Ajodhya Hill and Mesmerizing Murguma in Purulia

Ajodhya Hill and Mesmerizing Murguma in Purulia

অযোধ্যা পাহাড় ও মনোরম মুরগুমা

পাহাড়ের কোলে এক মোহময়ী লেক ও বাঁধ। জঙ্গলময় সবুজ পাহাড়ে ঘেরা বিশাল নীল জলরাশি। বাঁধের উপর লাল মাটির রাস্তা। কাছেই একটি আদিবাসী গ্রাম। প্রকৃতি, বুনো গন্ধ ও একরাশ প্রশান্তির মেলবন্ধনে, পুরুলিয়া জেলায় অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে মুরগুমা। ড্যামের ৩০০মিটারের মধ্যে থাকার জন্য দুটি ইকো রিসর্ট। তারই একটা ‘পলাশ বিতান’। সাদামাটা একতলা কটেজের বারান্দায় চেয়ার নিয়ে বসে সামনের পলাশ গাছটা ও তার পিছনের পাহাড়টার শোভা দেখছিলাম। দুটি গাছে ফোটা পলাশের লালিমা বসন্তের আগমন জানান দিচ্ছে। রিসর্টের চারদিকেই পাহাড়ে ঘেরা। বড়ই শান্ত ও নিরিবিলি পরিবেশ মুরগুমার। কটেজের একটু উপরে, রিসর্টের বাইরের রাস্তা দিয়ে চলা গরুর গলার ঘন্টাধ্বনি কানে আসছে মাঝে মাঝে। অযোধ্যা পাহাড়ের আনাচে কানাচে ঘুরে, একটু আগে দুপুরে এসে পৌঁছেছি মুরগুমায়। এ বছর শীতের লম্বা ইনিংসে বসন্ত যেন এখনও ঠিক মাথা তুলতে পারছে না। তাই ফেব্রুয়ারির তৃতীয় সপ্তাহেও বেশ ঠান্ডা আবহাওয়া দিনের বেলাতেও।

‘পলাশ বিতান জাঙ্গল হাট’, মুরগুমা – ফুটে থাকা পলাশের লালিমা বসন্তের আগমন জানান দিচ্ছে

 বরাভুম থেকে যাত্রা শুরু

গতকাল হাওড়া থেকে রাত ১১টা ৫ এর আদ্রা-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে চেপে সকাল সোয়া ৭ টায় নামি বরাভুম স্টেশনে। পুরুলিয়া ছাড়িয়ে বরাভুম স্টেশন। জায়গাটা আসলে বলরামপুর। এখান থেকেই আমাদের এবারের পুরুলিয়া সফর শুরু। স্টেশনের বাইরেই ছৌনাচের কিছু মূর্তি বানানো, যা পুরুলিয়ায় আমাদের স্বাগত জানায়। আগে থেকে গাড়ি বলা ছিল বরাভুম স্টেশনে। কথা হয়েছিল যে সে গাড়িই আমাদের প্রথমে সাইট সিয়িংয়ে অযোধ্যা পাহাড় ঘুরিয়ে পৌঁছে দেবে মুরগুমায়। বলরামপুর থেকে বাঘমুন্ডির রাস্তায় গাড়ি ছুটল। প্রথম গন্তব্য ‘পাখি পাহাড়’, মিনিট কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে গেলাম। মূল রাস্তা থেকে দেড় কিমি ভিতরে, শালের জঙ্গলে ঢাকা পাখি পাহাড়। একজন বিশিষ্ট ভাস্কর চিত্ত দে ও তাঁর টিম নিরলস প্রচেষ্টায় পাথরের গায়ে খোদাই করে সমগ্র পাহাড় জুড়ে অসংখ্য পাখি ফুটিয়ে তুলেছেন। শিল্পির ছোঁয়ায় একটা গোটা পাহাড় আজ ভাস্কর্য্যের রূপ পেয়েছে। পাখি পাহাড়ের উপরের অংশের খোদিত পাখি গুলি চোখে পড়ে বহু দূর থেকেই। পাখি পাহাড়ের গায়ের পাখির ছবি দেখতে দেখতে নিচের গাছগাছালিতে অনেক পাখির কিচির মিচির – সকালের সুন্দর পরিবেশে মন ভরিয়ে দিল। পাহাড়ের নিচে কয়েক ঘর নিয়ে একটা ছোট্ট গ্রাম। সেখানে পর্যটকদের থাকার জন্য হোম স্টের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।

পাখি পাহাড় – শিল্পীর ভাস্কর্যে পাহাড়ের গায়ে ফুটিয়ে তোলা পাখির চিত্র

এরপর মূল সড়কে এসে পথে পড়ল ‘মাঠা’। মাঠা বুরু পাহাড়ের নিচে। রাস্তার বাঁদিকে মাঠা ফরেস্ট। থাকার জন্য মাঠায় বেশ কিছু হোটেল, রিসর্ট ও টেন্টের ব্যবস্থা হয়েছে। মাঠা বুরুর পর কুকু বুরু পাহাড়। এসবই অযোধ্যার পাহাড় শ্রেণী। এরপর সোনকুপি গ্রাম। একটু এগিয়ে সোনকুপি কাফেতে গাড়ি থামালাম ব্রেকফাস্টের জন্য। পথের পাশের এই কাফে এরাস্তায় একমাত্র বড় খাবারের জায়গা। রাতের ট্রেন জার্নির ক্লান্তি কাটাতে একটু ফ্রেশ হয়ে নিয়ে, গরম গরম রুটি তরকারি দিয়ে প্রাতরাশ সেরে আবার যাত্রা শুরু। বাঘমুন্ডির আগেই অযোধ্যা মোড় থেকে ডানদিকে ঘুরলাম বাড়রিয়ার দিকে। অযোধ্যা পাহাড়ে ওঠার মূলত তিনদিক দিয়ে পথ। এক, পুরুলিয়া থেকে সিরকাবাদ হয়ে। দুই, বরাভুম থেকে এই বাঘমুন্ডি, বাড়রিয়া হয়ে। তিন, ঝালদা/ বেগুনকোদর থেকে মুরগুমা হয়ে। অযোধ্যা পাহাড়ের মূল দ্রষ্টব্যগুলি এই বাঘমুন্ডি/ বাড়রিয়ার দিকে পাহাড়ের ঢালেই। অযোধ্যা পাহাড়ের নিচে এই বাড়রিয়ায় অনেক হোটেল ও লজ হয়ে গেছে থাকার জন্য। পাহাড়ে ওঠার ঠিক মুখে ‘লোহারিয়া ড্যাম’। পিকনিক স্পট। জলাধারের পাড়ে দাঁড়িয়ে অনেক ট্যুরিস্ট বাস।

অযোধ্যা পাহাড়ে ওঠার মুখে লোহারিয়া ড্যাম

অযোধ্যা পাহাড়ে ঘোরাঘুরি

এবার অযোধ্যা পাহাড়ে ওঠা শুরু। দু একটি বাঁক নিয়ে গাড়ি খানিকটা ওঠার পরই নিচে লোহারিয়া ড্যাম ও বিস্তীর্ণ সমতলের দৃশ্য বেশ লাগল ওপর থেকে। আরো কয়েক মিটার উঠেই পথের বাঁপাশে নিচে দেখা গেল ‘লোয়ার ড্যাম’এর জলাধার। নিচে সবুজ জঙ্গলে ঢাকা পাহাড়ের মাঝে নীল জলরাশির দৃশ্য অনবদ্য । পাহাড়ের উপর দেখা যাচ্ছে ‘পিপিএসপি’র সাবস্টেশন। ‘পুরুলিয়া পাম্প স্টোরেজ প্রোজেক্ট’ (PPSP) এর দুটি ড্যাম ও জলাধার – লোয়ার ও আপার। অযোধ্যা পাহাড়ের ঢালে জাপানী সহযোগিতায় নির্মিত এই পাম্প স্টোরেজ ইউনিট এক বিশেষ ধরণের জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। এমনিতে বৃষ্টির জল জমে জলাধারগুলিতে। দিনের বেলায় নিচের জলাধার বা লোয়ার ড্যাম থেকে পাম্প করে জল তোলা হয় উপরের জলাধার বা আপার ড্যামে। সন্ধ্যেয় যখন বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে, তখন আপার ড্যামের জল ছাড়া হয়। লোয়ার ড্যামের দিকে নিচে পড়তে থাকা সেই জলের ফোর্সকে কাজে লাগিয়ে টারবাইন ঘুরিয়ে তৈরি হয় বিদ্যুৎ। বেড়াতে গিয়ে আবার একটু ইঞ্জিনিয়ারিং জ্ঞান হয়ে গেল। কিন্তু কি করি, ঐ যে বলে স্বভাব যায় না মলে, থুরি বেড়াতে গেলেও।

পাহাড়ের কোলে PPSP র লোয়ার ড্যাম ও পাহাড়ের মাথায় Substation

PPSP র আপার ড্যাম

পাহাড়ি পাকদন্ডি রাস্তায় আরো খানিক উঠে এবার পথের পাশে পড়ল ‘আপার ড্যাম’ ও তার বিশাল জলরাশি। ছোটনাগপুর মালভূমির পূর্ব প্রান্তে, পাহাড়, জঙ্গল, ঝর্ণা, লেক, ড্যাম ও তার সাথে প্রযুক্তি নিয়ে অযোধ্যা পাহাড় অনবদ্য। অযোধ্যা পাহাড়ের উচ্চতা প্রায় ১৯০০ ফুট। সর্বোচ্চ শৃঙ্গ চামতাবুরু, ২৩০০ফুট। ১৬ বছর আগের দেখা অযোধ্যা পাহাড়ের, বিশেষত রাস্তাঘাটের, অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ছে। আজ পর্যটকের আনাগোনা অনেক বেড়েছে। এরপর আমাদের গন্তব্য ‘বামনি ফলস’। হিল টপের দিকে উঠে যাওয়া রাস্তা ছেড়ে, বাঁদিকের রাস্তা ধরে চলতে থাকল গাড়ি বামনি ফলসের দিকে। আমাদের গাড়ির ড্রাইভার লাল্টু নাকি কদিন আগে ট্রাক চালাত। কিন্তু এতক্ষণ গাড়ি চড়ে বুঝেছি, যে কদিন আগে ট্রাক চালালেও বেশ ভালই চালায় সে গাড়িটা । আর মানুষটাও সে ভালই, অনেক সহজ। জঙ্গলাকীর্ণ রাস্তাটির অনেকখানি এবড়ো খেবড়ো, পিচ ওঠা। এ রাস্তাটিও বাঘমুন্ডির দিকে নেমে গেছে। প্রায় ৪-৫ কিমি গিয়ে এক জায়গায় জঙ্গলের মাঝে কিছু দোকানপাট। গাড়ি থামল। এখান থেকেই হাঁটা পথে অনেকটা নিচে জলপ্রপাত। পাথুরে খাড়াই নামার পথটি। পাথরের উপর সাবধানে পা ফেলে নেমে চললাম জলপ্রপাত দেখতে। লাল্টুও চলে এসেছে আমাদের সাথে, পথ দেখাতে ও পাথুরে রাস্তায় সাহায্য করতে। জঙ্গলে ঢাকা বামনি জলপ্রপাত। প্রপাতের জলের ধারায় অনেকে স্নান সারছে সেখানে। জলের ধারা আরো অনেক নিচে পড়ে তৈরি হয়েছে একটি ছোট লেক। উপর থেকে গাছের ফাঁক দিয়ে নিচের লেকের নীল জলের দৃশ্য। ফলস দেখে আবার খাড়াই পথ বেয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে উঠে এলাম গাড়ির রাস্তায়। এর পরের দ্রষ্টব্য ‘মার্বেল লেক’। মার্বেল পাথরের প্রাচীরের মাঝে একটি ছোট লেক। আসলে এটা একটা পাথরের খাদান। মার্বেল পাথরের দেওয়ালের প্রেক্ষিতে নীল জলরাশি এক সুন্দর ছবির সৃষ্টি করে। এবার হিল টপের রাস্তায় গাড়ি ছুটল। অযোধ্যার মাথায় ১৯০০ ফুটে ‘হিল টপ’ জায়গাটি একেবারে সমতল। হিল টপে রয়েছে সরকারি আবাস, বেসরকারি হোটেল, লজ, দোকানপাট, আশ্রম সব। আগেরবার এসে অযোধ্যা হিল টপেই ছিলাম। এবার অবশ্য থাকার জন্য বেছে নিয়েছি অফবিট মুরগুমাকে। হিল টপের কাছেই ‘ময়ুর পাহাড়’। পাহাড়ের উপর আরেকটি পাহাড়, যার উপর থেকে সমগ্র অযোধ্যা পাহাড় শ্রেণী ও নিচের জঙ্গলের অসাধারণ ভিউ পাওয়া যায়।

বামনী জলপ্রপাত, অযোধ্যা পাহাড়

মার্বেল লেক, অযোধ্যা পাহাড়

ময়ুর পাহাড়ের উপর থেকে অযোধ্যার পাহাড় শ্রেণী ও জঙ্গল

এবার মুরগুমা

দুপুর গড়িয়ে এসেছে। এবার সকালের প্রাতরাশ হজম হয়ে পেটে ছুঁচোদের কীর্তন। অতএব এবার মুরগুমার পথ ধরলাম। কারণ সেখানে আমাদের জন্য লাঞ্চ অপেক্ষা করছে। ময়ুর পাহাড় থেকে মুরগুমা ১৭ কিমি। দু একটি আদিবাসী পাহাড়ি গ্রাম পেরিয়ে ধীরে ধীরে নামতে থাকে রাস্তাটি। পাহাড় থেকে নামার আগে একটা বাঁক ঘুরেই নিচে চোখে পড়ল নয়নাভিরাম মুরগুমা ড্যাম। উপর থেকে জলাধার ও পাহাড়ের দূর্দান্ত এক ভিউ। মুরগুমার প্রথম দর্শনেই মন একরাশ ভাল লাগায় ভরে উঠল। ধীরে ধীরে আরো নিচে নেমে গাড়ি চলে এল পাহাড় ঘেরা মোহময়ী এক লেকের পাড়ে। কি অদ্ভুত সুন্দর এক জায়গায় চলে এসেছি! এখানেই যে থাকব, সেটা ভেবেও দারুণ লাগছিল। ড্যাম পেরিয়ে পৌঁছে গেলাম আগে থেকে বুক করে রাখা ‘পলাশ বিতান জাঙ্গল হাট’এ।

অযোধ্যা পাহাড় থেকে নামার পথে মুরগুমা লেকের দৃশ্য

অযোধ্যা পাহাড়ের পাদদেশে মোহময়ী মুরগুমা

শেষ দুপুরে লাঞ্চ সেরে সামান্য বিশ্রামের পরই বিকেল হয়ে গেছে। সবাইকে ডেকে বেরোলাম ড্যামের পাড়ে যাওয়ার জন্য। পাহাড়ঘেরা এক উপত্যকায় এই মুরগুমা, বিকেলের পড়ন্ত আলোয় বড়ই মায়াবী লাগছে। পিচ রাস্তা ধরে মিনিট দুয়েক হেঁটেই সামনের পাহাড়টার নিচে। তারপর কয়েক মিটারের মধ্যেই মুরগুমা লেকের জলরাশি। পাহাড়ঘেরা মুরগুমা লেকের মোহময়ী রূপ দেখে মুগ্ধ হতে হয়। কংসাবতী নদীর শাখা নদীর উপর নির্মিত এই মুরগুমা ড্যাম ও লেক, ‘সাহারাজোর ইরিগেশন স্কিম’এর অধীন।

পড়ন্ত আলোয় মায়াবী মুরগুমা, পূর্বাকাশে উদিত চাঁদ

শেষ বিকেলে মুরগুমা লেক ও জঙ্গলময় পাহাড় – ঘরে ফেরার পথে একাকী অবলার তৃষ্ণা নিবারণ

বাঁদিকের পাহাড়টার উপর দিকে বড় বড় পাথর। ভাল করে ঠাহর করে চোখে পড়ল পাহড়ের উপরের দিকে অনেক হনুমান। তারা এ পাথর থেকে সে পাথর লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। পাহাড়টার একেবারে শিরে আছে একটি মন্দির। শেষ বিকেলে রাস্তায় অনেক গরুর পাল। শ’য়ে শ’য়ে গরু। কয়েকজন গ্রাম বাসী তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে ফিরে চলেছে গ্রামের পথে। ড্যামের নিচে নেমে যাওয়া রাস্তায় মুরগুমা গ্রাম। সূর্য পশ্চিমাকাশে ঢলে পড়েছে। ড্যামের জলে তার রঙ লেগেছে। আবার পূর্বাকাশে এসময় গোলাকৃতি চাঁদও উঠেছে। পড়ন্ত সূর্যের বিকিরিত কিরণ চারপাশের ঘিরে থাকা পাহাড়ের প্রাচীরে প্রতিফলিত হয়ে এই স্থানকে যেন আরো বর্ণময় করে তুলেছে। ড্যামের ওপারে বড় পাহাড়টাই অযোধ্যা। ড্যামের উপর থেকে এক অসাধারণ সূর্যাস্ত প্রত্যক্ষ করলাম। পাহাড়ের পিছনে আলোর ছটা ছড়িয়ে ও লেকের জলে তার কিছুটা রঙ লাগিয়ে অস্ত গেল সূর্য এদিনের মত।

মুরগুমায় সূর্যাস্ত

মুরগুমায় সূর্যাস্ত

সন্ধ্যের মুখে মানুষজন তাদের দৈনন্দিন জীবনের কাজ সেরে ফিরে চলেছে গ্রামে। কেউ গরু চড়িয়ে, কেউ বা জঙ্গল থেকে কাঠকুটো, গাছের পাতা সংগ্রহ করে। ড্যামের উপর থেকে গ্রামের দিকে এঁকে বেঁকে চলা রাস্তায় গরু নিয়ে মানুষজনের ফিরে চলা দেখতে লাগলাম। কয়েকজন আদিবাসী মহিলা মাথায় গাছের ডালপালা নিয়ে ড্যামের উপরের লালমাটির রাস্তা দিয়ে চলে গেল অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে। এসব অঞ্চলে গ্রামের মানুষজনের জীবন এরকমই। এরা গরীব। কিন্তু বাইরে থেকে বেড়াতে আসা মানুষজনকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা করতে তাদের কোন বাধা নেই। মুরগুমা শান্ত, নিরিবিলি। কিন্তু একই সাথে প্রাণোচ্ছ্বল। সেই সাথে বিশুদ্ধ প্রকৃতির খোঁজ মেলে এখানে। সূর্য ডোবার সাথেই ঠান্ডাটা মালুম হচ্ছিল বেশ। আলো কমে আসায় রিসর্টে ফেরার পথ ধরলাম। রিসর্টে যখন ফিরলাম, তখন চাঁদ প্রায় মাথার উপর। জ্যোৎস্নালোকে আলোকিত মুরগুমা। কিন্তু বাইরে কনকনে ঠান্ডা। সেই সাথে খোলা প্রান্তরে কনকনে বাতাস বইছে। তাই ঘরে সেঁধোতে হল।

মুরগুমা গ্রামের যাবার রাস্তা

সন্ধ্যার মুখে ঘরে ফেরার পালা, মুরগুমা ড্যাম

একটু বাদেই ঘরে পৌঁছে গেল মুড়ি-চানাচুর আর পকোড়া। সেসব উদরস্ত করে রুম হিটার চালিয়ে কম্বলের তলায় ঢুকলাম। রাতে ডিনারে পাশের টেবিলে বসা পর্যটকের কাছে শুনলাম যে তারা আমাদেরও পরে সন্ধ্যায় যখন রিসর্টে ফিরছিল, তখন সামনের পাহাড় থেকে একদল শেয়ালকে নেমে আসতে দেখেছে। এখানকার একজন কর্মীও জানাল যে গতকাল শেয়াল এই কম্পাউন্ডে ঢুকে মুরগী নিয়ে চলে গেছে। ডিনারে ছিল রুটি, বেগুন ভাজা, ফুলকপি, চিকেন ও শেষ পাতে গ্রামের দোকানের রসগোল্লা। শুনলাম এখানে বাজার ৪-৫কিমি দূরে বেগুনকোদরে। ডিনারের পর রিসর্টের গেটের কাছে গিয়ে দেখলাম বাইরে শুনশান নিস্তব্ধ পাহাড় ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। জ্যোৎস্নারাতে আলো-আঁধারির মায়াজালে যেন এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে সমগ্র প্রান্তর জুড়ে।

মুরগুমা ড্যাম

মুরগুমায় একটি সকাল

পরদিন সকালে উঠে আবার নতুন করে ভাল লাগা মুরগুমাকে। শুনেছিলাম সূর্যোদয়ও এখানে দেখার মত। কিন্তু এত ঠান্ডায় ও আলস্যে সেটা আর এযাত্রায় দেখা হল না। যখন ড্যামের দিকে যাবার জন্য বেরোলাম, তখন সূর্য অনেকটাই উঠে গেছে। সকালেও রাস্তায় অনেক গরুর পাল। সেই সাথে ভেড়ার পালও। গ্রাম বাসীরা চড়াতে নিয়ে বেরিয়েছে। বড় বড় পাথরওয়ালা পাহাড়টার কাছে এসে দেখি কাল বিকেলে দেখা হনুমানের দল পাহাড় থেকে নেমে এসেছে নিচের দিকে। নিচের গাছগুলিতে তাদের দাপাদাপি। ড্যামের উপরও গোটা চারেক হনুমান। আমাদের আসতে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে। তারপর সন্তর্পণে লেকের পাড়ের রাস্তার একটু নিচ দিয়ে আমাদের পার হয়ে দৌড়ে উঠে গেল পাহাড়ের দিকে। কাল বিকেলে ড্যামে কিছু পর্যটক সমাগম হলেও আজ সকালে একেবারেই নিরিবিলি। কখনও কদাচিৎ এক আধটা গ্রাম্য মানুষজন চোখে পড়ছে। সকালের আলোয় বড়ই মোহময়ী দেখাচ্ছে মুরগুমাকে। বিশুদ্ধ প্রকৃতির মাঝে ড্যাম ও জলাধারের অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য প্রাণ ভরে উপভোগ করতে লাগলাম সকালের নরম আলোয়। লেকের জলে অনেক জলজ পাখির সম্ভার। এখানকার বাতাসে কোন দুষণ নেই, আছে এক বুনো গন্ধ, যা আমার মত শহুরে মানুষকে দুদিনের জন্য এলে তাজা করে দেয়। ক্লান্ত জীবনে একটু টাটকা বাতাস যোগায়। ড্যামের কাছেই একটা ‘সিআরপিএফ ক্যাম্প’। ড্যামের উপরের রাস্তা ধরে কয়েকজন সিআরপিএফ জওয়ান বন্দুক হাতে অযোধ্যা পাহাড়ের দিকে চলে গেল, কোন রুটিন ডিউটিতে, আমাদের দিকে হাসিমুখে অভিবাদন জানিয়ে। এসবই একসময়ের অশান্ত পরিবেশের কথা মনে করিয়ে দেয়। আজ যদিও জঙ্গল মহলে শান্তি ফিরেছে, আর তার ফলেই পুরুলিয়া সহ আশপাশ পর্যটনের সম্ভারে সেজে উঠেছে। আর মুরগুমাতে এলে তো মনে হয়, এমন এক স্বপ্নময় স্থানে চলে এসেছি, যেখানে শুধুই সবুজ আর শুধুই শান্তি।

সকালের আলোয় মুরগুমা, জলে অনেক জলজ পাখির সম্ভার

মুরগুমা লেকে পাহাড়ের প্রতিবিম্ব

এবার নিচে নেমে লেকের পাড়ে গেলাম জলকে ছুঁতে। লেকের জলে দু একজন স্নান করছে। টলটলে নীল জল। তাতে সামনের তিনদিকের পাহাড়ের প্রতিবিম্ব। এবার মূল রাস্তায় না গিয়ে একটু শর্টকাট চড়াই উৎরাই পথে খুব তাড়াতাড়ি রিসর্টের সামনে পৌঁছে গেলাম। লুচি-তরকারি, ডিম সেদ্ধ, আপেল ও রসোগোল্লা দিয়ে জম্পেশ ব্রেকফাস্ট। তারপর কম্পাউন্ডে একটু ঘোরাঘুরি। কম্পাউন্ডের ভিতরে দুটি গাছ লাল পলাশ ফুলে ভরে উঠেছে। গাছের নিচে ছড়িয়ে আছে অনেক পলাশ ফুল। বাইরে একটু তফাতে একটা তিনকোণা পাহাড়ের সামনের দু একটি গাছেও পলাশ এসেছে। ‘পলাশ বিতান’এর কম্পাউন্ডের ভিতর ও বাইরে অনেক পলাশ গাছ, যাতে ফুল আসার অপেক্ষা। এখন সময়টা শীতের শেষ, আর বসন্তের শুরু। যদিও এবছর শীতটা অনেকদিন আরো থাকতে চাইছে। আরো দু তিন সপ্তাহ পরে বোধহয় বসন্ত পুরোপুরি দখল নেবে, আর পুরো এলাকাটা পলাশের রঙে রাঙিয়ে লালে লাল হয়ে উঠবে তখন।

পলাশ এসেছে মুরগুমায়

ফেরার পথে দেউলঘাটা

আজ দুপুরেই কলকাতা ফেরার ট্রেন পুরুলিয়া থেকে। গাড়ির ড্রাইভার লাল্টুকে যথা সময়ে চলে আসতে বলেছিলাম গাড়ি নিয়ে। গুছিয়ে নিয়ে এবার মুরগুমাকে বিদায় জানানোর পালা। আবার ফিরে আসার ইচ্ছে রইল এমন রমণীয় এই স্থানে। ড্যাম থেকে নেমে যাওয়া রাস্তা ধরে, মুরগুমা গ্রাম হয়ে গাড়ি চলল পুরুলিয়ার দিকে। অযোধ্যা ও মুরগুমার পাহাড়গুলো ক্রমশ দূরে সরে যেতে লাগল। কাঁচা বাডির পাশাপাশি পাকা বাড়িও চোখে পড়ল মুরগুমা গ্রামে। পুরুলিয়ার যেকোন গ্রামের মত এখানেও অনেক বাড়ির দেওয়াল নানা রঙে চিত্রিত। মুরগুমা গ্রাম ছাড়িয়ে পড়ল ‘বেগুনকোদর’। এখানে সব্জির খুব ভাল চাষ হ্য়। বেগুনকোদর থেকে একটি রাস্তা চলে গেছে ঝালদা ও মুরির দিকে। সেদিকে গেলে বেগুনকোদরের সেই কল্পিত ভৌতিক স্টেশন। অন্য রাস্তাটি চলেছে পুরুলিয়ার দিকে। ফেরার পথে আগে থেকেই ঠিক করা ছিল ‘দেউলঘাটা’ ঘুরে নেব। পুরুলিয়াগামী মূল রাস্তা ছেড়ে ৩-৪ কিমি ভিতরে ‘বড়াম’ গ্রাম হয়ে চললাম ‘দেউলঘাটা’।

দেউলঘাটার সুপ্রাচীন টেরাকোটা মন্দির

কাঁসাই নদীর ধারে সুপ্রাচীন কিছু মন্দিরের ঐতিহাসিক নিদর্শন। আজ অবশিষ্ট দুটি প্রাচীন মন্দির ও একটি পাতকুয়া। টেরাকোটার মন্দির গাত্রে অসম্ভব সুন্দর কারুকাজ। এছাড়া শিব মন্দির ও রাধা কৃষ্ণের মন্দির রয়েছে এখানে, যাতে পুজো হয়। আশেপাশের পাতা ঝড়া গাছগুলিতে অনেক মৌচাক চোখে পড়ল। পাশে কাঁসাই নদী। নদীর বুকে প্রস্তরখন্ড। এই কাঁসাই নদীর পাড়েই এবারের ভ্রমণ পর্ব সমাপ্ত। এবার পলাশ, কেন্দ ও মহুয়া গাছ দেখতে দেখতে সোজা পুরুলিয়া স্টেশন ও তারপর লালমাটি এক্সপ্রেস ধরে ফিরে চলা কলকাতার দিকে। মনে গেঁথে রইল এক অপরূপ পাহাড় ঘেরা লেকের নয়নাভিরাম দৃশ্য, গ্রাম্য মানুষগুলোর মুখ ও তাদের সরল জীবন যাত্রার কিছু ছবি আর বিশুদ্ধ প্রকৃতি ও বুনো গন্ধে ভরা মুরগুমার এক স্মৃতি।

কাঁসাই নদী, দেউলঘাটা

প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য

যাতায়াতঃ

হাওড়া থেকে রাতের আদ্রা চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার, সকালের রূপসী বাঙলা ও লালমাটি এক্সপ্রেসে (সপ্তাহে দুদিন) পুরুলিয়া। পুরুলিয়া থেকে গাড়িতে মুরগুমা দেড় ঘন্টা, ভাড়া ১১০০টাকা। অযোধ্যা ৮০০ টাকা, সিরকাবাদ হয়ে। আবার হাওড়া – রাঁচী ক্রিয়াযোগী এক্সপ্রেস বা শতাব্দী এক্সপ্রেসে মুরি নেমেও যাওয়া যায় আধঘণ্টায় মুরগুমায়। গাড়ি ভাড়া ৬০০-৮০০টাকা।
আবার অযোধ্যা পাহাড়ের সাইটসিয়িং করে বাঘমুন্ডির দিক দিয়ে অযোধ্যা পাহাড় বা মুরগুমা গেলে চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জারে বরাভুম স্টেশনে নামলে সুবিধে। অযোধ্যা পাহাড়ের সাইটসিয়িং করে মুরগুমা পৌঁছানর গাড়ি ভাড়া ২৫০০ টাকার মত।

দূরত্বঃ

পুরুলিয়া – অযোধ্যা হিলটপ (সিরকাবাদ হয়ে) ৩৫ কিমি
পুরুলিয়া – অযোধ্যা হিলটপ (বাঘমুন্ডি হয়ে) ৮০ কিমি
বরাভুম/ বলরামপুর – অযোধ্যা হিলটপ ৩৯ কিমি
পুরুলিয়া – মুরগুমা ৪৮ কিমি
মুরি – মুরগুমা ২২ কিমি

পলাশ বিতান জাঙ্গল হাট, মুরগুমায় থাকার জায়গা

থাকার জায়গাঃ

মুরগুমাতে – ‘পলাশ বিতান জাঙ্গল হাট’ (9674222675), ‘বন পলাশি ইকো হাট’ (9874361951)।
পলাশ বিতানের ৫জনের কটেজ, ভাড়া ১৫০০ টাকা ৩ জনের জন‍্য; অতিরিক্ত জনপ্রতি ৩০০ টাকা। খাওয়া জনপ্রতি ৫০০টাকা, একদিনের।
অযোধ্যা হিল টপে – CADCর সরকারী আবাস – ‘নিহারিকা’, ‘মালবিকা’ ও ‘বিভাবরী’ (ডালহৌসির অফিস থেকে বুকিং হয়), ‘আকাশ হিল টপ রিসর্ট’ (8001501501), বিলসাবহুল ‘কুশলপল্লী রিসর্ট’, এছাড়াও আছে সাধারণ মানের দু একটি লজ।
অযোধ্যার পাদদেশে বাড়রিয়ায় – ‘আরণ্যক লজ’ (9932725555, aranyakbaghmundi@gmail.com), ‘অযোধ্যা হিল ভিউ লজ’ (9007509955), ‘শুভম ট্যুরিস্ট লজ’ (8001680857), ‘মানভুম ট্যুরিস্ট লজ’ (9734776894); বাঘমুন্ডির কাছে ‘ছৌবুরু হোমস্টে’।
মাঠায় – ‘মাঠা ইকো ক্যাম্প’, ‘মাঠা হিল ভিউ রিসর্ট’, ‘মালগুডি রিসর্ট’ (7003876456); সোনকুপিতে – ‘সোনকুপি বাঞ্জারা ক্যাম্প’, ‘কুকুবুরু হিল রিসর্ট’ (9051881754)।
খয়রাবেরা ড্যামে – ‘ইকো রিসর্ট’।
(উপরের থাকার জায়গা গুলির হদিশ অযোধ্যা পাহাড় যাবার আগে ক’দিন ইন্টারনেটে ঘেঁটে আমার বার করা। প্রতিটা থাকার জায়গার বিস্তারিত ‘Google Search’ করলেই পাওয়া যাবে। বুকিংয়ের আগে ইন্টারনেটে রিভিউ ও অবস্থান দেখেই বুকিং করা বাঞ্ছনীয়।)


  Travelogue and Photography by Subhrangsu Dasgupta


Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement