“দেবভূমি” – চতুর্থ পর্ব (মানা গ্রাম)

“দেবভূমি” – চতুর্থ পর্ব (মানা গ্রাম)

“দেবভূমি” – চতুর্থ পর্ব (মানা গ্রাম)


কাল এসে পৌঁছেছি বদ্রীনাথ। বিকেলেই মন্দির দর্শন হয়ে গেছে। আজ সকালে আরেকবার মন্দির দেখে গাড়িতে উঠলুম, গন্তব্য ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’। কলকাতায় আজ বিজয়া দশমী। এখানে তার লেশমাত্র বোঝার উপায় নেই। মন্দিরের দিকে চেয়ে দেখি, চূড়ার স্বর্ণকলসগুলো কাঁচা রোদের আলোয় ঝকঝক করছে। সকাল ১০টা বাজে, আমরা রওনা দিলাম তিন কিমি দূরে মানাগ্রামের দিকে।

Mana village

3 km away from Mana Village

বদ্রীনাথ থেকে মানা যাবার রাস্তার হাল খুবই খারাপ। ধস পড়ে বিপর্যস্ত রাস্তা, কিন্তু সমানে সারাইয়ের কাজ চলছে, তবু প্রকৃতির সাথে কি আর মানুষ পারে? চার-পাঁচদিন লড়াই করে যে জায়গাটা গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত করে তোলা হচ্ছে, সেটাই পাঁচ সেকেন্ডের ধস এসে লণ্ডভণ্ড করে দিচ্ছে। তবু কাজ চলছেই, একমনে। এখানকার মানুষদের ধৈর্য আর পরিশ্রম দেখে অবাক হতে হয়। পেল্লাই পেল্লাই পাথরগুলোকে একটা ছোট্ট হাতুড়ি দিয়ে ভেঙে টুকরো করছে। কাজ চলছে একটানা, যাতে ট্যুরিস্টদের কোনো অসুবিধে না হয়।

Mana Village

Shape of Human face

মাঝে মাঝে পাহাড়ি ঝোড়ার জলে টায়ার ভিজিয়ে গাড়ি চলছে, কখনো খোলা কাঁচের মধ্যে দিয়ে ছুটে আসছে হিমশীতল ঝর্ণার জল। দেখতে দেখতে কখন যে পৌঁছে গেলাম বুঝতেই পারলাম না। ঝকঝকে আবহাওয়া, পাশে পাশে চলছে নীলকণ্ঠ, নর-নারায়ণ আরো কত নাম না জানা হিমগিরি। তাদের গায়ের হিমবাহগুলো যেন শিরা-উপশিরার মত নামছে নদী হয়ে।

Way to Mana Village

Mana Village

Unknown Hill at Mana Village

হরিদ্বার থেকে বদ্রীনাথ হয়ে মানাগ্রাম অবধি পুরোটা একটিই জাতীয় সড়ক। কিন্তু এখানে এসে এই রাস্তার শেষ, এবার গ্রামের মধ্যে দিয়ে পাহাড়ি পথ ধরতে হবে। স্বাগত জানাচ্ছে একটা বোর্ড, তাতে লেখা, ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’য় আপনাকে স্বাগত। গাড়ি পার্ক করে গেট পেরিয়ে ঢুকলাম মানাগ্রামে। দেখতে আর পাঁচটা গ্রামের মতোই, তাহলে এতো এতো লোক ছুটে আসে কেন? শুধু গ্রাম দেখতে? না, এই মানাগ্রাম শুধু ভারতের শেষ গ্রামই নয়, মহাভারতের মহাপ্রস্থানিক পর্বে আছে যে, এই মানা গ্রাম থেকেই শুরু হয়েছে স্বর্গের পথ।

Mana Village

Way to Village

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের পরাজিত করে পাণ্ডবরা হস্তিনাপুরে ফিরে আসে। শ্রীকৃষ্ণ চলে যান দ্বারকায়, কিন্তু গান্ধারীর অভিশাপে সমস্ত দ্বারকা জলে নিমগ্ন হয়। যাদবকুল ধ্বংস হয়। শ্রীকৃষ্ণও এক ব্যাধের তীরে দেহত্যাগ করেন। পাণ্ডবরা উপলব্ধি করেন কুরুক্ষেত্রের এই মহাসংগ্রামে শুধু ইক্ষাকু বংশই নয় (কুরু-পান্ডব বংশ), প্রবলপ্রতাপী যাদববংশও ধসে পড়েছে। ভারতবর্ষে এখন এক নতুন রাজনীতির সূচনা হয়েছে, যা কিনা দ্বাপর যুগের অন্ত ঘোষণা করছে। শুরু হতে চলেছে কলিযুগ। ভারতের সমস্ত ছোট বড় রাজ্য তাদের ন্যায়িক ও অর্থনৈতিক অবনতির জন্য পাণ্ডবদের দোষারোপ করছে। এমতবস্থায়, পাণ্ডবরা অভিমন্যুর পুত্র পরীক্ষিৎকে রাজ্যের ভার দিয়ে মহাপ্রস্থানের সিদ্ধান্ত নেন। সেইমত, পঞ্চপান্ডব ও দ্রৌপদী হস্তিনাপুর থেকে পায়ে হেঁটে আসেন কেদারনাথ পর্বতে। এখানে আদিদেব শিব একটি মহিষের রূপে তাদের সাথে ছলনা করলে মহাবলী ভীমের সঙ্গে যুদ্ধ লেগে যায়। মহিষের কুঁজ খুলে পড়ে কেদার পর্বতে, সেই থেকে কেদারনাথের অবস্থান ওই কেদার পাহাড়ে। কেদারনাথের শিবলিঙ্গও তাই conical, কুঁজের আকৃতির। তারপর শিবের দেখা পেয়ে পাণ্ডবরা আসেন এই মানাগ্রামে। এখান থেকে এই পঞ্চপান্ডব ও দ্রৌপদীর যাত্রা শুরু হয় স্বর্গের পথে।

Mana Village

Towards Mana Village

আমরাও যাত্রা শুরু করলাম, এখানে লোকজন খুবই গরিব। সামান্য কিছু চাষবাস আর ভেড়া আর অন্য পশুর লোম থেকে উল বানিয়ে উলের পোশাক বিক্রি করে এদের দিন কাটে। গ্রামের রাস্তা হলেও পাথুরে আর বেশ চড়াই, দুজন লোক পাশাপাশি কোনোরকমে যেতে পারে। তার ধারে ধারে গ্রামের বাড়ি, ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলছে, কেউ কেউ অবাক চোখে দেখছে। বাচ্চাদের হাতে একটা করে লজেন্স দিতেই কি খুশি। বাড়ির বয়স্ক মহিলারা উল বুনছেন রাস্তার ধারে, বিক্রিও করছেন উলের টুপি, মোজা, দস্তানা। মহিলাদের চামড়া কুঁচকে ‘লোলচর্ম’ যাকে বলে সেই অবস্থা। এখানকার চরম আবহাওয়াই এর জন্য দায়ী। ও এখানে বলে রাখি, আমরা যেদিন গেছিলাম, সেদিন এখানকার তাপমাত্রা ছিল -৪ডিগ্রি সেলসিয়াস। আরো খানিকটা এগোতেই রাস্তাটা ঠিক ‘Y’ এর মত দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁদিকে আছে সরস্বতী নদীর উৎস, ভীমপুল, কেশবপ্রয়াগ আর ডানদিকে আছে ব্যাসগুহা ও গণেশগুহা। আমরা বাঁদিকের রাস্তাটাই আগে ধরলাম।

Mana Village

Selling crafts at Mana Village

খানিকটা এগিয়েই দেখি একজন ছাইমাখা সাধু বসে আছেন পাহাড়ের গুহায়। এঁদের ছবি তোলার ব্যাপারে ভীষণ আপত্তি। শুধু সাধুরাই নন, এখানকার গ্রামের মানুষজনও ছবি তুলতে অনাগ্রহী। হয় সরাসরি বারণ করবেন, নাহয়, মুখ ঘুরিয়ে নেবেন যাতে ছবি না ওঠে। আরেকটু গিয়ে ডানদিকে দিকে দেখি একটা জলজ্যান্ত হিমবাহ। আমি এর আগে কখন কোনো হিমবাহকে এতো কাছ থেকে দেখিনি। গুহার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে বরফগলা জল, আর তার ছিটে এসে পড়ছে গায়েতে। রোদের আলোয় তৈরী হয়েছে সুন্দর রামধনু।

Mana Village

Saraswati River

ভীষণ গর্জন, তীব্র জলোছ্বাস, আর মোহময়ী সৌন্দর্য এই হচ্ছে সরস্বতী নদী। নিচে আছে ‘কেশবপ্রয়াগ’, যেখানে এই সরস্বতী নদীই অলকানন্দায় মিশে গিয়ে একক ধারা তৈরী করেছে। আরেকটু সামনে থেকে দেখব বলে এগিয়ে গেলাম সরস্বতী মন্দিরের কাছে।

Mana Village

Saraswati River fromed from here.

ছোট্ট মন্দির, পাশেই ঝর্ণা, ঠিক কোলের কাছে একটা চায়ের দোকান। লেখা আছে ‘ভারতের শেষ চায়ের দোকান’।

Mana Village

Last shop of India

এখন থেকে আরো সুন্দর লাগছে এই উৎসটিকে। দেখলুম, একটু আগে যে জায়গাটা থেকে সরস্বতী নদীকে দেখছিলাম, সেটা আসলে একটা বিশাল পাথর। এই পাথরের তলা দিয়েই নদী নেমে গেছে অলকানন্দার দিকে। স্বর্গারোহনের পথে দ্রৌপদী এই সরস্বতীর তীব্র স্রোত আর ভয়ানক জলোচ্বাস দেখে নদী পেরোতে ভয় পাচ্ছিলেন। তখন মহাবলী ভীম একটা পাথর নিয়ে এই ঝর্ণার ওপরে সেতুর মত স্থাপন করেন। এখনো দেখা যাচ্ছে আসলে একটা লম্বাটে গোলাকার মতন পাথরের চাঁই দিয়ে এই ব্রিজ বা ‘পুল’ বানানো হয়েছে। প্রাকৃতিক সেতু নয়, আবার অতিপ্রাকৃতিকও নয়! এই হল ‘ভীমপুল’ আর এই পাথরটি হল ‘ভীমশিলা’।

Mana Village

Veem Pool

ভীমশিলা পেরিয়ে সরু পাথরফেলা রাস্তা উঠে গেছে স্বর্গের দিকে। এই পথে অনেকটা গেলে পরে আছে বসুধারা ফলস। সেখান থেকে আরো কতদূর জানিনা,
সতপন্থ তাল পেরিয়ে একটা জায়গা আছে যেখানে রাস্তা আর নেই। এই কি তাহলে স্বর্গ? না, বলা হয়, এই পাহাড়ের শেষে আসতে আসতেই পর্বতের দুর্গমতায় এক এক জায়গায় একে একে দ্রৌপদী, অর্জুন, নকুল, সহদেব ও ভীমের পতন হয়। অর্জুনের পতন হয় চক্রতীর্থে। শুধু যুধিষ্টির ধর্মরূপী সারমেয়কে সঙ্গে করে এই পথের শেষ সীমায় এসে পৌঁছন। সেখান থেকে তিনি সশরীরে স্বৰ্গরথে আরোহন করেন।

Mana Village

View from Mana Village

দেখে আবার ফেরার পালা, এখনো বাকি আছে গণেশগুহা আর ব্যাসগুহা। এ দিকটায় লোকজন বোধয় একটু কম আসে। সত্যিই গুহা, কিন্তু বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে একটা মন্দির মাত্র। মন্দিরের ভেতর দিয়ে কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে গুহায় ঢুকতে হয়, আর পুরোটাই পরিক্রমার সময় চার হাতেপায়ে হাঁটতে হচ্ছে। গুহার গায়ে অনেকে পয়সা আটকে রেখেছে। ভেতরে পাথুরে মূর্তি।

Mana Village

Ganesh Temple

এই দুই গুহাও মহাভারতের সাথে যুক্ত। এখানেই মহর্ষি দ্বৈপায়ন ব্যাস (বেদব্যাস বা ব্যাসদেব) মহাভারত লেখা শুরু করেন। লেখার জন্যে গণেশকে আনানো হয়, ব্যাস বলবেন আর গণেশ লিখবেন। কিন্তু গণেশের এক মহা জেদ, বেদব্যাস বলতে বলতে থেমে গেলে গণেশ আর লিখবেন না। ২৪ হাজার শ্লোকের মহাগ্রন্থ, থামতে তো হবেই। তাই ব্যাসও দিলেন মোক্ষম চাল। প্রতিটি শ্লোক লেখার সময় গণেশকে বুঝতে হবে সেই শ্লোকের অর্থ, তারপর লিখতে হবে। এইভাবে লেখা হল কুরুপান্ডবের ইতিহাস। ওজনে সমস্ত বেদ, পুরাণ, রামায়ণের থেকেও বেশি ভারী, তাই নাম হল মহাভারত (মহা+ভার)। পাথুরে রাস্তা দিয়ে উঠে গেলে প্রথমে পড়বে গণেশ গুহা, সেখান থেকে খানিকটা উঠে গেলে ব্যাস গুহা।

Mana Village

Ganesh Cave

মানা গ্রাম দেখা শেষ, এবার ফেরার পালা। আবার সেই গ্রামের মধ্যে দিয়ে। দুপুর হয়েছে, রোদ উঠেছে মাথার ওপর। নিচে অলকানন্দার জলে ঠিকরে পড়ছে আলো। আমরা ফিরলাম গাড়িতে। এবার আমাদের গন্তব্য সারি গ্রাম ও দেওরিয়াতাল। কিন্তু পথে রাত কাটাবো ‘মন্ডল’ বলে একটা ছোট্ট জনপদে। তবে একটা জায়গা ছেড়ে এসেছি, গতকাল ঘুরেছি আউলি, তাই পরের পর্বে আউলির গল্প বলবো।

Mana Village

Mana Village

Mana Village

Mana Village

ভালো লাগলে প্লিজ কমেন্ট দিয়ে জানাবেন।


“দেবভূমি” – তৃতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ মন্দির)


Sourav Mukherjee – An IT expert by profession and A traveller by heart.

His facebook profile: Facebook


 

1 Comment

  1. দারুণ লাগল। খুব মন খারাপ লাগলো এই ভেবে যে জানি না এই জায়গায় কখনো জেতে পারবো কিনা

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement