“দেবভূমি” – দ্বিতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ যাওয়ার পথে)

“দেবভূমি” – দ্বিতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ যাওয়ার পথে)

“দেবভূমি” – দ্বিতীয় পর্ব (বদ্রীনাথ যাওয়ার পথে)


হরিদ্বার থেকে রওনা দিয়েছি পরশু। আজ (১০ অক্টোবর, ২০১৬) সকালে নন্দপ্রয়াগ থেকে আউলি হয়ে বদ্রীনাথ যাবো। আউলির গল্প অন্য একদিন শোনাবো। যোশীমঠ থেকে শুরু করি এখন।
যোশীমঠকে বদ্রীনাথের দরজা বলতে পারেন। পিক সিজনে এখান থেকে বদ্রীনাথ যাবার গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করতে গেট সিস্টেম করা হয়। মানে, সরু রাস্তায় দুর্ঘটনা এড়াতে বিকেল চারটের সময় শেষবারের মত গাড়ি ছাড়া হয়। এখান থেকে বদ্রীনাথ প্রায় ৪০ কিমি। তাই অন্তত দু থেকে আড়াই ঘন্টা তো লাগবেই পাহাড়ি রাস্তায়। আমরা মোটামুটি দুপুর একটা নাগাদ রওনা হলুম বদ্রীনারায়ণের উদ্দেশ্যে। কিন্তু যোশীমঠেও একটা দেখার জায়গা আছে।
সেটা হল, নরসিংহ মন্দির। শীতকালে যখন বদ্রীনাথ মন্দির বরফে ঢেকে যায়, আর মন্দিরের দরজা বন্ধ হয়ে যায় ছ’মাসের জন্য, তখন এখানেই বদ্রীনারায়ণের পুজো হয়। মন্দিরে যেতে গেলে যোশীমঠ বাজারের ঠিক মুখেই একটু নেমে যেতে হবে। মূল মন্দিরটা দেখতে অনেকটা আসল বদ্রীনাথ মন্দিরের মতই, তবে পশে আরেকটা নতুন মন্দির তৈরী হচ্ছে দেখলাম। দোতলা মন্দির, নিচে নরসিংহ ও দেবী লক্ষ্মী আর ওপরে বদ্রীনাথের আসন।

Badrinath Trip Report

Narasingha-Temple

 

Badrinath Trip Report

A new temple is coming soon

এই মন্দির নিয়ে একটা পৌরাণিক আখ্যান আছে, শুনে নিই সেটা-
সেই কোনকালে, হিমালয়ের কোলে এই ছোট্ট রাজ্যের অধিপতি ছিলেন রাজা নন্দ ঘোষ। এই নন্দ ঘোষের নামেই পঞ্চপ্রয়াগের একটার নাম নন্দপ্রয়াগ। রাজা বিষ্ণুভক্ত, আরাধ্য দেবতা বিষ্ণুর অবতার নরসিংহ। এই মন্দিরেই বিষ্ণু পূজিত হতেন। রাজার ভক্তি সুবিদিত হলেও বিষ্ণু স্বয়ং একদিন এক অতিথির বেশে এলেন রাজাকে পরীক্ষা করতে। রাজা তখন ভবনে নেই, রানীর আতিথেয়তায় তুষ্ট হয়ে নররূপী বিষ্ণু রাজার পালঙ্কে শুয়ে নিদ্রা গেলেন। রাজা এসে দেখলেন এক অপরিচিত মানুষ তাঁর শয্যায় নিদ্রিত। ক্রোধে তখনই তিনি অতিথির গায়ে তরোয়ালের কোপ বসিয়ে দিলেন। সেই আঘাতে অতিথির হাতখানি কেটে গিয়ে কোনোরকমে শরীরের সাথে লেগে রইলো। বিষ্ণু রাজার সম্মুখ থেকে অন্তর্হিত হলেন। ক্রোধ সংহত হলে রাজা নিজের ভুল বুঝতে পারলেন, তখুনি ছুটে গেলেন নরসিংহদেব মন্দিরে। দেখলেন বিগ্রহের একটি হাত কাটা, একটুখানি জুড়ে আছে। রাজা সবই বুঝতে পারলেন, ক্ষমা চাইলেন নারায়নের কাছে। দৈববাণী হল, বিষ্ণু এখন থেকে বদ্রীনাথে অবস্থান করবেন। আর যেদিন এই বিগ্রহের হাত ভেঙে শরীর থেকে আলাদা হয়ে যাবে, সেদিন জয় ও বিজয় পাহাড়দুটি জুড়ে গিয়ে বদ্রীনাথে যাবার সমস্ত পথ বন্ধ হবে। ভগবান তখন অবস্থান করবেন ভবিষ্যবদ্রীতে। এখনও এই মন্দিরের বিগ্রহের হাতটি একটুখানি লেগে আছে। সকালে যখন মূর্তি মার্জনা হয়, তখন গেলে দেখা যায়।
নরসিংহ মন্দিরের মধ্যেই আরো অনেক ছোট ছোট মন্দির আছে। আছে নবদুর্গার মন্দির, দুষ্প্রাপ্য অষ্টভুজা গণেশ, কালী, শিব ও আরো নানান মন্দির।

Badrinath Trip Report

Sign Board of Different Temples at Narasingha Temple

এই সব দেখে বেরোতে বেরোতে প্রায় দেড়টা বাজে, সূর্য মাথার ওপরে। এরপর যে পাহাড়ি রাস্তা শুরু হল সেটা এতটাই দুর্গম যে ড্রাইভারও বেশ উদ্বিগ্ন মনে হল। দু’পা যেতে যেতেই দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের গা বেয়ে ধস পড়ার টাটকা চিহ্ন।

Badrinath Trip Report

Condition of Road

গাছ, পাথর ছড়িয়ে লণ্ডভণ্ড করে রেখেছে। এই জায়গাটা আবার নন্দাদেবী রিসার্ভড ফরেস্টের মধ্যে পড়ে, তাই রাস্তায় কোনো গ্রাম তো দূরের কথা, একটা মানুষও চোখে পড়লো না। কোথাও পাহাড়ি ঝর্ণা, কুলকুল করে বইছে আপনমনে।

Badrinath Trip Report

Going through Nandadevi Reserve Forest

আর নিচে একমনে বয়ে চলেছে স্বর্গের নদী অলকানন্দা। সেই হরিদ্বার থেকেই পাশে পাশে চলছে। এতো বড় বড় ধস পড়েছে, দুএকটা গাড়িও দেখলাম, চেপ্টে বসে গেছে। এই সবই হয়ত আজ সকালে কি গতকাল হয়েছে, তাই এই রাস্তায় আমাদের গাড়িও নিরাপদ নয়।

Badrinath Trip Report

Crossing Alakananda

বেশ কিছুটা যাবার পর, দেখলাম ফরেস্টের সীমানা শেষ হল, সেই জায়গাটার নাম হনুমানচটি। ছোট্ট একটা হনুমানের মন্দির। বিগ্রহটি ভারী চমৎকার, নৃত্যরত হনুমান। হলদে রঙের মন্দির, আর চারদিকে সবুজ পাহাড়। ঠিক যেন গাছে একটা কলকে ফুল ফুটে আছে।

Badrinath Trip Report

Hanuman Chati

একটু বিশ্রামের পর আবার যাত্রা শুরু, এবার একদম বদ্রীনাথ গিয়েই থামবো। ও বলতে ভুলেই গেছি, সেদিন আবহাওয়া এত ভাল ছিল যে সকাল থেকেই চৌখাম্বা, নন্দাদেবী, ত্রিশূল নীলকণ্ঠ ইত্যাদি বরফঢাকা শৃঙ্গরা আমাদের পাশে পাশে চলছে। ঠিক যেন ক্যানভাসে আঁকা ছবি, পথের পাশেই দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। সেই বদ্রীনাথ অবধি চললো তারা। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে তাদের গায়ে আঁকাবাঁকা হিমবাহ, নদীর মত নিচে নামছে। খানিক পরে দেখা গেল দূরে একটা উপত্যাকার মত জায়গায় একটা জনপদ, বদ্রীনাথ।
দূর থেকে শহরটাকে দেখা যাচ্ছে। ঢোকার মুখেই বড় বাসস্ট্যান্ড, হরিদ্বার থেকে সারাদিনই বাস যাচ্ছে ও আসছে।

Badrinath Trip Report

Bus Stand at Gobinda Ghat, base point of Hemkundu Sahib and Valley of flowers.

ঢুকতেই স্বাগত জানাচ্ছে ভারত সেবাশ্রম সংঘ। আরো একটু গেলে রাস্তার দুধারে অনেক হোটেল। এখানে সব হোটেলের অবস্থা খুব ভালো নয়, কিন্তু সংখ্যায় অনেক। একটু কাছে আসতেই চকচক করে উঠলো বদ্রীনাথ মন্দিরচুড়ার সোনার কলস। ওই তো সারা জনপদের প্রাণ, ঠিক মাঝখানে বসে আছে। আরেকটু এগিয়ে আমাদের গাড়িটা হোটেলের সামনে দাঁড়ালো।

Badrinath Trip Report

Badrinath Temple

(পরের পর্বে বদ্রীনাথ মন্দিরের কথা বলবো, কিন্তু তার আগে জানাতেই হবে এই লেখাটা কেমন লাগলো।)


“দেবভূমি” – প্রথম পর্ব (হরিদ্বার)


Sourav Mukherjee – An IT expert by profession and A traveller by heart.

His facebook profile: Facebook


 

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement