“দেবভূমি” – তৃতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ মন্দির)

“দেবভূমি” – তৃতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ মন্দির)

“দেবভূমি” – তৃতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ মন্দির)


লকাতায় অঝোরে বৃষ্টি, তাই পুজোর নবমীটা প্রায় মাটি হয় হয়। আমরা কিন্তু কলকাতা থেকে এখন অনেএএএক দূরে, এমনকি হরিদ্বার থেকেও প্রায় ৩০২ কিমি দূরে, বদ্রীনাথে। গাড়ি থেকে সবে নামার তোড়জোড় করছি।

বদ্রীনাথে পৌঁছতে পৌঁছতে দুপুর গড়িয়ে গেছে। কিন্তু আকাশ এখনো ঝকঝকে, এতটুকু মেঘের লেশমাত্র নেই। আজ সকালেই নন্দপ্রয়াগ থেকে আউলি হয়ে বদ্রীনাথে ঢুকলাম। পরনে একটা ফুলস্লীভ জ্যাকেট, জিন্সএর প্যান্ট, আর কানঢাকা টুপি। গাড়ি থেকে নেমে যেই কিনা দু’পা গেছি শুরু হয়ে গেলো ঠান্ডা। এ যে সে ঠান্ডা নয়, সোজা নীলকণ্ঠ পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে আসা অলকানন্দার বরফ-বাতাস। হাতের তেলোদুটো জমে যাচ্ছে, ঠোঁট ফাটছে একটু একটু। বুঝলাম বোকামি হয়েছে, হাতের গ্লাভস আর ময়েশ্চারাইজার আনাটা খুব জরুরি ছিল। আজকে এখানে -৪ডিগ্রি সেলসিয়াস। একটু এগিয়েই দেখি লোকজনের চিৎকার পেছনে। তাকিয়ে দেখি, পাশের গাছগুলোর ওপরে কে যেন পাউডার ঢালছে। মিহি বরফের আস্তরণে ঢেকে যাচ্ছে আশপাশ। এক্ষুনি যে সব পাহাড় বা গাছগুলোকে সবুজ দেখছিলাম, তারাই এখন বরফের চাদরে গা ঢাকছে। পটাপট ফটো, উল্লাস। আমরা একটু এগিয়ে হোটেলে মালপত্র গ্যারেজ করে দিয়ে বেরোলাম।

Bardinath Travelogue

Neel Kantha

ওমা, একী? বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। কিন্তু ঠিক দুমিনিট, তারপর কোথায় বৃষ্টি? আবার ঝকঝকে আকাশ, সূর্য বিদায় নিচ্ছে, আর তার সাতরঙের আলোতে নীলকণ্ঠ পর্বতের শ্বেতশুভ্র শিখর কখনো কমলা, গোলাপি, লাল… আস্তে আস্তে সূর্য ডুবে গেলো। বদ্রীনাথ মন্দিরটা ঠিক এই নীলকণ্ঠ পর্বতের নিচে, নর আর নারায়ন এই দুই পাহাড়ের মাঝের উপত্যকায়। পুরাণে আছে, এই নর আর নারায়ণ ভগবান বিষ্ণুরই দুই রূপ। দ্বাপর যুগে নর অর্জুনরূপে আর নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণরূপে আবির্ভুত হন। এই সেই বদ্রীনাথ, যেটি কিনা হিন্দুদের প্রধান চারটি বিষ্ণু তীর্থক্ষেত্রের মধ্যে একটা। এই চার ক্ষেত্র ভারতের চার কোণে অবস্থিত ‘চারধাম’ নাম খ্যাত। উত্তরে বদ্রীনাথ (যেখানে বিষ্ণু নারায়ণ রূপে বিরাজিত, অলকানন্দার জলে তিনি স্নান করেন, অথর্ববেদের প্রতীক), পূর্বে পুরী (যেখানে বিষ্ণু জগন্নাথ নামে অন্নগ্রহণ করেন, ঋকবেদের প্রতীক), পশ্চিমে দ্বারকা (কৃষ্ণরূপে এখানে তিনি শৃঙ্গার করেন, সামবেদের প্রতীক) এবং দক্ষিণে রামেশ্বরম (রাম রূপে তিনি বিশ্রাম করেন, যজুঃবেদের প্রতীক)। এ চারধাম সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি – এই চার মহাযুগেরও সাক্ষী। প্রতিটি ক্ষেত্রের কাছেই একটি করে শৈব তীর্থক্ষেত্রও আছে, যথাক্রমে কেদারনাথ, লিঙ্গরাজ, সোমনাথ ও রামেশ্বরম। আমার কিন্তু দক্ষিনেরটি এখনো যাওয়া হয়নি। বদ্রীনাথ আবার গাড়োয়ালের চারধাম (কেদার-বদ্রী-গঙ্গোত্রী-যমুনোত্রী)-এর মধ্যেও একটি। বিশাল নামের জনৈক রাজা মন্দিরটি তৈরী করেন বলে একে বদ্রীবিশালও বলা হয়। একবার চট করে দেখে নিই বদ্রীনাথের ইতিহাস-

কোনো এক পুরাণে আছে, যে ভগবান বিষ্ণু একবার ব্রাহ্মণবধের পাপ থেকে মুক্ত হতে এখানে ধ্যানে বসেন। কিন্তু এখানকার চরম আবহাওয়ায় তাঁর ধ্যানের বিঘ্ন হতে পারে বলে দেবী লক্ষ্মী বিষ্ণুর অজ্ঞাতেই একটি কুলগাছের রূপে তাঁকে রক্ষা করেন। সংস্কৃতে কুল অর্থাৎ ‘বদ্রী’। সেই থেকে বদ্রীনাথ। আবার হিন্দুদের আদিগুরু শঙ্করাচার্য, এখানে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে বিষ্ণুর অবয়ব খুঁজে পান। ‘ব্রহ্মকুণ্ড’ থেকে পাওয়া এই নারায়ণের মূর্তির না ছিল হাত-পা, না ছিল সুস্পষ্ট মুখাবয়ব। তাই, সেই মূর্তি কুন্ডের জলে বিসর্জন দিয়ে তিনি আবার ধ্যানে বসেন এবং আবার ওই একই মূর্তি পান। শঙ্করাচার্য বোঝেন, এই হলো বদ্রীনারায়ণ; সেই মূর্তিই এনে প্রতিষ্ঠা করা হয়।

Badrinath Trip Report

Badrinath Trip Report in Bengali

বদ্রীনাথ মন্দিরের সামনে দিয়ে বয়ে চলেছে স্বর্গের যদি অলকানন্দা। এই অলকানন্দাই একে একে মন্দাকিনী, ভাগীরথী, কর্ণগঙ্গা, নন্দাকিনী ইত্যাদি নদীর সাথে মিশে তৈরী করেছে ‘গঙ্গা’। The Great Ganges. এখানে অলকানন্দার খাত অতি গভীর, কিন্তু তুলনায় চওড়া কম। তার ওপর দিয়ে সাঁকো বানিয়ে মন্দিরে ঢোকার রাস্তা।

Bardinath Travelogue

Entrance of Wooden Gate

মন্দিরটি রংচঙে, জাঁকজমকে পূর্ণ। এইরকম মন্দিরের ধরণ সারা ভারতেই বিরল। হলুদ-নীল-কমলা-ও সোনালী রঙে কারুকার্য করা তোরণ। মাথায় তিনটি স্বর্ণকলস।তোরণ পেরোতেই গরুড়ের মূর্তি। একেবারে সামনেই বদ্রীনাথ মন্দিরের গর্ভগৃহ। পাশে আছে লক্ষ্মী মন্দির, ঘন্টাকর্ণ, শঙ্করাচার্য, ও আরো নানান মন্দির। গর্ভগৃহেই বদ্রীনাথের সাথে নর-নারায়ণ-কুবের ইত্যাদি দেবতার বিগ্রহ। ময়ূরপুচ্ছের সুবৃহৎ মুকুটে শোভা পাচ্ছেন স্বর্ণালঙ্কারভূষিত নারায়ণ। ভেতরে বসার জায়গায় আছে, টিকিট কেটে সেখানে বসে আরতি দেখা যায়। কিন্তু আমরা যখন গেছিলাম, তখন মন্দিরে হাতে গোনা কয়েকজন লোক ছিল, তাই আমরা আরতি দেখতে পেয়েছিলাম বিনা টিকিটেই! এখানে বলে রাখি, মন্দিরের একজন নিরাপত্তারক্ষীই আমাদের এ ব্যবস্থা করে দেন, নিঃস্বার্থভাবে।

Bardinath Travelogue

Inside Temple

ভেতরে বেশ কিছুক্ষন ঘুরলাম, পুজো দিলাম। ক্যামেরার কোনো বাধানিষেধ নেই, তবে গর্ভগৃহের ছবি তোলা বারণ। এ মন্দির-ও মন্দির ঘুরে আবারও এলাম মূলমন্দিরে। এখানে বেশ ঠান্ডা। ও, বলে রাখি, ইতিমধ্যেই একটা কটসউল, হাফ সোয়েটার, আর ফুলস্লীভ জ্যাকেট গায়ে উঠেছে। চারদিকে ধুপ-ধুনোর গন্ধ। লোকজন ভজন করছে একমনে। মোট তিনবার দেবদর্শন ও মন্দির প্রদক্ষিণ করে আমরা গেলাম মন্দিরের নিচে দুটি কুন্ড দেখতে। এখানে ব্রহ্মকুণ্ড ও তপ্তকুণ্ড নামে দুটি কুন্ড আছে। প্রথমটির জল থেকেই নারায়ণ উঠেছিলেন। আর তপ্তকুণ্ড আসলে একটি উষ্ণ প্রস্রবণ (হট-স্প্রিং)। লোকেরা এখানে স্নান করছে, ধোঁয়া উঠছে খুব, কিন্তু জল যে ভীষণ গরম তা কিন্তু নয়। কুন্ডদুটি বেশ নিচে,প্রায় অলকানন্দার কাছেই। নিচে নামবার সিঁড়ি আছে, আর সিঁড়ির দুপাশেও অনেক ছোট ছোট মন্দির। শুনেছিলাম, ব্রহ্মকুণ্ডে নাকি একটি পাথরে শেষনাগের চোখ দেখা যায়, কিন্তু অনেককে জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে পারলাম না।

Bardinath Travelogue

Market beside Badrinath Temple

বাইরে অন্ধকার হয়েছে, কিন্তু বদ্রীনাথের দোকান-হোটেল-বাড়ি সব মিলিয়ে যেন একটা চাঁদের হাট বসে গেছে। দিনের চেয়েও বেশি আলো, কি যে অপূর্ব লাগছিলো,কি বলবো!

Bardinath Travelogue

Temple at Night

পায়ে পায়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকলাম, এখানে ভালো খাবারের দোকানের একটু অভাব। আমরা যেহেতু অফ-সিজনে গেছিলাম, তাই লোকের ভিড় ও জিনিসের দাম দুটোই বেশ কম ছিল। এই মন্দির থেকেই অনেকগুলো ট্রেকিং রুট উঠে গেছে।

Bardinath Travelogue

Nearby tracking rout

চরণ পাদুকা (বিষ্ণুর পদচিহ্ন আছে এখানে), ব্রহ্মকমল ইত্যাদি আরো অনেক জায়গায় যাওয়া যায়। চারদিকের দোকানে সুন্দর সুন্দর পেতলের মূর্তি বিক্রি হচ্ছে। নারায়ণ, লক্ষ্মী, কুবের আর হরেক রকম পুজোর উপাচার। যেন ছোটোখাটো একটা মেলা। শহরটা কিন্তু বেশি বড়ো নয়। হাঁটতে হাঁটতে কিছুদূর গিয়ে দেখলাম গাড়ির স্ট্যান্ড। এখান থেকে মানাগ্রাম যাবার গাড়ি পাওয়া যায়। মন্দির থেকে হোটেল অবধি যাতায়াতের জন্যে বয়স্ক লোকেরা ডুলির সাহায্য নিতে পারেন। তবে মন্দিরের খুব কাছ দিয়েই গাড়ি যায়, তাই সাধারণত ডুলির দরকার হয় না।

Bardinath Travelogue

Caring Idol

রাতের খাওয়া তাড়াতাড়ি সেরে নিয়ে হোটেলে ঢুকলাম আটটা নাগাদ। এবার একটা একটা করে দোকানপাট বন্ধ হতে লেগেছে। পাহাড়ের গায়ে আলো কমছে একটু একটু করে। মাথার ওপর তাকিয়ে দেখি, আকাশে হাজার তারার মেলা বসে গেছে। কলকাতার ধোঁয়া ভরা আকাশে কবে শেষবারের মত তারা দেখেছি মনে নেই, কিন্তু এখানে পরিষ্কার কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমণ্ডল আরো কত তারার সমারোহ। সামনেই পূর্ণিমা, তাই চাঁদ অকৃপণ আলো ছড়াচ্ছে গোটা উপত্যকায়। সেই মায়াবী আলোতে আবার সোনালী হয়ে উঠেছে নীলকণ্ঠ পর্বতের বরফঢাকা শৃঙ্গ।

Bardinath Travelogue

Badrinath Temple

ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ার আগে ভাবছিলাম, সেই মহাভারতের যুগ বা তারও আগে থেকে মানুষ এইসব জায়গায় আসে, থাকে, কিন্তু কিসের টানে? তখন না ছিল গাড়ি, না রাস্তা, না নিরাপত্তা। শুধু পাপ থেকে মুক্তির আশায়? দেবদর্শন করতে? তাই যদি হয় তবে দেবতারা এমন দুর্গম জায়গায় কেন টেনে আনেন? যাতে পাহাড়ি বিপদসংকুল রাস্তায় মৃত্যুভয় সঙ্গে করে আসতে আসতে তাদের জীবনের চরম সত্যের উপলব্ধি হয়? সত্যিই তো, যারা যাত্রা শুরু করতো, তাদের ক’জনই বা শেষ অবধি এসে পৌঁছতে পারত। কিন্তু তার জন্য তো তাদের আসা বন্ধ হয়নি। দিনে দিনে, যুগে যুগে মানুষে এসেছে, এখনো আসছে, পরেও আসবে। অনেকদিন আগে পড়া সেই গীতার শ্লোকটা মনে পড়ল-

“সর্বধর্ম পরিত্যজ্য মামেকং শরনং ব্রজ |
অহং ত্বাম সর্বপাপেভ্যঃ মোক্ষয়ামী হি সর্বদা ||”

অনেকদিন আগের পড়া তো, তাই একটু ভুলভ্রান্তি হতে পারে। অর্থাৎ, (হে অর্জুন) সকল ধর্ম পরিত্যাগ করে আমার (শ্রীকৃষ্ণের) কাছে এস, আমিই তোমায় সর্বদা সকল পাপ থেকে মুক্ত করব। হয়তো সেটাই সত্যি, হয়তো বা নয়। কে জানে? গীতার এই শ্লোকের গভীরতা বিচার করার ক্ষমতা আমার অন্তত নেই।

কাল সকালে যাবো ভারতের শেষ গ্রাম ‘মানা’। যেখান থেকে মহাপ্রস্থানের পথ উঠে গেছে, পাণ্ডবদের অনুসরণ করে।

লেখাটা খুব বড় হয়ে গেলো? পরের থেকে চেষ্টা করবো একটু কম ডিটেলে লিখতে। পড়ে কেমন লাগলো জানাবেন, সেইমত পরেরটা লিখবো।


“দেবভূমি” – দ্বিতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ যাওয়ার পথে)


Sourav Mukherjee – An IT expert by profession and A traveller by heart.

His facebook profile: Facebook


2 Comments

  1. valo laglo.

    Reply
  2. কি অপুর্ব্ব লেখা। ডিটেলস কমানোর কথা বলছেন, আমার মনে হল আরো লেখা নেই কেন

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement