Rinchenpong – The Jewel in West Sikkim

Rinchenpong – The Jewel in West Sikkim
Reading Time: 9 minutes

পশ্চিম সিকিমে রিনচেনপং ও উত্তরে

অনাবিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা, পশ্চিম সিকিমের এক ছোট্ট হিল স্টেশন রিনচেনপং, যেখানে কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ শোভা দেখার হাতছানি। সিকিমের পর্যটন মানচিত্রে নব সংযোজন কালুক ও রিনচেনপং এই দুটি জোড়া পাহাড়ি গ্রাম।


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

চার মাস আগে ট্রেনের টিকিট কেটে রেখেছিলাম NJP অবধি, পশ্চিম সিকিমের প্ল্যান করে। শনি ও রবির সাথে বড়দিন – সব মিলিয়ে তিন দিনের ট্যুর। পেলিং আগে ঘোরা। তাই ওদিকের রাস্তার করুণ দশার কথা শুনে শেষ মুহুর্তে পেলিং বাদ দিয়ে, রিনচেনপং যাওয়া ঠিক করে ফেলি। ইন্টারনেটে খোঁজখবর নিয়ে, “রিনচেনপং নেস্ট” হোটেলটির নম্বর জোগাড় করে, ফোনে ঘর বুক করি। বিনা অ্যাডভান্সে স্টেশনে গাড়িও পাঠিয়ে দেবার কথা বলে সিকিমিজ হোটেল মালিক। শুক্রবার রাতে পদাতিক এক্সপ্রেসে চড়ে পরদিন সকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন। সেই চেনা NJP,  স্টেশন চত্বরে  শতাধিক গাড়ি ও পাহাড়ে চড়ার ব্যস্ততা। Bengal Tourism এর “Welcome to Majestic Mountains and Enchanting Dooars”  লেখা বোর্ড। সব মিলিয়ে ট্রেন থেকে এখানে নামলেই যেন নতুন এক পাহাড় অভিযানের আনন্দে মনটা ভাল হয়ে যায়। কুয়াশার কারণে ঘণ্টা দেড়েক লেট ছিল ট্রেন। হোটেল থেকে পাঠানো কুমার দাজুর গাড়িতে রওনা দিতে সোয়া এগারোটা বেজে গেল। ১২০ কিমি পথ রিনচেনপংয়ের। শিলিগুড়ি শহরের জ্যাম পার হয়ে মহানন্দা স্যাংচুয়ারির রাস্তা, তারপর সেবক থেকে তিস্তাকে সঙ্গী করে সেই বহু চেনা পথ। ২০১৭র মাস চারেকের ভয়ংকর পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠেছে আমার প্রিয় পাহাড়। তিস্তাবাজারে তিস্তাকে পার হয়ে পূর্ব পাড়ে গিয়ে, ১0কিমি চলে মেলি। তারপর মেলিতে গ্যাংটক গামী রাস্তা ছেড়ে, আবার তিস্তা পার করে পশ্চিম পাড়ে এসে চেকপোস্ট পেরিয়ে সিকিমে প্রবেশ।


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

মেলির পর থেকেই রাস্তার বেহাল দশা, জাতীয় সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। মেলি থেকে শুরু হয়ে, পশ্চিম সিকিমের মধ্যে দিয়ে, একেবারে ভারত-নেপাল সীমান্তের শেষ গ্রাম উত্তরে অবধি। বছর দুয়েক আরো লাগবে কাজ শেষ হতে। তখন পশ্চিম ও দক্ষিণ সিকিমে যাতায়াত অনেক অনায়াস হয়ে উঠবে। শেষ দুপুরে জোরথাংএ রঙ্গিত নদীর উপর সেতু পেরিয়ে দক্ষিণ ছেড়ে পশ্চিম সিকিমে প্রবেশ করলাম। রেশি/ পেলিংগামী রাস্তা ছেড়ে অপেক্ষাকৃত একটু ভাল রাস্তায়, ঘণ্টা দুয়েক চলে সোরেং হয়ে কালুক পৌঁছতে, শীতের ছোট দিন ফুরিয়ে গেল। আরো ৩কিমি চলে সন্ধ্যের মুখে “রিনচেনপং নেস্ট হোটেলে” পৌঁছলাম।

মেলিতে তিস্তা নদীর উপর ব্রীজ পেরিয়ে সিকিম; তিস্তায় র‍্যাফটিং

জোরথাংয়ে রঙ্গিত নদী – নদীর উপর ব্রীজ পেরিয়ে দক্ষিণ থেকে পশ্চিম সিকিমে


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

তিনতলায় ডাইনিং রুমের লাগোয়া কোনার দিকের ভিউ ফেসিং ঘর আমাদের জন্য বরাদ্দ। বারান্দায় দাঁড়িয়ে চোখে পড়ে দূরের পাহাড়ের গায়ে অসংখ্য আলোকবিন্দু। ওগুলি পশ্চিম সিকিমের বিভিন্ন গ্রাম-শহরের আলো। ঐ দিকেই পাহাড়ের মাথার উপর সকালে নাকি দেখা মিলবে কাঞ্চনজঙ্ঘার। কোন নতুন জায়গায় এসেই হোটেলের ঘরে বন্দী না থেকে একটু বেরোতে মন চায়। তাই ঠান্ডা কে তোয়াক্কা না করেই বাইরে বেরিয়ে কিছুক্ষণ আলো আঁধারি রাস্তায় পদচারণা করে রুমে ফিরে এলাম। রাতে লাগোয়া ডাইনিং রুমে ডিনার সেরে হোটেলের মালিকের সাথে আলাপচারিতা হল। আগে লিজে দুজন বাঙালি চালালেও এখন বাড়ির মালিক টি.বি যোগী ও তাঁর ছেলে সন্দীপ চালায় হোটেলটি। রান্নার দায়িত্বে তার স্ত্রী, সহযোগিতা করে পরিবারের বাকিরা। এদের রান্না বেশ ঘরোয়া ও সুস্বাদু। হোটেলটি অনেকটা হোম স্টের মতই। সারাদিনের দীর্ঘ জার্নিতে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শয্যা নিলাম লেপ কম্বলে মুড়ে।

সকালে দরজা খুলেই হোটেলের ঘর ও বারান্দা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

রিনচেনপংয়ে একটি সকাল

পরদিন সকালে কুয়াশার চাদর সরলে উত্তর পশ্চিমে মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিল কাঞ্চনজঙ্ঘার তিনটি বরফাবৃত শৃঙ্গ। কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনে প্রতিবারের মতই উত্তেজিত ও আনন্দিত হলাম। যদিও মেঘের আড়ালে ঢেকে রইল বাকি শৃঙ্গগুলি। দূরে সামনের পাহাড়ের গায়ে দেখা যাচ্ছে পশ্চিম সিকিমের জেলাসদর গেজিং শহরের ঘর বাড়ি। পাহাড়টির মাথায় হিল স্টেশন পেলিং। একপাশের জানলা দিয়ে দেখা যাচ্ছে একটি সুন্দর মনাস্ট্রি। এই শীতের মরসুমে পশ্চিম সিকিমে এসে মন চাইছিল, আরো উজ্জ্বল ভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার পুরো রেঞ্জটার দেখা পেতে। আর আসল দৃশ্য আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল পরেরদিন সকালে, যার কথায় পরে আসছি।

ব্রেকফাস্টের পর বেরিয়ে পড়লাম পায়ে হেঁটে রিনচেনপংকে দেখতে। প্রথমেই চললাম রুম থেকে দেখতে পাওয়া পাশের মনাস্ট্রিতে। “রিনচেনপং চোলিং মনাস্ট্রি” (Rinchenpong Cholling Monastery)। সুন্দর, উজ্জ্বল তিব্বতীয় কারুকাজ করা মনাস্ট্রিটি অপেক্ষাকৃত নতুন। চারপাশে নানা রঙ বেরঙের বুদ্ধিস্ট প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, হাওয়ায় উড়ছে। সামনের রাস্তাটি কালুকের দিক থেকে এসে হোটেলের সামনেই একটা বাঁক নিয়ে পাহাড়ের ওপাশে গিয়ে রেশি হয়ে পেলিংয়ের দিকে চলে গেছে। রিনচেনপংয়ের একেবারে শেষ প্রান্তে এই হোটেল ও মনাস্ট্রিটির অবস্থান। দূর্দান্ত লোকেশন হোটেলটির।


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

মনাস্ট্রির পাশ দিয়ে উঠে চলা একটি পাথুরে পথে মিনিট খানেক চলে “রবীন্দ্র স্মৃতিবন”। রবীন্দ্রনাথ এসেছিলেন এই রিনচেনপংয়ে। পাশে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতির উদ্দেশে একটি ফলক ও তাতে কবির একটি কাবিতার ইংরেজি অনুবাদ খুদিত, গীতাঞ্জলি থেকে। তবে জায়গাটির তেমন রক্ষণাবেক্ষণ হয় বলে মনে হল না। এরপর চললাম হোটেলের ডানদিকে অর্থাৎ বাজারের দিকে। খানিক বাদে বাদে দু একটি হোটেল। পাইন – ফারের সারির সবুজের মাঝে কিছু সুদৃশ ঘর বাড়ি, বৌদ্ধ স্থাপত্য, তিব্বতী ভাস্কর্য্য, রাস্তার ধারে ফুটে থাকা রঙ বেরঙের ফুলের সারি, মৃদু বাতাসে চারিদিকে উড়তে থাকা প্রেয়ার ফ্ল্যাগ, একদিকে দন্ডায়মান কাঞ্চনজঙ্ঘার শ্বেত শুভ্র শিখর – সব মিলিয়ে এই ঝকঝকে একটি সকালে রিনচেনপংকে বড়ই মনোরম লাগছিল। হিমালয়ের ৫৫৭৮ ফুট উচ্চতায় শান্ত নিরিবিলি এই হিল স্টেশনটির অবস্থান ভৌগলিক ভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার খুব কাছে। মোট ১০-১২টি হোটেল হয়েছে কালুক-রিনচেনপং জুড়ে। খানিকটা পেলিংয়ের জনপ্রিয়তার আড়ালে থাকা এই রিনচেনপং এখনও পর্যটকের ভিড়ে কলুষিত হয়ে যায় নি।

রিনচেনপংয়ে একটি সকাল

হোটেলের ঘর থেকে দেখা রিনচেনপং চোলিং মনাস্ট্রি


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

ছোট বাজার এলাকার পাশ দিয়ে একটি চড়াই রাস্তা মূল রাস্তা ছেড়ে উঠে গেছে পাইনের সারির মধ্যে দিয়ে। সে রাস্তা ধরে মিনিট ২০ উঠে পৌঁছে গেলাম ঐতিহাসিক “রিনচেনপং মনাস্ট্রিতে” (Rinchenpong Monastery)। পাহাড়ের মাথায় খানিকটা সমতল জায়গায় অবস্থান ১৭৩০ সালে তৈরি এই মনাস্ট্রিটির। এটি সিকিমের তৃ্তীয় প্রাচীনতম মনাস্ট্রি। উপর থেকে দারুণ ভিউ পাওয়া যায়। পাশেই একটি হোটেল, “ল্যান্ডস্কেপ”, অসাধারণ লোকেশনে। নামার পথে একটি মোড় থেকে ডাইনে মিনিট দুয়েক চলে পৌঁছলাম “পয়জন লেকে”। পাইনের সারির ফাঁক দিয়ে সামান্য নিচে যে মাঠের মত দেখা যাচ্ছে সেটি আসলে ছিল লেক। ব্রিটিশ সৈন্যরা যখন হানা দেয় এ অঞ্চলের দখল নিতে, তখন স্থানীয়রা এই লেকের জলে বিষ মিশিয়ে ব্রিটিশদের মেরে দিয়েছিল। সেই থেকেই এর নাম পয়জন লেক (Poison lake)।

হোটেলের পাশেই রিনচেনপং চোলিং মনাস্ট্রি

পাহাড়ের খানিকটা উপরে সুপ্রাচীন রিনচেনপং মনাস্ট্রি


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

উপর থেকে গাছের ফাঁক দিয়ে নিচে পয়জন লেক

সাইট সিয়িংয়ে সিংশোর ব্রীজ ও উত্তরে

হোটেলে ফিরে স্নান খাওয়া সেরে দেড়টা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম কুমার দাজুর গাড়িতে হাফ বেলা সাইট সিয়িংয়ে। মূল গন্তব্য সিংশোর ব্রিজ ও ৩৫কিমি দূরের উত্তরে। কালুক পেরিয়ে এবার অন্য রাস্তা। হি ও বার্মিওক নামের দুটি ছোট জনপদ পার হয়ে, “হি ওয়াটার গার্ডেন” (Hee Water Garden)। একফালি উপত্যকার মাঝ দিয়ে বয়ে চলা একটি পাহাড়ি নদীর পাশে ছোট্ট পার্ক। ঝোড়াটি এক জায়গায় জলপ্রপাতের আকার নিয়েছে। তারপর সশব্দে পাথরের উপর আছড়ে পড়ে, রাস্তার সেতুর নিচ দিয়ে বয়ে গেছে। এরপর ডেন্টাম ভ্যালি ও তার মাঝে ডেন্টাম (Dentam) শহর। বেশ কয়েক বছর আগে দেখা ডেন্টাম কলেবরে বেড়েছে। এই ডেন্টামেই রয়েছে প্রসিদ্ধ “অ্যাল্পাইন চিজ ফ্যাক্টরি”। আরো ৬কিমি চলে বিখ্যাত “সিংশোর ব্রীজ” (Singshore Bridge)। এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম এই সাস্পেনশন ব্রীজটি। পেলিং থেকে সাইট সিয়িংয়ে এসেছিলাম আগে একবার এই “সিংশোর ব্রীজ” দেখতে। আগে গাড়ি চলাচল করলেও এখন গাড়ির যাতায়াত বন্ধ এই ব্রীজ দিয়ে রক্ষণাবেক্ষণের কারণে। ঝুলন্ত সেতুর উপর দিয়ে দুলতে দুলতে ওপারে যাওয়া। অনেক নিচে, প্রায় ১০০মিটার নিচে খাদের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলেছে একটি পাহাড়ি ঝোড়া। ব্রীজের উপর থেকে নিচের দিকে তাকালে মাথা ঘুরে যাওয়ার জোগাড়। শুনেছি খাদ এতই গভীর যে, উপর থেকে পাথর ফেললে নাকি নিচের মাটি স্পর্শ করতে ৮ সেকেন্ড লাগে।

হি ওয়াটার গার্ডেন


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

সিংশোর ব্রীজ – এশিয়ার দ্বিতীয় উচ্চতম ব্রীজ

এর পরের গন্তব্য উত্তরে (Uttarey)। এখান থেকে ৭কিমি। আগে সিংশোর ব্রীজ পেরিয়েই রাস্তা ছিল উত্তরে যাবার। ব্রীজে গাড়ি চলাচল বন্ধ বলে এখন রাস্তাটি একটু ঘুরে, উপর দিয়ে ঝোড়াটি পার হয়ে। উপরে অগভীর ছোট ব্রীজটি ঝোড়াটিকে পার করার। সেতুটি পার করে ঝোড়াটি প্রপাতের আকারে অনেক নিচে নেমে, সিংশোর ব্রীজের নিচে অনেক গভীরে চলে গেছে। উপরের রাস্তা থেকে নিচে দেখা যাচ্ছে সিংশোর ব্রীজ। খানিকটা বন্ধুর, অমসৃণ পথে চলে একটি সুসজ্জিত তোরণ পার হয়ে প্রবেশ করলাম উত্তরে গ্রামে। চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা পাইনের সারিতে সজ্জিত ছবির মত একটি উপত্যকার মাঝে ৬৬০০ ফুট উচ্চতায় ছোট্ট গ্রাম উত্তরে। ভারত – নেপাল সীমান্তের শেষ গ্রাম। এখান থেকে শুরু কয়েকটি ট্রেক রুটের। পর্যটকদের জন্য রয়েছে তিন চারটি হোটেল। শেষ বিকেলে পাহাড় ঘেরা উত্তরেতে কনকনে হিমেল ঠান্ডায় জমে যাওয়ার উপক্রম। অনেকটা জায়গা জুড়ে একটা সমতল মাঠ। শুনলাম এখানেই একটি লেক খনন করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে সরকারি উদ্যোগে, জায়গাটার পর্যটন আকর্ষণ আরো বাড়ানোর জন্য। ছোট্ট গ্রাম পেরিয়ে পিচের রাস্তাটি শেষ হয়ে গেছে। তারপর পদব্রজে তিন ঘণ্টা চলে একটা ট্রেক করে তবে পৌঁছানো যায় নেপালে। পড়ন্ত আলোয় উজ্জ্বল হয়ে ওঠা পিছনের পাহাড়গুলোর ওপারেই নাকি নেপাল। বেশ কিছুক্ষণ এই সুন্দর গ্রামটিতে কাটিয়ে একটি হোটেলের রেস্টুর‍্যান্টে গরম গরম ম্যাগি ও চা খেয়ে, সন্ধ্যের ঠিক আগে ফেরার পথ ধরলাম। অন্ধকারে ঘণ্টা দুয়েক চলে ফিরে এলাম রিনচেনংয়ের হোটেলে।

উত্তরে যাবার পথে – উপর থেকে সিংশোর ব্রীজ


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

পাহাড় ঘেরা শান্ত ‘উত্তরে’ গ্রাম – পশ্চিম সিকিমে নেপালের দিকে শেষ গ্রাম

বড়দিনের সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা

পরদিন ছিল বড়দিন। আর সকালে উঠেই প্রকৃতির থেকে মিলল এক দারুণ খ্রিস্টমাস গিফ্ট। ঘুম ভেঙে জানলার বাইরে চোখ রেখেই দেখলাম আজ উত্তর পশ্চিম দিক অনেকটা পরিস্কার। দেখা যাচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘার অনেকটা রেঞ্জ। অতি উৎসাহে বারান্দায় বেরিয়ে দেখি ধীরে ধীরে সমস্ত মেঘের আস্তরণ সরে গিয়ে উজ্জ্বল ভাবে প্রতিভাত হয়ে উঠছে দিগন্তজোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু, পান্ডিম, সিনিয়লচু সহ পুরো রেঞ্জটা। নীলাকাশের নিচে ঝকঝক করছে শ্বেত শুভ্র আট-ন’টি বরফাবৃত চূড়া। সামনের পাহাড়ের গেজিং ও পেলিংয়ের মাথার উপরে প্রাচীরের মত দাঁড়িয়ে রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘা। অসাধারণ দৃশ্য, যেন স্বর্গীয় অনুভুতি। একবারে সুস্পষ্ট, যেন হাত বাড়ালেই কাঞ্চনজঙ্ঘা। রিনচেনপং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার অ্যারিয়াল ডিস্টেন্স যে মাত্র ৫১ কিমি। পূর্ব হিমালয়ের অন্য কোন হিল স্টেশন থেকে এর আগে এত স্পষ্ট ও উজ্জ্বলভাবে কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ দেখেছি কিনা মনে পড়ে না। একমাত্র পশ্চিম সিকিম থেকেই এমন এক পরিস্কার দিনে এ দৃশ্য দেখা সম্ভব। কাঞ্চনজঙ্ঘার অপরূপ শোভায় আমরা এতটাই অভিভুত, বিহ্বল হয়ে পড়লাম, যে চোখ মোটে সরাতেই পারছিলাম না সেদিক থেকে। ব্রাশ করা থেকে চা পান, ব্রেকফাস্ট সব কিছুই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে দেখতে। সারাটা সকাল আশ মিটিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখলাম আর মনের মণিকোঠায় ও ক্যামেরার ফ্রেমে তা বন্দী করে ফেলার চেষ্টা করে চললাম। সোমবার হাট বসে রিনচেনপংয়ে। হোটেল থেকে বেরিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে ডানপাশে সঙ্গী রেখে একবার ঢূ মেরে এলাম বাজার এলাকায় বসা পাহাড়ি হাট থেকে।

বড়দিনের সকালে ঝকঝকে রাজকীয় কাঞ্চনজঙ্ঘা


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

বারান্দায় বসে সকালের চায়ের কাপ ও কাঞ্চনজঙ্ঘা

কমলালেবুর বাগান ও ফিরে চলা

এবার ফেরার পালা। আজ রাতেই কলকাতা ফেরার ট্রেন NJP থেকে। ফেলে যেতে মন চায় না রিনচেনপংকে, কাঞ্চনজঙ্ঘা কে। সাড়ে এগারটা নাগাদ কুমারের গাড়িতেই চললাম জোরথাং অবধি, এবার অন্য পথে। রিনচেনপং থেকে ৬কিমি দূরে পড়ল আজিং ফার্ম হাউস (Azying’s Farm House)। পাহাড়ের কোলে, গাড়ির রাস্তা থেকে প্রায় শ’খানেক ফুট নিচে নেমে ফার্ম হাউসটি। রয়েছে অরেঞ্জ গার্ডেন ও ওয়াইন ফ্যাক্টরি। সিঁড়ি ভেঙে বেশ খানিকটা নেমে পাশেই কমলালেবুর গাছ। শীতের মরসুমে গাছে হয়ে রয়েছে কমলালেবু। আরো খানিকটা নিচে নেমে ফার্ম হাউসটি। কমলা ছাড়াও হয়ে রয়েছে আনারস, প্যাসন ফ্রুট ও নানান ফল ও ফুলের গাছ। এদের তৈরি ফ্রুট ওয়াইনের নমুনাও সংগ্রহ করে নিলাম। তারপর গাড়িতে উঠে রেশি পার হয়ে রঙ্গিত নদীকে সঙ্গী করে পৌঁছে গেলাম জোরথাং। সেখান থেকে কুমার কে বিদায় জানিয়ে চেপে বসলাম শিলিগুড়ির শেয়ার জিপে। ফিরে চললাম রিনচেনপং ভ্রমণের, বিশেষত কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শনের এক অনন্য অভিজ্ঞতা কে সম্বল করে, যা কোন দিন ভোলার নয়।

(এই ভ্রমণ বৃত্তান্তের সময়কালঃ ডিসেম্বর ২০১৭)

ভরা শীতে ‘আজিং ফার্ম হাউস’এ কমলা লেবুর গাছ

প্রয়োজনীয় তথ্যঃ

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে রিনচেনপং যেতে সময় লাগে ৫-৬ ঘন্টা। গাড়ি ভাড়া ৩৫০০-৪০০০ টাকা। শিলিগুড়ি থেকে শেয়ার জিপে জোরথাং অবধি গিয়ে জোরথাং থেকেও গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যায়। ভাড়া ১৫০০-২০০০ টাকা। জোরথাং থেকে কালুক/ রিনচেনপংয়ের শেয়ার জিপ থাকলেও তা অনিয়মিত।

হোটেল রিনচেনপং নেস্ট


(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

থাকার জন্য রিনচেনপং ও কালুক দু জায়গাতেই কিছু হোটেল আছে। রিনচেনপংয়ে ভাল লোকেশনে বাজেট হোটেল ‘Rinchenpong Nest’। ভাড়া ১২০০-১৫০০টাকা। বুকিংয়ের জন্য যোগাযোগঃ 7432021509. এছাড়াও আছে Hotel Royal Dewachen (78729 80787), Hotel Landscape (9836755550), Hotel Rinchen (9434343472), Hotel Mount View ( 98005 54562)।

কালুকে থাকার জন্য আছে Kanchan Valley Tourist Lodge (94331 27828); একটু বেশি বাজেটে Ghonday Village Resort, Mandarine Village Resort।

পশ্চিম সিকিমের আরেক নব সংযোজন ছায়াতালে থাকার জন্য রয়েছে Chhayatal Heritage Homestay। এছাড়াও হি, বার্মিওক ও উত্তরেতেও থাকার ব্যবস্থা আছে।

ছোট গাড়ির জন্য যোগাযোগঃ কুমার দাজু  –  9733092636

এছাড়াও যে হোটেলে বুকিং থাকবে তাদের আগে থেকে বললেই NJP স্টেশনে গাড়ি পাঠিয়ে দেয়।


 

Travelogue and Photography by Subhrangsu Dasgupta 

 



(adsbygoogle = window.adsbygoogle || []).push({});

2 Comments

  1. সুন্দরদেখা এবং প্রয়োজনীয়লেখা

    Reply
  2. Khub e sundor apnar lekha.thank you for ur illustration.

    Reply

Trackbacks/Pingbacks

  1. Mangalbarey - A new offbeat destination of West Sikkim - Tour Planner Blog - […] direct hired car from Siliguri Junction. Regular share car ply between Siliguri and Mangalbarey or Rinchengpong/ Kaluk. It will…

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement