জঙ্গলময় রাজস্থান – Bharatpur Keoladeo Ghana National Park

জঙ্গলময় রাজস্থান – Bharatpur Keoladeo Ghana National Park

রাজস্থান বলতেই মনে পড়ে কেল্লা, বালি, পাথর আর মরুভূমির কথা। কিন্তু জঙ্গল, বন্যপ্রাণ ও পক্ষীকুলের সম্ভার নিয়ে আরেকটা সবুজ অংশও রয়েছে এই বৈচিত্রময় রাজ্যে। ‘রেগিস্তান’এর ছবির আড়ালে পূর্ব রাজস্থানে রয়েছে তিনটি অনন্য অভয়ারণ্য – সরিস্কা, রনথম্ভোর ও ভরতপুর। কলকাতা থেকে ৮-১০ দিনের রাজস্থানের ট্যুর প্যাকেজে গিয়ে সাধারণত যা দেখা হয় না অধিকাংশ পর্যটকেরই।

“Maati Baandhe Painjanee../Bhangd Pehne Baadli../ Dedo Dedo Baavdo../ Ghod Mathod
Bhavdi…”

চেনা চেনা ঠেকছে গানের লাইনগুলো? এটা রাজস্থান ট্যুরিজমের বিজ্ঞাপনের সেই সরকারি থিম সং। সেই বিজ্ঞাপনে একেক জন রাজস্থানকে দেখে একেকরকম ভাবে। এতই বৈচিত্রে ভরা রাজস্থান। মনমাতানো রাজস্থানী ফোক গানটির সাথে একাত্ম হয়েই আজ দেখে নেওয়া যাক পাখিদের স্বর্গরাজ্য ভরতপুরকে।

ভরতপুর। ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





‘কেওলাদেও ঘানা ন্যাশনাল পার্ক’। পূর্ব রাজস্থানে ভরতপুর শহরের কিনারে অবস্থিত এই অভয়ারণ্য বেশি পরিচিত ‘ভরতপুর বার্ড স্যাঙ্কচুয়ারি’ নামে। ভারতের বৃহত্তম পাখিরালয়। নভেম্বর থেকে মার্চ যা হয়ে ওঠে পাখি দেখার স্বর্গরাজ্য। দিল্লি থেকে দূরত্ব ১৮২ কিমি। আগ্রা – জয়পুর জাতীয় সড়কের পাশেই পাখিরালয়ের প্রবেশদ্বার। যা আগ্রা থেকে ৫৫ কিমি ও জয়পুর থেকে ১৭২ কিমি। ২৯ বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে এই অভয়ারণ্যে গড়ে উঠেছে পাখিরালয়।

Turtle at Bharatpur. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

১৯৮১ তে জাতীয় উদ্যানের শিরোপা পায় এই পাখিরালয়। মূলতঃ শুষ্ক পর্ণমোচী বৃক্ষ, ঝোপঝাড়, জলাভূমি ও ঘাসের জঙ্গল – এই নিয়ে অভয়ারণ্য। স্টর্ক, হেরন, বিল, ডাস্ক, কর্মোরান্ট, স্যান্ডপাইপার সহ প্রায় ৩৬০ রকম প্রজাতির পাখির দেখা মেলে ভরতপুরে। এর মধ্যে একটা বড় অংশই পরিযায়ি পাখি বা মাইগ্রেটরি বার্ড। শীতের মরসুমে পাড়ি জমায় পৃথিবীর নানা দেশ থেকে। পাখি ছাড়াও এ জঙ্গলে আছে কিছু হরিণ, নীলগাই, সম্বর, বুনো শুয়োর ও নানা প্রজাতির সাপ। কদম, বাবুল, জাম এ জঙ্গলের উল্লেখযোগ্য গাছ। এছাড়াও রয়েছে বেড়, কয়ের ও কুশ ঘাসের জঙ্গল।

Spottes Deer. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





Northern Shoveler. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

পোচার্ড। ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





ভরতপুরে সূর্যাস্তের সময়। ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

“পাখ-পাখালির গান শুনিগে চল/ ঝর্ণা ধারার মত পাখির শব্দ কলকল…”

সকাল ৭টায় খোলে পাখিরালয়ের গেট। রিক্সায় চড়ে জঙ্গলের ভিতরে ভ্রমণ ও পাখি দর্শনের ব্যবস্থা, যা অন্যান্য অভয়ারণ্যের তুলনায় বেশ অভিনব। এছাড়া সাইকেল ভাড়া নিয়ে বা গাইড নিয়ে পদব্রজেও ঘোরা যায় স্যাঙ্কচুয়ারির ভিতরে। মূলতঃ পাখিরালয় হওয়ায় ও হিংস্র জন্তু এ জঙ্গলে না থাকায় এ ব্যবস্থা। কোন জ্বালানিচালিত যান প্রবেশ নিষেধ পাখিরালয়ের পরিবেশ রক্ষার্থে। রিক্সায় চড়ে জঙ্গলে প্রবেশ করলে রিক্সাওয়ালারাই হবে গাইড, চেনাতে থাকবে নানা অচেনা ও অজানা পাখি।

Painted Stork. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

Soft Shell Tortoise. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

জঙ্গলে প্রবেশ করতেই হয়ত স্বাগত জানাবে উঁচু গাছের মগডালে বসা কোন ‘সার্পেন্ট ক্রেস্টেড ঈগল’ (Serpent Crested Eagle), বা ঈগল ও পেঁচার মাঝামাঝি দেখতে ‘ঈগল আউল’ (Eagle Owl), তার বাসায় বসে। চোখে পড়বে গাছের একেবারে মগডালে বসা ছোট্ট পাখি ‘ব্ল্যাক ড্রঙ্গো’ বা ওয়াচ বার্ড। উঁচুতে বসে যেন জঙ্গলে সব কিছুর উপর নজর রাখছে। সাক্ষাৎ হতে পারে ‘টাইগার ব্রাশ’ নামক পাখির সাথে, যা নাকি জঙ্গলে বাঘের মুখ থেকে খাবার সংগ্রহ করে বাঘের দাঁত পরিস্কার করে দেয়, বাঘ যখন ঘুমায়। যদিও ভরতপুরের জঙ্গলে বাঘ নেই।

Indian Spotted Eagle. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





কোন গাছের ডালে হয়ত চোখে পড়বে ঘাড় ঘুরিয়ে পোজ দেওয়ার ভঙ্গিতে বসা ‘কিংফিশার’ (Kingfisher) বা মাছরাঙা। কোথাও আবার গাছের ঘন পাতার আড়ালে ‘রেড পিক ল্যাপউইং’ (Red Peak Lapwing), গাছের ডালে লেজ ঝুলিয়ে বসা ‘ম্যাগপাই রবিন’ (Magpie Robin) ও ‘পার্পেল মূরহেন’ (Purple Moorhen), বা পাতাঝড়া জাম গাছের ডালগুলিতে বসা অজস্র ‘কর্মোরান্ট’ (Cormorant)। এই কর্মোরান্টএর একটা জাত হল ‘পানকৌড়ি’। জঙ্গলের ভিতরে নজরে পড়বে ছোট ছোট গর্তওয়ালা উঁচু ঢিবির মত। বুঝতে হবে যে সেগুলি আসলে সাপের বাসা। এ জঙ্গলে আবার পাইথন (Python) আছে। ভাগ্যে থাকলে দেখাও মিলতে পারে পাইথনের।

Serpent Crested Eagle. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

Spotted Owl. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





White brested kingfisher. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দীভরতপুরে অভয়ারণ্যের একটা বড় অংশ জুড়ে বিস্তৃত জলাজমি বা মার্শল্যান্ড, যা পাখিদের বসবাসের আদর্শ জায়গা তৈরি করেছে। দেখা যায় অগভীর জলা জমিতে বা গাছের উপর বসা অসংখ্য ‘পেইন্টেড স্টর্ক’ (Painted Stork), ‘পার্পেল হেরন’ (Purple Heron) বা হল্যান্ড থেকে আসা ‘গ্রে হেরন’ (Grey Heron)। কোথাও ঘাসের উপর বসা স্মল ও লার্জ ‘ইগ্রেট’ (Egret), কোথাও বা তার পাশে ‘শ্রীলঙ্কান ডাস্ক’। আবার অগভীর জলায় দেখা মিলবে কয়েক ডজন ‘সাইবেরিয়ান ডাস্ক’ (Siberian Dusk), সুদূর সাইবেরিইয়া থেকে আসে তারা। এমনকি ভাগ্য সহায় থাকলে গাছের ফাঁক দিয়ে দর্শন মিলতে পারে ‘ইন্ডিয়ান সারস ক্রেন’এর। সারস ক্রেনকে (Indian Saras Crane) বলা হয় ‘Asia’s largest flying Bird’। বিখ্যাত পক্ষীবিশারদ সেলিম আলির বইতে যে সব পাখির কথা ও ছবি দেখা যায়, তাদের অনেকের সাথেই সাক্ষাৎ হবে এই ভরতপুরে। এত হরেক রকম পাখির দেখা মিললেও, রাজস্থানের অন্যান্য অভয়ারণ্যের মত ময়ূরের দেখা কিন্তু মেলে নি ভরতপুরে।

Spoonbill Duck. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

Indian Sarus Crane. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





Painted Stork. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

রিক্সায় চেপে অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরি করে পাখি দেখার পর, ইচ্ছে হলে রিক্সা থেকে নেমে খোলা প্রান্তরে একটু হেঁটে ঘুরলেও বেশ লাগবে। শত শত, হাজার হাজার পাখি নানান বিহঙ্গে, নানা ফর্মেশনে উড়ে বেড়াচ্ছে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। আর তাদের সমবেত কলরবে মুখরিত হয়ে উঠছে চারিপাশের জঙ্গল। এ দৃশ্য দেখে এক অদ্ভুত ভাল লাগায় মন ভরে উঠবে।

“অতিথ পাখি পথিক পাখি, সকল পাখির ঝাঁক/ দূর থেকে ঐ আসছে উড়ে হাজার হাজার লাখ”।

Bar Headed Goose. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

Bhraminy starling. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দীমনে হতেই পারে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী বোধহয় এই পক্ষীকূল। ঈর্ষা হতেই পারে এই ভেবে যে পরিযায়ী পাখিরা স্বাধীন ভাবে ডানায় ভর করে কেমন হাজার হাজার মাইল উড়ে চলে, এ দেশ থেকে সে দেশ, কোন ভিসা, পাসপোর্ট বা প্লেনের টিকিট ছাড়াই।
পথের পাশে জলাশয়ে নজরে পড়বে ভেসে বেড়ানো ‘ডার্টার’ (Darter)। সাপের মত গ্রীবা ও এঁকে বেঁকে জলে ডুব সাঁতার দেওয়ার জন্য এদের স্নেক বার্ডও বলে। জলে ডুব সাঁতার দেওয়ার পর, এরাই আবার গাছের মগডালে বসে ডানা শুকায়, অনেকটা দুহাত দুপাশে ছড়িয়ে ক্রসের ভঙ্গিতে একভাবে বসে। আবার জঙ্গলের মাঝে কোন জলাশয়ের চারপাশের গাছগুলিতে দেখা মিলতে পারে একসাথে অনেক ‘হোয়াইট ইবিস’ (White Ibis)। এই পাখিদের আকৃতি অনেকটা বড়সর মুরগীর মত হয়। হঠাৎ দেখলে মনে হতেই পারে যেন গাছে থোকা থোকা অনেক ফুল ফুটেছে। গাছের ডালে ও জলাশয়ের পাড়ে বসে থাকা অসংখ্য পেইন্টেড স্টর্ক, হেরন, কর্মোরান্ট ও ইবিসের সম্মিলিত কলরব ও একটানা হইচই শুনতে বেশ লাগবে।

Indian Darter. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





Bluethroat. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

আমাদের পাখিরালয়ের সফরে এক সর্দারজি ছিলেন রিক্সাওয়ালা কাম গাইড। তিনি খুব যত্ন সহকারে আমাদের সব পাখি চিনিয়েছিলেন। এমনকি বিভিন্ন পাখির খটমট বিজ্ঞান সম্মত নামও তার নখদর্পনে। এত এত বিভিন্ন পাখি দেখে অভিভূত হয়েছিলাম ভরতপুরে এসে। হয়েছিল এক অনন্য অভিজ্ঞতা। অজস্র পাখি দেখার পর দেখা মিলেছিল একটি পাইথনের, যা ছিল উপরি পাওনা। সদ্য শিকার ধরে এসে পাইথনটি তার ডেরায় ছিল বিশ্রামরত।

Rudy Shell Duck. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

Redstart. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

জঙ্গলের মাঝে রয়েছে একটি ওয়াচ টাওয়ার। উপর থেকে চোখে পড়ে দিগন্ত বিস্তৃত জলাজমি বা মার্শল্যান্ড, যা সূর্যরশ্মির বিকিরণে চিকচিক করে। পাশেই জঙ্গলের ভিতরে আছে কেওলদেও মহাদেব মন্দির, অতি প্রাচীন। এই মন্দিরের নামেই নামকরণ হয়েছে ‘কেওলদেও ঘানা’ ন্যাশনাল পার্ক’। ‘ঘানা’ শব্দের অর্থ ঘন জঙ্গল।

Keoladeo Mahadev Temple





ঘন্টা তিন চারেকের এই পাখিরালয়ের সফরে অজস্র চেনা, অচেনা পাখির দর্শন করে ও তাদের সম্মিলিত কলরবে মুগ্ধ হয়ে, পাখিদের সাথে কেটে যায় একটি স্বপ্নের সকাল। একরাশ ভাললাগা গেঁথে থাকে মনের মনিকোঠায়।

White Wagtail. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

Black Wing Stilt. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দীভরতপুরে পার্ক ছাড়াও দেখার মতো হলো রাজপুত-মোঘল শৈলী তে নির্মিত ভরতপুর প‍্যালেস। বিখ্যাত লোহাগড় দূর্গ যা অনেকবার বৃটিশ রা আক্রমণ করেছিল তবুও এই দূর্গ জিততে পারেনি। ৩২ কিমি দুরে অবস্থিত ডিগ প‍্যালেস। যা রাজাদের গ্রীষ্মকালীন আবাসস্থল। এছাড়াও ঘুরে আসতে পারেন Chambal Gharial River Sanctuary। হাতে সময় থাকলে ঘুরে আসতে পারেন আগ্রা ও ফতেহপুর সিক্রি থেকেও।

Purple Sunbird. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী





যাতায়াতঃ

দিল্লির হজরত নিজামুদ্দিন রেল স্টেশন থেকে ট্রেন বা সরাই কালেখাঁ টার্মিনাস থেকে বাসে মথুরা হয়ে ৪-৫ ঘন্টায় পৌঁছে যাওয়া যায় ভরতপুরে। স্টেশন থেকে ৭ কিমি দূরে পার্কের গেট। এছাড়া আগ্রা বা জয়পুর থেকে বাস বা গাড়িতে সোজা ভরতপুর বার্ড স্যাঙ্কচুয়ারি।

Hoopoe. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

থাকার জায়গাঃ

জাতীয় সড়কের ধারে স্যাঙ্কচুয়ারির গেটের কাছে বিভিন্ন দাম ও মানের অনেক হোটেল আছে। এছাড়া ভরতপুরে আছে RTDC র ‘হোটেল সারস’। ভরতপুর শহরেও থাকার জন্য আছে কয়েকটি বাজেট হোটেল ও লজ।

হোটেল সারসে যোগাযোগের উপায়: 

Contact No. :05644-223790 

Mobile+91 9875126330 

Emailsaras@rtdc.in

Pied Kingfisher. ছবি সৌজন্য : শ্রী সুজিত নন্দী

 


The content has been written by Mr. Subhrangshu Dasgupta and the photo of Keoladeo Mahadev Temple appearing here is clicked by the author.

The beautiful pictures of the birds, deer, turtle etc. as appearing and mentioned here is clicked by Mr. Sujit Nandi. We are specially thankful to him for contributing his beautiful photographs in our blog.


 



1 Comment

  1. Very informative and interesting post,and pictures of birds shot by Mr. Sujit Nandi are mind blowing.

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement