সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( তৃতীয় পর্ব )

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( তৃতীয় পর্ব )

সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!!

তৃতীয় পর্ব
মেঘদূতের দেশে

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে দেখি আকাশ অন্ধকার। লক্ষীবন থেকে আলুর পরোটা, চা খেয়ে শুরু হাঁটা। বৃষ্টি শুরু ঝিরঝিরিয়ে। জবরজং বর্ষাতি পড়ে হাঁটা মুশকিল, ছাতা নিয়েই শুরু হলো চলা।অলকানন্দার কিছু ওপর দিয়ে চলেছি। সামনেই দেখছি নদী বাঁ দিকে পাহাড়ের আড়ালে ঘুরে গেছে। সেই দিকে নদীর হিমবাহ শুরু। আমাদের যেতে হবে নীলকণ্ঠ পর্বত কে অর্ধ পরিক্রমা করে। যদিও ঘন মেঘে দেখা যাচ্ছেনা নীলকণ্ঠ। বাঁকের কাছে এসে আরেকটি হিমবাহ এসে অলকানন্দার হিমবাহে মিশেছে। ভগীরথ খড়্গ। শুনেছি এই হিমবাহ ধরে গেলে পাঁচ ছয় দিনে গোমুখ পৌঁছানো যায়। এই দুই হিমবাহের সঙ্গমে দাঁড়াই। শোভন, আমাদের গাইড ওর ডাকে চমকে তাকাই। অলকানন্দা র অপর পারে দুটি পর্বত শ্রেনির মধ্যে একটি নদী উপত্যকা। এই সেই অলকাপুরী!!!


সাথে সাথেই উমপ্রসাদের বর্ণনা মনে পড়ে; এই অলকাপুরী থেকেই অলকানন্দা র উৎপত্তি। এই সেই অলকাপুরী, কবি কালিদাসের অমর অলকাপুরী! কুবেরের অক্ষয় সুখ সম্পদ সঞ্চিত এখানেই? বিরহী যক্ষের চোখের জলে ভরা অলকাপুরী।।




টপকে টপকে পার হওয়া

অলকানন্দার হিমবাহের বরফ কাদা, মাটি পাথরে শক্ত, আশেপাশে বরফ গলা জলের ধারা, এগিয়ে চলি পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে লাফিয়ে। এগোচ্ছি, আর শুনতে পাচ্ছি প্রচন্ড বেগে পড়া জলের শব্দ। একটু এগোতেই বুঝলাম কারণ। নীলকণ্ঠ পর্বতের গা বেয়ে বহু ধারা নেমেছে। সহস্রধারা।। শুনেছি যারা অন্য সময়ে আসেন, এই ধারাগুলো শুকনো থাকে, বুঝতেই পারেননা এর মহিমা। সে কি জলরাশি, যতদুর চোখ যাচ্ছে নামছে জলের ধারা ওপর থেকে।। এখানেই নাকি ভীম জল না পেয়ে মারা গেছিলেন, আর অর্জুন সেই দুঃখে, রাগে তীর ছুঁড়ে এই সহস্রধারার সৃষ্টি করেন।




পঞ্চধারা তীর্থ

সামনেই দেখছি পাঁচটা বড় জলপ্রপাত। উমপ্রসাদ অনুযায়ী এই পাঁচটি প্রপাত হলো পুরাণ বর্ণিত পঞ্চধারা তীর্থ। নামগুলি হলো প্রভাস, পুষ্কর, গয়া, নৈমিষ ও কুরুক্ষেত্র তীর্থ।। ভগবানের আদেশে পঞ্চতীর্থের দেবতারা এখানে তপস্যা করেন। ওই ধারা নদীর সৃষ্টি করেছে, খরস্রোতা, কিন্তু পার হতে হবে উপায় নেই; একে অপরকে হাতে হাত ধরে পেরিয়ে এলাম। খানিকদূর অল্প চড়াই পেরিয়ে শুরু হলো শিরদাঁড়া পথ বা razor-edged ridge, যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগের জীবজন্তু দের কঙ্কাল দুই পর্বত শ্রেণীর মধ্যে শুয়ে আছে। তার ওপর দিয়ে হাঁটতে হবে। একটা সরু লাইন, দুদিকে পাহাড়ের ঢালু গা, নেমে গেছে সোজা তিন চারশ ফুট নিচে। শুরু করলাম। সে এক সাংঘাতিক চলা, নরম মাটি বৃষ্টিতে ভেজা, পা হড়কে যাচ্ছে, আমাদের এক বন্ধু হঠাৎ পা হড়কে… ধরে ফেললো আমাদের এক্সপার্ট পর্বতারোহী অন্য বন্ধু। আমরা স্থির করলাম আর নয়, নিচে নেমে এগোব। নিচে জলের ধারায় শিরা উপশিরা। নেমে এলাম বহু কষ্টে ওই তিন চারশ ফিট।। তারপর জল দিয়ে এক কষ্টসাধ্য যাত্রা।। কোথাও কোমর, কোথাও পায়ের পাতা জলে, কোথাও একসাথে পঞ্চাশ টার ওপর পাথরের ওপর দিয়ে চলা।

পেরিয়ে এলাম সহস্রধারা আর Razor edged ridge




সেই সাত সকালে, ৯ টার সময় রওনা হয়ে বিকেল ৪ টা নাগাদ পৌঁছলাম চক্রতীর্থ। ভাবলাম প্রচুর হেঁটেছি ; ও মা, শুনলাম লক্ষীবন থেকে দূরত্ব নাকি মাত্র আট কিমি। তবে দুরত্ব দিয়ে বিচার করলে ভুল হবে, এ পথ সত্যি কঠিন ছিল।

চক্রতীর্থ

চক্রতীর্থ। ওপর থেকে দেখলাম একটা প্রায় গোলাকার সবুজ ঘাস আর ফুলে ঢাকা খেলার মাঠ। শুনলাম অন্য সময় শুকনো ঘাসহীন রুক্ষ থাকে। এখানেই নাকি শ্রীকৃষ্ণ তাঁর সুদর্শন চক্র গেঁথে রেখেছিলেন তার প্রয়োজন ফুরিয়েছে বলে। অদ্ভুত, মাঠ জুড়ে খাঁজ খাঁজ দাগ !!! পুরাণ বিশ্বাস করতে মন চায়। মাঠটাকে ঘিরে বালাকুন পর্বত, চৌখাম্বা পর্বত আর নীলকণ্ঠ তো আছেনই। এখান থেকে দূরে অলকাপুরী দেখা যাচ্ছে, ঠিক চাইনিজ পেইন্টিং যেন। অপূর্ব। একটি কুকুর এসে জুটেছে লোমশ কালো, গাইড বলল যারা ভেড়া চড়ায় তাদের।


আমার মনে পড়ল যুধিষ্ঠিরের কুকুর এর কথা। উমপ্রসাদ ও তার পথে পেয়েছিলেন এরকম একটি কুকুর, তিব্বতী মেস্টিফ। ভালোই, মহাপ্রস্থানের আয়োজন সম্পূর্ণ হলো। রাতে শুলাম, মাঝরাতে ভীষণ বজ্রপাতের শব্দে ঘুম ভাঙলো, ভয়ে আমরা বাইরে বেরিয়ে এলাম।। গাইড কে ডাকাডাকি করায় ও বেরিয়ে বলল, ও কিছুনা, avalanche!!! বলে কি? মাথায় এসে পড়বে নাকি? বালাকুন আর নীলকণ্ঠ তো মাথার ওপর ঝুলছে।।। খুব চিন্তা নিয়ে ঘুমোতে গেলাম।

ক্রমশ


Advertisement




পরবর্তী পর্বটি পড়তে নিচের লিংকটি দেখুন

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!!  (অন্তিম পর্ব)


পূর্ববর্তী  পর্বটি পড়তে নিচের লিংকটি দেখুন

সতপন্থ তাল ট্রেক  অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( দ্বিতীয় পর্ব )


সতপন্থ তাল ট্রেক অথবা মহাপ্রস্থানের পথে!! ( প্রথম পর্ব )


Advertisement




Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement