ফুলের পাহাড় : এমন দেশটি কোথাও খুঁজে…

ফুলের পাহাড় : এমন দেশটি কোথাও খুঁজে…




লঙ্গুড়ি পাহাড় – পুষ্পগিরি বিহার

প্রথম যখন পুথিপত্রে এর খোঁজ পাই, তখন ওড়িশার প্রায় কোনও মানুষের কাছেই লঙ্গুড়ি পাহাড়ের সঠিক অবস্থানটি জানতে পারিনি। ভাসা ভাসা শুনতে পাই পাঁচ নম্বর জাতীয় সড়ক হয়ে যেতে হবে। জাজপুর জেলা। কিন্তু এটুকু তথ্য যথেষ্ট নয়।

হঠাৎ আমার দফতরে একজন সহকর্মীর স্থানান্তর হলো।  এই ভদ্রলোকের বাড়ি জাজপুরে ব্রাহ্মণী আর কিমিরিয়া নদীর সঙ্গমের কাছে। তাঁর কাছে তখন লঙ্গুড়ি পাহাড়ে সম্প্রতি উদ্ধার করা বৌদ্ধ পুরাবশেষের কিছু হদিশ পেলুম।  তিনি নিজেও সেখানে কখনও যাননি। কিন্তু এইটুকু জানেন চণ্ডীখোল আর জারকের মাঝখান থেকে একটি রাস্তা বেরিয়ে গেছে নদী-গ্রাম-জঙ্গল পেরিয়ে। সেটি ধরে গেলে পুষ্পগিরি বিহারের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া যাবে।

Ruins of rock cut sculpture, Pushpagiri Vihar





আমিআমার সহায়ক অফিসারকে বললুম চণ্ডীখোল শাখার ম্যানেজারকে বলো আমার সঙ্গে কথা বলতে। সে ভদ্রলোক অবিলম্বে আমাকে ফোন করলেন। কিন্তু তিনিও শুনেছেন পুষ্পগিরির কথা। নিজে যাননি কখনও। সঠিক জানেন না। তাঁকে বলি, কয়েকদিন পর চণ্ডীখোল হয়ে একটি সরকারি কাজে পারাদিপ যাবো। তার আগে খোঁজখবর করে রাখুন। তা তিনি করেছিলেন। কয়েকজন স্থানীয় মানুষকে জোগাড় করে প্রায় একটা স্কাউট পার্টি তৈরি করে জিপে আমাদের গাড়ির আগে পাইলটের মতো লাগিয়ে দিলেন। পরে বুঝলুম, এই সাহায্যটি না পেলে কদাপি পৌঁছোতে পারতুম না পুষ্পগিরি বিহারের কাছে।

Pushpagiri Vihar, Langudi Hills

নদীমাতৃক ওড়িশার  চোখ জুড়োনো সবুজের সমারোহ আর জলে ভাসাভাসি নদীছাপানো অসংখ্য স্রোতধারা চারদিকে। তার  মধ্যে দাঁড়িয়ে ছোট ছোট কয়েকটি পাহাড়। তাদের মধ্যে কয়েকটি মাটির  গভীরে  লুকিয়ে থাকা বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংসাবশেষ। এই পুরানির্মাণটির বিস্তৃতি অতি বৃহৎ। চোখে দেখে মনে হয় শতকরা দশভাগের  বেশি এখনও উদ্ধার করা যায়নি। কিন্তু যা দেখা যাচ্ছে, তার গুরুত্ব এই কারণে কমে যায়না। পুরোপুরি উদ্ধার হলে পুষ্পগিরি আমাদের  বিস্ময়কর ঐতিহ্যের একটা উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে উঠবে।

Langudi Hills





পুষ্পগিরিরকথা প্রথম পাওয়া যায় চিনা পরিব্রাজক পণ্ডিত জুয়ান জঙের (হিউ-এন-সাং-৬০২-৬৬৪ খ্রিস্টাব্দ) দিনলিপিতে। কয়েকটি অন্য প্রাচীন শাস্ত্রেও এর উল্লেখ ছিল। ১৯৯০ সাল পর্যন্ত মনে করা হতো ললিতগিরি-রত্নগিরি-উদয়গিরি ত্রিভুজই ছিল পুষ্পগিরি বিহারের কেন্দ্র। কিন্তু ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত যেসব পুরাতাত্ত্বিক উৎখনন হয়েছে তার থেকে এখন স্পষ্ট পুষ্পগিরি বিহার ছিল  একটু দূরে। কারণ লঙ্গুড়ি পাহাড়ে প্রত্নসন্ধানের সময় একটি শিলালেখ পাওয়া যায় যেখানে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল পুষ্পগিরিবিহারের অবস্থিতি এখানেই।

Ruins of rock cut sculpture – Langudi Hills

জুয়ানজঙের বর্ণনা অনুযায়ী এখানে ছিল একটি বিশাল সঙ্ঘারাম। নাম পু-সে-পো-কি-লি। ওড্রদেশের দক্ষিণে তার অবস্থিতি। বিহারটি একটি পাহাড়ের উপর নির্মিত হয়েছিল। একটি প্রস্তরনির্মিত বৌদ্ধ স্তূপ ছিল এখানে, যেটি থেকে অলৌকিক আলোকপ্রভা বিকীর্ণ হতো। স্তূপের শীর্ষে আমলকটির চৌম্বক শক্তি ছিল। চুম্বকশলাকার মতো তা দিকনির্দেশ করতো।  পণ্ডিত স্ট্যানিস্লাস জুলিয়েন ও স্যামুয়েল বীল প্রাচীন নিদর্শন থেকে ‘পুষ্পগিরি’ নামটি উদ্ধার করেন।

Ruins of Mahastoopa, Pushpagiri Vihar




এটিই আসল পুষ্পগিরিবিহার কি না তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। ২০০৭ সালে অধুনাতম উৎখননের ফলে এখানে পাহাড়ের উত্তরদিকে ৩৪টি খোদিত স্তূপের সন্ধান পাওয়া গেছে। পাহাড়ের দক্ষিণদিকে অনেকগুলি ধ্যানী বুদ্ধের পাহাড় কাটা বাস রিলিফ মূর্তিও  উদ্ধার হয়। ভারতীয় পুরাতাত্ত্বিক সংস্থা তার পর এই পুরানিদর্শনটি অধিগ্রহণ করেন। তাঁদের মতে এইসব অবশেষ খ্রিস্টিয় প্রথম থেকে নবম শতকের মধ্যে নির্মিত হয়েছিল। সম্ভবত এটি  সে সময় ভারতবর্ষের বৃহত্তম বৌদ্ধ বিহার কেন্দ্র ছিল।

Pushpagiri Vihar, Langudi Hills




খ্রিস্টিয় তৃতীয় শতক থেকে পুষ্পগিরিবিহার বেড়ে উঠেছিল নালন্দা, বিক্রমশিলা, ওদন্তপুরী, তক্ষশিলা’র মতো একটা বিশাল নির্মাণ হয়ে। তার কেন্দ্র ছিল ব্রাহ্মণী- মহানদীর ব’দ্বীপ এলাকায়।  কিন্তু পুষ্পগিরি, যেটা ঐ চিনা পরিব্রাজকের মতে সব চেয়ে বিশাল, ২০০৭ সাল পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। অতি সম্প্রতি খননের পর প্রাচীন কলিঙ্গরাজ্যের রাজধানী দন্তপুরী আর ব্রাহ্মণী ও কিমিরিয়া নদীর সঙ্গমের কাছাকাছি লঙ্গুড়ি পাহাড়কে ঘিরে এই প্রত্ন-অবশেষ পাওয়া গেছে। সবে শুরু, এখনও অসংখ্য পাহাড়িয়া ঢিপি, টিলা ছড়িয়ে আছে, যেখানে খোঁজ করা দরকার। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে উল্লিখিত বিহারগুলি বস্তুত পুষ্পগিরিবিহারেরই অংশ। আজকের জাজপুর-কেন্দ্রাপাড়ার একটা বেশ বড়ো এলাকা জুড়ে আমাদের ঐতিহ্যের এইসব নিদর্শন আবিষ্কারের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে আছে।

Ruins of rock cut sculpture – Langudi Hills

 

Ruins of rock cut sculpture – Langudi Hills




লঙ্গুড়ি পাহাড়ের পাশেই রয়েছে কাইমা পাহাড়। সেখানে একটি অতি প্রাচীন হস্তীমূর্তি সময়ের প্রহার অস্বীকার  করে এখনও রয়ে গেছে। যদি ফা হিয়েনের বর্ণনা মেনে নিই, তবে এই মূর্তিটি স্বয়ং পিয়দস্সি অশোকের সময় থেকে এখানে রয়েছে। এই মূর্তিটিকে বৌদ্ধরা খুবই পবিত্র জেনে পূজা করতেন। আমি যখন জুয়ান জঙের লেখায় এর উল্লেখ পেয়েছিলুম, কখনও ভাবিনি এটিকে নিজের চোখে দেখতে পাবো। এর কাছেই ব্রাহ্মণী ও কিমিরিয়া নদীর সংযোগ স্রোতের পাশের দেউলি পাহাড়ে আরও পাঁচটি ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। এছাড়া ছড়িয়ে থাকা বজ্রগিরি, সরগিরি আর পাইকরাপুর অঞ্চলে বৌদ্ধ ইতিহাসের অবশেষ দেখা যায়। সবগুলি মিলিয়েই ছিল পুষ্পগিরি।

Ancient elephant statue

 

কিভাবে যাবেন :

হাওড়া থেকে রাতের ট্রেন ধরে পৌঁছে যান উড়িষ্যার ভুবনেশ্বর বা কটকে। ভুবনেশ্বর থেকে লঙ্গুড়ি পাহাড় প্রায় ৭৫ কিমি আর কটক থেকে এর দূরত্ব ৫০ কিমি। ভুবনেশ্বর থেকে যেতে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগে। ভুবনেশ্বর থেকে লঙ্গুড়ি পাহাড় ঘুরে সেইদিন ফিরে আসা যায়। তবে স্থানীয় লোকজনের সাহায্য দরকার সেক্ষেত্রে যিনি জায়গাটা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল।
নাহলে আপনি হাওড়া থেকে ট্রেন ধরে জাজপুর (Jajpur – JJKR) এসেও লঙ্গুড়ি পাহাড় যেতে পারেন। জাজপুর স্টেশন থেকে এর দূরত্ব ৪০ কিমি।

Ruins of Mahastoopa – Pushpagiri Vihar




কোথায় থাকবেন :

ভুবনেশ্বরে বিভিন্ন মানের ও বিভিন্ন দামে অনেক হোটেল পেয়ে যাবেন। আর যদি আপনি জাজপুর হয়ে আসেন তো জাজপুরেও বেশ কিছু হোটেল পেয়ে যাবেন।

জাজপুরে কয়েকটি হোটেলের নাম হলো:
১. Hotel Brahmani – + 06726-222001 / 06726-222002, E-mail –  reservationhotelbrahmani@gmail.com

২. Hotel Royal Kalinga – +91 94393 69659

৩. Suryansh Hotel – + 06726-224920-24, E-mail: suryanshjajpur@gmail.com

 


This conten is written by Mr. Shibanshu De.




 

 

 





Trackbacks/Pingbacks

  1. 5 Offbeat Destinations for your Perfect Weekend Gateway - Tour Planner Blog - […] To know more about this place, click the link. […]

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement