NEORA VALLEY NATIONAL PARK TREK, 2nd part

NEORA VALLEY NATIONAL PARK TREK, 2nd part

‘বুনো ফুলে ঘুরে ঘুরে প্রজাপতি ক্লান্ত যখন…’

দ্বিতীয় দিন

এখন জড়িবুটি ওয়াচ টাওয়ারের সামনে একটা বড়ো গাছের গোড়ায় উজ্জ্বল কমলা রঙের বিশালাকৃতি একঝাঁক মাশরুমের সামনে দাঁড়িয়ে, সময় এখন দুপুর ১২-৩০টা, কনকনে ঠান্ডায় হাত পা জমে যাচ্ছে; অনেক বরফ ঢাকা অঞ্চলে আগে হেঁটেছি, হাঁটার সময় এতো ঠান্ডা কখনো লাগেনি I

ভোরবেলা লাভায় হোটেলে ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নাস্তা সেরে ঝটপট গাড়িতে  বেরিয়ে পড়েছিলাম যখন, তখন ও ঠান্ডা লাগছিলো, কিন্তু এরকম ছুঁচ বিঁধিয়ে দেওয়া ঠান্ডা না; সকালের নরম আলোয় মনাস্ট্রি কে বাঁদিকে রেখে গাড়ি এগিয়েছিল সামনের পাহাড়ের দিকে, পাহাড়ে খানিক এগিয়ে দুটো রাস্তা ভাগ হয়ে গেছে, বাঁদিকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে গেলে কোলাখাম, আর আমরা রওনা হয়েছিলাম ডানদিকে I লাভা থেকে মোটামুটি ৭ কিমি গিয়ে পৌঁছেছিলাম চৌদাফেরি; এখানে ছোট একটি ফরেস্ট বীট অফিস আছে, আর আছে রেড পান্ডা হাট; ওখানে পারমিট দেখিয়ে শুরু করেছিলাম হাঁটা I অনেকে এই চৌদাফেরি থেকে ৬ কিমি মতো দূরত্বে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত গিয়ে ফিরে আসেন; ওখানেইকাছাকাছি PHE ক্যাম্প ও আছে থাকার জন্য I

আমরা যখন হাঁটা শুরু করেছিলাম তখন ঘড়িতে প্রায় ৯-৩০ টা, ঠিক ফরেস্ট অফিস এর গা দিয়েই ঢুকে পড়েছিলাম জঙ্গলে, একটু এগোতেই ওই জানুয়ারী মাসেও টের পাচ্ছিলাম স্যাঁতস্যাঁতে সোঁদামাটির গন্ধ, আর আকাশ জুড়ে শাল সেগুনের উপস্থিতি I একটু উঁচু অঞ্চল দিয়েই হাঁটছিলাম, প্রাণ ভোরে নিচ্ছিলাম প্রায় অনাঘ্রাত এই জঙ্গলের গন্ধ, চোখ মেলে দেখছিলাম প্রায় অসূর্যম্পশ্যা এই জঙ্গলের রূপ, কান পেতে হাওয়ার শনশন শব্দ, পোকার কিরকিট কিরকিট আওয়াজ শুনছিলাম I 

আমরা জিরো পয়েন্ট কে ডানদিকে রেখে এগোচ্ছিলাম, গাইড যোসেফ বলছিলো এই জঙ্গলের বিভিন্ন গল্প, ওই বলছিলো যে এই জঙ্গলে খুব শীত ছাড়া ঢোকা মুশকিল, আমরাও দেখছিলাম এই শুকনো, শুষ্ক সময়েও কত ঘন সবুজ হতে পারে একটা বন I  যোসেফ ফরেস্ট গার্ড, কিন্তু আদতে ও পাখি বিশারদ; এই জঙ্গলকে হাতের তালুর মতন চেনে, টুকরোটুকরো কথায় বিভিন্ন পাখি, তাদের হ্যাবিট, কোথায় কখন থাকে এইসব বলে যাচ্ছিলো ও, আর আমি ওর কথামতো ওপর নিচে তাকাতে  তাকাতে চলছিলাম মোহাবিষ্টের মতো I জিরো পয়েন্ট, PHE ক্যাম্প কে এড়িয়ে আমরা এগিয়ে যাচ্ছিলাম সবুজ, আরো সবুজের ভেতরে I এতক্ষন পাহাড়ে কখনো উঁচু, কখনো একটু গড়ান দিয়ে হাঁটছিলাম, এবার পৌঁছলাম জঙ্গলে ঢাকা প্রায় সমতল এক অঞ্চলে, অদ্ভুত এক জায়গা, ঘন সবুজে ঢাকা, কোনটা আমাদের যাওয়ার রাস্তা বোঝার উপায় নেই গাইড ছাড়া; মাঝখান দিয়ে এক ছোট্ট তিরতিরে নদী, তলার সবকটা পাথর শেওলা সবুজ; জল যেন আয়না; আর তাকে ঘিরে লতা পাতা, ছোট ছোট ঝোপ, বাঁশবন-প্রচুর নাম না জানা অর্কিড, ছায়া ছায়া চারিদিক, শিশির জমে বরফ হয়ে ঝুলে আছে ঝোপ থেকে, নদীর পাথরের ওপরে; স্বচ্ছ সে বরফ স্ফটিক শুভ্রতায় ঝলমল করছে I 

বাঁদিকে ওই নদীর স্রোত, আমরা পাড় দিয়ে দিয়ে এঁকেবেঁকে চলেছি; ঝোপ মাঝে মধ্যে এতো ঘন যে সামনের লোককেও দেখা যাচ্ছিলোনা I হঠাৎ ই একটু দূরে দেখতে পেলাম একটা ওয়াচ টাওয়ার, যোসেফ বললো জড়িবুটি ওয়াচ টাওয়ার, প্রচুর ওষধি গাছ এ অঞ্চলে বলে তার এরকম নাম I খসে পড়া কাঠ, সদ্য রং করা একটা অংশ, নিচে দাঁড়িয়ে ভীষণ ঠান্ডা লাগছে, প্রায় তিন ঘন্টা হেঁটেও কোনো উত্তাপ নেই শরীরে, যত উত্তাপ মনে ছড়িয়ে পড়েছে; এমন সময় হঠাৎ দেখি ওই উজ্জ্বল কমলা মাশরুম !!!এই মাশরুমটি দেখে এতো অবাক হলাম, যে ঠান্ডাও ভুলে গেলাম, জোসেফ বললো ওর নাম সালফার মাশরুম বা চিকেন মাশরুম ( Laetiporous ),ও তুলে নিলো বেশ বড়ো দুটো মাশরুম, বললো ভাজা খেতে দারুন লাগে; এডিবল I

আমরা ওই ওয়াচ টাওয়ার এর ওপর উঠলাম, বিস্তৃত এক ঘাসজমি আর বুনোঝোপে ঠাসা সামনেটা, দূরে আস্তে আস্তে আবার পাহাড় উঠে যাচ্ছে, পেছনে নিচে নীল নদী আর সবুজ বনের ক্যামোফ্লাজ I এই টুকু রাস্তাতেই অনেক রকম পাখি চিনিয়েছে যোসেফ; এই ওয়াচ টাওয়ার থেকেও পেলাম বেশ কিছু পাখি; আমি পাখির ব্যাপারে একেবারে অশিক্ষিত, পাখি ভীষণ পছন্দ করি, কিন্তু নাম মনে রাখতে পারিনা, যোসেফের সাহচর্যে অনেক কিছু জেনেছিলাম, rufous-throated partridge, crimson-breasted woodpecker, Darjeeling woodpecker, rufous-gorgeted flycatcher,  black-faced laughingthrush – এরকম কিছু নাম এখনো মনে আছে I বেশ খানিকক্ষণ ওই টাওয়ার এ কাটিয়ে আবার হাঁটা শুরু, ঘাসজমি দিয়ে শুরু হলো, এলো বিশাল বিশাল ঘাসের জঙ্গল, আবার পড়লাম বড়ো গাছের জঙ্গলে I সে এক অনবদ্য হাঁটা, আকাশ এবার খানিকটা খোলা, দেখা যাচ্ছে দূরের সবুজ পাহাড়; হাঁটে হাঁটে পৌঁছলাম একটু বড়ো আরেকটা নদীর পাড়ে, এটি নেওড়া নদীরই একটা শাখা, আবার টলটলে জল, আবার এখনো শিশির জমা বরফ.. টপকে ওপারে গেলাম বাঁশের সাঁকো দিয়ে, ওপারে ছোট একটি ফরেস্ট ক্যাম্প, দুপুর প্রায় ১-৩০টা; হাত পা ছড়িয়ে বসলাম ক্যাম্পের বারান্দায়; বসলেই ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছে, শিরশিরে হাওয়া বইছে সারাক্ষন, সামনে আপন মনে নদী বয়ে চলেছে নীলচে সবুজ আভা মেখে; হালকা সবুজ, গাঢ় সবুজ, পাটকিলে, হলদেটে সবুজ গাছ গাছালি চুপচাপ দাঁড়িয়ে অল্প অল্প দুলছে; আকাশ নীল, আদিগন্ত বিস্তৃত এক স্বপ্ন যেন সামনে থেকে হাতছানি দিচ্ছে I 

বিশ্রাম সেরে আবার শুরু করলাম হাঁটা, জঙ্গল আরো ঘন, পায়ে জড়িয়ে যাচ্ছে লতানে গাছ, গাঢ় অন্ধকার, জলে জঙ্গলে মাখামাখি, বাঁশবন আধিভৌতিক চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে, চিলতে আলো পড়ে মায়াবী এক জগৎ চোখের সামনে I চলতে চলতে যেন হারিয়ে যাচ্ছি আদিম এক পৃথিবীতে I  আর বর্ণনা দেওয়ার ক্ষমতা নেই আমার, ছবি যদি কুচু বলতে পারে I একটা ছোট টিলা টপকে পড়লাম সমতলে, মাথার ওপর দিয়ে লম্বা লম্বা ঘাস, অদ্ভুত ঘাসফুলে এ মাঠ ছেয়ে আছে; দূরে পাহাড় উঠে গেছে, তার মাঝামাঝি জায়গায় একটা ওয়াচ টাওয়ার দেখা যাচ্ছে, জোসেফ বললো, ওটা ভাঙা, এখন আর ওঠা যায়না, ওই ওয়াচ টাওয়ার এর পাশ দিয়েই ওপরে উঠতে হবে I ঘাসফুলগুলো কি অন্যরকম, কখনো দেখিনি আমি, বেশ বড়ো বড়ো, সুন্দরের মতো প্রচুর ফুল একসাথে জড়ামরি করে আছে i  ঘাসবন পেরিয়ে চড়াই শুরু হলো, ভালোই চড়াই, তবে এতো সবুজ আর এতো রূপ দেখে দেখে কোনো কষ্টই আর কষ্ট মনে হচ্ছেনা I এক ধরণের কুল টাইপের গাছ পেলাম, টকটকে লাল ফল,ধূসর ঘাস বনের মাঝে রক্তিম চমক i জোসেফের কাছ থেকে আশ্বাস পেয়ে খেলাম ও কয়েকটা, টকটক মিষ্টি মিষ্টি, বেশ খেতে i উঠছি  ধীরে ধীরে, পাশে ওক গাছ বেশ কিছু চোখে পড়লো, অদ্ভুত এক জঙ্গল, এরকম বিভিন্ন বিপরীতধর্মী গাছ আর কোনো জঙ্গলে আছে আমি জানিনা I পাহাড় চড়তে চড়তে পৌঁছলাম ওই ওয়াচ টাওয়ার এর কাছে; সব ঝুলে ঝুলে পড়েছে কাঠকুটো, দূর থেকে দেখলে কিছুই বোঝা যায়না I

তখন বিকেল ৩টে, এবার একটু খাওয়াদাওয়া দরকার, জোসেফ ঝুলি থেকে বের করলো ওর করে আনা চিকেন আর রুটি; ওই আদিম জঙ্গলে হাত পা ছড়িয়ে আয়েশ করে বসলাম, দেখলাম কিছু দেখতে পাচ্ছিনা, আমরা ঘাসের জঙ্গলে ডুবে গেছি; খাওয়া দাওয়া শেষ করে আবার হাঁটতে শুরু করলাম, আর বেশি নেই, ওপরে পাহাড়ের খাঁজে দূর থেকে একটা ছোট ঘর চোখে পড়ছে, ওটাই আলুবাড়ি ফরেস্ট ক্যাম্প I আজ আমাদের রাতের আশ্রয়স্থল I ক্রমশ কাছে পৌঁছচ্ছি, আর গাছপালা গুলো sub-temperate ধরণের হয়ে যাচ্ছে, অদ্ভুত I আমি বোধহয় বারবার অদ্ভুত কথাটা লিখে ফেলছি, কি করবো? এতো অন্যরকম জঙ্গল তো দেখিনি আগে I চলে এলাম ক্যাম্পের কাছে, পাশের ঝোপেই দেখি ভীষণ সুন্দর কিছু পাখি, জোসেফ বললো তুলুন তাড়াতাড়ি, খুব রেয়ার ক্যাচ, black faced  laughingthrush ; ঢুকলাম ক্যাম্পে, চৌকিদার খুব ই অমায়িক, বললো সাব আজ রাতে তো বরফ পড়বে! আমি তো অবাক? এই উচ্চতায়? কত হবে? মেরেকেটে ৮০০০ ফিট i জোসেফের মুখ থেকে শুনলাম যে তার মানে হলো তাপমাত্রা শুন্যের নিচে নামবে , জল সব জমে ক্রিস্টাল হয়ে যাবে!!!

সে ঠান্ডা রাতে টের পেয়েছিলাম, স্লিপিং ব্যাগ এও মনে হচ্ছে জল ঢেলে রাখা আছে, কোনোরকমে তীক্ষ্ণ ঠান্ডায় খানিক বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম, পূর্ণিমা ছিল, চারিদিকে ভেসে যাচ্ছিলো আলোয়,কিন্তু ৫ মিনিট এর বেশি দাঁড়াতে পারিনি I  ৯ টার সময় কোনোরকমে খাওয়া সারতে ছোট এক চিলতে রান্না ঘরে গেছিলাম, তীব্র ঠান্ডায় চরাচর জমে আরো নিকষ কালো I সেই কমলা মাশরুম  ভাজা, রুটি আর ডিমের ঝোল খেয়ে ঘরে I ঘর ও খুব পোক্ত নয়, কাঠের মাঝে ফাঁক, মাথায় টিনের তলায় কঞ্চির শয্যা I ওখানে রাখা যন্ত্র তাপমাত্রা দেখিয়েছিলো  -৩ ডিগ্রি !!!

যাক সে কথা, তখন বিকেল ৫টা, আকাশ লাল হচ্ছে, পাতাঝরা গাছেরা তৈরী করছে অদ্ভুত সিল্যুয়েট; পাশেই একটা ঝোপ কিচিরমিচির শব্দে মাতোয়ারা; লালচে কমলা রঙের ছোট ছোট পাখি ঝোপ ভর্তি, Red headed bullfinch  I

সেই সন্ধ্যা বন্দনার আবহে  গোধূলির আলোয় আদিম পৃথিবী  নিজের ডানার তলায় অন্ধকারে সযত্নে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে তার রং, রূপ সব…….

‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতো

সন্ধ্যা আসে, ডানায় রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;

পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে পাণ্ডুলিপি করে আয়োজন

তখন গল্পের তরে জোনাকির রঙে ঝিলমিল ;

 

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement