NEORA VALLEY NATIONAL PARK TREK, 4th part

NEORA VALLEY NATIONAL PARK TREK, 4th part
Reading Time: 5 minutes

উপত্যকায় শরীর মুড়ে চতুর্থ দিন

ভোর এলো এখানেও…… ঠিক আগল আলগা করে জড়োসড়ো হয়ে নয়; আধশোয়া ভোরের ঘুম ভাঙালো ধোঁয়া ওঠা চায়ের মতো আবছায়া কুয়াশা। এই তো সেই সময়, যখন ভালোবাসার দেখা পেয়ে গাছ হয় আনত, ফসল আভূমি চুম্বন করে, রোদ খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে। সামনের উপত্যকা ভালোবাসায় ভরিয়ে দেয় সুন্দর সকালকে, সবুজ, হলুদ ঢেউ খেলে যায় আজ সকালের আমন্ত্রণে।
নিচে তোদে-তাঙটা বা তামটা ভ্যালি আড়মোড়া ভেঙে সেজেগুজে টুকটুকে হয়ে আমায় দেখছে অবাক চোখে। তার গা ভর্তি সোনালী গম, মাথায় সবুজ চুলে সোনালী মুকুট, কানে, গলায় সোনার ঝিকিমিকি, এক্কেবারে সালংকারা। আয়েশ করে সকালের রোদে পিঠ দিয়ে পাথরের ওপর আমরা সবাই চা নিয়ে বসে গল্পে মশগুল হলাম; জোসেফ এ অঞ্চলের বিভিন্ন অভিজ্ঞতা বলছিলো। আমরাও শেয়ার করছিলাম আমাদের ছোটোখাটো হাঁটার গল্প।






প্রথম যখন লাভা থেকে আসবো ভেবেছিলাম তখন কি হয়েছিল তাতো আগেই বলেইছি, আরেকটা অভিজ্ঞতা বলি। তখন ও জানিনা কোথা থেকে ট্রেক করলে সুবিধা, তখন আমি আলিপুরদুয়ারে; আমরা ঠিক করলাম নেওড়াভ্যালি হাঁটবো, যেমন ভাবা তেমন কাজ, তিন চারজনে এক শীতকালে বেরিয়ে পড়লাম, সালটা ২০০৪ মনে হয়। এলাম ঝালং হয়ে তামটা ভ্যালি, কাউকেই পেলামনা যে বলতে পারে কি করে, কোন রাস্তায় ট্রেকটা করা যায়। কোথায় গিয়ে এ জঙ্গল শেষ হবে তাও ঠিকঠাক জানিনা, শুধু জানি এ ঘন জঙ্গলে আমরা হাঁটবো। কোনো ফরেস্টের লোকজন ও চোখে পড়লোনা। যাক, আমরা শুরু করলাম হাঁটা, ছোট ছোট চোরাবাটো দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। জানিনা কোনদিকে যাচ্ছি, কেন জানি হঠাৎ করে চাঁদের পাহাড় মনে পড়ছিলো, অন্ধকার জঙ্গল, বিশাল বিশাল গাছ, নিচেও লতাপাতায় পা জড়াচ্ছে, আমরা চলেছি।






পথে হঠাৎ একটি লোকের দেখা পেয়ে হাতে চাঁদ পেলাম; ও তো আমাদের দেখে ভয় পেয়ে গেলো, আমরা অনেক কষ্টে বোঝালাম যে আমরা প্রায় ঘন্টা চারেক হাঁটছি, কিন্তু কোনদিকে যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছিনা। ভীষণ সন্দিগ্ধ চোখে ও মাপছিলো আমাদের, তখন ও এ অঞ্চলে অস্থিরতা ভালোই ছিল, কামতাপুর নিয়ে তখন ও আন্দোলন চলছে। ও ভাবলো আমরা বোধহয় সেই আন্দোলনকারীদেরই কেউ। কিছুতেই বোঝেনা যে আমরা ট্রেক করতে এসেছি। তারপর বোধহয় আমাদের নিরীহ আলুভাতে মুখ দেখে খানিক বিশ্বাস করলো। জিজ্ঞেস করলো বন্দুক সাথে আছে কিনা? নেই শুনে তার সেকি দুশ্চিন্তা…. আপলোগ ইয়ে জঙ্গল মে ঘুম রাহে হো, সাথমে কুছ নাহি, জানতে হ্যায় ইঁহা কিতনা জংলী জানোয়ার হ্যায়? আমরা তো সাংঘাতিক ভয় পেয়ে গেলাম, ভয় অনেকক্ষণ থেকেই পাচ্ছিলাম, এবার একেবারে বসেই পড়লাম। অনেক অনুনয় বিনয় করলাম আমাদের সাথে যাওয়ার, তার কাঠকুটো আনার দেরি হয়ে যাচ্ছে, সে একটা দিক দেখিয়ে বললো এদিক দিয়ে এগিয়ে যান, জঙ্গল শেষ হয়ে একটা গ্রাম পাবেন। চললাম সেদিকেই… আর দীর্ঘায়িত করছিনা, শুধু এটুকুই, আরো কতক্ষন চলেছিলাম মনে নেই, সন্ধের মুখে জঙ্গল মাথায় নিয়ে একটা গ্রামে পৌঁছলাম, অন্ধকার ঘুটঘুট করছে, কোথায় যে এসেছি, কিছু বুঝতে পারছিনা; একটা দোকানে একটি মহিলা বসে, তাকে জিজ্ঞেস করতে সে বললো এ গ্রামের নাম রঙ্গো। যাহঃ, এতো হেঁটে, এতো জঙ্গল পেরিয়ে এসে পৌঁছলাম রঙ্গো? রঙ্গো হলো ঝালং যাওয়ার রাস্তায় বাঁদিকে বেঁকে গেলে ভুটান সীমান্তের একটি গ্রাম। পেলাম আখবার রাই কে, থাকলাম তার বাড়ি, সে আরেক গল্প। আজ রঙ্গোতে অনেক লোক ঘুরতে যায়, আখবার দারুন হোমস্টে বানিয়েছে, পারলে একবার ঘুরে আসবেন, অপূর্ব একটি গ্রাম।




ঠান্ডাটা রুখা ক্যাম্পে একটু কম, নেমেও এসেছি অনেকটাই, জঙ্গল ও আর তত অন্ধকার, রহস্যময়ী নয়। দুদিনের সোঁদা গন্ধে মাতাল অন্ধকার জঙ্গল, স্যাঁতস্যাঁতে রাস্তা জেঁকে বসেছিল মনের মধ্যে, আজ ভোরে এই সামনের উপত্যকার প্রাণখোলা আমন্ত্রণে যেন ঘরে ফেরার ইঙ্গিত, যেন ‘ আজ তোমারে দেখতে এলেম অনেকদিনের পরে….’ ; আজ যাবো তাঙটা ভ্যালি এই রুখা ক্যাম্প থেকে, হাঁটা আজ ই শেষ; ওখানে থাকবো আজ, কাল গাড়ি করে যে যার বাড়ি।


সকালের জলখাবার সেরে রওনা হলাম। জঙ্গল ক্রমশ সাধারণ জঙ্গলে পরিণত হচ্ছে, মানে যেমন জঙ্গল সাধারণত দেখি আর কি; নামছি বেশ তরতর করে, বাঁশগাছের হাতছানি আর নেই, বদলে চেনা ট্রপিকাল গোত্রীয় গাছপালা নজরে আসছে। কখনো ঝরঝর করে নামছি, কখনো বা আবার জঙ্গুলে বাঁকের মায়ায় মোহিত হচ্ছি। চলছি বেশ হেলেদুলে, জোসেফ পাখি দেখাচ্ছে কতরকমের, তুলেছিও বেশ কিছু, …. Chestnut bellied rock thrush, green tailed sunbird, black capped sibia… এরকম আরো বেশ কিছু।
পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নামা শুরু করলাম ঘন্টাখানেক হাঁটার পর, নিচেই পসরা সাজিয়ে বসে আছে তোদে ভ্যালি।

তোদে ভ্যালি






ছোট ছোট কাঠের বাড়ি দেখা যাচ্ছে, খেত গমে ভরে আছে, তরতর করে নামছি নিচে, প্রথমেই পড়লো একটা মাঠ, ছেলেপুলে মনের আনন্দে ফুটবল পেটাচ্ছে…. এতক্ষন হাঁটার পর গরম লাগতে শুরু করেছে, গরম পোশাক খুলে আমরাও খানিক্ষন মেতে উঠলাম ওদের সাথে। ওদের কি আনন্দ, যে গোল দেবে তাকেই মেঠাই ( লজেন্স)- ওদের আনন্দ আর ধরেনা, সহজ সরল মুখগুলোর সাথে বেশ খানিক্ষন কাটিয়ে আবার রওনা হলাম। ছোট একটি গ্রাম, মাঝে মাঝে বড়ো এলাচের খেত, দেশীয় পদ্ধতিতে স্প্রিংলার ইরিগেশন চলছে…

গ্রাম পেরিয়ে আবার ঢুকে পড়লাম জঙ্গলে; অবস্থান টা একটু বললে রাস্তাটা পরিষ্কার বোঝা যাবে, আমরা রুখা ক্যাম্প থেকে নেমে এলাম তোদে তে, এই ভ্যালি আবার নিচে নেমে মিলে গেছে নেওড়া নদীতে, নদীর ওপারে আবার ধীরে ধীরে উঠে গেছে তামটা ভ্যালি। নামছি জঙ্গলের রাস্তা দিয়ে, ঘন জঙ্গল কিন্তু রাস্তা বোঝা যাচ্ছে, শিমুল, জারুল গাছে ভর্তি এ অঞ্চলটা। প্রচুর পাখি, সারাক্ষন এক অদ্ভুত আওয়াজ ঘিরে রেখেছে আমাদের। নামতে নামতে এলাম নদীর কাছে, দু একজন পাহাড়ি মেয়ে কাঠকুটো কুড়োচ্ছে, দূর থেকে নদীর ওপর দোলনা ব্রিজ দেখতে পাচ্ছিলাম, কাছে এসে দেখি ব্রিজের মাঝখানে কিছু নেই !! মানে পাথর টপকে নদী পেরোতে হবে, জোসেফ বললো শীতকাল বলে পেরোনো যাচ্ছে, বৃষ্টি পড়ে গেলে এ নদী পেরোনো আমাদের কম্মো না। টপকে টপকে পাথর পেরিয়ে এলাম। এ পারে তামটা ভ্যালি, ধাপচাষে ভরে আছে চারিদিক, অদ্ভুত সুন্দর এক টোপোগ্রাফি তৈরী করেছে ধাপে ধাপে।






ওপরে উঠতে উঠতে কিছু সুন্দর বাড়ি চোখে পড়লো, খুব খিদে পেয়ে গেছে, তখন দুপুর প্রায় ২ টো হবে। একটি সুন্দর বাড়ির সামনে লোক দেখে আমাদের ইচ্ছের কথা জানাতেই তারা ভেতরে নিয়ে বসালো, খুব যত্ন করে চা, ভুট্টা ভাজা খাওয়ালো।
তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে পৌঁছলাম তামটা বাজারের কাছে। এতজনের থাকার ব্যবস্থা কি হবে? একটি বাড়িতে ব্যবস্থা হলো, ঠিক হোমস্টের মতো নয়, ওদের নিজেদের একটা ঘর ছেড়ে দিলো। শেষ হলো হাঁটা, দুবার ব্যর্থ চেষ্টার পর অবশেষে সফল।
তিনদিন ধরে নিবিড় এ জঙ্গলে শিখলাম অনেক কিছু, আদিম পৃথিবী কতটা অন্যরকম ছিল তার কিছুটা আঁচ পেলাম এই ট্রেক এ। আমাদের হাতের কাছে এরকম একটা জায়গা যে আছে, না এলে কোনোদিন জানতেও পারতামনা।

আমারো ইচ্ছে করে এই ঘাসের এই ঘ্রাণ হরিৎ মদের মতো
গেলাসে-গেলাসে পান করি,
এই ঘাসের শরীর ছানি – চোখে ঘষি,
ঘাসের পাখনায় আমার পালক,
ঘাসের ভিতর ঘাস হ’য়ে জন্মাই কোনো এক নিবিড় ঘাস-মাতার
শরীরের সুস্বাদ অন্ধকার থেকে নেমে।।


নেওড়া ভ্যালি ট্রেকের এই অসাধারণ বর্ণনা আর ছবিগুলো দিয়েছেন আমাদের সকলের প্রিয় ও সকলের খুবই পরিচিত শুভময় পাল দাদা।


 



1 Comment

  1. দারুন উপভোগ্য লেখা ।খুব আনন্দ পেলাম ।

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement