দুয়েকটা কাঠের বাড়ী, অনভ্যস্ত হাতে ছড়িয়ে দেওয়া হালকা হলুদ-লাল-আসমানী রঙের আকাশে বিহঙ্গকূলের ঘরে ফিরে যাওয়া কিংবা নীচের স্বপ্নসুন্দরী শিবখোলার কালচে নীল ধারার অবিরাম উচ্ছল বয়ে চলা দেখতে দেখতে মনে মনে অপরুপা প্রকৃতির মাঝে একাত্ম হয়ে পড়লাম ।

দুরের পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যদেব তার রক্তিম আভা ছড়িয়ে টুপ করে বিদায় নিলেন আর আমরা কতিপয় মানবকূলের প্রতিনিধি স্হান-কাল-পাত্র ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো রাস্তার ধারে বসে রইলাম । সম্বিত ফিরল অমিতের চেনা গলায় “DC, এবার ক্যাম্পে ফিরতে হবে তো, নাকি ? আমরা কিন্ত্ত প্রায় দেড় কিমি দুরে চলে এসেছি ।”

সুন্দরের ঘোর তৎক্ষনাৎ উধাও; অচেনা-অজানা স্হানে জঙ্গলাকীর্ণ চটজলদি তমসাচ্ছন্ন বন্ধুর পথে তৎক্ষনাৎ টর্চের আলোর ভরসায় অবতরণপর্ব শুরু হল । চিতাবাঘের খবর না থাকলেও অন্যদের বিশ্বাস কি ?

খানিক পরে চন্দ্রোদয় হলে নদীর ধারে চায়ের পেয়ালা আর ফুলকপির পকোরা নিয়ে সদলবলে বসে পড়লাম । প্রধান সাহেব তার এক পক্ষীবিশারদ বন্ধুকে নিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিলেন, জ্ঞানভান্ডার কিঞ্চিৎ বৃদ্ধি হল কিনা জানিনা, কিন্ত্ত পূর্ণিমা পরবর্ত্তী চন্দ্রালোকিত নদীপাড়ের এই শীতের সন্ধ্যা মনের মণিকোঠায় চিরস্হায়ী জায়গা করে নিল । রাতের বরাদ্দ উদরস্হ করে যখন নিদ্রাদেবীর কোলে নিজেকে সমর্পণ করলাম তখন ঘড়ির কাঁটা পরবর্ত্তী দিন ঘোষনার প্রস্ত্ততি শুরু করতে চলেছে ।

ঘুম ভাঙ্গল লামাদাজুর ডাকে, “চা লিজিয়ে সাব” । শিবখোলায় সূর্যোদয়ের প্রশস্তি নেই বলে, কিংবা পাখিদের ক্যামেরবন্দী করার তাগিদ ছিলনা বলেই সাতসকালে ঘুম থেকে ওঠার কোন তাড়া ছিল না, তবুও শীতের স্নিগ্ধ প্রভাতে চা-পানের আন্তরিক উদাত্ত আহ্বানকে অস্বীকার করতে পারলাম না । গরম চা হাতে নিয়েই নদীর ধার দিয়ে হাঁটতে থাকলাম । আধ-ঘ্ন্টা বাদে গরম জলে স্নান সমাপণ করে বেড়িয়ে পড়লাম এখানকার প্রসিদ্ধ শিবদূর্গা মন্দিরের রাস্তায় । নদীর দু-ধারে চেনা-অচেনা নানান পাখির খুনসুটি, বুনো ফুলের অনাঘ্রাত সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম গাড়ীচলার রাস্তার দিকে । আধ-ঘন্টা বাদে মন্দিরের মূল তোরণ পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম ছোট্ট মন্দিরের গর্ভগৃহের সামনে । চারিপাশ গাছপালা দিয়ে ঘেরা শান্ত পরিবেশ; স্হানীয় কিছু মানুষ পূজো দিতেও এসেছেন দেখলাম ।

মন্দিরের পাশ দিয়ে বয়ে চলা শিবখোলার পাড়ে নেমে এলাম । নানাবিধ উপলখন্ডের উপর দিয়ে বয়ে চলা চঞ্চলা সুন্দরীর শীর্ণ ধারাপথ অনুসরণ করে ফিরে এলাম শিবখোলার ক্যাম্পের কাছে ।

প্রাতঃরাশের পর্ব সমাপ্ত করে কালকের বাহনে চড়ে বসলাম । লক্ষ্য মালদিরাম-সুখাপোখরী হয়ে সুন্দরী অহলদাঁড়া……….

শিবখোলা থেকে রওনা হয়ে আধঘন্টা পরে মোটামুটি মসৃণ রাস্তা পাওয়া গেল । তবে বুঝলাম পাখি-প্রেমীকদের স্বর্গরাজ্য হওয়া সত্ত্বেও এ পথে অভিযাত্রীর সংখ্যা নগন্য । সেটা আমার মতো শহুরে জীবনের থেকে পালিয়ে বেড়ানো নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে যথেষ্ঠ স্বস্তিদায়ক ।

প্রকৃতিমায়ের রুপ-রস-গন্ধকে নিবিঢ়ভাবে নিজের মতোকরে পাওয়া যায় । পথ চলার মাঝে মাঝে ৮-১০টা কাঠের চালাঘর কিংবা ছোট্ট একটা ঝুপরী সদৃশ দোকান মানবকূলের দিন-গুজরানের জলজ্যান্ত অস্তিত্বের জানান দিয়ে যাচ্ছিল ।

আরো ঘন্টাখানেক দৌড়নোর পর আমাদের চালক তার বাহনকে রাস্তার পাশে ক্ষনেক বিশ্রামের সুযোগ দিয়ে সামনের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে সুখাপোখরীর অস্তিত্ব জানান দিলেন । সার্থকনামা পোখরীতে জলবিন্দুর ছিঁটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই, কিন্ত্ত পারিপার্শ্বিকতার নিরিখে দৃষ্টিনন্দন সন্দেহ নেই ।পরে পদযুগলকে ব্যস্ত করে পোখরীর অন্দরে প্রবেশ করার বাসনা নিয়ে বাহনে চেপে বসলাম এবং ১০ মিনিটের মধ্যে তিনমাথার সংযোগস্হলে সেলফু হীলটপের নির্দেশখচিত বনবিভাগের কাঁচা রাস্তার সামনে হাজির হলাম । একটি সড়ক নেমে পড়েছে ৫ কিমি দুরের লাটপাঞ্চার অভিমুখে, ২য়টি সর্পিল ভঙ্গীতে কমলালেবুর বাগানগুলিকে পেঁচিয়ে মংপুর কোল ঘেঁসে ঝাঁপ দিয়েছে এন-এইচ-১০-র বুকে, ৩য়টি নীচের মালদিরাম-শিবখোলা বেয়ে সটান নেমে গেছে সুকনায় । ধুলো উড়িয়ে, ৫০ টাকার স্হানীয় পরিবেশরক্ষণের ট্যাক্স দিয়ে, একধারে চাবাগান এবং অন্যপাশে দূর্লভ সিঙ্কোনা জঙ্গলের মধ্যের পায়ে চলা ২০০ মিটার পথ পেরিয়ে অহলদাঁড়ায় পৌঁছে হতবাক হয়ে গেলাম । ভাষার মাধ্যমে বর্ণনাতীত এ এক অনিন্দ্যসুন্দর অবশ্যদ্রষ্টব্য তুলনাহীন স্হান । পাঠকবন্ধুদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী, এ পরিবেশ ভাষায় পরিবেশন করার ক্ষেত্রে এ বান্দা অপারগ ।

কতক্ষন যে আমরা হতচকিতের মতো অহলদাঁড়ার প্রথম দর্শনের ঘোরের মধ্যে ছিলাম জানিনা কিন্ত্ত কাল লাটপাঞ্চার বাতিল করে আরো একটা গোটা দিন-রাত এখানেই অবস্হান করার সিদ্ধান্ত নিতে একমূহুর্ত্ত দেরী হল না । আমাদের বরাদ্দ তাঁবু এবং কটেজটিতে ব্যাগপত্র রেখে ক্যামেরা নিয়েই কাটল ঘন্টাখানেক ।

প্রায় ২০ ফুট ব্যাসার্ধ্যের পাহাড়ের শীর্ষদেশে কেবলমাত্র ৩টি কটেজ, রান্না-খাবারের ১টি ঘর, সবুজ চা-ক্ষেত্র, সিঙ্কোনার জঙ্গল আর ২-৩টি তাঁবু খাটানোর স্হান । আধুনিকতার ছোঁয়াচ থেকে মসৃনভাবে পাশ কাটিয়ে, নেটওয়ার্ক-ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপকে ব্রাত্য ঘোষণা করে এ এক অনির্বচনীয় প্রকৃতি-প্রেমের চারণভূমি । দক্ষিনে দুরের বাগোড়া, চটকপুরের পাহাড় কিংবা আরো দুরে সুবিখ্যাত টাইগার-হিল, বামে ছোট-ছোট পাহাড়ের সারি পেড়িয়ে কালিমপং-ডেলো পাহাড় কিংবা আরো দুরের পেডং খাসমহল, পশ্চাতে বহু নীচে বয়ে চলা পান্না-সবুজ তিস্তার জলরাশি কিংবা কালিঝোড়ার স্পষ্ট ছবি, সেবকের দিকে সর্পিল রাস্তা, সামনের দিকে নীচের মজে যাওয়া রিয়াংখোলা, সিটং খাসমহল, মংপু এবং সিকিমের পাহাড়শ্রেণী, সর্বোপরি সিনিয়েলচু-পান্ডিম-কাঞ্চনজঙ্ঘা-জানুর সদম্ভ উপস্হিতি; অপূর্ব, অসাধারণ । মধ্যাহ্নের ডাল-ডিমের ঝোল দ্রূততার সাথে শেষ করে নীচের দিকে গ্রামের পথে কমলালেবুর বাগান দেখে এবং পকেটস্হ করে সন্ধ্যার আগেই ফিরে এলাম অহলদাঁড়ার প্রশস্ত চূড়াদেশে, উদ্দেশ্য চন্দ্রালোকিত হিমশৈলশিখরের দূর্লভ দর্শণ, যা পূর্বেই বর্ণীত । বনফায়ারের আগুন নিভে এলেও চন্দ্রদেব আকাশে হাজির হলেন বেশ দেরীতেই; মন ভরল না । উত্তর দিক কুয়াশাচ্ছন্ন থাকায় চন্দ্রালোকিত হিমশৈল অধরাই রয়ে গেল । শীতের কামড় জোরালো হতেই নৈশাহার পর্ব সমাপ্ত করে আরামদায়ক তাঁবুতে ঘুম আসতে দেরী হল না ।

তীব্র ঠান্ডা হাওয়ার পরশে কিংবা কোন এক অজ্ঞাত কারণে ঘুমটা ভাঙ্গতেই ঘড়িতে দেখলাম ৫-০৫ । স্লিপিং-ব্যাগের পরম আদরের হাতছানি উপেক্ষা করে তড়িঘড়ি ধড়াচূড়া পরে বাইরে আসতেই পূব আসমানে চোখ আটকে গেল । ঈষৎ রক্তিম ওড়নায় পূবাকাশ রঞ্জিত আর উত্তরাকাশে স-পার্ষদ কাঞ্চনজঙ্গার রাতের কুয়াশামুক্ত মোহময় রাজকীয় উপস্হিতি, অন্যদিকে নীচের লাটপাঞ্চার উপত্যকায় শ্বেতশুভ্র মেঘের সমুদ্রের বিনম্র বিচরণ; স্হান-কাল-পাত্র কিয়ৎক্ষন বিস্মৃত হলাম ।

অকস্মাৎ অনুভব করলাম ‘এ রুপ তো শুধু আমার একার জন্য্ নয়, আদি-অনন্তকালব্যাপী সকলের, স্বার্থপরের মতো একাকী উপভোগ করার চেয়ে সম্মিলিত অবলোকনের আনন্দই যে চিরন্তন সত্য’ । পাহাড় মনকে যে উদারতা এবং বিশালত্ত্ব দান করে, নতুন করে তা পুনরায় অনুভব করলাম । কটেজের দরজায় ধাক্কা মেরে, তাঁবুর সামনে চিৎকার করে, ঘুমন্ত মানুষগুলিকে ব্যতিব্যস্ত করে সবাইকে নিয়ে নতুন করে সূর্যোদয় আর পর্বতশৃঙ্গের উপর রঙের হোলির প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করলাম । প্রভাতের স্নিগ্ধ রবিকিরণে, প্রকৃতি-মায়ের অকৃপণ স্নেহছায়ায় আমরা যেন নতুন করে অভিষিক্ত হলাম ।

দাজু ৬টার মধ্যে চা দিয়ে গেল, অহলদাঁড়ার চূড়ায় আমরা বাকশক্তিরহিত ৬জন মানুষ কাঞ্চনজঙ্ঘার রুপের পূজারী; শুধু ক্যামেরার শাটারের শব্দ

আর পাখিদের কলকাকলী ছাড়া সমগ্র চরাচরে পরম নীরবতা বিরাজমান । আবার ফিরে আসতেই হবে ।

সকাল ৮টা নাগাদ প্রাতঃরাশ সমাপ্ত করে পদযাত্রা শুরু হল লাটপাঞ্চার অভিমুখে । পদম গুরুং-র হর্ণবিল রিসর্টে দ্বি-প্রাহরিক নিমন্ত্রণ রক্ষার তাগিদে অথবা পাহাড়ী আঁকাবাঁকা পথে পথচলার আনন্দে চারদিকের প্রকৃতিকে লেন্সবন্দী করতে করতে আমরা কচ্ছপগতিতে এগিয়ে চললাম । কিন্ত্ত সে তো আর এক ট্রেকিং-র গল্প, লাটপাঞ্চার-সিটং ভ্যালী-বাগোড়া-কার্শিয়াং-র গল্প- অন্য কোন দিন………………….

যোগাযোগ পর্ব :

শিবখোলা নেচার ক্যাম্প:

Mr. D.P.Pradhan (8910116905)

Rs.1000-1200/- with Fooding per head per day

অহলদাঁড়া কটেজ এবং তাঁবু:

Mr. Padam Gurung (9475959974)

Rs 1200-1400/- for Cottage & Rs. 900-1000/- for Tent With Fooding per head per day

N.B. অহলদাঁড়া সরাসরি বুক করার ক্ষেত্রে নেটওয়ার্ক বড় প্রতিবন্ধক । যখনই কথা বলবেন, একবারে পুরো বিষয় সম্পন্ন করবেন । ৮/১০ বার “Not reachable/Out of reach” পাওয়াটা এক্ষেত্রে স্বাভাবিক ঘটনা । অহলদাঁড়ার কটেজ না পাবার সম্ভাবনা বেশী কারণ ট্রাভেল-এজেন্সীর লিজ নেওয়া আছে, যথেষ্ঠ সময় রেখে যোগাযোগ করবেন ।

Transport: (Fare Up-Down Seasonwise)

NJP To Shivakhola: (7 Seater ) Rs. 1800-2200/-

Shivakhola To Ahaldanra: (7 Seater) Rs 1800-2000/-

Ahaldanra To Latpanchar: (7 Seater) Rs. 500/- [oneway]

Ahaldanra To NJP: (7 Seater) Rs. 2200-2500/-


Advertisement


 


  This post is written by Debashish Chakraborty



Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement