সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( দ্বিতীয় পর্ব )

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( দ্বিতীয় পর্ব )

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!!

দ্বিতীয় পর্ব

চামতোলি বুগিয়াল

পথ যে আমি পেলাম

সাধারণতঃ এই ট্রেক এ যারা যান, তারা গাড়িতে বদ্রি থেকে মানা গ্রাম পর্যন্ত গিয়ে হাঁটা শুরু করেন, আমরা তো উমাপ্রসাদের ‘ হিমালয়ের পথে পথে’ পড়ে উদ্বুদ্ধ ; ঠিক করলাম ওনার বর্ণিত পথেই এগোব। আজ যাবো ১১  কিমি মতো রাস্তা।

সকাল ৯ টার মধ্যে মন্দির পরিক্রমা করে বদ্রিবিশাল কে প্রণাম করে রওনা হলাম। দুজন পোর্টার ও একজন কুক মালপত্রসহ পেছনে, একদম প্রথমে গাইড শোভন, মাঝে আমরা। জানি পথ চলতে চলতে এ বিন্যাস ওলটপালট হয়ে যাবে; কখন দেখবো চলতে চলতে একা একাই হেঁটে চলেছি এই সুবিশাল হিমালয়ে; নিজের এই ক্ষুদ্র নশ্বর শরীর যেন মিশে গেছে বিশালতায়। এটাই ট্রেক এর মজা ; মহত্ব ও বলতে পারেন। এ জন্যই বারবার ফিরে ফিরে আসা নতমস্তকে হিমালয়ের কোলে।

যাক, আবার ফিরি হাঁটার ছন্দে-

বদ্রী থেকে রওনা

আপাতত সোজা পথ, আমাদের বাঁ দিকে স্তব্ধ নারায়ণ পর্বত, ডানদিকে নিচে তীব্র গতিতে অলকানন্দা , আর নদীর ওপারে নরপর্বত। হাঁটতে হাঁটতে কিমি তিনেক পরে ওপারে দেখা গেল মানা গ্রাম। ওই দিক দিয়ে মানা পাস হয়ে তিব্বত যাওয়ার নাকি পথ আছে। সে দিক দিয়ে তীব্রবেগে নেমে আসছে সরস্বতী নদী। মানা গ্রাম থেকে বসুধারা জলপ্রপাতের চড়াই রাস্তায় এর ওপরই আছে ভীমসেন পুল। কথিত মহাপ্রস্থানের পথে মধ্যম পান্ডব পাথর ফেলে এই পুলের সৃষ্টি করেছিল। যাই হোক, মানা গ্রামের নিচেই সরস্বতী আর অলকানন্দা র সঙ্গম, কেশব প্রয়াগ। আমাদের রাস্তা অলকানন্দার ধারা বেয়ে।

চারিদিকে গমের খেত। খেত এর চারপাশে পাথরের পাঁচিল। দুই দিকে একটানা পাঁচিলের মধ্যে দিয়ে সরু পথ। কি আশ্চর্য, উমপ্রসাদ সেই কবে ঠিক এভাবেই গেছেন এ রাস্তা দিয়ে। ঠিক তাঁর বর্ণনা মতোই মনে হচ্ছে গ্রামের কোনো গলি দিয়ে চলেছি!

খানিকদূর গেলেই মানা গ্রামের প্রায় উল্টোদিকে একলা নির্জন দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি সাদা মন্দির। মাতা মূর্তির। দুদিকে দুই পর্বত ভ্রাতা নর আর নারায়ণের জননী (পুরাণ মতে)। উমপ্রসাদ লিখেছেন যে এই দুই ভাই তপস্যার জন্য গৃহত্যাগী হন। উদ্বেগে মাতা খুঁজতে বেরোন, তাঁকে আসতে দেখে দুই ভাই দুই পর্বত হয়ে স্থানু হয়ে যান, পরে মাতার দুঃখ দেখে ঋষি নারায়ণ এই স্থানে মাতার বসবাসের সম্মতি দেন। সেই থেকে একা মাতা এই নির্জন মন্দিরে।।

প্রণাম করে এগিয়ে চললাম। ইতিমধ্যে পোর্টার রা সবাই এগিয়ে গেছে। খানিক দূর গিয়ে দেখি সবাই দাঁড়িয়ে। রাস্তা ধসে গেছে, নিচে বহু নিচে অলকানন্দা।। ওহ, যাবো কি করে? ওরা বললো কোনো চিন্তা নেই, কারোর কিছু হবেনা। ওই ঝুরঝুরে বালিমাটিতে সার বেঁধে দু তিন হাত দূরত্বে দাঁড়ালো, আমরা মোটামুটি ওদের হাতে হাতে ওপারে চলে গেলাম। কি করে গেলাম জানিনা, তবে চলে তো গেলাম!!

ধান্য হিমবাহ

মানা থেকে যাঁরা হাঁটেন তারা অলকানন্দা পার হন ধান্য হিমবাহ দিয়ে। চমকাবেননা, এটা স্নো ব্রিজ। বহু আগে বরফের বিশাল আস্তরণ নারায়ণ পর্বত থেকে অলকানন্দায় মিশেছিল, তার ওপর যুগের নিয়মে বালি, পাথর জমে শক্ত।।

বসুধারা

যদিও ফাটল প্রচুর। ওর গা বেয়ে বেয়ে উঠে এলাম চামতোলি বুগিয়াল এ। বিস্তীর্ণ তৃণভূমি, বর্ষাকালে প্রচুর নাম না জানা ছোট ছোট ফুলে ভর্তি। উল্টো দিকে তীব্র বেগে নেমে আসছে বসুধারা জলপ্রপাত, নিচে তাকালে ধোঁয়া। এই তৃণভূমিতেই নাকি নকুল আর সহদেব প্রাণত্যাগ করেন।

ধীরে ধীরে চারিদিক উপভোগ করতে করতে বেলা দুটো নাগাদ পৌঁছলাম লক্ষীবন।

লক্ষী দেবী নাকি এখানে তপস্যা করেছিলেন। কি করেছিলেন জানিনা, তবে এতক্ষন রুক্ষতার মধ্যে হঠাৎ এক সবুজ আয়তক্ষেত্র। নিচে ঢালু হয়ে অলকানন্দায় মিশেছে। ওই ঢালে প্রচুর ভূর্জ গাছ। খয়েরি ছাল খুলে খুলে আছে। এই সেই বিখ্যাত ভূর্জপত্র, যাতে পুরাকালে লেখা হতো। কিছু নিলাম হেফাজতে।

ওই ঢালেই কিছু রাখাল ভেড়া চড়াচ্ছে । আমরা দেদার গড়াগড়ি করে, মনের আনন্দে গল্পগুজব করে তাঁবুতে সেঁধোলাম সন্ধ্যে বেলা। গাইড বলল কথিত আছে এখানে দ্রৌপদীর মৃত্যু হয়। তা এখানে মরেও সুখ। মহান হিমালয় আর অলকানন্দা কে সাক্ষী রেখে।

কাল নাকি বিপদসংকুল যাত্ৰা। বর্ষাকালে সহস্রধারা পেরোনো নাকি খুব চাপের। যাক, সে চাপ কাল ই নেব। আজ তো এই নন্দনকাননে সুখনিদ্রায় যাই।

ক্রমশ:

লক্ষীবন


Advertisement




পরবর্তী পর্বটি পড়তে নিচের লিংকটি দেখুন

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( তৃতীয় পর্ব )

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!!  (অন্তিম পর্ব)

 


পূর্ববর্তী  পর্বটি পড়তে নিচের লিংকটি দেখুন

সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( প্রথম পর্ব )


Advertisement



Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement