Kalej Valley – A Nature Lover’s Paradise in Darjeeling Himalaya

Kalej Valley – A Nature Lover’s Paradise in Darjeeling Himalaya

কালিজ ভ্যালির রামধনু ঝর্ণা

একটি পাহাড়ি উপত্যকায় লোকচক্ষুর অন্তরালে, নির্জনতায় মোড়া পরিবেশে লুকিয়ে আছে এমন এক জলপ্রপাত,  মেঘ সরিয়ে রোদ উঠলেই যেখানে দেখা যায় রামধনু। স্থানীয় নাম ইন্দ্রানী ছাগো বা ইন্দ্রানী ফলস, তবে বেশি পরিচিত ‘রেনবো ফলস’ (Rainbow Falls) নামে। আর দার্জিলিং হিমালয়ের কোলে এই শান্ত, স্নিগ্ধ ও সৌন্দর্য্যময় পাহাড়ি উপত্যকাটির নাম ‘কালিজ ভ্যালি’ বা ‘রেনবো ভ্যালি’। সবুজে মোড়া ছবির মত সুন্দর এই উপত্যকায় থাকার জন্য আছে চা বাগানের ঢালে এক ভীষণ সুন্দর ও মিষ্টি একটি রিসর্ট, যার নাম ‘রেনবো ভ্যালি রিসর্ট’ (Rainbow Valley Resort)। ঠিক যেন শিল্পীর তুলিতে একটা সবুজ ক্যানভাসে কয়েকটা রঙিন বিন্দু আঁকা একটা ছবি। রিসর্টের পাশেই ‘কালিজ ভ্যালি চা বাগান’। একটু উপরে ‘আপার কালিজ ভ্যালি’ গ্রাম। এখানে অবসর যাপনে এসে বিশুদ্ধ প্রকৃতির মাঝে সারাদিন ধরে চা বাগান, পাহাড় ও ভ্যালির অসাধারণ দৃশ্য দেখে ও হরেক রকম পাখির ডাক শুনে মন ভরে যায়।

কালিজ ভ্যালি (Kalej Valley) চা বাগান, রংবুল
Rainbow Falls – কালিজ ভ্যালির রামধনু ঝর্ণা – ঝর্ণার জলে রামধনু




ভুমিকাঃ

বছর দুয়েক আগে ‘ভ্রমণ’ পত্রিকায় প্রথম সন্ধান পাই কালিজ ভ্যালির ‘রেনবো ভ্যালি রিসর্টের’। পয়লা বৈশাখের সময় দিনদুয়েকের ছুটিতে হঠাৎ করেই এনজেপির ট্রেনের টিকিটের ব্যবস্থা করে, ঠিক করে ফেলি এবারের আমাদের দুজনের ভ্রমণ কালিজ ভ্যালিতেই। এমনিতেই সবাই জানে আমার পায়ের তলায় অনেক সর্ষে। আর ছোট্ট ছুটিতে পাহাড়ে আবার যাব শুনলেই ইদানিং বন্ধুদের কাছ থেকে শুনতে হয় ‘সেকেন্ড হোমে যাচ্ছে’ বা ‘পাহাড়ে ডেইলি প্যাসেঞ্জারি করে’ এরকম শব্দবন্ধ। তবে আমি তাতে দমবার পাত্র নই। কারণ উত্তরবঙ্গের পাহাড় যে আমায় টানে, শুধুই সময় সুযোগ ও ট্রেনের টিকিটের অপেক্ষায় থাকি।

সোনাদার কাছে পাহাড়ের গায়ে দেওদার সারি – দার্জিলিংয়ের পাহাড়ের চেনা ছবি

বিকেল ৫-৪৫ এ হাওড়া স্টেশন থেকে কামরূপ এক্সপ্রেসে রওনা হয়ে পরদিন সকাল সাড়ে সাতটায় পৌঁছলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে। সেই অতি চেনা স্টেশন চত্বর। আমাদের গন্তব্য রংবুল। দার্জিলিংগামী রাস্তায় ঘুমের ৪ কিমি আগে। স্টেশনের বাইরের একটি রেস্ট্যুর‍্যান্ট প্রাতরাশ সেরে শেয়ার অটো ধরে চটপট চললাম শিলিগুড়ির শেয়ার জিপ স্ট্যান্ডে। দার্জিলিংগামী দুটি জিপ তখন যাত্রী নিয়ে ছাড়ার অপেক্ষায়। তারই একটাতে দুটি জায়গা পাওয়া গেল। ভাড়া জনপ্রতি ১৫০ টাকা।  সুকনা পেরিয়ে রোহিনি রোড ধরে গাড়ি পাহাড়ে উঠতে থাকল। মাত্র কয়েকবছর তৈরি হওয়া কার্শিয়াং অবধি এই রাস্তাটিতে ব্রেথটেকিং ভিউ পাওয়া যায়। তাই আমার বরাবরের প্রিয় এই পথ। হালে পথের পাশে ‘আই লাভ কার্শিয়াং’ নামের একটি ভিউ পয়েন্ট তৈরি হয়েছে। যেখান থেকে পাহাড়, নিচে চা বাগান ও খাদ, অনেক দূরে সমতলে নদীর উপত্যকা আর অন্য দিকে কার্শিয়াং শহরের অসাধারণ দৃশ্য দেখা যায়। মাত্র একঘন্টাতেই পৌঁছে গেলাম কার্শিয়াং। এরপর অপেক্ষাকৃত ঘিঞ্জি হিলকার্ট রোডে পড়লাম। কার্শিয়াং থেকে ২ কিমি দূরে ‘সিঙ্গেল টি গার্ডেন’। এখানে বছর দুই আগে প্রধান পরিবারের হোমস্টে তে এসেছিলাম। এরপর একে একে টুং, দিলারাম ও সোনাদা পার হলাম। রাস্তার উপরের রেল লাইন দিয়ে একটি টয় ট্রেন কু ঝিক ঝিক করে কার্শিয়াংয়ের দিকে চলে গেল। ক’দিন বাদেই পাহাড়ে ভোট। তাই ভোটের উত্তাপ এবার লেগেছে শীতল পাহাড়েও। হিল কার্ট রোডের দুধারে যুযুধান দুপক্ষের ব্যানার পোস্টার। এমনকি একটি ভোট মিছিলের মধ্যে পড়ে কিছুক্ষণ আটকেও গেলাম। অবশেষে সোনাদা থেকে ৬ কিমি দূরে রংবুল ফাটক পৌঁছলে আমাদের সেখানে নামিয়ে দিয়ে দার্জিলিংয়ের দিকে চলে গেল গাড়ি।

রংবুল থেকে কালিজ ভ্যালির পথে




আগে থেকে ফোন করে বলে রাখায় রেনবো ভ্যালি রিসর্ট থেকে গাড়ি এসেছিল আমাদের নিতে রংবুল ফাটকে। হিল কার্ট রোড থেকে বাঁদিকে নেমে যাওয়া রাস্তায় ৫ কিমি দূরে কালিজ ভ্যালির ঐ রিসর্ট। কিন্তু গাড়ির চালক সূরয জানাল যে রাস্তার যা অবস্থা তাতে পৌঁছতে লেগে যাবে পৌনে ঘন্টা। রাস্তা নয়, বরং বোল্ডার ফেলা একটি উৎরাই পথ, পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে ক্রমশ নিচে নেমে চলেছে। কিছুটা চলেই ভোটের সমস্ত উত্তাপ উধাও, যেন ক্রমশ প্রবেশ করছি এক পরম শান্তির জগতে। তার নিজের ধূমপানের জন্য এক জায়গায় সূরয গাড়ি থামালে, নেমে দেখি চারিদিকে পাহাড় ঘেরা উপত্যকার মনমুগ্ধকর দৃশ্য। কয়েকদিন ধরে আকাশ মেঘলা থাকলেও গত কাল রাতে বৃষ্টির পর আজ সকাল থেকে চারিদিক ঝক ঝক করছে। কিছুটা উপরে পাহড়ের মাথায় দেওদার গাছের সারি। একটা পুরনো কাঠামো দেখিয়ে সূরয জানাল এটি ছিল ব্রিটিশ আমলের রোপওয়ের নিদর্শন। নিচের চা বাগান থেকে উপরের হিল কার্ট রোডে মাল তোলার জন্য বানানো হয়েছিল রোপওয়ে। এরপর আবার চলা। পড়ল একটি গ্রাম, নাম ‘আপার কালিজ ভ্যালি’। এটিই সূরযের গ্রাম।

কালিজ ভ্যালির পথে




কালিজ ভ্যালি চা বাগান

রেনবো ভ্যালি রিসর্টঃ

আরো খানিকটা নেমে একটি চা বাগানের পাশে গাড়ি দাঁড় করিয়ে সূরয জানাল আমাদের রিসর্ট এসে গেছে। চা বাগানের ঢালে রাস্তা থেকে শ’খানেক ফুট নিচে ধাপে ধাপে কয়েকটা রং বেরংয়ের কটেজ দেখা যাচ্ছে। ছবির মত সুন্দর ‘রেনবো ভ্যালি রিসর্ট’ (Rainbow Valley Resort)। প্রথম দর্শনেই মন ভরে গেল। পাথর ও লোহার সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা নিচে নেমে, রেস্ট্যুর‍্যান্ট কাম রিসেপশন। তার বাইরে আমাদের স্বাগত জানালেন সাইমন রাই। আলাপচারিতায় জানতে পারলাম বেশ কয়েক বছর কলকাতায় চাকরি করার পর, তার নিজের গ্রামে এসে এই অসাধারণ লোকেশনে রিসর্টটি বানিয়েছে সাইমন। বছর চারেক হল। মোট সাতটা কাঠের তৈরি কটেজ এখানে, এক একটি ফুলের নামে। আমাদের জন্য বরাদ্দ নিচের তিনটি কটেজের একটি, নাম ‘মেরি গোল্ড’। কটেজের ঘর ও বারান্দা থেকে সামনের চা বাগান ও চারপাশের পাহাড় ও নিচে ভ্যালির দৃশ্য দেখে সারাদিন কেটে যায়। প্রকৃতি যেন খুব যত্ন করে এখানে সবুজের বিভিন্ন শেডে সাজিয়ে তুলেছে এই কালিজ ভ্যালি। কটেজের ঘর পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ও আধুনিক সুযোগ সুবিধে যুক্ত। এরকম নিরিবিলি পাহড়ি জায়গার তুলনায় বন্দোবস্ত যথেষ্টই ভাল। হিল কার্ট রোড থেকে প্রায় ১৫০০ফুট নিচে এই কালিজ ভ্যালির উচ্চতা প্রায় ৫২০০ফুট। এসে থেকেই নানান জানা অজানা পাখির ডাক কানে সুখের অনুভুতি সৃষ্টি করছিল। একাধিক ‘ব্রেইন ফিভার’ বা ‘হক কুক্কু’ (Hawk Cucku) পাখির ডাকে চারিদিক মুখরিত। ‘হুইসলিং থ্রাশ’এরও আছে সঙ্গত। সামনের গাছ গুলিতে হলুদ, কালো কয়েকটি পাখি লাফাচ্ছে। যদিও আমি পক্ষী বিশারদ নই। ক্রমাগত ডাকতে থাকা ‘পিউ কাঁহা’ বা ‘চোখ গেল’ ডাক আশেপাশের পাহাড়ে প্রতিফলিত হয়ে অনুরনন হচ্ছে।

কালিজ ভ্যালির চা বাগান
পাখিরা যেথায় শোনায় গান,
পাহাড়-উপত্যকার শোভায়
মন আমার জুড়িয়ে যায়।
কালিজ ভ্যালি চা বাগানের ঢালে ছবির মত ‘রেনবো ভ্যালি রিসর্ট’




কটেজের বারান্দা থেকে

একটু পরেই খাবার ঘরে ডাক পড়ল। ডিমের কারি সহযোগে গরমা গরম, সুস্বাদু ও ঘরোয়া রান্নার লাঞ্চ সারলাম বাঁশের তৈরি রেস্ট্যুর‍্যান্টে বসে, পাহাড় দেখতে দেখতে। সাইমন রাই জানালেন আমাদের খেতে দেওয়া অনেক সব্জিপাতির চাষ এই রিসর্টেই হয়। এমনকি স্যালাডের গাজরটাও পাশের বাগান থেকে তোলা। সাইমন রাই ও তাঁর স্ত্রীই দেখভাল করে এখানে। তাদের সাথে আছে ছটু, বিরু ও সূরয (এরও নাম সূরয) নামের তিনজন কর্মচারী। নামে রিসর্ট হলেও এখানে আসলে সেই হোম স্টের ছোঁয়াই মেলে। সাইমন রাই ও কর্মীদের ব্যাবহার ও আতিথেয়তায় মুগ্ধ হতে হয়। মেনুতেও হরেক রকম খাবারের আয়োজন। এরকম নির্জন জায়গায় এত সুন্দর আরামদায়ক ব্যবস্থাপনা, এত সুস্বাদু হরেক রকম খাবারের আয়োজন, এসবে অভিভুত হতে হয়।

হাত বাড়ালেই চা বাগান, রেনবো ভ্যালি রিসর্ট

শব্দময় নৈশব্দঃ

রেস্টুর‍্যান্টের লাগোয়া ঝুলন্ত বারান্দাটা দারুণ। চেয়ার নিয়ে বসে পাশের চা বাগানটাকে যেন স্পর্শ করা যায়। চা বাগানটি ঢালু হয়ে নিচে নেমে গেছে খাদের দিকে। খাদের ওপারে সুউচ্চ সবুজ পাহাড়ের প্রাচীর। সেই পাহড়ের ঢালে আবার নানান গাছ গাছালি, সবুজ ঢালু মাঠ, বা দু একটি বাড়ি, অনেক দূরে। নিচে একফালি উপত্যকা। কটেজে ফিরে আসার পর আকাশ কালো হয়ে মেঘের জাল ঢেকে দিল চারিদিক। এ তো ‘মেঘ পিওনের দেশ’। ওপারের পাহাড় গুলো আবছা হয়ে এল। শুরু হল বৃষ্টি। ঘরে শুয়ে চা বাগানে বৃষ্টি পড়া দেখতে বেশ লাগছিল। বৃষ্টি থামলে বিকেলের দিকে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এলাম গাড়ির রাস্তায়। কোন নতুন জায়গায় এলে পায়ে হেঁটে আশপাশটা একটু না দেখলে কি চলে। রাস্তা থেকে নিচের বৃষ্টিস্নাত চা বাগানের ঢাল ও রেনবো রিসর্টের দৃশ্য দেখে অপূর্ব লাগছিল। দু’পা দূরে চা বাগানের পাশে ‘পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং’য়ের একটি ওয়াটার ওয়ার্ক্স। এখান থেকে জলের পাইপ লাইন উপরের রংবুল অবধি গেছে। চারিদিক জনহীন। যে দিক থেকে গাড়িতে এসেছিলাম সে দিকেই জঙ্গলে ঢাকা রাস্তায় কিছুটা পদ চারণ করলাম।অনেক নিচ থেকে একটা নদী বা ঝর্ণার বয়ে চলা জলের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ঐ দিকেই বোধহয় রেনবো ফলস। বিকেলের দিকে ‘ব্রেইন ফিভার’ (Brain Fever) ও ‘হুইসলিং থ্রাশ’ (Whistling Thrush) সহ সব পাখির ডাক যেন আরো বেড়েছে। অদ্ভুত সব স্বরে তারা ডেকে চলেছে মাঝে মাঝে, যা কোন জায়গায় গিয়ে হয়ত শুনিনি। ‘ঘষঘষ’, ‘টিকটিক’ থেকে আরম্ভ করে চেনা স্বর ‘পিউ কাঁহা’ – নির্জন এই জগতে তারাই যেন প্রাণের সঞ্চার করছে। একেই বলে বোধহয় ‘শব্দময় নৈশব্দ’।




বারবিকিউ ও সান্ধ্য জলসাঃ

সন্ধ্যের পর রিসর্টের কম্পাউন্ডে আলো জ্বলে ওঠার সাথে সাথে একফালি উপত্যকার ওপারে দূরে পশ্চিমের পাহাড় গুলি অনেক আলোক মালায় সজ্জিত হয়ে উঠল। জানা গেল দূরের পাহাড়ের নিচের দিকেই মিরিক। আর পাহাড়ের উপর দিকের আলোগুলো নেপালের। এখান থেকে নেপালের এরিয়াল ডিস্টেন্স খুব বেশি নয়। বৃষ্টি নেই। ঘরের সামনের ছোট্ট মাঠটাতে আমাদের জন্য শুরু হল আগুন জ্বালিয়ে বারবিকিউ। আগে থেকে অর্ডার দেওয়া ছিল। কাঠের উনোনের পাশে চেয়ার পেতে দিলে একে একে অন্যান্য কটেজ থেকেও গেস্টরা বেরিয়ে এল। আমরা ছাড়া এই সন্ধ্যেয় আরো তিনটি কটেজে আছে তিনটি পরিবার। ঠান্ডাটা যদিও হাড় কাঁপানো নয়, তাও আগুনের ধারে বসে বেশ আরাম হচ্ছিল। আলাপ হল বাকি তিনটি পরিবারের সাথে। সাইমন রাই এর মধ্যে আবার সবাইকে প্রসাদ দিয়ে গেলেন। বিকেলে উপরের গ্রামের মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন তিনি। প্রসাদে গোলাকার চাকতির মত অল্প মিস্টি একধরণের রুটি, বেশ খেতে। ছটু নামের ছেলেটি খুব কাজের। সে একাই বারবিকিউ পর্ব শেষ করে ভালো করে বানিয়ে আমাদের জন্য ঘরে পরিবেশন করল সুস্বাদু ঝলসানো মাংস।

বারবিকিউ চিকেন দিয়ে সান্ধ্য ভোজন সারার পর শুরু হল আবার হাল্কা বৃষ্টি। এর মধ্যে উপরের দিক থেকে ভেসে আসতে লাগল গিটারের সুর। উপরের খাবার ঘরে গিয়ে দেখি সেখানে গান বাজনার আসর বসেছে। মধ্যমনি আজকের সকালের গাড়ির চালক সূরয, ইলেক্ট্রিক গিটার বাজিয়ে গান ধরেছে। আর সাইমন রাই সহ বাকি তিনটি পরিবার সেখানে উপস্থিত। জানা গেল সূরয একজন মিউজিক টিচার। পেটের দায়ে এখন গাড়ি কিনে ড্রাইভারি শুরু করেছে। প্রায়ই সান্ধ্যেয় আগত পর্যটকদের জন্য গান বাজনার ব্যবস্থা হয় এখানে। এর আগে কোন পাহাড়ি হোম স্টেতে এ অভিজ্ঞতা হয় নি। কয়েক মুহুর্তেই এই গান বাজনার ঘরোয়া আসরের দৌলতে সম্পূর্ণ অচেনা পরিবারগুলি কাছাকাছি চলে এল। যেন কতদিনের চেনা। সবাই মিলে চলল হিন্দি, বাংলা, নেপালি অনেক গান, সূরযের গিটারের সঙ্গতে। সুরের মূর্চ্ছনা ছড়িয়ে পড়ল যেন সমগ্র পাহাড়ে। এই পাহাড়ি পরিবেশে নির্জন সন্ধ্যে গান বাজনায় মুখরিত হয়ে উঠল। রাতে ডিনারের সময় অনেক কথা হচ্ছিল সাইমনের সাথে। প্রাণ খুলে গল্প চলল অনেকক্ষণ। সাইমন একজন শিক্ষিত, রুচিশীল মানুষ। এখনও কমার্শিয়াল হয়ে যায় নি তার এই স্টে।  ডিনারের পর দেখলাম দূরের পাহাড়ে মিরিকের অনেক আলো নিভে গেছে। নিশুত পাহাড়ি রাতে কাঠের কটেজের আরামদায়ক বিছানায় শয্যা নিলাম। দারুণ ঘুমে রাত কাবার।




নববর্ষের সকাল ও রামধনু ঝর্ণাঃ

পরদিন নববর্ষের সকালে নানা পাখির ডাকে পাহাড়ের প্রকৃতি আবার মুখরিত। এখানে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায় না। তাই অন্যান্য পাহাড়ি গ্রামের মত এখানে কাঞ্চনকে দেখার আশা বা উতকন্ঠা নিয়ে সকালে উঠতে হয় না। নির্মল, বিশুদ্ধ পরিবেশে এখানে শুধুই প্রাণভরে নিশ্বাস নেওয়া ও অলসভাবে পাহাড় ও চা বাগানের প্রকৃতিকে উপভোগ করা। চা বাগানের পাশে বসে সেই বাগানেরই চা পান করার মজাটাই আলাদা। ‘ব্রেইন ফিভার’ পাখিটা তার রাজ্যে বেড়াতে আসা আমাদের দেখে সকালবেলা যেন ডেকে জিজ্ঞেস করছে ‘এরা কারা?’ আজ আমাদের যাওয়ার কথা এখানকার প্রধান দ্রষ্টব্য ‘রেনবো ফলস’ দেখতে। রিসর্ট থেকে ৩ কিমি, যার ১ কিমি অবধি গাড়ি যায়, তারপর বাকি পথ হেঁটেই। শুনেছিলাম রোদ থাকলেই সে জলপ্রাপাতে ‘রেনবো’ দেখা যায়। কিন্তু আকাশ কেমন যেন মেঘলা। পুরি-সব্জি সহযোগে ব্রেকফাস্ট করতে করতে রোদ উঠল। তাই আর বিলম্ব না করে বেরিয়ে পড়লাম ফলসের উদ্দেশে। আমাদের পাশের ঘরের প্রবীণ দম্পতিও আমাদের সঙ্গী হলেন। তাই গাড়িতেই ১ কিমি পথ চলে গেলাম। তারপর হাঁটা শুরু। রাস্তা থেকে নেমে যাওয়া একটা সিঁড়ির পথে নামতে থাকা। পাহাড়ের গা ঘেঁষে কোথাও ঢালু নেমে যাওয়া পথ, কোথাও বা পাথরের সিঁড়ি আবার কোথাও সিমেন্টের বাঁধানো সিঁড়ি। অনেকাংশেই পথের পাশে রেলিং। তবে জনমানুষের কোন চিহ্ন নেই এ পথে।

পথ চলাতেই আনন্দ মোর
অচেনাকে চিনতে বিভোর,
রামধনু দেখ ঝর্ণার জলে
লুকায়ে আছে প্রকৃতির কোলে।
রেনবো জলপ্রপাতের পথে





রেনবো জলপ্রপাতের পথে – অনেক নিচে একতি পাহাড়ি নদীখাত

সূর্য আবার মুখ লুকিয়েছে মেঘের আড়ালে। বৃষ্টি না হয়। নিচে নামার সাথে সাথে নিচ থেকে আসা পাহাড়ি ঝোড়ার শব্দটা তীব্র হতে থাকে। একসময় নিচে চোখে পড়ল একটি শীর্ণ নদীর গিরিখাত। নদীখাতের ওপারের পাহাড়ে আবার চোখে পড়ে গাড়ি চলার রাস্তা। নির্জনতায় মোড়া উৎরাই পথে নামতে নামতে এক একটি বাঁকে পাহাড়-জঙ্গলের সৌন্দর্যময় শোভা। একটি ছোট্ট ঝর্ণার উপর সেতু পার হলাম। তারপর আরো কিছুটা চলে অবশেষে পৌঁছলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত ‘রেনবো জলপ্রপাতে’। ছবি তুলতে তুলতে প্রায় হাজার খানেক ফুট নিচে নামতে সময় লাগল প্রায় আধঘন্টা। খাড়াই পাহাড়ের গা বেয়ে সশব্দে ঝরে পড়ছে একটি সুন্দরী ঝর্ণা। জলপ্রপাতের দুটি জলের ধারা। এই জলের ধারা গিয়ে মিশছে সামান্য নিচ দিয়ে বয়ে চলা নদী্টিতে। খরস্রোতা নদীটি দুপাশের পাহাড়ের মাঝের গিরিখাত বরাবর সশব্দে বয়ে চলেছে দক্ষিণ পশ্চিমে। সিঁড়ি পথের শেষে জলপ্রপাতের সামনে একটা প্রশস্ত চাতাল। পাহাড় ঘেরা জায়গাটায় একদিকে সুউচ্চ জলপ্রপাত ও আরেকদিকে বয়ে চলা নদীখাত। অপূর্ব দৃশ্য। হঠাৎ মেঘের আড়াল থেকে সূর্য একটু মুখ দেখাল আর জলপ্রপাতের জলে এক ঝলকের জন্য যেন রামধনুর আভা। সকালে এই সময় সূর্যের অবস্থান ঠিক জলপ্রপাতের বিপরীত দিকে। আমাদের হাতে তাড়া নেই। তাই বিশ্রামের ছলে জলপ্রপাতের দিকে চেয়ে বসে রইলাম। এবার সত্যি মেঘের আড়াল থেকে বেশ কিছুক্ষনের জন্য সূর্য বেরিয়ে এল, আর জলপ্রপাতের জলে আলোর বিচ্ছুরণে সৃষ্টি হল রামধনু বা ‘রেনবো’। জলপ্রপাতের নিচের অংশে একেবারে সুস্পষ্ট, অর্ধচন্দ্রাকারে VIBGYOR – সাতটি রঙ। এক অপার্থিব দৃশ্যের সাক্ষী রইলাম। নববর্ষের সকালে এক দারুণ উপহার। সার্থক এই ট্রেক করে জলপ্রপাত দেখতে আসা।

রেনবো জলপ্রপাত – জলেতে অর্ধচন্দ্রাকারে রামধনু – VIBGYOR

এখনও লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে গেছে এই অসাধারণ জলপ্রপাতটি। খুব বেশি ট্যুরিস্ট আসে না। তাই এখনও পবিত্রতা বজায় আছে এই রেনবো ফলসের, বিশুদ্ধতা বজায় আছে কালিজ ভ্যালির পাহাড় জঙ্গলের। এক পরম তৃপ্তি নিয়ে এবার চড়াই ভেঙে ওঠার পালা। প্রায় হাজারখানেক ফুট উঠতে হাঁফিয়ে গেলাম সবাই। পথের পাশের বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিতে নিতে চড়াই উঠতে সময় লাগল নামার সময়ের চেয়ে ঢের বেশি।

রিসর্টে ফিরে দেখি কালিজ ভ্যালি টি এস্টেটের বাগানের ঢালে কর্মরতা চা কর্মীরা। কয়েকজন নেপালি মহিলা পিঠে ঝুড়ি নিয়ে চা পাতা তুলতে ব্যস্ত। ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’ র গল্প। দার্জিলিং পাহাড়ের ব্র্যান্ড এই ছবি। বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে চা পাতা তোলার সে দৃশ্য দেখতে দেখতে চায়ের কাপে মৌতাঁত।




রিসর্টের পাশে কালিজ ভ্যালি চা বাগানে কর্মরতা মহিলা চা কর্মী

তারপর? তারপর আর কি… প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে হারিয়ে গিয়ে, নিরবিলিতে, হট্টোগোল, লোকারন্য এসব থেকে অনেক দূরে, চক্ষু, কর্ণ ও জিহবার সুখ করে, কেটে গেল দুটো দিন। মনকে একেবারে তাজা করে নিয়ে, অন্য পথে পাইন ঘেরা আরেক গ্রাম বাগোরা ও চিমনি ঘুরে, ফিরে চলা ঘরের পানে। ক্যামেরায় ও মনে রয়ে গেল কালিজ ভ্যালির পাহাড়, জঙ্গল, চা বাগান, পাখির ডাক, রামধনু ঝর্ণা, আর সাইমন-সূরযদের মুখগুলো ও চা বাগানে কর্মরতা চা কর্মীদের ছবি।

যাতায়াতঃ

নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে নেমে শেয়ার অটো ধরে ২০ টাকায় শিলিগুড়ির জিপ স্ট্যান্ড। সেখান থেকে দার্জিলিং গামী শেয়ার জিপে জনপ্রতি ১৫০টাকায় ২.৫ ঘন্টায় রংবুল ফাটক (Rongbull Fatak)। দূরত্ব ৫৫ কিমি। দার্জিলিংয়ের শেয়ার জিপ নিউ জলপাইগুড়ি থেকেও পাওয়া যায়, কিন্তু তার ভাড়া শিলিগুড়ির স্ট্যান্ডের তুলনায় অনেকটাই বেশি নেয়। রংবুল ফাটক থেকে গাড়িতে ৫ কিমি উৎরাই রাস্তায় কালিজ ভ্যালির রেনবো রিসর্ট। ভাড়া ৫০০ টাকা।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে সরাসরি গাড়িতে কালিজ ভ্যালির ভাড়া ২৭০০টাকা।

কালিজ ভ্যালি থেকে বেরিয়ে নেওয়া যায় টাইগার হিল। আবার একই ট্যুরে ঘুরে নেওয়া যায় দার্জিলিং, মিরিক, বা চটকপুর – বাগোরা।

দার্জিলিং থেকে কালিজ ভ্যালির দূরত্ব ১৭ কিমি।




রেনবো ভ্যালি রিসর্টের কটেজ

থাকা-খাওয়াঃ

রংবুলের কালিজ ভ্যালিতে একমাত্র থাকা-খাওয়ার জায়গা ‘রেনবো ভ্যালি রিসর্ট’(Rainbow Valley Resort, Rongbull)। কটেজের ভাড়া ১৮০০ টাকা ও ২২০০ টাকা। একটি ডুপ্লেক্স ফ্যামিলি কটেজ আছে, যার ভাড়া ৩৪০০ টাকা।খাওয়া প্যাকেজ সিস্টেমে জনপ্রতি ৬০০টাকা প্রতিদিন। এছাড়া ‘আলা-আ-কার্টে’ সিস্টেমেও খাওয়া যায়, তাতে একটু কম পড়ে। বারবিকিউ চিকেন – ফুল ৭৫০ টাকা, হাফ – ৪০০ টাকা।

  • যোগাযোগঃ Simon Rai – 9832616970/ 7679793364

পরিশেষেঃ

পাহাড় প্রেমী মানুষ, যারা নিরিবিলিতে শুধু পাহাড়ের প্রকৃতি উপভোগ করেই দু-একদিন কাটাতে চায়, রংবুলের কালিজ ভ্যালি শুধু তাদের জন্য।

“Travel is the only thing you buy,  that makes you richer”

The Travelogue and Photographs by Subhrangsu Dasgupta. An engineer by profession, a nature lover, traveler and travel blogger by passion.





link : http://oyo.go2cloud.org/SH23

Code : TOURPLANNER (valid upto June)

আপনি যদি কোথাও হোটেল বুক করবেন ভাবছেন, তাহলে OYO দিয়ে হোটেল বুক করে দেখতে পারেন। শুধুমাত্র ট্যুরপ্ল্যানার পরিবারের সদস্যদের জন্য OYO দিচ্ছে 60% ডিসকাউন্ট। নীচে লিংক ও কুপন কোড দেওয়া হল। Code : TOURPLANNER (valid upto June) link : http://oyo.go2cloud.org/SH23

link : http://oyo.go2cloud.org/SH23

বিঃদ্রঃ বুকিং সম্পর্কিত যেকোনো প্রকার সমস্যা কেবলমাত্র OYO নিজেই সমাধান করবে। এব্যাপারে ট্যুরপ্ল্যানার কোনভাবে সাহায্য করতে পারবে না।

1 Comment

  1. Darun laglo. Jabar ichha roilo. Ebar Tinchule niye ekta lekha din.

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement