কিরিবুরু মেঘাটুবুরুর গল্প – অরুনাভ মালো

কিরিবুরু মেঘাটুবুরুর গল্প – অরুনাভ মালো

কিরিবুরু মেঘাটুবুরুর গল্প


23শে জুন, রাত 11:45

পল্লব দা আর প্রীতম ঘুমাচ্ছে। মানে পল্লব দা সত্যি করে ঘুমাচ্ছে আর প্রীতম এমনি চোখ বুজে শুয়ে আছে। আমি সবথেকে ওপরের বার্থে, ঘুম আসছে না। গান শুনছি।
প্ল্যানটা খুব একটা পাকাপোক্ত না, তবু যাচ্ছি। অনেকটা জঙ্গল, জঙ্গলের মধ্যে রাস্তা আর “700 পাহাড়” …আসলে কত পাহাড় কেউই ঠিক জানে না, একটা পয়েন্ট আছে, সেখান থেকে নাকি দেখা যায় দূরে তাকালে। সেখানে যাচ্ছি। কিরিবুরু – মেঘাবুরু – সারান্দা।
হাওড়া থেকে রাতের খাবার কিনে এনেছিলাম তিনজন। রাত সাড়ে নটার কোরাপুট এক্সপ্রেস। খাওয়ার পরে যে যার মত শুয়ে পড়েছি কারণ কাল খুব রাতভোরে উঠে পড়তে হবে। গরমের সময়, তবু জানালা দিয়ে সুন্দর গা- জুড়ানো ঠান্ডা হাওয়া আসছে… রোজ রোজ অফিস জীবন থেকে দুদিনের পালিয়ে যাওয়া 🙂 এই পালানোর কোনো অর্থ নেই, তবে কিছু একটা সুন্দর ভালোলাগা আছে, যেটার জন্য এরকম সময়ে একটা পুরোনো গান শুনতে শুনতে বেশ খুশি লাগছে। প্রীতম ও কি সেই কারণেই ঘুমায়নি? রাগ হয়েছিল একটু আজ হাওড়া স্টেশনে এসে ওর ওপর। রাগ নেই। রাগ থাকেনা। থাকতে পারে না 🙂 ..
কামরা অন্ধকার। বাকি যাত্রীরাও ঘুমোচ্ছে সবাই। এইমাত্র সশস্ত্র দুজন পুলিশ টহল দিয়ে গেল এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত। বাইরে এক অদ্ভুত শান্ত ভাব, শুধু ট্রেন চলার আওয়াজ। শোয়ার আগে প্রীতমের সাথে নিচে জানালার ধারে বসে ছিলাম। যতদূর চোখ যায় শুধু শান্ত একটা অন্ধকার। মাঝে মাঝে আলো, দোকানপাট, গাড়ি, কারখানা, মানুষের ভিড়ের আলো। কয়েক সেকেন্ডের জন্য হয়তো। আবার অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে ছুটে চলেছে আমাদের কোরাপুট এক্সপ্রেস।
কাল থেকে যেন একটু হলেও বৃষ্টি হয়… হালকা বৃষ্টিতে পাহাড় জঙ্গল যেন বেঁচে ওঠে। শুকনো মাটি যেন সুন্দর একটা ভেজা গন্ধে ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠে। গাছের পাতায় কি সুন্দর ভাবে যেন লেখা হতে থাকে বৃষ্টির জলে খুব সোজা অথচ খুব দামি একটা বন্ধুত্বের adventure …
ঘুমোনোর চেষ্টা করি লেখা থামিয়ে। ভোরে উঠতে হবে। আপাততঃ অ্যালার্মই ভরসা। প্রীতম ও ঘুমিয়ে গেছে। পল্লব দা বোধহয় মঙ্গল গ্রহে পৌঁছে গেছে। আমিও রেডি হই ।

24শে জুন, দুপুর 1টা

ভোরবেলায় মনোহরপুর স্টেশনে নামার পর থেকেই লক্ষ্য করি যে কারোর ই ফোনে নেটওয়ার্ক পাওয়া যাচ্ছে না। ভোর 3:45 এ স্টেশনে পৌঁছনোর কথা, ট্রেন একটু দেরি করে ওই 4টে নাগাদ পৌঁছলো। শুনসান বড় স্টেশন, বাইরে সবজি ব্যাপারীরা ঘুমোচ্ছে, সকালের ট্রেনে সবজি আসবে যাবে। ওয়েটিং রুমটায় বেশ আলো, আর অনেক পোকা। সবুজ হলুদ মথে ভর্তি। আমরা যে জায়গাটায় যাচ্ছি সেটার নাম কিরিবুরু, মানে পোকার পাহাড় 😀 … সব পাহাড় গুলোই কিছু একটা বুরু (পাহাড়)। ওয়েটিং রুমে একজন একা স্টাফ বেরসিক মুখে নিজের কাজ করছেন কাউন্টারে। একটা শালিক পাখি মনের আনন্দে পেটের আনন্দে পোকা খাচ্ছে ধরে ধরে।
স্টেশনের বাইরেটা দেখতে বেরোলাম অন্ধকারেই। চা খেলাম। তারপরে দিনের আলো ফুটতে লোকজনদের জিজ্ঞেস করে জানলাম মনোহরপুর স্টেশনের কাছেই কোয়েনা নদী। পায়ে হেঁটে 10-15 মিনিট বাদে পৌঁছলাম সেখানে। নদীর জল খুবই কম, ওপরে বড় ব্রিজ। নিচে ব্রিজের ভিতে স্কেল দেখে বুঝলাম বর্ষাকালে জল অনেক বেড়ে যায়। ফটো তুলে ,নদীর ধারে পাথরে কিছুক্ষণ বসে থেকে আবার স্টেশন ফিরলাম।

অরুনাভ মালো

কোয়েল নদী-অরুনাভ মালো

আমরা আসলে অপেক্ষা করছি বাসের, যেটা একেবারে চাইবাসা অবধি যায়। ঠিক সাড়ে সাতটায় বাস ছাড়লো, সান্ডাল চক অবধি যাবো আমরা। ভেবেছিলাম বাস ছেড়ে কিছুটা চলতে শুরু করলে নেটওয়ার্ক ফিরে পাবো, কিন্তু সান্ডাল অবধি কোনো সিগন্যাল নেই। বাস সুন্দর ছবির মত নৈসর্গিক দৃশ্যের মধ্যে দিয়ে খুব জোরে সুন্দর রাস্তা দিয়ে ছুটে চলেছে। ওঠার সময় মনোহরপুর স্টেশন থেকে সিঙ্গারা কলা কেনা হয়েছিল। তাই খেতে খেতে তারপরে গান শুনতে শুনতে যাচ্ছি আমরা। পল্লব ঢুলতে ঢুলতে ঘুমিয়েই গেল। আমি আর প্রীতম দুচোখ ভরে বাইরের সিনারি দেখছি। কখনো একদিকে উঁচু আকাশচুম্বী বহুতলের উচ্চতার মত একদিকে উঠে গেছে পাহাড়ের দেওয়াল। কখনো দুদিকেই সবুজ ঘন জঙ্গল আর দূরে পাহাড়, মাঝে কোথাও পাহাড়ের গায়েই মাটি কেটে সমতল করে চাষ হচ্ছে। মনোরম মেঘলা আবহাওয়া। সুন্দর ঠান্ডা হাওয়া। পল্লব ঘুমে মগ্ন। প্রীতমের দেখলাম সিগন্যাল না থাকলেও কোনো চিন্তা নেই। আমিই বোধহয় একটু বেশি ঘরকুনো হয়ে গেছি, বারবার মোবাইল টা চেক করছি, বাড়ির লোকদের একবার ফোন করতে হবে তো, ঠিকভাবে পৌঁছেছি কিনা কাউকেই কিছু জানানোর সুযোগ পাইনি। এই জিনসটাই আমার “24 ঘন্টা অনলাইন” মনে একটু কেমন বাজে লাগল।
বাইরে অপূর্ব পাহাড়ের দৃশ্য। অনেকটা গিয়ে গিয়ে কোথাও কোথাও একটু সময় বাস দাঁড়াচ্ছে, স্থানীয় মানুষেরা উঠে পড়ছেন। দেখতে দেখতে ভিড় হয়ে গেল। কোথাও এরকমও দেখলাম, রাস্তার ধারে স্থানীয় মানুষদের ছোট ছোট পুঁচকে পুঁচকিরা কয়েকটা গাছপাকা আম ইত্যাদি নিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। দারিদ্র্যসীমার নীচে এই স্থানীয়দের সামান্য “আসুন আসুন হিমসাগর ল্যাংড়া” এসব বলার বোধ বা চালাকিটুকুও জানা নেই। তারা শান্ত, তাদের মা তাদের প্রকৃতির মত। এটা মনে গভীর দাগ ফেলল।
সান্ডাল চক যেতে মনোহরপুর থেকে প্রায় দুঘন্টার একটু কম সময় লাগল। নেমে প্রীতমের ফোনে সিগন্যাল পেয়ে আমাদের যেখানে থাকার কথা হয়েছে সেখানকার লোকদের আর আপনজনদের সাথে কথা বলা হল। সান্ডাল চক থেকেই কিরিবুরু জামশেদপুর এসব জায়গায় বাস যাচ্ছে।

অরুনাভ মালো

সান্ডাল চক – ছবি অরুনাভ মালো

দশ পনেরো মিনিট দাঁড়াতেই (তখন বোধহয় ওই সাড়ে নটা মতন বাজে) কিরিবুরু যাওয়ার বাস এলো। ততক্ষনে একটা অসুবিধা জানা গেছে, যে ভদ্রলোকের সাথে যোগাযোগ করে আমরা কিরিবুরু তে SAIL এর গেস্টহাউসে থাকার কথা ঠিক করেছিলাম, তিনি জানিয়েছেন যে কিছু অসুবিধার জন্য সেটা এখন বুক করা সম্ভব না। কনফার্ম বুকিং না করে শুধুমাত্র চেনা জানা কারোর রেকমেন্ডেশন নিয়ে কোথাও যাওয়ার ভুল এরপরে আর কোথাও করবোনা। যাইহোক, তিনি বললেন SAIL er গেস্টহাউসের থেকে একটু দূরে হিলটপ বলে একটা জায়গা আছে সেখানে গেস্টহাউস পেয়ে যাবো, তিনি ফোন করে সেটা ঠিকও করে দিলেন। অন্যান্য রাস্তার লোকেরা আরো গেস্টহাউস, হোটেলের কথা বললেন। অতএব বাস যখন কিরিবুরু তে SAIL এর সাজানো গোছানো অতিথি ভবন (2 নম্বর) এর পাশ কাটিয়ে চলতে লাগল তখন একটু আমরা মিইয়ে গেলাম। কি আর করা যাবে।

অরুনাভ মালো

SAIL এর অফিস থেকে- ছবি অরুনাভ মালো

খানিকটা যেতেই ব্যাংক মোড় (SBI) , সেটা কাটিয়ে আরেকটু গিয়ে মুরগা পাড়া। এখানে বাস থেকে নামলাম আমরা। স্থানীয় “আকাশ হোটেল” এ থাকবো আমরা যেটা মুরগা পাড়া থেকে প্রায় দেড়- দু কিলোমিটার দূরে হিলটপ এ। হোটেলে ফোন করে গাড়ি পাঠাতে বললাম আমরা। গাড়ি এসে আমাদের নিয়ে গিয়ে হোটেলে তুলল এবং আমি দরজা খুলেই ধপাস করে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম।
বেলা প্রায় সাড়ে এগারোটায় পৌঁছেছি। খিদে পেয়েছে। নেটওয়ার্ক প্রবলেম। স্নান করে ভাত চিকেন কারী খেলাম হোটেলের থেকেই। ক্লান্ত খুব। একটা বেজে গেলো। লেখাটা লেখা রইলো, সুযোগ পেলে, মানে নেটওয়ার্ক পেলে শেয়ার করে দেবো।

26শে জুন, বিকেল 4:50

নেটওয়ার্ক না থাকায় আর সারাদিন ই প্রায় ঘোরাঘুরি করে ক্লান্ত হয়ে যাওয়ায় কাল আর লেখা হয়নি। এখন আমরা জনশতাব্দী এক্সপ্রেসে, বরজামদা স্টেশন থেকে ট্রেনে উঠেছি দুপুর 2টোর সময়। রাত প্রায় 9টা নাগাদ বাড়ি পৌঁছব। মনোরম পরিবেশ থেকে অনেকটা দূরে আমরা। বাইরে ঝকঝকে রোদ্দুর, বেশ গরম তবে ট্রেন চলছে তাই অতটা বাজে লাগছেনা যতটা প্লাটফর্মে ট্রেনের জন্য ওয়েট করতে লাগছিল। দুই বন্ধু গান শুনছে।
সেদিন মানে 24 তারিখ বিকেলে একটু হেঁটে কাছেই কিরিবুরু মাইন এর গেটের মুখ অবধি গেলাম। পারমিশন নেওয়া এখানে বাধ্যতামূলক এবং এ ব্যাপারে যে এরা কতটা কড়া সেটা পরের দিন মানে গতকাল টের পেয়েছি। যাইহোক, পরশুদিন শুধুমাত্র আশপাশের রাস্তা আর গাছ এগুলো দেখতেই ভালো লাগছিল। পরেরদিন আমাদের প্রাইভেট গাড়ি বুক করে আশেপাশের মাইন আর বিভিন্ন জায়গা দেখার প্ল্যান।

অরুনাভ মালো

ঘন জঙ্গল – ছবি অরুনাভ মালো

রাত্রিবেলায় খাওয়া দাওয়া করে তিনজন একটু সাহস করেই আবার কিরিবুরু মাইন এর রাস্তা টার দিকে আলসে ভাবে হাঁটতে থাকলাম। কটাই বা বাজে তখন, সাড়ে নটা হয়ত হবে। কিন্তু রাস্তায় শুধুমাত্র যেটুকু আলো পড়েছে সেটুকু বাদ দিয়ে বাকিটা একদম নিশ্ছিদ্র অন্ধকার, খুব তীক্ষ্ণ স্বরে ঝিঁঝিঁপোকা ডাকছে। কোনো মানুষের আওয়াজ নেই। কোনো মানুষই নেই! খুব একটা ভয়লাগা নিয়েও কেমন মুগ্ধ হয়ে আমরা হাঁটতেই লাগলাম। আকাশভরা তারা, আর ঝিঁঝিঁপোকার আওয়াজ। হঠাৎ কয়েক পা দূরে রাস্তার আলোটা ঝুপ করে নিভে গেল। তাতেই বোঝা গেল চারিদিকে যেন অন্ধকারটা এটারই অপেক্ষায় ছিল…সবটা অন্ধকারে ঢেকে গেল। কেউই আর এগোনোটা ঠিক হবে বলে মনে করলাম না। টেরোরিস্ট দের আস্তানা আছে কিরিবুরুতে না হলেও চারিদিকে ঘন পাহাড় আর জঙ্গলে। যার জন্যই বাড়তি সিকিউরিটি।
পরের দিন সকালে আমরা SAIL এর বাসে ‘লিফট’ নিয়ে হিলটপ থেকে সোজা চলে গেলাম মেঘাটুবুরু। একটা দারুণ জিনিস যেটা প্রীতম ই প্রথম আবিষ্কার করল, যে সম্পূর্ণ কিরিবুরু – মেঘাবুরু – হিলটপ এই জায়গা গুলোর মধ্যে যেতে আসতে টাকা দিয়ে বসে উঠতে হয় না। দরকার শুধু একটু ধৈর্য। এখানে লিফট দেওয়ার পদ্ধতি চালু আছে এবং স্থানীয় মানুষেরা ও SAIL এর বাসগুলোতে বিনা ভাড়ায় মেঘাটুবুরু থেকে হিলটপ বা উল্টোটা যেটা শুধুমাত্র যেতেই পায়ে হেঁটে প্রায় একঘন্টা লাগবে (মানে এককথায় অসম্ভব), সেখানে পৌঁছে দেওয়া হয়। তবে সবসময় যে লিফট চাওয়ার জন্য গাড়ি পাওয়া যাবে তা না, দশ পনেরো মিনিট কোনো গাড়িই যাচ্ছেনা, এরকমটাও দেখেছি।
লিফট নিয়ে মেঘাটুবুরু যাওয়া হল। সেখানে সানসেট পয়েন্ট। অপূর্ব দৃশ্য! যতদূর চোখ যায় শুধু পাহাড় আর পাহাড়। যেন শিল্পীর হাতের জলরঙে আঁকা নিখুঁত ছবি… এখান থেকে নাকি 700 পাহাড় দেখা যায়। সুন্দর ঠান্ডা হাওয়ায় ভোরবেলার মিষ্টি একটা দূষণমুক্ত ভালোলাগা পরিবেশে আমরা বেশ কিছুক্ষণ ধরে দেখলাম সেই দৃশ্য। এটাকেই বোধহয় ব্রেথটেকিং ভিউ বলে… SAIL ভীষণ সুন্দর ভাবে মেনটেইন করেছে জায়গাগুলি। নীল পরিষ্কার আকাশ, মাঝে মাঝে সাদা মেঘ, আর রাস্তার দুপাশে সবুজ গাছের পাতার মধ্যে হাওয়ার আওয়াজ শুনতে শুনতে আমরা এবার হোটেলের দিকে ফিরলাম, কারণ আর কিছুক্ষণ বাদেই আমরা গাড়িতে করে মাইন দেখতে বেরোবো।

 মেঘাটুবুরু সানসেট পয়েন্ট

মেঘাটুবুরু সানসেট পয়েন্ট – ছবি অরুনাভ মালো

পারমিশন নেওয়াটা এখানে যে কতটা শক্ত নিয়ম সেটা মেঘটুবুরুতে SAIL এর অফিসে পৌঁছেই বুঝতে পারলাম। প্রথমেই সবাই বলল এভাবে দিনকে দিন পাওয়া যায়না একদিন তো সময় লাগবেই। অনেক অনুরোধে অনেক প্রশ্ন ও আইডি কার্ডের ক্সেরক্স জমা দেওয়ার পরে আমাদের বলা হল প্রায় একঘন্টা পরে আমাদের পারমিশন দেওয়া ‘হয়তো যাবে’। এই সমস্ত ফর্মালিটিস করতেই একঘন্টা কেটে গেল, তাই একঘন্টা পরে পারমিশন লেটার পাওয়া যাবে শুনে আমরা ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম যে এই সময়ের মধ্যে কাছেপিঠে কোথায় যাওয়া যাবে। ড্রাইভার নিয়ে চলল আমাদের “পুন্ডুল” মন্দিরের দিকে, যেখানে নাকি মন্দিরের গায়ে একটা ঝরনাও আছে। জায়গাটা কিরিবুরু এন্ট্রি পয়েন্টের থেকে বারবিল যাওয়ার রাস্তায় একটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে পড়ে।

পুন্ডুল মন্দিরের দিকে

পুন্ডুল মন্দিরের দিকে

জঙ্গল এ ঢোকার পরেই অনেকরকম পাখি আর ঝিঁঝিঁর ডাক শুনতে পেলাম। একজায়গায় বন দপ্তরের গাড়িও দেখলাম। কিন্তু যতই ভেতরের দিকে যেতে থাকলাম, একটা ছোট গ্রাম পেরিয়ে এসে আর সেরকম মানুষের দেখাই পেলাম না। একজন কাঠুরিয়া কে দেখলাম সে রাস্তা বলে দিল। ঘন জঙ্গল, মাঝে মাটির রাস্তা দিয়ে আমাদের স্করপিও চলছে, আর দুপাশে লম্বা লম্বা উঁচু গাছের সারি, ঠিক যেন কেউ নিখুঁত ভাবে একটার পরে একটা লাঠি পুঁতে রেখেছে মাটিতে। এভাবে যেতে যেতে দু-তিনবার রাস্তা ভুল হল।

পুন্ডুল যাওয়ার পথে ঘন জঙ্গল

পুন্ডুল যাওয়ার পথে ঘন জঙ্গল

অবশেষে আরেকজন মানুষের দেখা পেলাম। তার বলা রাস্তায় বেশ কিছুটা যেতেই বুঝতে পারলাম, আমরা জঙ্গলের এতটাই গভীরে এসে পড়েছি যে এখানে কোনো বিপদ হলে চেঁচিয়ে গলা ফাটিয়ে সাহায্য চাইলেও কোনো মানুষের কানে পৌঁছবেনা সেই আওয়াজ। কয়েকটা শুকনো জলধারা (যেগুলো বর্ষাকালে হয়তো পেরোনো যায়না) পেরিয়ে এসে একজায়গায় দেখলাম সামনে রাস্তা অত্যন্ত খারাপ। তাই মন্দির না দেখেই মাইন দেখতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম সবাই। জঙ্গলে গাড়ি দাঁড় করিয়ে ছবি তুললাম। তারপরে ফিরে এলাম SAIL এর অফিসে।

পুন্ডুল যাওয়ার পথে ঘন জঙ্গল গাড়ি থেকে তোলা

পুন্ডুল যাওয়ার পথে ঘন জঙ্গল গাড়ি থেকে তোলা

পারমিশন লেটার হাতে পেয়ে আমাদের অবস্থা অনেকটা এরকম হল যেন আমরা সবাই SAIL এ চাকরি পেয়ে গেছি 😀 ..মহা আনন্দে মেঘাটুবুরুর রেসট্রিক্টেড মাইন এ যেতে পারলাম। আর সত্যি বলছি, যা চোখে দেখলাম, ভাষায় প্রকাশ করা খুব শক্ত। শুধু এটুকু মনে আছে আমি বাচ্চাদের মত লাফাচ্ছিলাম “কি সুন্দর কি সুন্দর!” বলে, পল্লব অলরেডি ফটো তুলতে লেগে গেছে, আর প্রীতম ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করছে নীচে অবধি যাওয়া যাবে কিনা।

লাল রঙা মাটি

লাল রঙা মাটি

গ্রান্ড ক্যানিয়নের ছবি দেখেছি নেটে। এ যেন তারই এক মিনিয়েচার ভার্সন! বিশাল জায়গা জুড়ে শুধু লাল লাল পাহাড়, যেগুলো কাটা হয়েছে আয়রন উদ্ধারের জন্য। মাঝে কোথাও কোথাও কাটা পাহাড়ের রং হলুদ, কোথাও হালকা সবুজ। এ যেন এক আশ্চর্য গ্রহ! The Martian এ মঙ্গল গ্রহ যেরকম দেখিয়েছিল, আমরা যেন সেরকমই কোথাও পৌঁছে গেছি! মাটির বৈচিত্র্য, রঙের বৈচিত্র্য! “বিশাল” শব্দটাও অনেক ছোট জায়গাটার পরিধি বোঝাতে গেলে। অনেক বিস্ময় নিয়ে মাইনের নীচে পর্যন্ত পায়ে হেঁটে নেমে গেলাম আমরা। তারপরে দারুণ এই অভিজ্ঞতা নিয়ে আবার গাড়িতে ফিরে এলাম, “করম্পদা” যাওয়ার জন্য।

মেঘাটুবুরুর মাইনস

মেঘাটুবুরুর মাইনস

করম্পদা জায়গাটা গ্রাম, কিন্তু খুব খারাপ অবস্থা না। South Eastern Railways এর স্টাফ কোয়ার্টারের পাশে চায়ের দোকানে খাঁটি ঘন দুধের আদা চা খেলাম। এখানে সেরকম খুব একটা দেখার কিছু নেই। এরপরে আমরা কিরিবুরু মাইনের দিকে চললাম। কিরিবুরু মাইন যাওয়ার পথটা খুব সুন্দর। বিভিন্ন বড় বড় মেশিনঘর চোখে পড়ল, আর অনেক হনুমান। আয়রন শুধু মাইন থেকে নিয়ে আসলেই হল না, তার প্রসেসিং এর যে কত বিভিন্ন প্রসেস আর মেশিনারি ইনভোলভড আছে সেটা দেখতে গিয়ে মনে হচ্ছিল বেশ ইন্টারেষ্টিং একটা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রেনিংয়ে এসেছি। আবহাওয়া ভালো না থাকলে হয়ত অত সুন্দর লাগত না ঘুরে ঘুরে দেখতে।

আইরন মাইন্

SAIL এর আইরন মাইন্

আরো বেশ কিছু জায়গা দেখার ছিল কিন্তু টেরোরিস্ট দের ভয়ে আমাদের অলরেডি বেশ কিছু জায়গায় যেতে SAIL থেকে স্ট্রিক্টলি মানা করে দিয়েছিল। যেমন ‘থলকবাদ ফরেস্ট’। তবে খুব অল্প জায়গা গিয়েও এত আশ্চর্যজনক জায়গা আর ঘন জঙ্গলের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা খুব খুশি। সন্ধ্যে হওয়ার আগে সানসেট পয়েন্টে আরেকবার যেতে চাই, তাই গাড়ী ভ্রমণে ইতি টানতে আমরা হোটেলে ফিরে এলাম, লাঞ্চ করলাম (বিকেল 5টা!) আর দেরি না করে সানসেট পয়েন্টের দিকে লিফট চাইতে এগিয়ে চললাম।
সানসেট পয়েন্টে যখন পৌঁছলাম সূর্য প্রায় অস্ত গেছে, লাল আকাশটা আস্তে আস্তে কালচে নীল হয়ে যাচ্ছে। আর কেউ নেই সানসেট পয়েন্টে, শুধু আমরা তিনজন। হঠাৎ প্রীতম ডাকল “ভুতের রাজা দেখবি?” … খুব অন্ধকার হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও দূরে পাহাড়ের শ্রেণী স্পষ্ট- অস্পষ্ট ভাবে দেখা যাচ্ছিল, আর মায়াবী একটা ভৌতিক অনুভব সবার মনেই ঘুরে ফিরে আসছিল। গিয়ে দেখি সানসেট পয়েন্টের ডানদিকে নীচে পাহাড়ি ঘন ঝোপের মধ্যে অজস্র জোনাকি! অজস্র মানে অজস্র! সব বেশ একটা ছন্দে জ্বলছে নিভছে, ঠিক যেন ভুতের রাজার চারপাশের আলো! কিছুতেই তারা থামল না, বরং বাড়তে থাকল। এই সময় আমি লক্ষ্য করলাম দূরে আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, আর আকাশেও অজস্র তারক-জোনাকির মেলা। আকাশগঙ্গা বোঝা যাচ্ছে। ওই কালো আকাশে অগুনতি তারা, দূরে অস্পষ্ট পাহাড়ের শ্রেণী আর পাশে জঙ্গলে জোনাকির মেলা… এর মধ্যে চুপ করে বসে রইলাম আমরা। গাছের পাতায় হাওয়ার আওয়াজ যে এত সুন্দর লাগে জানতাম না। যে পরিবেশে আমরা থাকি, কিকরে জানবো… 🙂

সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা বুনো ফুল

সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা বুনো ফুল

বাড়ি ফেরার সময় একটা ছোট অথচ বেশ মজার ঘটনা ঘটল। বিচ্ছিরি ফুচকা (এরা নুন মসলা কম দেয়, সেদ্ধ মটর বেশি দেয়, আবার মটর দিতে বারণ করলে বলে যে ওটা ছাড়া নাকি স্বাদই হবেনা) খাওয়ার পরে আমরা বেশ খানিকক্ষণ লিফট চাওয়ার আশায় মুরগাপাড়া এসে বসে আছি, এমন সময় দেখি একটা গাড়ি আসছে। লিফট দিলো আমাদের কিন্তু হিলটপে হোটেলের সামনে এসে দাঁড় করানোর সময় হঠাৎ লোকটা মোটা গলায় ঘাড় ঘুরিয়ে চেঁচিয়ে উঠল “এ মামু, আপুন তেরেকও লিফট দিয়া তু কায়কো থ্যাংক ইউ বোল রেলা হে রে?” .. আমরা হতভম্বের মত হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে লোকটা হো হো করে হেসে উঠে বলল “মে Mimicry করতা হুঁ, আর্টিস্ট হুঁ। বোলো কিসকা ভয়েস সুনাউ?” , এই বলে আপনভোলা শিল্পী মানুষটি নিজে নিজেই কোনো অনুরোধ ছাড়াই এক এক করে অমরেশ পুরি, সানি দেওল, প্রাণ, শাহরুখ খান এদের গলা প্রায় হুবহু নকল করে ডায়ালগ দিয়ে শোনাল। এই প্রথম এরকম শান্ত নিরীহ গ্রামে এরকম চনমনে খুশি একটা মানুষকে দেখে বেশ মজা লাগল। লাস্ট দিনের লাস্ট এন্টারটেনমেন্ট।
আজ সকালেও একটু কিরিবুরু মাইন ঘুরে এসেছি, আগের দিনের পারমিশন লেটার টা হাতে নিয়েই। তারপরে রেডি হয়ে ফিরছি বাড়ি। সঙ্গে একগাদা কলা (আমি জঙ্গলে থেকে হনুমান হয়ে গেছি বোধহয়) আর অনেক অনেক ফটো। আর তার থেকেও বেশি অজানা একটা লুকোনো জায়গার সুন্দর সুন্দর দৃশ্যের স্মৃতি। মাইন জায়গাটা কেমন সে সম্পর্কে আমার খুব ভুল ধারণা ছিল। জঙ্গলে হঠাৎ নিজেদেরকে সম্পূর্ণ একলা করে খুঁজে পাওয়ার অভিজ্ঞতাও কখনো হয়নি। এইরকমই একটা অভিজ্ঞতা খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিলাম বাড়ি থেকে। আজ অনেক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরছি। বরজামদা স্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ার পরেই। আবার ফিরছি নিজের “কমফোর্ট জোন” এ। ওয়াইফাই আর ব্রডব্যান্ড 3জি নেটওয়ার্কের মধ্যে রোজকার ভালো থাকায়। ঘুরতে এসেও খুশি লাগছিল,আজ বাড়ি ফিরতে গিয়ে ট্রেনে নেটওয়ার্ক ফিরে পেয়েও বেশ খুশি লাগছে। একটা নেসেসিটি। আরেকটা এমনিই একটা ভালোলাগা। 🙂


অরুনাভ মালো ফেসবুক 

1 Comment

  1. SUNDOR LEKHA.

    Reply

Trackbacks/Pingbacks

  1. How to plan your trip, when Durga Puja is knocking at the door? | Tour Planner Blog - […] Take Ispat Express from Howrah Station go  Manoharpur, from there you will get buses for Sandal Chowk, from Sandal…

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement