সপ্তাহান্তে ঝান্ডি ও কোলাখামের পথে

সপ্তাহান্তে ঝান্ডি ও কোলাখামের পথে




ছোট্ট ছুটিতে চলেছি উত্তর বঙ্গের পাহাড়ে, মে মাসের গ্রীষ্ণের দাবদাহ থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে। গন্তব্য ঝান্ডি ও কোলাখাম। পূর্ব হিমালয়ের কোলে, অধুনা কালিম্পং জেলায়, পরিচিত পর্যটন স্থল লাভার আশেপেশে এ দুটি অল্পচেনা পাহাড়ি গ্রাম।

ঝান্ডি যাওয়ার পথে





ঝান্ডির পথেঃ

 

শিয়ালদা থেকে সাড়ে আটটার কাঞ্চনকন্যা এক্সপ্রেসে চড়ে পরদিন সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ পৌঁছলাম নিউ মাল জংশন স্টেশনে। শিলিগুড়ির পর থেকে চা বাগান ও ডুয়ার্সের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে, নানান পাহাড়ি নদীর উপর ব্রীজ পেরিয়ে এ রেল যাত্রা খুবই মনোরম। ডুয়ার্স ভ্রমণের গেটওয়ে নিউ মাল। মালবাজারে এখন অসহ্য গরম। এযাত্রায় আর সমতলের গরমে না থেকে পাহাড়ের ঠান্ডায় যাওয়া ঠিক করেছি। এখান থেকে ঝান্ডি ৩২ কিমি। ঘন্টা দেড়েকের রাস্তা। ঝান্ডিতে আমাদের বুকিং ‘ঝান্ডি ইকো হাট’এ। সেখান থেকেই গাড়ি পাঠিয়েছিল আমাদের জন্য নিউ মাল স্টেশনে। অল্প বয়সী নেপালি ড্রাইভার অনিল শর্মা, বেশ ভদ্র ও বিনয়ী। নানান চা বাগানের মধ্যে দিয়ে পথ। পথে পড়ল লোয়ার ফাগু টি এস্টেট। খানিকটা ড্রাইভারের জোরেই চললাম ফাগু টি বাংলো দেখতে। মূল রাস্তা ছেড়ে কয়েক কিমি বন্ধুর পথ। বাংলোটিতে পৌঁছে মন ভরে গেল। ফাগু টি এস্টেটের মাথায়, বহু পুরানো ব্রিটিশ আমলের হেরিটেজ বাংলো। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ চমৎকার। এক কর্মচারী থাকার ঘর গুলি ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রীও নাকি এসে থেকে গেছে এই বাংলোয়। বাংলোর হাতা থেকে দেখা যায় ডুয়ার্সের উপত্যকার দারুণ এক দৃশ্য। বারান্দায় বসে চা পান করে আবার চলা।

ফাগু টি বাংলো থেকে





এরপর পথে পড়ল গরুবাথান। এক আধা পাহাড়ি, নেপালি জনপদ। স্থানীয় নাম সোমবারে। পথের বাঁদিকে দেখা হল ‘চেল’ (Chel) নদীর সাথে। লাভাগামী মূল সড়ক ছেড়ে বাঁহাতি রাস্তায় চেল নদীর উপর কাঠের ব্রীজ পার হলাম। নদীর রূপ দেখে থামতে হল কিছুক্ষণ। নদীবক্ষে ছোট বড় অনেক প্রস্তরখন্ড। তার মধ্যে দিয়ে সশব্দে বয়ে চলেছে খরস্রোতা নদীটি। চারিপাশ সবুজ পাহাড়ে ঘেরা। সে দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী করে আবার চলা। এরপর আপার ফাগু টি এস্টেটের মধ্যে দিয়ে উঠে চলা রাস্তা। বেলা হয়ে গেছে। চা বাগানে লাঞ্চব্রেক। পথের দুধারে সারি দিয়ে বসে চা শ্রমিকরা আহারাদি ও বিশ্রামে রত। আরো কিছুক্ষণ চড়াই চলার পর পৌঁছে গেলাম ৬২০০ফুট উচ্চতায় ঝান্ডিতে।

চেল নদী, ঝান্ডি যাওয়ার পথে





ঝান্ডি ইকো হাটেঃ

 

পাহাড়ের শিরে অনেকখানি জায়গা জুড়ে ‘ঝান্ডি ইকো হাট’। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে গোটা কুড়ি সুদৃশ কটেজ। আমাদের জন্য বরাদ্দ কটেজটির নাম ‘গ্লাস হাউস’। কাঠের সুসজ্জিত কটেজগুলি বেশ আরামদায়ক। পিছনের জানলা দিয়ে দেখা যায় ডুয়ার্সের উপত্যকা। রিসর্ট থেকে উত্তর দিকে দার্জিলিঙের পাহাড়, নাথুলা, এমনকি মেঘমুক্ত দিনে বরফাবৃত কাঞ্চনঞ্জঙ্ঘাও দেখা যায়। ইকো হাটের মালিক রাজেন প্রধান নিজে এসে আমাদের ঘর দেখিয়ে দিলেন। উনি মালবাজারের লোক। এখানে মাঝেমধ্যে আসেন দেখভাল করতে। তাঁর কাছে শুনলাম যে এটি একটি কমিউনিটি রিসর্ট। এখানে নাকি দু তিন জন ইনভেস্ট করেছে। অনেক স্থানীয় মানুষের রুজির ব্যবস্থা হয়েছে। এক একটি কটেজ থেকে উপার্জনে নাকি এক একজনের শেয়ার আছে।

ঝান্ডি ইকো হাট থেকে





শুরু হল মেঘ বৃষ্টির ঘনঘটা। মে মাসে পাহাড়ে এটাই স্বাভাবিক। আবছা হয়ে গেছে চারিদিক। বাতাসে ঠান্ডার পরশ। বেশ লাগছিল এত তাড়াতাড়ি সমতলের গরম থেকে এসে হিমালয়ের এই ঠান্ডার পরশ নিতে। খাবার ঘরে গিয়ে ঘরোয়া ও সুস্বাদু লাঞ্চ সেরে, বৃষ্টিটা একটু কমলে, রিসর্টের এক উচ্চস্থানে বানানো ভিউ পয়েন্টে উঠে এসে বসলাম। এখান থেকে প্রায় ২৭০ ডিগ্রি জুড়ে পাহাড় ও খাদের দৃশ্য দেখা যায়। পিছনদিকে জঙ্গলময় উঁচু পাহাড়। এটিই ঝান্ডির বৈশিষ্ট্য। ওয়েবসাইটে যেমন দেখেছিলাম, পুরো ব্যাপারটা তার চেয়েও বেশি ভাল লাগল। পরিস্কার দিনে নাকি ‘ঝান্ডি ইকো হাট’ থেকে একাধারে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখা যায়। বেশ খানিকক্ষণ ভিউ পয়েন্টে বসে অলস দুপুর কাটিয়ে, মনে হল এবার একটু পায়ে হেঁটে ঘুরে দেখি ঝান্ডিকে। উৎরাই পথ বেয়ে নেমে চললাম ইকো হাটের নিচের রাস্তায়। কুয়াশা ঘেরা, ফার্ণে ছাওয়া জঙ্গলময় রাস্তা ধরে খানিক হেঁটে চললাম। নিস্তব্ধ, নিরিবিলি ঝান্ডি। শোনা যাচ্ছে নানান পাখির ডাক। এছাড়াও একটানা ঝিঁঝিঁ র শব্দ। এরকম ঝিঁঝিঁ র ডাক গত বছর লামাহাটাতে গিয়েও পেয়েছিলাম। কোলাহল মুক্ত, দূষণ মুক্ত এই পরিবেশে, প্রাকৃতিক শোভায় ঘেরা ঝান্ডিতে এই কুয়াশা ঘেরা বিকেল, মনকে একেবারে তাজা করে দেয়। রাতে ঠান্ডার পরশ নিয়ে, খাবার ঘরে ডিনার সেরে, সারাদিনের প্রাকৃতিক শোভা উপভোগ করার পর, পরম শান্তিতে শয্যা নিলাম, কটেজের দুগ্ধফেনিত বিছানায়।



পূর্ব হিমালয়ের যেকোন হাই আল্টিচ্যুড স্থানে এলে ভোরে ঘুম ভাঙে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার উতকন্ঠা বা আশা নিয়ে। ঝান্ডিতেও ঘুম ভেঙে কয়েক পা উঠে চলে এলাম ভিউ পয়েন্টে। ক্ষীণ আশা, যদি দেখা যায় বরফাবৃত পাহাড়চূড়া। কিন্তু আকাশ মোটামুটি মেঘমুক্ত হলেও, আশেপাশের পাহাড় পরিস্কার দেখা গেলেও, মে মাসের সকালে যথারীতি দেখা মিলল না কাঞ্চনজঙ্ঘার। তবে আশেপাশের পাহাড়ের দৃশ্যে মোহিত হয়ে গেলাম ঝান্ডির এই সুন্দর সকালে।

ভিউ পয়েন্টে বসে, রিসর্টের পাহাড়ি ঢালে হাঁটাহাঁটি করে, অনেক ছবি ক্যামেরা বন্দী করে, চললাম কাল বিকেলের সেই ফার্ণের জঙ্গলে ঘেরা রাস্তায়। সে রাস্তা ধরে খানিক এগিয়ে আজ পৌঁছে গেলাম পথের কিনারে এক ভিউ পয়েন্টে। সেখান থেকে এই সকালে ডুয়ার্সের উপত্যকার এক দারুণ দৃশ্য দৃশ্যমান। আজ আমরা ঝান্ডি ছেড়ে চলে যাব আরেক সুন্দর গ্রাম কোলাখামে। পথে লাভা ঘুরে। কালকেই গাড়ির কথা ইকো হাটের ফিরোজকে বলা ছিল। ফিরোজের পরামর্শে ঠিক হয়েছিল যে এই গাড়ি আজ আমরা রাতে রেখে দেব কোলাখামে। একই গাড়ি পরদিন পৌঁছে দেবে এন জে পি স্টেশনে। এর ফলে দুদিনের আলাদা গাড়ির খরচ ও কোলাখাম থেকে গাড়ি ভাড়ার অতিরিক্ত খরচ না হওয়ায় আমাদের কিছুটা সাশ্রয় হবে।



লাভা হয়ে কোলাখামঃ

 

লাভা মোনাসট্রির পথে





সাড়ে দশটা নাগাদ অনিলের গাড়িতেই রওনা দিলাম লাভা হয়ে কোলাখামের উদ্দেশে। ঝান্ডি থেকে লাভার দূরত্ব ১৬ কিমি। পথে পড়ল ‘সামেবিয়ং টি গার্ডেন’। পাহাড়ের ঢালে এক অসাধারণ, ছবির মত সুন্দর চা বাগান। গাড়ি থেকে নেমে চা বাগানের ভিতরে আমরা। পাহাড়ের ঢালে অনেকটা নিচ অবধি নেমে গেছে চা বাগানটি। বাগানের নিচে একটি ছোট্ট গ্রাম। তার ওপারে উঁচু পাহাড়। চা বাগানটির বিশেষত্ব হল এই যে, এখানে চা গাছগুলি উচ্চতায় মাত্র ফুট দেড়েক। চায়ের মান নাকি খুব ভাল ও এক্সপোর্ট কোয়ালিটির। অসাধারণ সব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দী করে ফিরে এলাম গাড়িতে।

সামেবিয়ং টি গার্ডেন





আরো খানিক চলে পৌঁছলাম লাভা। ৭৪০০ ফুট উচ্চতায় পাহাড়ি শহর লাভা, আজকাল একটি জনপ্রিয় ট্যুরিস্ট স্পট। পাইনে ছাওয়া পাহাড় ও বিশাল বৌদ্ধ মনাস্ট্রি, এখানকার মূল আকর্ষণ। লাভা নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের প্রবেশদ্বার। এছাড়াও রিশপ ও কোলাখাম যাওয়ার ট্রান্সিট পয়েন্টও লাভা। ৯ বছর আগে দেখা লাভা আজ কলেবরে অনেকটাই বেড়েছে। বড়বড় বাড়ি, অজস্র হোটেল, বাজার নিয়ে লাভায় শহুরে ছোঁয়া লেগেছে। এক উচ্চস্থানে অবস্থান লাভা মনাস্ট্রিটির। অনেকটা জায়গা জুড়ে, বেশ বড় ও জাঁকজমক পূর্ণ মনাস্ট্রিটা অসাধারণ। ৯ বছর আগের তুলনায়, মনে হল আরো জাঁকজমক বেড়েছে মনাস্ট্রির। সিঁড়ি বেয়ে উঠে চাতালটিতে লাল রঙা অনেকগুলি বাড়ি। তাদের মাথায় সোনালি রঙের নানান বৌদ্ধ কারুকার্য। রয়েছে ধর্মচক্র। লাল কাপড় জড়ানো একদল বৌদ্ধ লামা নিজেদের মধ্যে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত। প্রচুর পর্যটক সমাগম হয়েছে। আজকাল অনেক সিনেমার শুটিং হচ্ছে এই লাভা মনাস্ট্রিতে। মূল উপাসনা গৃহে বৌদ্ধ মূর্তি। গুরু গম্ভীর পরিবেশ। মনাস্ট্রির উপর থেকে লাভা শহর ও আশেপাশের পাইনে ছাওয়া পাহাড়ের শোভা দেখে মুগ্ধ হতে হয়।

লাভা মোনাসট্রি থেকে






লাভা থেকে ৮ কিমি দূরত্বে কোলাখাম। চেক পোস্ট পেরিয়ে প্রবেশ করলাম নেওড়া ভ্যালি ন্যাশনাল পার্কের এলাকায়। পিচের রাস্তা নয়, নেওড়া ভ্যালির গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বোল্ডার ফেলা, সরু সে পথ। এবড়ো খেবড়ো। উতরাইয়ে নেমে চলেছে। খুব সন্তর্পণে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। দুপাশের জঙ্গল যেন চেপে ধরছে। জঙ্গল এতই ঘন যে দিনের বেলাও কোথাও কোথাও আলো ঢোকে না। খানিকক্ষণ চলার পর মনে হচ্ছিল, সভ্যতা থেকে যেন অরণ্যের কোন গভীরে চলেছি। বেশ অ্যাডভেঞ্চারাস লাগছিল বলাই বাহুল্য। খানিক বাদে একটু খোলা জায়গা পেয়ে গাড়ি থামানো হল। নিচে অরণ্যে ঢাকা খাদের দৃশ্য। দূরে ওপারের পাহাড়ের গায়ে দু একটি গ্রাম। এই রাস্তাটিই এঁকে বেঁকে আরো নিচে নেমে গেছে কোলাখামের দিকে। সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা চারিদিকে। শুধু নিচে থেকে উঠে আসা গাড়ির শব্দ আসছে মাঝে মাঝে। আরো মিনিট কুড়ি চলে জঙ্গলের শেষে পৌঁছলাম কোলাখামে। লাভা থেকে ৮ কিমি পথ আসতে লেগে গেল ১ ঘন্টা।

কোলাখামের পথে





কোলাখামেঃ

 

আগে থেকে বুক করা ছিল ‘পাইন উড রিসর্ট’। রাস্তার বাঁকে প্রথমেই পড়ল কোলাখাম রিট্রিট। তারপর রেড পান্ডা, কোলাখাম নেস্ট, প্রভৃতি থাকার জায়গা। জানা গেল কোন উঁচু মগডালে পাইন উড রিসর্টের অবস্থান। গাড়ির রাস্তা থেকে প্রায় ৮০ ফুট উঁচুতে। অতএব সিঁড়ির পথ বেয়ে উঠতে থাকলাম উপরে। প্রায় সত্তর আশিটা সিঁড়ি ভেঙে একটা মাঠের মত চাতাল। সেখান থেকে আবার কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে আমাদের থাকার জায়গা। রিসর্ট বলতে একটা নীল রঙা কাঠের ছোট দোতলা বাড়ি। স্থানীয় একটি পাহাড়ি পরিবার দ্বারা পরিচালিত। দোতলায় একটা ডুপ্লেক্স রুম আমাদের জন্য রাখা আছে। একটি ছেলে গাড়ি থেকে আমাদের মালপত্র নিয়ে এল উপরে। এতটা উঠে সবাই হাঁপাচ্ছি। তবে উপর থেকে কোলাখামের যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে গেল। নিচে সুন্দর কোলাখাম গ্রাম ও রাস্তা। রাস্তাটি এঁকে বেঁকে আরো নিচে নেমে গেছে সাইলেন্ট ভ্যালি ও ছাঙ্গে ফলসের দিকে। সামনের খাদের ওপারের উঁচু পাহাড়টির মাথায় রিশপ। দু বছর আগে এসেছিলাম সেখানে। দেখা যাচ্ছে অতি ক্ষুদ্রাকারে হোটেলগুলি। তারই কোন একটাতে থেকেছিলাম সেবার। বাঁদিকে পাহাড়ের শিরে লাভা শহর ও লাল রঙা মনাস্ট্রি দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের মাথায়। একটু আগেই যেখানে ছিলাম। ডানদিকে সিকিমের পাহাড়। বাড়িটির পিছনে জঙ্গলময় পাহাড় অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। মালিক গঙ্গের সাথে আলাপচারিতা হচ্ছিল। পাশেই তার বাড়ি। সে বলছিল যে, এই পথ ধরেই চলে যাওয়া যায় সিকিমের রেনক ও আরিটারে – অর্থাৎ সিল্ক রুটের রাস্তায়। ডানদিকে ভাল করে ঠাহর করলে পাহাড়ের গায়ে অনেক দূরে যে শহর দেখা যাচ্ছে, সেটি রেনক।

কোলাখামে সকালের দৃশ্য





কাঠের সুদৃশ ঘর। ভিতরে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপরের তলা। ডুপ্লেক্সের উপরের জানলাটা খুলে দিলে উপর থেকে দারুণ ভিউ। বারান্দায় এসে বসলাম। অনেকটা উপরে হওয়ায় ছোট্ট গ্রাম কোলাখামের একটা অসাধারণ বার্ডস আই ভিউ পাওয়া যায় বারান্দা থেকে। নেওড়া ভ্যালির জঙ্গলের কিনারে ছোট্ট গ্রাম কোলাখাম ক্রমশ পর্যটন মানচিত্রে জায়গা করে নিচ্ছে। নেওড়া ভ্যালির জঙ্গল ও প্রাকৃতিক শোভা ছাড়াও এখানকার মূল আকর্ষণ মেঘমুক্ত দিনে সূর্যোদয় ও বরফাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করা। সামনের পাহাড়ের মাথায় রিশপের উচ্চতা ৮০০০ ফুট, লাভার ৭৪০০ ফুট। কোলাখামের উচ্চতা ৬০০০ ফুট।

কোলাখামে রিসর্টের বারান্দা থেকে





দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর মন চাইল পায়ে হেঁটে একটু ঘুরে দেখতে কোলাখামকে। প্রায় শ’খানেক ফুট নিচে নামা ও তারপর উঠে আসার কষ্ট উপেক্ষা করেই নেমে পড়লাম নিচের রাস্তায়। নিচের দিকে নামতে থাকা পাকদন্ডি পথে খানিক হাঁটাহাঁটি। আর পাঁচটা পাহাড়ি গ্রামের মতই সঙ্গী হল একটি পাহাড়ি কুকুর। সে আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। চারিদিকে সবুজের সমারোহ। ৭-৮টি রিসর্ট ও হোম স্টে আছে কোলাখামে পর্যটকদের জন্য। তবে গরমের ছুটির ভরা মরসুমে সব কটিই নাকি বুকড। বড়ই শান্ত ও নিরিবিলি এই গ্রাম। পথের বাঁকে নানান অচেনা পাখির ডাক। কখনও বা সেই অদ্ভুত ঝিঁঝিঁ র ডাক।

উল্টোদিকে রিশপ





বিকেলে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বারান্দায় বসে উপভোগ করছিলাম কোলাখামের শোভা। মাঝে মাঝে মেঘের লুকোচুরি। সন্ধ্যের পর আরেক রূপ কোলাখামের। চারপাশের পাহাড়ের গায়ে জ্বলে উঠল অসংখ্য আলোর বিন্দু। বাঁদিকে পাহাড়ের উপর লাভা, সামনের পাহাড়ের মাথায় রিশপ ও পাহাড়ের গায়ে দু একটি গ্রামের আলো। ডানদিকে সিকিমের পাহাড়ের গায়ে রেনক ও আরিটারের আলো। জোনাকির মত চিকচিক করছে একসাথে সব আলো। আমাদের ড্রাইভার অনিল গল্প করতে বারান্দায় এসে বসেছিল। সে বলছিল তার দার্জিলিং ও সিকিমের নানা জায়গায় গাড়ি নিয়ে ঘোরার দু একটা অভিজ্ঞতার কথা। ডানদিকের পাহাড়ের কোলে আবছা কয়েকটি আলোক বিন্দু দেখিয়ে বলল সেটি পাকিয়াং (Pakyong)। সিকিমের একমাত্র এয়ারপোর্ট নির্মাণের কাজ চলছিল তখন।



আবার শুরু হল মেঘেদের আনাগোনা। চারিদিক হঠাৎই ঢেকে ফেলল কোথা থেকে উড়ে আসা অনেক অনেক মেঘ। দূরের পাহাড়ের গায়ের সব আলো গায়েব। একেবারে গায়ের মধ্যে চলে আসছে মেঘ। ঘরের ভিতরেও ঢুকে পড়ছে তারা। এরকম বেশ খানিকক্ষণ মেঘেদের দাপাদাপি চলার পর হাওয়ার সাথে হঠাৎই উধাও হয়ে গেলে সমস্ত মেঘ। তারপর ম্যাজিকের মত আকাশ একেবারে পরিস্কার। রাতে খাওয়ার পর লোডশেডিং হয়ে গেল। অন্ধকারে নির্মেঘ আকাশে এক অদ্ভুত দৃশ্য। আকাশে অজস্র তারা। সপ্তর্ষিমন্ডল, কালপুরুষ, শুকতারা ছাড়াও শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে তারা। এত তারা একসাথে এর আগে কবে দেখেছি মনে পড়ে না। কলকাতার আকাশে একসাথে এত তারা ইদানিংকালে খুব একটা দেখি নি। কোলাখামের সে রাতের অভিজ্ঞতা কোনদিন ভোলার নয়। শীতল রাতে, নিকষ কালো অন্ধকারে, তারা ভরা আকাশের নিচে, এই ডুপ্লেক্স কটেজে নিদ্রামগ্ন হলাম, ভোরে ওঠার অ্যালার্ম লাগিয়ে।
ভোরে উঠেই পর্দা সরিয়ে উত্তর দিকে চেয়ে খোঁজার চেষ্টা করলাম কাঞ্চনজঙ্ঘাকে। কাল রাতের অদ্ভুত মেঘমুক্ত আকাশ দেখে সকালে উঠে যে তুষারশুভ্র চূড়া দেখার প্রবল আশার সঞ্চার হয়েছিল, বাস্তবে তা আজও সম্ভব হল না। আকাশ পরিস্কার হলেও, উত্তর দিকে ঠিক ততটা নয়, যাতে অভিমানি কাঞ্চনজঙ্ঘা এই মে মাসের সকালে মুখ দেখাতে পারে। যাই হোক ভোরের উদাত্ত পরিবেশে শীত বস্ত্র চাপিয়ে নেমে এলাম নিচের রাস্তায় প্রাতঃভ্রমণে। বাঁদিকের রাস্তা ধরে চললাম খানিক নেওড়া ভ্যালির জঙ্গলের দিকে। অনেক পাখির ডাক চারিপাশে। সামনের পাহড়ের মাথায় লাভা মনাস্ট্রি দেখা যাচ্ছে। আরেক পাহাড়ের মাথায় রিশপ। সেসব ছবি ক্যামেরা বন্দী করে, এরপর চললাম রাস্তা ধরে নিচের দিকে, অর্থাৎ, সাইলেন্ট ভ্যালির দিকে। এই রাস্তা ধরেই আরেকটু গেলে ছাঙ্গে ফলস। মূল রাস্তা থেকে ট্রেক করে দেড় কিমি যেতে হয় জলপ্রাপাত দেখতে। সাত সকালেই লাভার দিক থেকে গোটা দুয়েক গাড়ি ট্যুরিস্ট নিয়ে চলে গেল সেদিকে।

কোলাখামে পাইনউড রিসর্ট





রিসর্টে ফিরে আলু পরাঠা দিয়ে ব্রেকফাস্ট সেরে আবার বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসলাম। বারান্দার পাশে ও নিচের মাঠের মত জায়গাটায় নানা ফুলের গাছ। একপাশে এলাচ ও দারচিনি গাছের চাষ করা হয়েছে। ড্রাইভার অনিল চলে এসেছে, আমরা আজ কখন বেরোব তার খোঁজ নিতে। একটু বাদেই বেরিয়ে পড়তে হবে কোলাখাম ছেড়ে। আজ যে নিউ জলপাইগুড়ি থেকে কলকাতা ফেরার তিস্তা তোর্সা এক্সপ্রেস বিকেল চারটেয়। এখান থেকে ৪-৫ ঘণ্টা লাগবে স্টেশনে পৌঁছতে। কোলাখামকে ছেড়ে, হিমালয়ের শীতল সান্নিদ্ধ্য ছেড়ে যেতে মন চাইছিল না। কিন্তু ছুটি শেষ। অগত্যা ফিরে চলা কাজের জগতে। দশটা নাগাদ বেরিয়ে পড়লাম কোলাখামকে বিদায় জানিয়ে, নেওড়া ভ্যালির জঙ্গলের পথ বেয়ে। তারপর লাভা ছাড়িয়ে, সামেবিয়াং টি গার্ডেনের পাশ দিয়ে, একই পথে ঝান্ডির নিচ দিয়ে, ফাগু টি গার্ডেন হয়ে চেল নদী পেরিয়ে গরুবাথান। এবারের ছোট্ট ছুটিতে হিমালয়ের কোলে ঝান্ডি ও কোলাখামের প্রাকৃতিক শোভায় ও নির্জনতায় নিজেকে স্নিগ্ধ করেছি। সুন্দর এই ভ্রমণ অভিজ্ঞতার স্মৃতি নিয়ে ডামডিম, ওদলাবাড়ি হয়ে, তিস্তার উপর সেবক ব্রীজ পার হয়ে ফিরে চলা সেই চেনা এন জে পির দিকে।

সামেবিয়ং টি গার্ডেন





CONTACT DETAIL OF JHANDI ECO HUT

Mr. Rajen Pradhan : +91 943 411 6325

Mr. Avik Manna : +91 943 334 6189

Email : jhandiecohut@gmail.com

CONTACT DETAIL OF PINEWOOD RESORT, KOLAKHAM

Sukanta Biswas : 9874520005, 9163596075

Email : sukanta@pinewoodresort.in

CONTACT DETAILS FOR CAR :

Firoj Mukhiya : 8942820444

 


The content has been written by Mr. Subhrangshu Dasgupta and the photographs also have been clicked by him.


 




2 Comments

  1. darun laglo pore..north India onek bar ghure asleo North bengal jawar sujog hoyni akhono..Jawar icche r o bere galo lekha ta pore.

    Reply
  2. Very nice.

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement