সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! (অন্তিম পর্ব)

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!!  (অন্তিম পর্ব)

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!!  (অন্তিম পর্ব)




সতপন্থ তাল

অন্তবিহীন পথ চলাই জীবন

সকালবেলা ঘুম ভেঙে দেখি চারিদিক ঝকঝক করছে। তাঁবুর থেকে বেরিয়ে দেখি ছোট জলাশয়, ঝর্ণা সব নীলে নীল। ঘাসে ঘাসে শিশির সাজ। পেছনে বালাকুন পর্বত ঝুঁকে আছে। সামনে একটি ঝর্ণা পেরিয়ে সবুজ ঘাসের আস্তরণ ক্রমে উঁচুতে উঠে গেছে, তার ওপর দিয়ে শুভ্র সমুজ্জল চৌখাম্বা ঝকঝক করছে। চক্রতীর্থের পেছন দিকে তাকাতেই দেখি মায়াময় অলকাপুরী মোহময়ী বেশ ধরে, সাদা মেঘ কালো পর্বতের গায়ে গায়ে লেগে আছে। কেন কালিদাস মেঘদূত এ এই অলকাপুরীর বর্ণনা দিয়েছিলেন বুঝতে পারছি। এই প্রাচীন ভারতের প্রতিটি শ্বাস প্রশ্বাস মন প্রাণ ভরে আত্মস্থ করলাম, যতটুকু এই অর্বাচীনের পক্ষে সম্ভব।

অলকাপুরী




আজ আমাদের স্থির হয়েছে, এখান থেকে  সতপন্থ  গিয়ে ফিরে চক্রতীর্থেই থাকবো। সতপন্থ এ এখন তাঁবু ফেলা নিষেধ। আমরাই এর জন্য দায়ী, যত জঞ্জাল সব ওখানে ফেলে নিজেরা ভারমুক্ত হয়ে প্রকৃতিকে ভারাক্রান্ত করা আমাদের চিরকালীন স্বভাব।

চক্রতীর্থ ও চৌখাম্বা




শুরু হলো হাঁটা….

সবুজ ঢাল বেয়ে ওপরে উঠছি, বাঁয়ে নীলকণ্ঠ, আর ডাইনে বালাকুন হাঁ করে দেখছে। এ জায়গাটা প্রায় ১৪৫০০ ফুট, তাই অল্প চড়াইতেই হাঁফ ধরছে। চোখে সানগ্লাস, চোখ খুললেই পাতা ভারী হয়ে আসে, যেন ঘুম কাটেনি এখনো। খুব আস্তে আস্তে ওই ঢালের মাথায় উঠে এলাম। উঠেই চমক; ভাবতেও পারিনি ওপরে ঐটুকু জায়গা। উঠে দাঁড়াতে গিয়েই টলে পড়ে যাচ্ছিলাম উল্টোদিকে। একটু সম্বিৎ ফিরে বসে পড়লাম। ওপরে দুপা রাখার জায়গাটুকু, উল্টোদিকে পাথর আর পাথর, একদম খাড়া নিচে নেমে গেছে। বসলাম, হু হু করে হাওয়া দিচ্ছে। নামতে শুরু করলাম ধীরে ধীরে, বালি পাথর-কুচি ঝুরঝুর করছে নিচে, লাঠি দিয়ে ব্যালান্স করতে করতে নামা। তারপর আবার উঁচুনিচু পথ। ডানদিকে মোরাইন, কাদা মাটি মাখা, কোথাও পুরোনো বরফ জমে শক্ত। হঠাৎ আবার সেই গত রাত্রের আওয়াজ, নীলকণ্ঠ থেকে avalanche নামছে, যেখানে ভাঙছে বরফ সেখানে সাদা মেঘের কুন্ডলি। হঠাৎ পাহাড় জেগে উঠেছে, ঘটে যাওয়ার পর আবার সব সুনসান, কিছুই যেন ঘটেনি এখুনি।

সবুজ ঢাল, নীলকন্ঠ ও সরস্বতী





আমরা এবার চলেছি আবার সেই গতকালের মতো razor edged  রাস্তা দিয়ে, তবে পার্থক্য হচ্ছে এ রাস্তা নড়বড়ে পাথরের। রাস্তা বললাম বটে, তবে রাস্তা নেই;  পাথর, তার ওপর পাথর ছড়িয়ে ছিটিয়ে অজগরের মতো পড়ে আছে, সরু ওপর দিয়ে এগিয়ে চলা। নিচ দিয়ে কলকল করে হিমবাহ গলে যাওয়া জলের স্রোত শুনতে পাচ্ছি। কোন পাথরে পা দেব সেটা বোঝাই মুশকিল, ভুল হলে হড়কে গেলেই একদম পাথরের রাজ্যে সলিল সমাধি। ভালো গাইড ছাড়া এই পাথরের রাজ্যে দিক চেনা মুশকিল। কিছু দূর দূর পাথর জড়ো করে রাস্তা বোঝানো আছে বটে, তবে সে বোঝা আমার আপনার কম্ম নয়। কিছুক্ষন পর কেমন অভ্যস্ত হয়ে গেলাম; হালকা পা ফেলছি কোনো পাথরে, নড়েচড়ে উঠলেই সরিয়ে অন্যটায়। এ ভারী মজা, জানি পা ভুল করলেই তলা দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের স্রোতে ভেসে যাব, কিন্তু skill দেখাতে, মানে নিজেকে দেখাতে বেশ লাগছে।

পাথর্, মোরেন আর সমূহ বিপদ

একবার একটু উঁচু জায়গায় একটু দাঁড়ালাম, দেখি, দূরে আরেকটি এরকম উঁচু জায়গায় এক সাধু, খালি পা, খালি গা, ছোট কৌপিন পড়া। অবাক হয়ে দেখলাম উনি এগিয়ে আসছেন। তারপর আবার নিচের দিকে তাকিয়ে চলতে শুরু করেছি, খানিক পরে খেয়াল হতে সামনে তাকিয়ে দেখি উনি নেই?? কিরে বাবা, এই পাথর বোঝাই পথে হাঁটতে হাঁটতে ভুলভাল দেখছি!! ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি উনি আমাদের ছাড়িয়ে আরো অনেকদূর চলে গেছেন!! শুনলাম উনি তাল এর ওখানেই থাকেন গুহায়, এখন একটি ছোট ঘর বানিয়ে দেওয়া হয়েছে, তবে তা মাঝে মাঝেই ধ্বসে যায়। কথা বলেননা কারোর সাথে, খাবার কিছু দিলে নেন।


অনেক অনেক্ষন হাঁটা হলো, শুধু পাথর, জলের শব্দ, মোরাইন  ছাড়া আর কিছুই নেই। গাইড শোভন কে জিজ্ঞেস করাতে ও বললো যে সামনের যে উঁচু পাহাড় মতো, ওর ওপর উঠলেই দেখা যাবে। আমি বললাম দেখা তো যাবে, তারপর?? হেসে বললো, তার থেকে নামলেই বহু প্রতীক্ষিত সতপন্থ তাল।

শেষ চড়াই দিয়ে ওঠা শুরু হলো খানিক উৎসাহ জড়ো করে। ওপরে উঠেই, আহা, কি দেখলাম–

সতপন্থ তাল

ততঃ সত্যপদন্নাম তীর্থং সর্বমনোহরম ।

ত্রিকোনাকারমেবৈতৎ কুন্ডং কল্মষনাশনম্ ।।

স্কন্দপুরানের বর্ণনা। বিস্মিত হয়ে দেখি পুরান রচয়িতার  নিখুঁত বর্ণনা। যেন মাটির বুকে ভারতের মানচিত্র। তিন কোণে নাকি তিন দেবতার অধিষ্ঠান। ব্রহ্ম, বিষ্ণু, মহেশ্বর। তাঁরা সেখানে ধ্যানরত। চারিদিকে বরফের প্রাচীর, ওপরে সুনীল আকাশ। নিস্তরঙ্গ স্ফটিকস্বচ্ছ জল। একপাশ দিয়ে নেমে এসেছে সরস্বতী হিমবাহ, অন্যদিকে সেই বিখ্যাত স্বর্গরোহিনী হিমবাহ। ওদের কাছেই শুনলাম এই হিমবাহ টি একদম সিঁড়ির মতো আকাশে উঠে গেছে মনে হয়, যদিও আমরা ওপরে মেঘ থাকায় শুরু টা দেখতে পেলাম, কিন্তু ওপরের দিকটা মেঘাচ্ছন্ন। এই সিঁড়ি দিয়েই যুধিষ্ঠিরের স্বর্গযাত্রা।

সতপন্থ তাল, বাঁদিকে সরস্বতী হিমবাহ




নিচে নেমে সবাই পুজো দিলো। আমি ঠিক ওপরে একটা বড় পাথরে বসে চারিদিক দেখতে দেখতে ভাবছিলাম যে পুরাণ, মহাভারতে এত বর্ণনা আছে, তার মানে মানুষ কত আদি কাল থেকে এসব দুর্গম অঞ্চলে আসছে। তখন তো পায়ে হাঁটা ছাড়া কোনো উপায়ই ছিলোনা। অথচ মানুষ তখন শুধু দেখার আনন্দে, অজানার পথে গেছে। সৃষ্টি করেছে কত অমর সাহিত্য।

এরপর তো ফেরা। একদিন চক্রতীর্থ থেকে পরদিন সোজা বদ্রিধাম।

কিছু জরুরি তথ্য..

গাইড জনপ্রতি ২০১১  এ নিয়েছিল ৫ হাজার টাকা, খাওয়া, টেন্ট, পোর্টার সব সমেত (একটা টেন্ট আমাদের, আর বাসন আমাদের)।

উচ্চতা সতপন্থ তাল এর ১৫১০০  ফিট। ওপরে উঠে নামতে হয়, ধরে রাখুন উঠতে হবে ১৫৫০০ ফিট।

মোট দূরত্ব বদ্রি থেকে হাঁটলে ২৯  কিমি। তবে আবার সাবধান বাণী, দূরত্ব কম, কিন্তু পথ একটু কঠিন।।

সমাপ্ত


অমলিন


Advertisement




পূর্ববর্তী  পর্বটি পড়তে নিচের লিংকটি দেখুন

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( তৃতীয় পর্ব )


সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( দ্বিতীয় পর্ব )


সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( প্রথম পর্ব )


Advertisement




 

 

2 Comments

  1. EXECELLENT

    Reply
  2. Fantastic, Superb, Excellent……….Subhamoy Babur lekhar kono tulana nei…….

    Reply

Trackbacks/Pingbacks

  1. সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( তৃতীয় পর্ব ) - Tour Planner Blog - […] সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের … […]
  2. সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( দ্বিতীয় পর্ব ) - Tour Planner Blog - […] সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের … […]

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement