জঙ্গলময় রাজস্থান – সারিস্কা টাইগার রিসার্ভ ও ন্যাশনাল পার্ক

জঙ্গলময় রাজস্থান – সারিস্কা টাইগার রিসার্ভ ও ন্যাশনাল পার্ক
Reading Time: 5 minutes

জঙ্গলময় রাজস্থান – সারিস্কা টাইগার রিসার্ভ ও ন্যাশনাল পার্ক

 

রাজস্থান বলতেই মনে পড়ে কেল্লা, বালি, পাথর আর মরুভূমির কথা। কিন্তু জঙ্গল, বন্যপ্রাণ ও পক্ষীকুলের সম্ভার নিয়ে আরেকটা সবুজ অংশও রয়েছে এই বৈচিত্রময় রাজ্যে। ‘রেগিস্তান’এর ছবির আড়ালে পূর্ব রাজস্থানে রয়েছে তিনটি অনন্য অভয়ারণ্য – সরিস্কা, রনথম্ভোর ও ভরতপুর। কলকাতা থেকে ৮-১০ দিনের রাজস্থানের ট্যুর প্যাকেজে গিয়ে সাধারণত যা দেখা হয় না অধিকাংশ পর্যটকেরই।

“Maati Baandhe Painjanee../ Bhangdi Pehne Baadli../ Dedo Dedo Baavdo../ Ghod Mathod
Bhavdi…”

চেনা চেনা ঠেকছে গানের লাইনগুলো? এটা রাজস্থান ট্যুরিজমের বিজ্ঞাপনের সেই সরকারি থিম সং। সেই বিজ্ঞাপনে একেক জন রাজস্থানকে দেখে একেকরকম ভাবে। এতই বৈচিত্রে ভরা রাজস্থান। মনমাতানো রাজস্থানী ফোক গানটির সাথে একাত্ম হয়েই আজ দেখে নেওয়া যাক আলোয়ার জেলায় আরাবল্লী পাহাড়ে ঘেরা ছবির মত সুন্দর ‘সারিস্কা ন্যাশনাল পার্ক’ কে।

সারিস্কার বড় তালাও

২৭৩.৮ বর্গ কিমি কোর এলাকা নিয়ে অবস্থিত এই ‘সারিস্কা ন্যাশনাল পার্ক’। বাফার এলাকা ৮০০ বর্গ কিমি। আলোয়ার শহর থেকে ৩৭ কিমি ও দিল্লি থেকে ২০০ কিমি দূরে পার্কের গেটের অবস্থান। বন্যপ্রাণী দেখার এক আদর্শ স্থান এই সারিস্কার জঙ্গল। পাহাড় ঘেরা উঁচু নিচু, ঢেউ খেলানো বনভুমিতে হুড খোলা জিপসিতে চড়ে জঙ্গল সাফারি অত্যন্ত চিত্তাকর্ষক। এই অরণ্যে দেখা যায় অজস্র সম্বর, নীলগাই, চিতল, চতুরশৃঙ্গী, চিঙ্কারা সহ বিভিন্ন প্রজাতির অ্যান্টিলোপ (Antelope) ও লেঙ্গুর।

পুরুষ নীলগাই

হরিণ ও লেঙ্গুর – সারিস্কাতে

পথের পাশে কখনও দেখা মেলে বুনো শুয়োর বা ওয়াইল্ড বোর, ওয়াইল্ড ক্যাট ও শিয়ালের। এছাড়া জঙ্গলে যত্রতত্র ঘুরে বেড়ায় ময়ূর। কখনও বা তারা গাড়ির সামনেই রাস্তা ধরে নাচতে নাচতে এগিয়ে চলে। এ তল্লাটে অবশ্য সর্বত্রই দেখা মেলে আমাদের জাতীয় পাখিটির।

সারিস্কাতে ময়ূর

নৃত্যরত ময়ূর – সারিস্কাতে

হিংস্র জন্তু বলতে লেপার্ড আর অবশ্যই বাঘ আছে এ জঙ্গলে। তবে বাঘ দেখার জন্য তেমন সুখ্যাতি নেই সারিস্কার। দেশের অনেক অভয়ারণ্যে ঘুরেছি। কিন্তু সারিস্কায় দুবারের ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি যে জঙ্গল সাফারিতে এত বন্যপ্রাণী, বিশেষতঃ অ্যান্টিলোপ, আর কোন জঙ্গলে বোধহয় দেখতে পাওয়া যায় না।

সাম্বার – সারিস্কাতে

স্পটেড ডীয়ার

একসময় আলোয়ার রাজাদের মৃগয়াভূমি ছিল এই জঙ্গল। ১৯৫৫তে সংরক্ষিত অভয়ারণ্য হবার পর ১৯৭৮ এ ব্যাঘ্র প্রকল্পের শিরোপা পায় এই অভয়ারণ্য। ১৯৯০ এ জাতীয় উদ্যান ঘোষিত হয় সারিস্কা। মূলত ধোক গাছের জঙ্গল। এছাড়াও দেখা মেলে সালার, বের, খয়ের, অর্জুন, বাঁশ ও নানান ঝোপঝাড় ও শুষ্ক কাঁটাগাছ। জঙ্গলের মাঝে আছে ছোট বড় বেশ কয়েকটি তালাও, তাতে জল খেতে আসে বন্যপ্রাণীরা। আর তাই তালাওয়ে দেখা মিলতে পারে একসাথে অনেক জন্তুর। বড় তালাওটি পাহাড় ঘেরা ছবির মত। মাঝের চড়ায় রোদ পোহায় কুমীরের দল। দেখা যায় অনেক সারস (Crane)। সারিস্কায় দেখা মেলে ট্রি পাই (Treepie), জাঙ্গল ব্যাবলার (Jungle Babbler), ঈগল সহ আরো অনেক প্রজাতির পাখির। এছাড়া বন মুরগীর দল তো আছেই।

জঙ্গলের মাঝেই পান্ডুপোলে আছে হনুমানজির মন্দির। গাছমছমে পরিবেশে মন্দিরটি। পুজারি, পুজোর সামগ্রী বিক্রেতা সবাই আশেপাশের গ্রাম থেকে আসে। এছাড়া পার্কের মূল প্রবেশ পথের কাছে, জঙ্গলের ভিতরে আছে একটি Nature Interpretation Centre। জঙ্গলের মাঝে এক টিলার উপর ঐতিহাসিক ‘কাঙ্কওয়ারি দূর্গ’এর ধ্বংসাবশেষ।। এজঙ্গলের সংলগ্ন বেশ কয়েকটি গ্রাম আছে। গ্রামবাসীদের যাতায়াতের রাস্তাও জঙ্গলের ভিতর দিয়ে। এমনকি কিছুদিন আগে অবধি (হালের খবর অজানা) একটি সরকারি বাসের রুট ছিল জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, যা সচরাচর অন্য জাতীয় উদ্যানে দেখা যায় না।

লেঙ্গুরের দল – সারিস্কাতে

নামে ব্যাঘ্র প্রকল্প হলেও কয়েক বছর আগে পোচিংয়ের কারণে বাঘ শূন্য হয়ে গিয়েছিল সারিস্কা। তারপর রনথম্ভোর থেকে দুটি বাঘ এনে এ জঙ্গলে ছেড়ে বাঘের সংখ্যা সফলভাবে বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়। বর্তমানে বাঘের সংখ্যা বেড়ে ১৪-১৫টি। জঙ্গলের মাঝে ঘুরতে ঘুরতে হঠাৎ গাছের মগডালে বসা হনুমানের অস্বাভাবিক ডাকাডাকি বা থেকে থেকে ময়ূরের কর্কশ ধ্বনি এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতির জানান দিতে পারে। ঐ বুঝি কাছাকাছির মধ্যে বাঘ আছে। যারা জঙ্গলে ঘোরেন, তাঁদের এমন অভিজ্ঞতা নিশ্চই হয়েছে। কাছাকাছির মধ্যে বাঘ আছে টের পেলে জঙ্গলের পশু পাখি ডাকাডাকি করে অন্যদের সজাগ করে দেয়। তৈরি হয় টানটান উত্তেজনাময় পরিবেশ। এবার বাঘ মশাইয়ের দেখা পাওয়া না পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। হোক বা না হোক বাঘের দর্শন, সারিস্কার জঙ্গলের সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ আর ঘন্টা তিনকের জঙ্গল ভ্রমণে অসংখ্য বন্যপ্রাণী ও ময়ূরের দর্শন পর্যটকদের মন ভরিয়ে দেয়।

এক ঝাঁক সাম্বার

রাস্তা পারাপার করছে নীলগাই

যাতায়াতঃ

দিল্লি থেকে ট্রেন বা বাসে তিন ঘন্টায় ১৬৩ কিমি দূরের আলোয়ার শহর। আলোয়ার থেকে জয়পুর গামী বাসে পৌনে ঘন্টায় পৌঁছানো যায় সারিস্কায়। তেমনি জয়পুর থেকে আলোয়ার গামী বাসেও যাওয়া যায় সারিস্কা। জয়পুর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১১০ কিমি। এছাড়া দিল্লি থেকে গাড়িতে ঘন্টা চারেকে পৌঁছে যাওয়া যায় সারিস্কা। পার্কের গেটের বাইরে থেকে হুড খোলা জিপসি ভাড়া নিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ ও জঙ্গল সাফারি।
আগে সকাল ৮টা থেকে বিকেল অবধি সারাদিন খোলা থাকত এই অভয়ারণ্য। ইদানিং নিয়ম বদলে অন্যান্য জাতীয় উদ্যানের মতই সকাল ৬-৩০ থেকে ১০-৩০ ও দুপুর ২টো থেকে সন্ধ্যে ৬টা – দিনে দুবার সাফারির অনুমতি দেওয়া হয়। আক্টোবর থেকে জুন সাফারির জন্য খোলা থাকে সারিস্কা।

থাকার জায়গাঃ

সারিস্কার জঙ্গলের কিনারে, গেটের ঠিক পাশেই রাজস্থান ট্যুরিজমের ‘টাইগার ডেন’ হোটেল, থাকা জন্য সবচেয়ে ভাল। এখানে থাকলে রাতে শোনা যায় জঙ্গলের ভিতর থেকে নানান বন্যপ্রাণীর ডাক। এছাড়া আছে হেরিটেজ হোটেল ‘সারিস্কা প্যালেস’, যা অতীতে ছিল আলোয়ার রাজাদের ‘হান্টিং লজ’। তবে বেশ মহার্ঘ্য। চাইলে আলোয়ারের বাজেট হোটেলে থেকেও ঘুরে নেওয়া যায় সারিস্কা।

RTDC র টাইগার ডেন

 

টাইগার ডেনে যোগাযোগ করার উপায়:

Mobile : 9829192986

Email : tigerden@rtdc.in

Website: http://rtdc.tourism.rajasthan.gov.in/Client/Home.aspx


This content is written by Mr. Subhrangsu Dasgupta. All the photographs has been clicked by the author. He is an engineer by profession.


Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement