NEORA VALLEY NATIONAL PARK TREK, 3rd part

NEORA VALLEY NATIONAL PARK TREK, 3rd part

ট্রেকের তৃতীয় দিন




আলুবাড়ি ক্যাম্পে ভোর এলো একেবারে আগল আলগা করে। ট্রেক এ সাধারণত রাতে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়াই দস্তুর, এখানেও ব্যতিক্রম হয়নি। ভোররাত থেকে জেগে স্লিপিং ব্যাগের ভেতরে শুয়ে, কাঠেরবাড়ির ফাঁকফোঁকর দিয়ে যখন আলোর আবছা অস্তিত্ব ঘরের মধ্যে টের পেলাম, উঠে পড়লাম। বেরোলাম বাইরে, অল্প আলোয় তীব্র ঠান্ডায় জড়োসড়ো নেওড়াভ্যালি; এই ক্যাম্প থেকে নিচের ঢালে অন্ধকার জঙ্গলের গায়ে মাথায় আলোর ছোঁয়া, শিরশির করা এক ঠান্ডায় যেন আস্তে আস্তে ঘুম ভাঙছে পৃথিবীর, ডানা খুলে দিয়ে সব রূপ রস গন্ধ মেলে ধরছে সকালের নরম আলোয়।

নির্বাক এক সময়ের সাক্ষী আমি, পাখিরা আস্তে আস্তে জাগছে, দূরে কোথায় একটানা কিচিরমিচির, বেশ একটা উৎসব উৎসব আমেজ জঙ্গলের শরীর জুড়ে। আলো খেলা করছে নিচে নদীতে, পাশের ঘন ঝোপে, নিচের হলুদ সবুজ বনে, ফুলে ফলে পাতায় পাতায়। শিশির ভেজা বারান্দায় বসে আছি, চা এলো মনের খবর নিতে; এলো বাকি বন্ধুরাও, কোনো কথা নেই, চুপচাপ চায়ে আর সোনাঝরা সকালের জঙ্গলে একসাথে চুমুক দিচ্ছি।





ভোরের জঙ্গলের রূপে যখন মাতালপ্রায়, জোসেফ পাখির সালতামামি শুরু করলো, নেশা গেলো চটকে। তখন ভালো লাগছিলোনা এতো পড়াশুনা, একটু দূরে এগিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম, পাখিও দেখলাম, নাম জিজ্ঞেস করিনি, ভালো আছো কিনা শুধু এটুকুই ছিল জিজ্ঞাস্য; এপাশ ওপাশ ঘুরে আবার তরতাজা হয়ে ফিরলাম গোছগাছ শুরু করতে। গোছগাছ করে একেবারে জলখাবার খেয়ে আজকের দিনের জন্য রেডি; আজ হাঁটবো রাচেলা পাস বা রাচেলা দাঁড়া হয়ে রুখা ক্যাম্প। জোসেফের মুখে শুনলাম আজ জঙ্গল আরো ঘন, এবং চড়াই ও আছে খানিক। শুরু হলো হাঁটা, গাছের চরিত্র ও আস্তে আস্তে পাল্টাতে শুরু করলো, শাল, ওকের জায়গা নিলো বাঁশ, রডোডেনড্রন। ঘন জঙ্গল, নিরবিচ্ছিন্ন অন্ধকার মাঝে মাঝে, উচ্চতাও বাড়ছে অল্প অল্প করে, আকাশ পরিষ্কার, কিন্তু জঙ্গল ভেদ করে রোদ্দুর আসছেনা, স্যাঁতস্যাঁতে ভাব সব জায়গায়। ঘন্টাখানেক হাঁটার পর একটু সমতল, মাটিতে বালির ভাগ বেশি এখানে, ঝুরঝুরে মাটি, নাম না জানা পাখির আওয়াজ চারিদিক থেকে, টেম্পারেট অঞ্চলের মতো আবহাওয়া, গাছপালা।






চলতে চলতে আবার ঘন জঙ্গলে ঢুকে পড়লাম, ঝুপ্পুস অন্ধকার একদম, বাঁশগাছে ভর্তি এ অঞ্চলটা, জোসেফ বললো এখানেই বেশি রেড পান্ডা দেখা যায়।
চলতে চলতে আমি একটু একলা হয়ে গেছিলাম, আমার এটা বদভ্যাস, একটু হাঁ করা টাইপের আছি আমি; ঝোপঝাড় দেখতে দেখতে, আর আকাশ পাতাল ভাবতে ভাবতে চলছিলাম, হঠাৎ জোসেফ দেখি ডাকছে; দৌড়োতে দৌড়োতে গিয়ে শুনি, একটা রেড পান্ডা ছিল এক বাঁশ গাছের মাথায়, দোল খাচ্ছিলো, ও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে আমি আসছিনা দেখে বাধ্য হয়ে ডাক দেয়; ততক্ষনে তিনি চলে গেছেন। কি আর করা যাবে? এবার ক্যামেরা বাগিয়ে খুব সতর্ক হয়ে হাঁটা শুরু করলাম, চোর পালালে বুদ্ধি বাড়ার মতো আর কি; আর তার দেখা পাওয়া যায়? লাভের লাভ হলো কিছু পাখি পেলাম। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছলাম একদম অন্যরকম এক জায়গায়, রাস্তাটা হঠাৎ করে সুঁড়িপথ হয়ে গেছে, সরু, অন্ধকার, সুঁড়িপথ, পাশে ঝুরঝুরে বালির মতো মাটি, আর ওপরে বাঁশ, রডোডেনড্রন ঝুঁকে আছে। মাঝে মাঝে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হচ্ছিলো, শেষ আর হয়না, কি অন্ধকার আর অস্বস্তিকর, না গেলে বোঝানো যাবেনা। জোসেফ আবার খানিক আগেই শুনিয়েছে এ অঞ্চলে ভাল্লুক ভালোই আছে, ভাবছি আর ওপরে তাকাতে তাকাতে হাঁটছি বা হামাগুড়ি দিচ্ছি; সবসময় মনে হচ্ছে যেন কেউ এখুনি মাথায় ঘাড়ে ঝাঁপিয়ে পড়বে। বেশ কিছুক্ষন পর সেই অন্ধকার গুহা থেকে বেরোলাম, বেরোতেই পড়লাম ভীষণ সবুজ এক মাঠের মধ্যে।

সবুজে সবুজ এক অঞ্চল, ঝোপঝাড়, বাঁশগাছে ভরা; সামনেই দুটো পুকুর, এই সেই জোড়পোখরি। জলের কিছু কিছু জায়গা জমে বরফ হয়ে আছে, বাকিটা সবজে নীল থকথকে জেলির মতো দেখতে লাগছে। পুকুরের বাঁদিকে একটু ওপরে পাকা বাড়ি????






আমরা তো অবাক; লাফালাফি শুরু করে দিলাম যে ওখানেই থাকবো। জোসেফ বললো আগে চলুন ওখানে, তারপর বুঝতে পারবেন। সামনে গিয়ে দেখি পুরোপুরি ধ্বসে গেছে, কিছুই আর ঠিকঠাক নেই; কি ব্যাপার? কেন এমন হলো? শুনলাম এক প্রশাসনিক চাপানউতোরের গল্প; বাংলোটি সিকিম সরকার বানিয়েছিলো, কিন্তু হিসেবের গোলমালে বাংলোটি পড়ে গেছে পশ্চিমবঙ্গের সীমানার মধ্যে, সেই নিয়ে অনেক বাদানুবাদে আর শুরুই করা যায়নি কিছু।
এই জায়গাটি ভীষণ ইউনিক, রাচেল্লা পাস বা দাঁড়া হলো এর পরেই, এই জায়গাটিকে ট্রাই-জংশন ও বলে, এটি পশ্চিমবঙ্গ, সিকিম আর ভুটানের মিলনস্থল। জলের কোনো উৎস কাছে নেই, ফলে বাংলো চালু করতে সেটাও এক অন্তরায়; অবাক লাগছে না? দুটো পুকুর আছে বলছি, অথচ জলের উৎস নেই বলছি? বলছি, কারণ হলো এ পুকুর দুটি বৌদ্ধ ও হিন্দু দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছেই খুব পবিত্র, স্থানীয় মানুষ ওখানকার জল ব্যবহার করে না, করতেও দেয়না। যাক, এখানে বসে আমরা খাওয়া সারলাম, খানিক জিরিয়ে নিয়ে আবার হাঁটা শুরু করলাম, একটু এগোতেই এলো রাচেল্লা পাস বা দাঁড়া, উচ্চতা ১০৬০০ ফুট, ধীরে ধীরে ওপরে উঠে এলাম আমরা, তখন বেলা প্রায় ১১-৩০টা, সামনে বিশাল আকাশ আর দূরে সবুজ, নীল, ধূসর পাহাড় ক্রমশ আবছা থেকে আবছাতর; অনেক অনেকেক্ষন পরে খোলা আকাশের দেখা পেলাম, সেই সকালে আলুবাড়ি থেকে বেরোনোর পর থেকে আর সামনে খোলা অঞ্চল পাইনি, গাছপালা, ঝোপঝাড় আর এঁকেবেঁকে চলা সুঁড়িপথ ই ছিল আমাদের এতোক্ষনের সঙ্গী।

রাচেলা পাস






সকাল থেকে রোদ্দুর ছিল আকাশে, আমাদের ই কপাল খারাপ, এখন বেশ মেঘলা, সাথে জোরালো হাওয়া দিচ্ছে, ধূসর আরো ধূসর হয়ে যাচ্ছে চারপাশ, রাচেল্লা দাঁড়ার ওপরে শুধু উলুখাগড়ার মতো ঝোপ, কখনো ছোট ছোট, কখনো বিশাল বড়ো বড়ো। বসে পড়লাম সবাই, মেঘের আড়ালে কাঞ্চনজঙ্ঘার মাথা উঁকি দিচ্ছে, জোসেফ বলছিলো আকাশ পরিষ্কার থাকলে অপূর্ব দেখা যায়। এই বা কি কম অপূর্ব, মেঘের ফাঁকে কখনো একটু, কখনো বা মেঘের ওপর দিয়ে… সাদাকালো পুরোনো দিনের ছবির মতো লাগছে কাঞ্চনজঙ্ঘা কে; বহুক্ষণ বসে আকাশে মেঘ আর কাঞ্চনজঙ্ঘার লুকোচুরি দেখলাম আমরা; ভাষায় বোঝানো মুশকিল আকাশ জুড়ে এই অসাধারণ সিল্যুয়েটকে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা






ঘড়িতে প্রায় ১২-৩০টা, এবার আবার এগোনোর পালা, দুটো রাস্তা দিয়ে রুখা ক্যাম্পের দিকে যাওয়া যায়, একটা একদম সোজা নেমে গেছে ক্যাম্পের দিকে, আরেকটি রাচেল্লা দাঁড়াকে বেড় দিয়ে ঘুরে ঘুরে নামছে। আমরা দ্বিতীয় রাস্তা ধরলাম। আমি বুঝতে পারছিনা এবার রাস্তার বর্ণনা কিভাবে দেব। বিশাল বিশাল গাছ, মহীরুহের মতো, কান্ড, পাতা একদম চেনা রডোডেনড্রন, কিন্তু এতো বড়ো বড়ো গুরাস আমি কোনোদিন দেখিনি; পাহাড়ে অনেকদিন ঘোরাঘুরিতে বহু রকম গুরাস বা রডোডেনড্রন দেখেছি, কিন্তু এরকম এক জায়গায় জটলা করে উঁচু, আরো উঁচুতে উঠে গেছে কখনো দেখিনি। বাকল খসে গেছে, লালচে বাকল ঝুলছে, আর সাদা কান্ড উঠে গেছে উঁচুতে, জড়ামরি করে দাঁড়িয়ে…. নিচে ঝরা পাতার গদি, সরসর করে নামছি। কখনো বসে পড়ে পাতার গদি দিয়ে হুড়মুড় করে খানিক নেমে এলাম; সে এক ভারী মজা।
খানিক নামার পড়ে আবার জঙ্গল শুরু হলো, গাছের চরিত্র ইতিমধ্যে বদলে গেছে, পরিচিত গাছপালা বেশি নজরে আসছে। এখানে জঙ্গল আর অতো ঘন নয় সবসময়, খানিক খোলা জায়গা পাওয়া যাচ্ছে চারপাশ দেখার জন্য। সুন্দর সুন্দর পাখি নজরে আসছে চারপাশে, তুললাম ও কিছু ছবি। একটা বাঁক এলো সামনে, বড়ো বড়ো গাছে ঘেরা জঙ্গল পেরিয়ে এলাম, সেই বাঁদরলাঠির গাছ চোখে পড়লো, চোখে পড়লো ওক ও; এই ট্রেক এর প্রথম থেকেই একটা জিনিস ভেবে অবাক লাগছে যে এতটুকু উচ্চতার পার্থক্যে এতো জঙ্গলের পার্থক্য হচ্ছে কি করে? নিচের দিকে ট্রপিকাল জঙ্গল, ঘাস জঙ্গল পেরিয়ে সাবটেম্পারেট, টেম্পারেট, এমনকি রাচেল্লা পাশের কাছে সাব আলপাইন জঙ্গল ও চোখে পড়লো !!! বিস্ময় বিস্ময় বিস্ময় ……
এতো বিস্মিত এই দুদিনে হয়েছি জঙ্গল দেখে, এমনটা আর আগে কখনো হয়নি। রুখা ক্যাম্প প্রায় চলে এসেছি, সূর্য পশ্চিমে ঢলছে, খুব বেশি হাঁটিনি আজ, কত হেঁটেছি তার হিসেবে রাখার চেষ্টাও করিনি, অপুর মুগ্ধতায় শুধু দেখে গেছি এই পৃথিবীর অপূর্ব এক সৃষ্টি…


রুখা-৪ এক ছোট্ট ক্যাম্প, গাছ গাছালির মধ্যে হঠাৎ ঠাহর করা যায়না। ঢুকে জিনিসপত্র রেখে বাইরে এলাম… ক্যাম্পের সামনের এক চিলতে জায়গা থেকে নিচে তাকালাম…. তোদে-তামটা যমজ ভ্যালি দেখা যাচ্ছে… সূর্যের শেষ আলো পড়েছে নিচের উপত্যকায় সোনালী ধানে, জঙ্গলের মাথায় মাথায়। পাখির কিচিরমিচিরে সূর্য ডোবার আহ্বান…..

রুখা ক্যাম্প






কুয়াশা ক্রমশ অস্পষ্ট উচ্ছাসে ঢেকে দিচ্ছে নিচের উপত্যকা,
কালো অন্ধকার ঘিরে ধরছে পৃথিবীর শরীর-
টুপটাপ শব্দের শিশির, স্যাঁতস্যাঁতে আবছায়া
বাউল উদাস মন আর আমি- একা।।

পরের পর্ব আসছে ……


নেওড়া ভ্যালি ট্রেকের এই অসাধারণ বর্ণনা আর ছবিগুলো দিয়েছেন আমাদের সকলের প্রিয় ও সকলের খুবই পরিচিত শুভময় পাল দাদা।


 



Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement