আলস্যের আউলিতে

আলস্যের আউলিতে
Reading Time: 6 minutes

 

জোশিমঠথেকে সোজা রাস্তা চলে গেছে আরও দূরে বদ্রীনাথের দিকে। কপালে পুণ্যিটুন্যি বিশেষ নেইও আমার। তাই এখান থেকে গাড়ি ঘুরল উপর পানে। আঁকাবাঁকা এ পথ চলে গেছে আরও ১৬ কিলোমিটার দূরে আউলির দিকে। আপাতত গন্তব্য আমার ঐখানে।
আরে ভাই, ওটা তো একটা স্কি রিসোর্ট।




বরফের ওপর স্কি করতেই সবাই যায় ওখানে। বিদেশিদের ভিড় ই বেশি। আলুপোস্ত খাওয়া ভেতো বাঙালী তুমি ওখানে গিয়ে কি করবে শুনি? তার ওপর আবার ভাঙা কোমর নিয়ে? এমনতর হাজার প্রশ্নের স্রেফ একটাই উত্তর আমার। যাবো আউলিতে একটু আলিস্যি করতে। করুক না সবাই স্কি টি বরফের ওপর। আমি না হয় ততক্ষন কুঁড়েমি করে শুয়ে বসে অপার হিমালয়ের অপরূপ রূপ দর্শন করি।
শুরুতেই বিপত্তি। পথ জুড়ে বরফের আস্তরন। একজন আর্মির ভদ্রলোক ওপর থেকে নেমে আসছিলেন। আমাদের চালক শুধল তাকে, পথ কি খোলা না বন্ধ? একগাল হেঁসে মানুষটি জানালেন বিশুদ্ধ হিন্দিতে, কাল তক তো সড়ক বন্ধই থা। বহুত বরফ গিরা থা। লেকিন আজ খুল গিয়া রাস্তা। সাবধানী সে যাও। এই বলে তিনি ওপরের দিকে নাকি স্বর্গের রাস্তার দিকে আঙুল দেখিয়ে দিলেন।




অত্যন্ত অনিচ্ছায় ড্রাইভার একবার আমার সর্বাঙ্গ মেপে নিয়ে গিয়ার মেরে গাড়ি চালু করলেন। তার ইচ্ছে ছিল জোশিমঠেই ঘাঁটি গাড়া এবং আমাদের রোপওয়ে দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া। সহযাত্রীরা তো আরও বিরক্ত আমার ওপর। একে ঠাণ্ডা, তায় বরফ, তার ওপর সরু রাস্তা, প্রান রাখার কি বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই? কারুর গোঁফ গেছে ঝুলে, উদ্বেগে আর আমার ওপর রাগে। কারুর বা লিপস্টিক ফ্যাকাশে। এমন বেখেয়ালে বাউন্ডুলে ঘোরাফেরা তাঁদের বিলকুল না পসন্দ। কিন্তু ঐ যে বরফের পাহাড়শ্রেণী উঁচু হয়ে আমাকে হাতছানি দিচ্ছে, পাগল করা রূপ নিয়ে। যেতে তো আমাকে হবেই। বেশ একরোখা হয়েই বললাম, চলিয়ে ড্রাইভার সাহাব, সাবধানী সে চলিয়ে। আউলি তো আ গিয়া হ্যায়। সব হতাশায় জল ঢেলে এগিয়ে চললাম যেন স্বর্গরাজ্যের পথে।




পাইন ওক কনিফার গাছে ঢাকা পথ একদিকে। দুপাশ জুড়ে কাল রাত্রের পড়া বরফ। আরেকদিকে খাদ বাড়ছে গভীরে। তার ওপাশে ক্রমশ উন্মোচিত হচ্ছে ধ্যানমগ্ন সুউচ্চ তুষারশৃঙ্গমালার। মধ্যদিনের সূর্যস্নাত সুনীল আকাশ। আঃ আউলি আমি আসছিইইই!
ইন্দো-টিবেটান বর্ডার পুলিশের ক্যাম্প ছাড়িয়ে আরও কয়েকপাক পিচ্ছিল পাকদণ্ডি পেরিয়ে অবশেষে পৌঁছলাম যখন আউলি, তখন সূর্যদেব মধ্যগগনে। আকাশ ঘন নীল। ওক পাইনের সবুজ বনানী, পাহাড়ের ঢাল, যেদিকে তাকাই শুভ্র বরফের চাদরে চারিদিক ঢাকা। সমস্ত চরাচরকে বড়ই স্নেহছায়ায় প্রহরীদের মতই যেন আগলে রেখেছে কামেট, মানা, হাতি, ঘোড়ই, ব্রহ্মকমল শৃঙ্গরাজি। একদম ওপাশে অপরূপা নন্দাদেবি।
সহযাত্রীদের অবশেষে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়ল। আমরা জিএমভিএন টুরিস্ট লজে গাড়ি ভেড়ালাম। পারকিং লট বরফে ভর্তি প্রায়। কোনোরকমে মালপত্র সহ বামাল আমরা বেমালুম ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে লজের স্বাছছন্দে সেঁধিয়ে গেলাম।
দেবভূমি গাড়োয়াল হিমালয়ের চামোলি জেলায় আউলির অবস্থান। আসলে আউলি হল বুগিয়াল বা ইংরেজিতে যাকে বলে Meadow. বিস্তীর্ণ পাহাড়ের ঢাল জুড়ে সবুজ তৃণভূমি। এখানেই অঞ্চলের মানুষজন ভেড়া চড়ায় গরমকালে। এখন অবিশ্যি পুরোটাই প্রায় বরফে ঢাকা।




এবার টুরিস্ট লজ ও তার আশেপাশে একটু “কালটিভেট” করা যাক লালমোহনবাবুর ভাষায়। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে অনেকখানি অংশ জুড়ে বেশ বড়সড় সরকারি আশ্রয়স্থল। বিদেশীরা আসেন বলে লাক্সারির ব্যাবস্থাও ভালই। মূল বিল্ডিং এর ওপর, তারও ওপর পর পর অনেক কটেজ। সবকটির ছাদে, দরজার সামনে স্তূপাকৃতি বরফ। সিঁড়ি উঠে গেছে কটেজের পাশ দিয়ে একদম ওপর পানে। সিঁড়ির ধাপে বরফ মাড়িয়ে ওপর দিকে যত উঠছি, পরের পর তুষারশৃঙ্গ যেন গলা জড়াজড়ি করে আমাদের দিকে আরও উদ্ভাসিত হতে রইল। প্রায় দশতলার উচ্চতায় প্রানান্তকর হাফিয়ে যখন উঠলাম, সেই শেষ ধাপে রয়েছে চেয়ার কেবল কার ছাড়ার জায়গা। এখান থেকে চেয়ার কেবল কার বা চেয়ার লিফটে চড়ে দশ নম্বর টাওয়ার অবধি যাওয়া যায়। সেখান থেকে মেন রোপওয়ে যাতায়াত করছে জোশিমঠ অবধি। চেয়ার লিফট স্টেশনের পাশে সেই গন্তব্যেই এক পাহাড়ি ঢাল বরফের চাদর মোড়া। শিক্ষানবিশি স্কির শুরুয়াত এখানেই। বেশ কয়েকজন দেখলাম অনুশীলন করতে ব্যাস্ত।






চেয়ার লিফট স্টেশনের এপাশ দিয়ে বরফে ঢাকা আরও এক সিঁড়ি পথ উঠে গেছে নন্দাদেবি টেম্পলের দিকে। গুটি গুটি পায়ে বরফ মাড়িয়ে ওপরে উঠে মন্দিরে পৌঁছে অপার বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। স্বর্গ কি তাহলে এখানেই আছে? চারিদিকে এক আশ্চর্য নিস্তব্ধতা। মন্দিরে তখন চলছে নন্দাদেবির সান্ধ্য আরাধনার প্রস্তুতি। প্রবল হাওয়ায় লাল শালুগুলো পত পত করে তখন উড়ছে। আর সামনে বাম থেকে ডাইনে প্রায় ১৮০ ডিগ্রি জুড়ে ধ্যানমগ্ন তুষারশৃঙ্গের সারি। কামেট পর্বত, মানা পর্বত, হাতি পর্বত, ব্রহ্মকমল শৃঙ্গ আরও ওদিকে স্বয়ং নন্দাদেবি শৃঙ্গ একেবারে চোখের সামনে উদ্ভাসিত। আসন্ন সন্ধ্যার অস্তগামী অরুণদেবের রাঙা আলোয় সমগ্র চরাচর যেন সত্যিই স্বর্গীয় রঙিন। মৃদু স্বরে মন্দিরের মাইক্রোফোনে শুরু হল সুরেলা সান্ধ্য আরতির স্তোত্র সুর। সামনে সুবিশাল হিমালয়, প্রবল ঠাণ্ডা হাওয়া, কনে দেখা আলোয় রাঙা দিকচক্রবাল, আবহে আরতির সুর… কেমন যেন ঘোর লাগে মনে… কোথায় রাজনীতি দুর্নীতি সঙ্কীর্ণতা… নিজেকে এই বিশাল প্রকৃতির মাঝে এতো ক্ষুদ্র মনে হয়… আমার মাথা নত করে দাও, হে প্রভু। তোমার চরণধুলার তলে।




পরদিন প্রত্যুষে এক অপূর্ব সূর্যোদয় দিয়ে দিন শুরু হল। হোটেলের ঘরের কাঁচের জানলা দিয়ে তুষারশৃঙ্গমালা দৃশ্যমান। তাও আমরা বাইরে একটা ছোট বারান্দায় চলে এলাম। পায়ের তলায়, বারান্দার কার্নিশে, রেলিঙে বরফ জমে আছে। সামনে উদ্ভাসিত পর্বতমালা। ক্রমশ অন্ধকার থেকে আলোয়, আবছা লাল থেকে তীব্র লাল এবং তারপর গলানো সোনা হয়ে একে একে শৃঙ্গগুলি নিজেদের মেলে ধরছে। ওপরের নন্দাদেবি মন্দিরে সকালের আরাধনা শুরু হয়ে গেছে। সমগ্র চরাচর জুড়ে আবহে সেই বন্দনা, ধ্যানমগ্ন অসীম হিমালয়ের প্রতি। একেবারে সামনে ব্রহ্মকমলের শীর্ষের প্রথম অরুণ আলোয় নন্দাদেবি সহ সমস্ত শৃঙ্গগুলির আলোকছটায় আউলি আলোকিত হয়ে উঠল। বারান্দায় রোদ্দুর। স্কি নয়, সাইট সিইং নয়। দেখি অলস ভ্রমনে আজ কোনদিকে যাই।


আমাদের লজের বাঁদিকে পারকিং লট ছাড়িয়ে আরও ওপাশে বেশ কয়েকটা হলুদ রঙা টেনট রয়েছে। সেখানেও টুরিস্টের থাকার ব্যাবস্থা। সদ্য সকালের সোনালী রোদে চারপাশের বরফে, সবুজ পাইনের বনের সামনে তাঁবুগুলো যেন ঝলমল করছে।




এর পাশ দিয়েই ওপরের চেয়ার লিফট স্টেশন যাবার সিঁড়ি। সকাল সকাল চলে এলাম চেয়ার লিফটের স্টেশনে। পরের পর চেয়ার চলেছে অটোমেটিক চালিত হয়ে আরও ওপর পানে পাহাড়ি বরফের ঢাল পেরিয়ে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে ১০ নম্বর টাওয়ারের দিকে। চারজন করে এক একেকটি চেয়ারে সর্বাধিক বসতে পারেন। সামনে হাতল লাগিয়ে দেবার পর নাগরদোলার মতন দুলে দুলে যেন শুন্যে উঠতে লাগলাম। চারদিকে উত্তুঙ্গ হিমালয়, মাথার ওপর ঘন নীল আকাশ, যেদিকে তাকাই ঝক ঝক করছে সকালের রোদে প্রতিফলিত শ্বেতশুভ্র তুষার। আর আমরা অসীম মহাকাশে ভেসে চলেছি। সে এক আশ্চর্য সুন্দর ভয়ংকর রোমাঞ্চকর শুন্যযাত্রা। যথারীতি সঙ্গীসাথীদের মুখ ফ্যাকাসে সাদা। তাদেরকে প্রায় জাপটে ধরে ছেলে ভোলানোর মতন করে আগলে এগিয়ে চললাম। বলা উচিত ভেসেই চললাম প্রায় মহাশুন্যে। পায়ের তলায় অনেক নিচে খাদের ঢাল। যেন বরফের চাদর মেলা রয়েছে। নিচে তাকালেই বুকের মধ্যে শির শির করছে। দূরের নন্দাদেবি যেন অবাক হয়ে আমাদের দিকে আরও এগিয়ে আসছেন। মিনিট পাঁচেকের পথ। আমরা উঠে এলাম আরও ওপরে আদ্যন্ত তুষারাবৃত আরেক পাহাড়ি ঢালে। এখানেই আসল স্কেটিং এর আসর বসে।


সাদা সাদা আর সাদা। সকালের রোদে ব্ররফ সাদায় যেন চোখ ঝলসে যাচ্ছে। অনতিদূরে সামনে এক কৃত্রিম জলাশয়। এখানে থেকেই সারা আউলিতে জল সরবরাহ করা হয়। জলের থেকে জমা বরফই বেশি। সেখানে নন্দাদেবির প্রতিবিম্ব। আরও দূরে ১০ নম্বর টাওয়ার। জোশিমঠ থেকে আসল রোপওয়ে এই অবধি যাতায়াত করছে। সেখান থেকে আবার বেশ কিছুটা বরফ মাড়িয়ে পিছলে এসে তারপর এই চেয়ার লিফট। যা নিয়ে যাবে সরকারি টুরিস্ট লজ অবধি। যদি পথ বন্ধ থাকে, তবে এটাই হল বিকল্প রাস্তা। ইষ্টনাম জপে নিলাম। এইটুকু রোমাঞ্চই সঙ্গীদের সহ্য হছছেনা। যদি সত্যিই গতকাল আমাদের এইভাবে রোপওয়েতে করে ঐ দূরের টাওয়ারে নেমে তারপর মালপত্র নিয়ে বরফে আছাড় খেতে খেতে এসে ফের ঐ চেয়ার লিফটে করে লজে যেতে হত তাহলে সহযাত্রীদের প্রতিক্রিয়া যে আমার প্রতি কেমন হত সেটা ভেবেই শিউরে উঠছি।
ধ্যুর, এসব মধ্যবিত্ত ভাবনা এখন থাক। দেবতাদের দেশে এসে পড়েছি। সেই স্বর্গীয় সৌন্দর্যে আপাতত অবগাহন করি।



নন্দাদেবির ছায়া ছোট্ট জলাশয়ে। আরও দূরে বরফের মাঝে আরেকটি রিসোর্ট। ক্লিফটপ। ওখানে থেকে যেন নন্দাদেবিকে হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। আরও ওপরে আরও একটি ঢালে অনেক দেশি বিদেশি টুরিস্ট স্কি করতে মত্ত। সেটা ছাড়িয়ে আরও দূরে গরসন বুগিয়াল। যদিও এখন বরফে ঢাকা সবই। কয়েকদিন পর বরফ সরলে সবুজ প্রকৃতি আঁচল বিছিয়ে দেবে সমস্ত চরাচরে। সেও আরেক নেশা ধরানো রূপ আউলির।
সবাই বরফ ছোঁড়াছুড়ি আর স্কি খেলায় বড়ই ব্যাস্ত। কেমন যেন ঘোর লাগা চারপাশ। চতুর্দিকে প্রহরী হয়ে অজস্র তুষার শৃঙ্গমালা। সামনে অপরূপা নন্দাদেবি। 

দূরের সবুজ পাইনবন। যতদূর চোখ যায় শুধু বরফ বরফ আর বরফ। স্বর্গরাজ্য কি একেই বলে? সুইটজারল্যান্ড কি এর থেকেও সুন্দর? কি জানি? চিতপাত হয়ে শুয়ে পড়ি সামনের পাথরের চাতালে। মাথার ওপর দিয়ে ঘন নীল আকাশ পেরিয়ে এক কেবল কার ফিরে চলেছে জোশিমঠের দিকে। দেবভূমিতে দেবতাদের কোলে শুয়ে পরম শান্তি পাই, আরামে আলস্যে আউলিতে। দিন কেটে যায়, স্বপ্নের মায়ায়।




প্রয়োজনীয় তথ্য – হরিদ্বার থেকে বাস বা গাড়িতে জোশিমঠ। এখানে থেকে রোপওয়ে করে আউলি ঘুরে আসা যায়। তবে প্রকৃত রূপে মজতে হলে দুরাত আউলিতে থেকে যান। থাকার জন্য বাজেটের মধ্যে

জিএমভিন টুরিস্ট লজ। মার্চ মাস অবধি জোশিমঠের মন্দিরে বদ্রিনাথের বিগ্রহ রাখা হয়। ঐ সময় গেলে বরফ আর বদ্রিবিশাল, দুটোই উপরি পাওনা।



1 Comment

  1. very nice

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement