হিমাচলের কয়েকদিন

হিমাচলের কয়েকদিন

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (প্রথম পর্ব)

১লা মার্চ, ২০১৮। আজ দোল।

নেট ঘেঁটে ঘেঁটে সিমলা মানালি চণ্ডীগড়ের লেখা পড়ে আর ছবি দেখে চোখে ছানি পড়ে গেছিলো। এদিকে গাদাখানেক লোকজন কোত্থেকে জানতে পেরে ফোন লাগিয়েছে, দাদা গাড়ি লাগেগা, হোটেল লাগেগা, এইসব। আমি আমার বিখ্যাত হিন্দিতে তাদের যথাসম্ভব নিরস্ত করছি। একজন তো বিরক্ত হয়ে বলেই বসল হোটেল লাগবে না তো কি গাছতলায় থাকবেন? সেই কবে টিকিট কাটা হয়েছে, সিমলার ঘর বুক করা হয়েছে। ব্যাস, তারপর দিন যেন আর কাটছেই না। শেষে কাল অফিসে সবাইকে টা টা করে বেরিয়ে মনটা কেমন ফুরফুরে হয়ে গেল।

সত্যি বলছি ফেব্রুয়ারির আঠাশ তারিখ, সবে মাইনে ঢুকেছে অ্যাকাউন্টে, অফিসে জেলাস পার্টি গুম হয়ে বসে আছে যেই শুনেছে দেড় সপ্তাহের ছুটিতে সিমলা মানালি বেড়াতে যাচ্ছি। এদিকে আমিও হ্যাপ্পি হোলি ইন অ্যাডভান্স বলে একটু তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছি।আজ রাতের ঘুমটা খুব জরুরি। কারণ কালকে রাতটা ট্রেনে জেগে কাটাবো। গড প্রমিস, একটুও ঘুমোবো না। ট্রেনে ঘুম আসে না তা নয়, ছোটবেলায় দোলনায় দুলিয়ে দুলিয়ে ঘুম পাড়ানো হত, ধেড়ে হয়ে যাওয়ার পরে একমাত্র ট্রেনেই দুলে দুলে ঘুমোনো যায়। কিন্তু কাল তো পূর্ণিমা, চারদিকে চাঁদের আলো পড়বে, আর আমি ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুমোবো এমন বেরসিক আমি নই। তাই বলে যে দাঁতে কলম আটকে কবিতা লিখব তাও নয়। শুধু বাইরের দিকে তাকিয়ে মোবাইলে খুব প্রিয় কিছু গান শুনব এরকম ইচ্ছে আছে।

সক্কাল বেলা বাইরে চেঁচামেচি। পিচ্চি পিচ্চি সব বাচ্চাগুলো রং খেলতে বেরিয়ে পড়েছে। ধেড়েরা বারোটার পর বেরোবে, কারণ ওদের বারোটা অনেক আগেই বেজে গেছে। এমন ছুঁচো, কি একটা কিনতে একটু বেরিয়েছিলাম, বাঁদুরে রং লাগিয়ে দিলো। আমিও আচ্ছা করে কথা শুনিয়ে দিয়েছি ওর বাবা না কাকা কে একটা দাঁড়িয়েছিল ভুত হয়ে, তাকে। বুঝলাম, সাতটা চল্লিশে হাওড়া থেকে ট্রেন, যদি সুস্থভাবে যেতে হয়, তবে পাঁচটায় বেরোতে হবে। এদিকে তো ‘ওলা’ওয়ালারা পাততাড়ি গুটিয়েছে। বাড়ি গিয়ে খেয়েদেয়ে একটু মোবাইল খোঁচাতে বসলাম। ও বাবা, মেসেজ এসেছে, কালকা মেল আজ সাতটা চল্লিশের বদলে রাত ন’টা দশে ছাড়বে। যাচ্চলে, এদিকে কালকা মেল দেরি করলে তো কালকা-সিমলা শিবালিক ডিলাক্স এক্সপ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। টেনশন শুরু হয়ে গেলো।

ধুস, ভগবান যা করেন মঙ্গলের জন্যে করেন, পৃথিবীর জন্যে কিস্যু করেন না। আর আমার জন্যে তো আরোই কিছু করবেন না বলেই দিয়েছেন। যাই হোক, যদি ভগবান মুখ তুলে চেয়ে কারেক্ট টাইমেই ট্রেন ছাড়ার ব্যবস্থা করে দেন, তাহলে আমি লোকাল ঠাকুরবাড়িতে পাঁচ টাকার পুজো দেব ভেবেছিলাম। ভগবান বলিলেন, বৎস, তুমি অতি কিপটা। তোমার ট্রেন সাড়ে নটায় ছাড়িবে।

ভগবানের মার্, কি আর করা যায়। শিবালিক ধরার আশা আমি কালকা মেলের ড্রাইভারের হাতেই ছেড়ে দিলাম। শীতের শেষ দিকে কুয়াশা থাকে বলে উত্তর ভারতের সব ট্রেনই প্রচুর লেট করছে। কালকা মেলও করবে, আর আমার শিবালিক ডিলাক্সের লাক্সারি যাত্রার সাড়ে সব্বোনাশ। তবু এই যে কালকা মেল পাওয়া গেছে এটাই বা কম কি? স্টেশনের ফ্রি ওয়াইফাই খরচা করে এই ট্রেনের ইতিহাসটা একটু চেক করে নিলাম।

ও ব্বাবা, এ তো যে সে ট্রেন নয়, জানতামই না এর এত হিস্ট্রি। তৎকালীন রাজধানী ‘ক্যালকাটা’ থেকে দিল্লি অবধি ‘ইস্ট ইন্ডিয়ান মেল’ চালু হয় ১৮৬৬ সালের ১লা জানুয়ারি। পরে ১৮৯১এ কালকা অবধি রেলপথ সম্প্রসারণ করে তার নাম হয় কালকা মেল। এ ট্রেনে যেতেন তৎকালীন ভাইসরয়, সরকারি আমলা, হোমরা চোমরা সব লোকজন। অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামী, নেতা, বরেণ্য ব্যক্তিও এই ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। পরে ১৯০৩এ কালকা সিমলা রেল সার্ভিস চালু হওয়ায় কলকাতা থেকে কালকা হয়ে সিমলা যাওয়া যেত। তাই এই ট্রেন খুব গুরুত্বপূর্ণ আর ঐতিহ্যবাহীও বটে।

ট্রেন ছাড়লো, সেই সাড়ে নটায়। ভগবানকে বললাম ডিমান্ড ছিলো বললেই পারতে, শুধু শুধু লেট করালে ট্রেনটা। ভগবান বলিলেন, আগে আগে দেখো হোতা হ্যায় কেয়া। ঘচাঘ্যাচ ঘচাঘ্যাচ করতে করতে ট্রেন চললো, লিলুয়া, বেলুড়, বালি হয়ে বর্ধমানের দিকে কর্ড লাইন ধরে। বাড়ি থেকে এক ব্যাগ খাবার আনা হয়েছিল, তার থেকে খুঁজে খুঁজে রাতের খাবারের কৌটোগুলো বের করে সিটের ওপর রাখলাম। আমাদের পাশের সিট খালি, টিটি যখন টিকিট দেখতে এলো, তখন চার্টে উঁকি মেরে দেখলাম প্রতিবেশীরা বর্ধমান থেকে উঠবেন।

আমাদের দুটো লোয়ার বার্থ আর তার সাথে একটা মিডল বার্থ ছিল। খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে ডানকুনি পেরোলো। ট্রেনের বাতি নিভিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজে চালিয়ে দিলাম ‘লাগ্ যা গলে…’ চাঁদের আলো এখনো তেমন বোঝা যাচ্ছে না, কারণ আধাশহুরে এলাকা শেষ হয়নি। চাঁদ শহরে দেখা দেয়, আলো দেয়  না। যেখানে চাঁদের আলো প্রয়োজন চাঁদ শুধু সেখানেই আলো ছড়ায়। পেরিয়ে গেলাম মশাগ্রাম। শুধু প্ল্যাটফর্মে টিমটিমে আলো, আর বাইরে দিগন্তে ছড়িয়ে আছে জ্যোৎস্না। চাঁদের আলো যে এতো ফুটফুটে হয় আগে দেখিনি, আকাশে কত শত তারা। ঠিক ভোরবেলায় গাছের নিচে পড়ে থাকা একরাশ শিউলি ফুলের মত স্নিগ্দ্ধ।

পরিষ্কার ধানের খেত, শেষটা কুয়াশায় মিলিয়ে গিয়ে আকাশের গায়ে ঠেকেছে। আর তার পর থেকে তারাদের মেলা বসেছে, দেখতে পাচ্ছি সব, কারণ জ্যোৎস্নার আলো। একটু একটু করে শহরে ঢুকছে। বর্ধমানই হবে। একটু চোখ বুজিয়ে নিলাম, নাহলে রেশটা কেটে যাবে। আধঘন্টার মধ্যে বর্ধমান ছেড়ে আবার দিগন্তের দিকে পাড়ি। আমাদের সহযাত্রীরা জুতো খুলে গাছের মগডালে উঠে গেছেন। সরি, বলতে চাইছি যে ওনারা আপার আর মিডল বার্থ দখল করে বিবিধ সুরে নাক ডাকছেন। ঘরর ঘরর ঘুঁৎ, ফঁরর ফঁরর ফুৎ। আমি আবার চাঁদ দেখতে মন দিলাম। ফোনে তখন চলছে ‘চন্দা রে চন্দা রে কভি তো জমিন পর আ…’। একে একে দুর্গাপুরের কাছাকাছি বড় বড় সব আয়রন এন্ড স্টিল ফ্যাক্টরির উঁচু উঁচু চিমনি থেকে নীল আগুন বেরোচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন সেই হ্যারি পটার এন্ড গবলেট অফ ফায়ারের সেই বিখ্যাত গবলেট। সেই আগুন মিশে যাচ্ছে আকাশে, চাঁদের কাছে। কানে তখন ‘চান্দ ছুপা বাদল মে… ‘

রাত বারোটা বাজতে যায়। টেনশন হচ্ছে ট্রেন প্রায় আড়াই ঘন্টা লেট এখানেই, শিবালিক অপেক্ষা করবে কি না। তার চেয়ে বেশি ভালো লাগছে এখন চোখ মেলে তাকিয়ে থাকতে আর গান শুনতে। আজ আর লিখবো না, আবার কাল। ততক্ষনের জন্য চাঁদটা চলুক আমাদের সঙ্গে।

হিমাচলের কয়েকদিন’ (দ্বিতীয় পর্ব)

২রা মার্চ, ২০১৮। আজ হোলি।

রাতের অনেকটাই জেগে ছিলাম। ভোরের দিকে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল ছিল না। কান থেকে একটা ইয়ারফোন খুলে নিচে ঝুলছে। ভাবলাম খাটটা এতো দুলছে কেন। তারপর শুনি ‘চায়ে চায়ে’ বলে হকার হেঁকে যাচ্ছে। বেশ তেড়ে উঠেছি, আমারই বাড়ির বেডরুমে ঢুকে চা ফেরি করা, হচ্ছে আজকে। মাথাটা স্বাভাবিক হতেই সব মনে পড়ল, আমি তো এখন কালকা মেলের লোয়ার সিটে শুয়ে শুয়ে কালকা যাচ্ছি। কাল রাত্তিরে হাওড়া থেকে দুঘন্টা লেট করে ট্রেন ছেড়েছে, আর কালকা-সিমলা শিবালিক এক্সপ্রেস ধরতে পারবো কিনা তার মুখে একটা ইয়াব্বড় প্রশ্নচিন্হ বসিয়ে দিয়েছে। মনে পড়েছে, আমার তো এখন টেনশন করার কথা। ওরে বাবা কি টেনশন হচ্ছে, উফ একটু চা খাওয়া যাক।

আগেও দেখেছি, এখনো দেখছি, মুঘলসরাই ঢোকার আগে থেকেই যে সব চাওয়ালারা চা ফেরি করেন, তাঁরা বলেন ‘চায়ে রামপেয়ারী’, অর্থাৎ তাঁরা সবাই নাকি রামপেয়ারীর চা বেচেন। যদি সবাই সত্যি বলেন, তাহলে রামপেয়ারী না জানি কোন ভোরবেলা থেকে উঠে গামলা গামলা চায়ের জল চাপান। আহারে রামপেয়ারী, এতো বড় তোমার ব্যবসা, তোমার চা না খেলে চলে?

একি বাপু? চা চেয়েছি, বিস্কুট তো চাইনি। ধরো ধরো, মানে পাকড়ো। হামারা বিস্কুট নেহি চাহিয়ে। চাওয়ালা বললো, ওটা নাকি ফ্রি। তারপর যতবার ট্রেনে চা খেয়েছি প্রতিবারই সুন্দর করে প্যাকেটে মোড়া দুটো মারি বিস্কুট পেয়েছি। বাঙালি হয়ে ফ্রি মাল নেবোনা তাই কখনো হয়? ইচ্ছে করছিলো ওই ফ্রি বিস্কুটের সঙ্গে দুটো সেলফি তুলি, কিন্তু তখনও দাঁত মাজা হয়নি বলে আর হলুদ দাঁতে সেলফি তুললাম না।

চা খেয়ে পেটটা ভারী হল। তারপর হালকা হয়ে এসে দেখি বাইরে আলো ফুটেছে ভালোই, কিন্তু সূর্য এই সবে উঠলো। সামনে ধূ ধূ মালভূমির মত উঁচু জমি, ট্রেনটা যেন একদিকে কাত হয়ে চলছে। আমাদের আপার বার্থে একজন ধুতি ও মোজা পরিহিত দাদু শুয়েছিলেন, তিনি তাঁর ছেলেকে প্রশ্ন করলেন, হ্যাঁরে, ট্রেনটা কি পুরোনো দিল্লি হয়ে যাবে? কোনো উত্তর না পেয়ে খানিক পরে আবার প্রশ্ন, হ্যাঁরে পুরোনো দিল্লি আর হস্তিনাপুর একই জায়গা, না?

আমার খুব খারাপ লাগছিল। সকাল থেকেই দেখছি দাদুর ছেলে, ছেলের বৌ, নাতনি কেউই ওনার কথাকে তেমন পাত্তা দিচ্ছেন না। আমিই প্রোঅ্যাক্টিভলি উত্তর দিলাম, হ্যাঁ পুরোনো দিল্লিই হস্তিনাপুর। আর ট্রেনটা পুরনো দিল্লি হয়েই যাবে। দাদু খুব খুশি। বললেন বাহ্, আসলে দিল্লিতে আমার বহুদিনের আসার ইচ্ছে। আমার মামাতো দাদার ছোট জামাইবাবু দিল্লিতে উকিল ছিল। ওনার ছেলে পাশ থেকে বললেন জামাইবাবু না, ছোট শ্যালক। দাদু একটু অবাক হয়ে বললেন, কি বললি? ছোটোলোক? কত বড় উকিল ছিল জানিস, সুপ্রিম কোর্টেও আসা যাওয়া ছিল। তোদের কাছে তো সবাই ছোট… এতক্ষনে বুঝলাম দাদুর কথায় কেন কেউ উত্তর দেয় না।

যাই হোক, সেই দাদু অনেক গল্প করছিলেন। বলছিলেন আগেকার দিনে কয়লার ইঞ্জিন চললে শব্দ হত, সেনগুপ্ত দাশগুপ্ত সেনগুপ্ত দাশগুপ্ত। এটা নাকি রবীন্দ্রনাথ বলেছেন। প্রথম যখন ইলেকট্রিক ট্রেন আসে তখন নাকি লোকেরা চড়তে ভয় পেত, ভাবত সঙ্গে সঙ্গে ছেড়ে দেবে। একটু আলগা ধরলেই গড়িয়ে পড়ে একদম ট্রেনের নিচে। কয়লার ইঞ্জিনে নাকি বাইরে তাকালে চোখে কয়লার গুঁড়ো আসতো। এমনি আরো নানান কথায় বেলা বাড়ল। উর্দিধারী লোক পেন আর চিরকুট নিয়ে এসে খাবারের অর্ডার নিয়ে গেল। কিন্তু দাম শুনে তো চোখ কপালে। টিকিটে লেখা আছে ৫৫ টাকায় ডিম-ভাত। আর এরা বলছে ডিম-ভাত ১৭০ টাকা! কপাল থেকে চোখ ঠিকঠাক জায়গায় নামিয়ে এনে বললাম তাই দাও, খেয়ে ধন্য হই। এরই মধ্যে ট্রেন এলো এলাহাবাদ স্টেশনে। ঘড়িতে তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। লেটের পরিমান বাড়ছেই। আর আমার সাধের শিবালিক ছেড়ে চলে যাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ছে।

সন্ধ্যেবেলা কানপুর সেন্ট্রালে ঢোকবার আগে পাক্কা আধ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকল ট্রেনটা। সব মিলিয়ে লেট হল সাড়ে চার ঘন্টা। এরপর যদি পথে আরো দেরি করে তাহলে হেঁটে হেঁটে সিমলা পৌঁছতে হবে। যাই হোক, শুনেছিলাম কালকা থেকে নাকি ট্যাক্সি অপারেটরদের বাঁধা রেটে গাড়ি পাওয়া যায় সিমলা যাবার জন্যে। চার জন্যে ছোট গাড়ির ভাড়া ১৮০০ টাকা। আগের দিন ফোনে (07015446347) বুক করতে হয়, ওরা ড্রাইভারের নাম, মোবাইল নম্বর, গাড়ির নম্বর সব দিয়ে দেয়। আর চন্ডিগড় থেকেও গাড়িতে সিমলা যাওয়া যায়। চন্ডিগড় স্টেশনের বাইরে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। একটু দরাদরি করে উঠে পড়লেই ঘন্টা তিনেকের মধ্যে সিমলা নামিয়ে দেবে।

শিবালিকের পরে হিমালয়ান কুইন বলে একটা ট্রেন আছে, কালকা থেকে সিমলা যায়, আমার সেই ট্রেনেও রিজার্ভেশন ছিল। বাই চান্স যদি শিবালিক মিস হয়, তাহলে দুপুর বারোটায় ওই ট্রেনে যাওয়া যাবে। কিন্তু শিবলিকের মজাই আলাদা, সেটা মিস হবে।

মাঝে দুপুরে ঘন্টাদুয়েকের ঘুম বাদ দিয়ে বাকি সময়টা দাদু নিজের মনে বকে চলেছেন। ওনার ধারণা ট্রেনের সকলেই ওনার গল্প মন দিয়ে শুনছে। আমি অবশ্য সত্যি সত্যিই শুনছিলাম কারণ পুরোনো দিনের গল্প শুনতে আমার এমনিতেই ভালো লাগে। সন্ধ্যের পর ওনার পরিবারের সবাই মুড়ি, চানাচুর আর আলুর চপ মেখে খেল, ওনার জন্যে শশা মুড়ি। খুব তৃপ্তি করে খেয়ে উনি ঘোষণা করলেন রাত্তিরে আর কিছু খাবেন না। পরিবারের লোকজন সেই শুনে রাতে চিকেন-ভাত অর্ডার করল। ঠিক সময়ে চললে পৌনে আটটায় দিল্লি ঢোকার কথা। কিন্তু সাড়ে চার ঘন্টা লেট করায় দিল্লি ঢুকতে ঢুকতে রাত বারোটা বাজবে। নটার সময় ছেলের বৌয়ের ধমক খেয়ে দাদু হুড়মুড়িয়ে শুয়ে পড়লেন। দিল্লি দেখা ওনার হল না।

দাদু খুব মিশুকে, কথা বলাই ওনার একমাত্র হবি। আর ওনার সঙ্গের বাকি লোকেদের কথা শুনেই বোঝা যাচ্ছে কোথাও রেখে আসার নেই বলেই দাদুকে নিয়ে বেড়াতে আসা। বাকি তিনজনে ঠিকও করে ফেলেছেন যে সাইট-সিইং এর দিনগুলোতে দাদুকে হোটেলে রেখে যাওয়া হবে। ঘরে শশা ও মুড়ি থাকবে। দাদু মৃদু প্রতিবাদ করলেন, হ্যাঁরে, এতো দূর এসে বরফ দেখব না? নাতনির সাফ জবাব, গাড়ি থেকেই বরফের পাহাড় দেখা যায়। বিদেশ বিভুঁই জায়গা, শেষে বরফে নেমে হাঁপানি হলে দেখবে কে?

আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছি। স্বপ্নে দেখছি দাদু গামবুট পড়ে বরফে বেশ জোরে জোরে হাঁটছেন, পেছনে ছেলে, ছেলের বৌ, নাতনি। হাওয়ায় চাদর উড়ছে, সেদিকে খেয়াল নেই। দুহাত তুলে চেঁচিয়ে বলছেন, এই তো শেষ, আর কি কোনোদিন আসতে পারবো? আরেকটু যাই, এই তো শেষ, খুব কাছেই শেষ।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (তৃতীয় পর্ব)

৩রা মার্চ, ২০১৮। যদি কপালে থাকে তবে আজ শিবালিক এক্সপ্রেসে চড়ে সিমলা পৌঁছনোর দিন।

হঠাৎ একটা ঝাঁকুনিতে ঘুম ভেঙে গেলো। ট্রেনটা কোনো স্টেশনে দাঁড়িয়েছে মনে হচ্ছে। কাঁচের মধ্যে দিয়ে যতটা সম্ভব খেয়াল করে দেখলাম অম্বালা ক্যান্টনমেন্ট জং। হিন্দিতে লেখা অম্বালা ছাউনী। ঘড়িতে এখন রাত তিনটে। মানে মাত্র পঞ্চাশ মিনিটের লেট। চোখ কচলে ধড়মড় করে উঠে বসেছি। কানপুর অবধি যে ট্রেন সাড়ে চার ঘন্টা দেরিতে চলেছে, সে কি করে এতটা মেকাপ করে নেয়? জিও, এই না হলে কালকা মেল। ব্যাপারটা ভাল করে বুঝে উঠতেই রাতভোরে চন্ডিগড় পৌঁছলো তখন ঠিক একঘন্টা লেট। কিন্তু চন্ডিগড়ে পঞ্চাশ মিনিট দাঁড়ানোর বদলে মাত্র কুড়ি মিনিটেই ছেড়ে দিল, এইভাবে আরো আধঘন্টা মেকাপ করে ফেললো। বাকি লোকজনের কথা থেকে বুঝলাম মাঝরাতে দিল্লিতেও একঘন্টা দাঁড়ানোর বদলে মিনিট কুড়ি দাঁড়িয়েছে। এগুলোই কালকা মেলের বাফার টাইম, শিবালিক ধরাতে হবেই, তাই এত তাড়া।

চন্ডিগড় ছাড়তেই পাহাড়ি এলাকা শুরু হয়ে গেল। যদিও বাইরে ঘন অন্ধকার তবুও দূরে পাহাড়ের ওপর শহরের আলো গুলো আকাশের তারার মত লাগছিল। আমরা কি ওই পাহাড়ের ওপর যাব, নাকি আরো ওপরে? দেখা যাক। আপাতত স্বস্তি, শিবালিক পাওয়ার সম্ভবনা বেড়ে গিয়ে একশ শতাংশে ঠেকেছে। একটু পরেই দেখি ট্রেনটা একটা বড়সড় স্টেশনে ঢুকছে, নাম দেখা যাচ্ছে কালকা। আরেকটা জিনিসও দেখা যাচ্ছে…

প্ল্যাটফর্মের একটু সামনের দিকেই একটা সরু রেললাইনের ওপর লাল রঙের একটা ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। অনেকটা যেন মিনিবাস, কিন্তু মিনিবাসের চেয়ে কিছুটা নিচু। আমি লালমোহনবাবু স্টাইলে ‘ঐতো শিবালিক…’ বলে ছোঁ মেরে লাগেজগুলো নিয়ে নেমে পড়লাম। কালকা দাঁড়িয়েছিল এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে, আর শিবালিক দাঁড়িয়েছে ছয় নম্বরে। কিন্তু এক নম্বরের মাথার দিকেই ছ’নম্বটা শুরু, তাই লাগেজ পত্র নিয়ে সিঁড়ি ভাঙবার বা এদিক ওদিক করবার দরকার নেই। কালকের ট্রেনের সেই দাদুও দারুন উৎসাহে সপরিবারে শিবালিকের দিকে হাঁটা লাগিয়েছেন।

কালকা মেলের ইঞ্জিনের সামনে এসে দেখি ড্রাইভার নেমে দাঁড়িয়ে আরেকজন সবুজ জামাপড়া ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বলছেন। মনে মনে তাঁকে বললাম, অনেক ধন্যবাদ আমাদের শিবালিক ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। প্রায় চারমাসের টেনশনের অবসান হয়েছে, আমায় আজ পায় কে? হ্যাটস অফ টু দ্যা ড্রাইভার বাবু। থ্রি চিয়ার্স ফর ইন্ডিয়ান রেলওয়ে, হিপ হিপ দৌড়োরে…

যাই হোক, দৌড়ে গিয়ে সিট দখল করলাম। টিকিটে যদিও ছিল একটা উইন্ডোসাইড, কিন্তু বাস্তবে দেখলাম দুটো সিট জানলার ধারে, ট্রেনের ডানদিকে। একটা সিঙ্গেল, একটা ডবল সিট। শিবালিকে আমাদের কোচ ছিল সি-৭। টিকিট কাটার সময়েই প্রেফারেন্স দিয়ে রেখেছিলাম। তার একটা রহস্য আছে। সি-৭ হল শিবালিকের শেষ কম্পার্টমেন্ট। কালকা সিমলা রেল ট্র্যাকের বেশিভাগটাই হালকা গোল বাঁক রয়েছে। তাই যেখানে যেখানে বাঁক আছে সেখানে এই শেষ কোচ থেকে ধোঁয়া ওড়ানো ইঞ্জিন সমেত পুরো ট্রেনটাকে সুন্দর দেখা যায়। আর যারা ফটোশিকারী, তাদের কাছে এ দৃশ্য যে কতটা লোভনীয় সে কথা আর না বলাই ভাল। কোচ পছন্দ করাটা আপনার হাতে, কিন্তু যেটা আপনার হাতে নেই, সেটা হল ডানদিকের সিট, নাকি বাঁদিকের। আমি যতদূর দেখেছি, বেশিভাগ ভিউ ডানদিকে বসলেই ভালো পাওয়া যায়। পুরো জার্নির প্রথমদিকটায় ডানদিকের জানলা থেকে পুরো উপত্যকার ছবি দেখা যায়। সিমলার কাছাকাছি পৌঁছে ডান ও বাঁ দুদিকেরই দৃশ্য সুন্দর। আরেকটা কারণ হল, যেহেতু আপনি উত্তর দিকে যাচ্ছেন, তাই আপনার ডানদিকটা পূর্বদিক। আর পূর্বদিকে কি হয়? ঠিক ধরেছেন, সূর্য ওঠে। সূর্যোদয়ের ছবি দেখতে চাইলেও আপনার অবশ্যই ডানদিকের সিট চাই। আবার সিমলা থেকে বিকেলে ছেড়ে যে ট্রেনটা কালকা পৌঁছয়, তার ক্ষেত্রে নিয়মটা ঠিক উল্টো।

যাই হোক, উঠে বসেছি ৫২৪৫১ আপ কালকা সিমলা শিবালিক ডিলাক্স এক্সপ্রেসের প্রথম শ্রেণীর চেয়ার কারে। লাল গদি মোড়া, পেছনে সাদা তোয়ালে। ব্যাপারই আলাদা এমন একটা ভাব। প্রত্যেকের সামনে খাবার টেবিল। প্রায় পা থেকে মাথা অবধি পরিষ্কার কাঁচের জানলা, পর্দাটানা। ট্রেন ছাড়া মাত্রই টিকিট চেক হয়ে গেল, প্রত্যেকের অরিজিনাল আইডি কার্ড সমেত। তারপর এলো গরম ধোঁয়াওঠা চায়ের কাপ। আর জলের বোতল। এবার আবার একটুখানি মোবাইল খুঁচিয়ে নিই। হ্যাঁ পেয়েছি, শিবালিক এক্সপ্রেসের ইতিহাস ভূগোল।

১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট হ্যারিংটন সাহেবের ওপর ভার পড়ল কালকার সঙ্গে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের গ্রীষ্মকালীন রাজধানী সিমলাকে রেলপথে জুড়তে হবে। সিমলা তো শুধু রাজধানীই নয়, ব্রিটিশ আর্মির সদর দফতরও বটে, ঘোড়ার গাড়িতে কি ওই পাহাড়ে চড়া যায়? ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জন কালকা থেকে সিমলা অবধি এই ন্যারোগেজ লাইনের উদ্বোধন করেন। প্রথমে দিল্লি-অম্বালা রেলওয়ে কোম্পানির হাতে থাকলেও পরে তা সরকার অধিগ্রহণ করে নেয়। তারপর আবার ইতিহাস ২০০৭ সালে, এই রেলওয়ে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের তকমা পায়। পাহাড় কেটে রেলপথ বানানোর আর্কিটেকচারের ক্ষেত্রে এ এক অনন্য উদাহরণ। ভাবলে অবাক হতে হয়, এই ৯৩ কিলোমিটার রেললাইনে ১০৭টি টানেল (তার মধ্যে ১০২ টি এখন ব্যবহৃত হয়) এবং ৮৬৪টি ব্রিজ আছে। টানেলগুলির অনেকগুলি আবার ছোট্ট একটা ব্রিজের মত, কোনো কোনোটি আবার কয়েক কিলোমিটার লম্বা। দেখতে দেখতে একটা ছবির মত সুন্দর স্টেশন পেরিয়ে গেল, নাম দেখলাম গুম্মান।

এদিকে সূর্য উঠছে। পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে পরিষ্কার আকাশে সূর্যের প্রথম আলো এসে পড়েছে আমাদের ট্রেনের গায়েও। লাল ট্রেনটা যেন কাঁসার থালার মত চকচক করে উঠল। গাছের পাতায় তার রিফ্লেক্সন। কোনো ভিউ পয়েন্টে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের সূর্যোদয় তো অনেক দেখেছি, কিন্তু ট্রেনে চলতে চলতে সূর্যোদয়ও যে এমন মায়াবী হতে পারে সেটা শিবলিকের দৌলতে জানা হল।

তারপর এল ধর্মপুর হিমাচল। ছোট্ট একতলা স্টেশন ঘর, কোথাও এতটুকু নোংরা নেই। গার্ডসাহেব হাসিমুখে আমাদের দিকে হাত নাড়ছেন। যদিও এ স্টেশনে দাঁড়ালো না, তবু যেন মনে হল দাঁড়ালেই ভাল হত। ঠিক যেন পোস্টকার্ডে আঁকা ছবি। তার খানিক পরেই গুমগুম শব্দে একটা টানেলে গিয়ে ঢুকলো ট্রেনটা। এতো বিশাল লম্বা টানেল, মাঝেমাঝে আবার লোক দাঁড়ানোর জন্য পাথুরে গর্ত করা আছে। এই টানেলে আবার মৃদু আলোও আছে, আর টানেলের মুখে নম্বর দিয়ে লেখা আছে কত নম্বর টানেল এটা। সঙ্গে দৈর্ঘ্যও। টানেল থেকে বেরোতেই ট্রেনটা ঘিসগিস শব্দে দাঁড়িয়ে পড়লো।

এটা বারোগ স্টেশন। আর আমরা পেরিয়ে এলাম বারোগ টানেল, যেটা নিয়ে একটা দুঃখের গল্প আছে। এই টানেল প্রায় দেড় কিলোমিটার লম্বা, পেরোতে সময় নেয় আড়াই মিনিট। শুনেছি বারোগ টানেলই নাকি পৃথিবীর দীর্ঘতম রেল টানেল যাতে কোনো বাঁক নেই। এই রেলপথের ইঞ্জিনিয়ার কর্নেল বারোগ নাকি এই টানেলটি খোঁড়ার সময় দুদিক থেকে পাথর কাটা শুরু করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুতেই গুহার দুইমুখ মেলাতে পারেন না। সরকারি কাজে ভুল হওয়াতে ব্রিটিশ রাজ্ তাঁকে ১ টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার টাকা দেওয়াটা তাঁর কাছে বড় ব্যাপার ছিল না, কিন্তু অভিমানী বারোগ সাহেব অপমানে গুলি করে আত্মহত্যা করেন। বারোগ সাহেবের প্রিয় কুকুরটি মালিকের এই অবস্থা দেখে ছুটে গিয়ে গ্রামবাসীদের ডেকে আনে। ততক্ষনে বারোগ সাহেবের মৃত্যু হয়েছে। তাঁর বারোগ সাহেবকে টানেলের মুখে রাস্তার ধরে একটি জায়গায় কবর দেওয়া হয়। পরে ইঞ্জিনিয়ার হ্যারিংটন এসে আবার সুড়ঙ্গ মেলাতে যান, কিন্তু তাতে তিনিও ব্যর্থ হন। সেখানে থাকতেন বাবা ভোলকু নাম এক সাধু। তাঁর সাহায্যে শেষ পর্যন্ত আসল জায়গা থেকে অনেকটা দূরে নতুন টানেল তৈরী হয় ১৯০০ সালে। বারোগ সাহেবের স্মৃতির উদ্যেশ্যে ৩৩নম্বর টানেলটির নাম দেওয়া হয় বারোগ টানেল ও সংলগ্ন স্টেশনটিরও নাম দেয়া হয় তাঁর নাম। বাবা ভোলকুর সম্মানার্থে বারোগ স্টেশনে একটি রেল মিউজিয়াম আছে। শোনা যায়, বারোগ টানেলে নাকি এখনো সাহেবের ভুত ঘোরাফেরা করে। আবার ৪৬ ও ১০৩ নম্বর টানেলদুটিও নাকি ভুতুড়ে।

যাই হোক, বারোগ স্টেশন থেকে আমাদের খাবার তোলা হল। দেখলাম একজন লোক ইঞ্জিন থেকে নেমে এসে স্টেশন ঘরের ভেতরে চলে গেল, লোকটাকে চেনা চেনা লাগল। বারোগে বেশ ঠান্ডা আছে। পাশেই একটা ছোট্ট কাঠের লজ। বারোগ টানেলের মুখটা হাঁ করে আছে, অনেকে ফটো তুলছে। ইন্ডিয়ান রেলওয়ের মাসকট হাতিটির একটা স্ট্যাচু আছে। খাড়া পাহাড়ের গায়ে লম্বা লম্বা পাইন গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে প্রহরীর মত। স্টেশনের ছবিটা ঠিক যেন হাতে আঁকা। তাতে সদ্য জলরং করা হয়েছে। সবুজ রংটা তো এখনো কাঁচা। সূর্যের আলোয় চারদিক ঝকঝক করছে, কোথাও এতটুকু মেঘ নেই। স্টেশনের ঘরটা, ফুলগাছগুলো, পাহাড়ের গা, নীল রঙের রেলিং সবেতেই যেন কে বেশি বেশি করে রং লাগিয়ে দিয়েছে। ও কাল হোলি গেছে, তাই প্রকৃতিও হোলি খেলেছে বুঝি?

যে লোকটা স্টেশনের ভেতরে গেছিল, সে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই ফিরে এল আর ট্রেনটাও ছেড়ে দিল। বাবা ভোলকু রেল মিউজিয়ামটা আর ঢুকে দেখা হল না। এবার মনে পড়েছে, এই লোকটাকে কালকা স্টেশনে দেখেছিলাম, কালকা মেলের ড্রাইভারের সঙ্গে গল্প করতে। কালকা মেল আর শিবালিক এক্সপ্রেস কানেক্টেড ট্রেন হওয়াতে ড্রাইভারদের মধ্যেও বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।

তারাদেবী বলে একটা স্টেশন পেরোলো। সিমলা বেশি দূর নয় আর। ইতিমধ্যে ব্রাউন ব্রেডে জ্যাম আর মাখন লাগিয়ে মুখে পুড়ে দিয়েছি। ডবল ডিমের অমলেটটা শেষ করে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইগুলোতে কামড় বসিয়েছি। আরে হ্যাঁ, ওই তো দেখা যাচ্ছে একটা বিশাল পতাকা উড়ছে, মানে ওই হচ্ছে সিমলা ম্যাল। তারপর আবার সে দৃশ্য গাছ পাহাড়ে ঢেকে গেল। শেষে এলো সামারহিল বলে একটা ছোট্ট স্টেশন। শেষে একটা চত্বর মতো জায়গায় এসে ট্রেনটা দাঁড়ালো। রেললাইনের একদিকে খাড়াই খাদ, আরেকদিকে প্ল্যাটফর্ম। স্টেশনের নাম সিমলা।

আমরা নামলাম, মালপত্র নামানো হল। কুলিতে ছেঁকে ধরলো। কেউ বলে হোটেল দেবে, কেউ বলে গাড়ি দেবে। কেউ বলে মাথায় করে রাখবে, জামাইআদর করবে। আমরা তাদের কবল ছাড়িয়ে ঢালু রাস্তা বেয়ে বেশ খানিকটা ওপরে উঠে গেলাম। গাড়িকে বললাম, কালীবাড়ি যাব।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (চতুর্থ পর্ব)

৩রা মার্চ, ২০১৮। সিমলা শহর।

চা টা যত না গরম, তার চেয়ে বেশি ধোঁয়া উঠছে। তবে বাইরে জব্বর ঠান্ডা, চা টা ভালোই লাগছে। যেইনা কালীবাড়িতে এসে পৌঁছেছি, শীত অমনি জাঁকিয়ে ধরেছে। শিবালিক পাবো কি পাবনা সেই টেনশন তো শেষ। এখন আরেক টেনশন, কাল থেকে আমাদের ঘুমচক্কর শুরু হয়ে যাবে। তার জন্য ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে হবে। সে পরে হবে, আপাতত কালীবাড়ি থেকে গোটা সিমলা শহরের দৃশ্য উপভোগ করি, আর চা টা শেষ করি।

সিমলা স্টেশনে কুলিদের গার্ড অফ অনার পেরিয়ে ঢালু রাস্তা বেয়ে কিছুটা উঠলেই গাড়ির স্ট্যান্ড। ফিক্সড রেটের গাড়ি নিয়ে পৌঁছে গেছি কালীবাড়ির কাছে এজি চক। এখান থেকে কালীবাড়ি অবধি কোনো গাড়ি যায় না, এই পথটুকু ভগবানপ্রদত্ত পা ই ভরসা। এজি চকে হিমাচল প্রদেশের একাউন্টস জেনারেলের অফিস, কলকাতায় যেমন এজি বেঙ্গল, তেমনি। তার থেকে দু’পা গেলেই স্টেট ব্যাংকের হেড অফিস, আর লাগোয়া তার গেস্ট হাউস। পাশেই পুলিশ সুপারের অফিস। মোট কথা, জায়গাটায় অফিসই অফিস। যেন কলকাতার ডালহৌসি চত্বর। সেখান থেকে আরো এগোলে রাস্তাটা দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। বাঁদিকের রাস্তাটা নিচের দিকে গেছে,তার পাশে কয়েকটা খাবার দোকান। ডানদিকেরটা সোজা উঠলে একটা মোড় নিয়েই কালীবাড়ির গেট। আবার এতটা না ঘুরে একটা শর্টকাট সিঁড়ি দিয়ে একটু উঠলেও কালীবাড়ির চাতালে পৌঁছে যাওয়া যায়। খুব না হলেও রাস্তা ভালোই খাড়াই, তাই শেষ অংশটুকু সিঁড়ি দিয়ে গেলেই ভালো হয়।

এ যা, চা টা একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেছে গো। আমাদের সঙ্গে সবসময়েই একটা ইলেকট্রিক কেটলি থাকে, তার জলটাও ঠান্ডা হয়ে গেছে। হবে নাই বা কেন, আজ এখানে টেম্পারেচার ২ডিগ্রি। মানালিতে তো -৬ বলছে, সেখানে কি হবে কে জানে। যাই হোক, কালীবাড়িতে পৌঁছেই ঘর পেয়ে গিয়েছিলাম। আগে থেকে মেইল করে বুক করা ছিল, সেই কাগজখানা হাতে নিয়ে হাসিহাসি মুখ করে রিসেপশনে দাঁড়াতেই একজন অবাঙালি লোক একটা জাবদা খাতায় নাম ধাম লিখিয়ে নিয়ে ঘরের চাবি দিয়ে দিলেন।

আমি অল্প অল্প লাফাচ্ছিলাম, আনন্দে আর এক্সাইটমেন্ট। কালীবাড়ি নিয়ে অনেক গল্প শুনেছিলাম, পজেটিভ নেগেটিভ দু’রকমই। তবে মাত্র আড়াইশো টাকায় কেমন ঘর পাওয়া যাবে সে নিয়ে আমারও একটু চিন্তা ছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকে দেখলাম, বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ঘর। বিশেষতঃ বাথরুমটা বেশ ভাল। তবে একটাই সমস্যা, গরম জলের ব্যবস্থা বাথরুমে থাকলেও সেই কলগুলো কাজ করে না। ঘরের ঠিক বাইরেই একটা কল থেকে চব্বিশ ঘন্টা ফুটন্ত জল মেলে। সব বোর্ডারই এখান থেকে জল নিয়ে যাচ্ছে। শুধু এটা ছাড়া ব্যবস্থা সত্যিই প্রশংসনীয়। খাবার জন্য একটা ডাইনিং হল আছে, সেখানে ব্রেকফাস্ট থেকে ডিনার অবধি বাঙালি খাবার পাওয়া যায়। খাবার দামও বেশ কম, আর স্বাদও ভাল। রিকোয়েস্ট করলে ঘরেও খাবার দিয়ে যায়। ঘরে একটা বড় কাঁচের জানলা আছে, সেটা দিয়ে ম্যাল থেকে শুরু করে প্রায় পুরো সিমলা শহরটাই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। এ যেন ঠিক কোনো ভিউপয়েন্ট থেকে দেখছি। ঠিক তখনই জানলা দিয়ে দেখলাম, একটা ছোট্ট ট্রেন এসে চুপচাপ সিমলা স্টেশনে দাঁড়ালো।

আমি ওরকম অল্প অল্প লাফাতে লাফাতেই প্রশ্ন করলাম কখন ম্যালে যাওয়া হবে। উত্তরে ধমক খেয়ে চুপ করে গেলাম। টের পাচ্ছিলাম, স্নান সেরে ফ্রেশ হওয়ার পর আমার আর তর সইছে না। সময় বহিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়… এখন দুপুর একটা। খাওয়া দাওয়ার পর বাঙালিকে জাগিয়ে রাখার জন্য এখনও কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। তাই ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কখন খেতে যাওয়া হবে?

দ্বিতীয়বার ধমক খেয়ে একদমই চুপ করে গেলাম। আবার মুখ খুললাম ডাইনিং হলে মাছের কালিয়া দেখে। চারদিকে সবাই বাঙালি, অনেকে এখানকারই বোর্ডার, অনেকেই আবার বাইরে থেকে শুধু লাঞ্চ করতে এসেছেন। সরু চালের ভাত, ডাল, ঝুরি আলুভাজা, বাঁধাকপির তরকারি আর মাছের কালিয়া দিয়ে ভাতগুলো শেষ করেই দেখি পিলপিলিয়ে লোকজন ম্যালের দিকে চলেছে। কপাল খুব ভালো ছিল সেদিন; খাওয়ার টেবিলেই একটা উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে স্থির হল যে খেয়ে উঠে ঘরে গিয়ে ‘একটু গড়িয়ে নেওয়ার’ প্রস্তাব খারিজ। এখন সোজ্জা ম্যালে যাওয়া হবে। যাই হোক, নিচে নামতে নামতে ফোনে একটু দেখে নিই কালীবাড়ির ইতিহাসটা। পরে সবাইকে বলতে হবে তো, নাকি?

সিমলার কালী অনেক প্রাচীন হলেও বর্তমান কালীবাড়িটি প্রতিষ্ঠা হয় শ্রী রামচরণ ব্রহ্মচারীর হাতে আর ব্রিটিশদের সহযোগিতায়, ১৮৪৫ সালে। দেবীর নাম শ্যামলা, আর তাঁর নামেই শহরের নাম সিমলা। আগে নাকি জাখু পাহাড়ে দেবীর অবস্থান ছিল, পরে ইংরেজরা দেবীকে বর্তমান মন্দিরে নিয়ে আসে। শিলাময় কালী মূর্তির পাশে দুটি লাল পাথরে রুপোর মুকুট পরানো অন্য দুটি ঠাকুর। সামনে অনেকটা বড় নাটমন্দির, পুরু গালিচা ঢাকা। সন্ধ্যেয় অসাধারণ আরতি হয়। কালীবাড়ির অতিথিশালাটি পুরোটাই জালে ঘেরা, কারণ গোটা সিমলা শহরেই বাঁদরের খুব উৎপাত। তবে বাঁদররা বেশ ভদ্র ওখানে, তেমন কিছু করে না, শুধু কারোর হাতে খাবার দেখলে ওরা আর নিজেদের স্থির রাখতে পারেনা। এমনকি মন্দিরের সামনের বিশাল চাতালে অনেক বাঁদর সপরিবারে বসে থাকে। ওদের বাচ্চাগুলো পিটপিট করে আপনার দিকে তাকাবে, আর কিছু বলবে না।

একটু নেমেই দেখি হুট করেই ম্যালের রাস্তায় এসে পড়েছি। চওড়া রাস্তা, তবে গাড়িঘোড়া কিছু চলেনা বলে লোকজন আনন্দে রাস্তার মাঝখান দিয়েই চলেছে। কালীবাড়ির ঠিক নিচে আর্মির ক্যাম্প, অনেকটা দার্জিলিঙের নামকরা স্কুলগুলোর মত গড়ন। এখানে যেকোন বাড়িই সেলফিযোগ্য, অর্থাৎ যেকোনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়েই আপনি সুন্দর ছবি তুলতে পারেন। আরেকটু এগিয়েই ডানদিকে বাঁদিকে বড় বড় দোকান। আইসক্রিম, কেক-পেস্ট্রি, পিৎজা-বার্গার থেকে শুরু করে রেস্টুরেন্ট, জামাকাপড়ের দোকান, সোয়েটারের দোকান, শালের শোরুম, ব্র্যান্ডেড পোশাকের দোকান কি নেই সেখানে? তবে ম্যালের ওপরে বলেই হয়ত জিনিসপত্রের দাম খানিক বেশি। বরং সেখান থেকে মিউনিসিপালিটির পাশ দিয়ে নেমে নিচের রাস্তার বাজারে জিনিসপত্র অনেক সস্তা। ওটার নাম লোয়ার বাজার। সেখানে আবার খুব ভিড়, পা ফেলার জায়গা নেই। খাবারের দোকান, শালের দোকানেই থেকেও বেশি সেখানে সোয়েটার আর জামাকাপড়ের শোরুম। দামও বেশ রিসনেবল।

এইত্তো, দোকান দেখলেই বাঙালির চলার গতি শ্লথ হয়ে আসে। একবার দোকানের দিকে, একবার রাস্তার দিকে তাকাতে তাকাতে শেষে ঢুকেই পড়তে হয়, এটাই ট্রেডিশন। বহুদিন ধরে চলে আসছে। ঢোকার পর দরাদরি, শেষে যুদ্ধ চলতে চলতেই কাস্টমারের হাতে দোকানদারের নিধন। শেষে বিজয়ীর মত হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসা। তারপর দোকানীও উঠে ভাবে ছাড় দিলাম না ঝাড় দিলাম? এদিকে বিকেল হতে চলল। বাঁপাশে বিএসএনএলের হেড অফিস, জিপিও ছাড়িয়ে একটু গেলেই রাস্তাটা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। ডানদিকেরটা নেমে গেছে লোয়ার বাজারের দিকে। আর বাঁদিকেরটা শেষ হয়েছে সিমলার বিখ্যাত চার্চের কাছে গিয়ে।

সিমলার এই রাস্তাটা নাকি হেরিটেজ ওয়াক। আর্মি ক্যাম্পের সামনে একটা সুন্দর মেমোরিয়াল স্কাল্পচার। একটু এগিয়ে ‘রিজ’, এখান থেকে চার্চ অবধি রাস্তাটা প্রায় সমতল। আরেকটু এগোলেই যে জায়গাটায় পড়ব, সেটার নাম স্ক্যান্ডাল পয়েন্ট। পাতিয়ালার মহারাজার সাথে ভাইসরয়ের কন্যার ‘স্ক্যান্ডাল’ ধরা পড়ে যাওয়ার স্মৃতি বহন করছে এই স্ক্যান্ডাল পয়েন্ট। সিমলা কি আজকের শহর? ধৌলাধার পর্বতমালার কোলে অবস্থিত ছোট্ট শহর তখন নেপালের রাজার দখলে। তখন ভারতের এক দেশীয় রাজা আরেক রাজার শত্রু। সেই সুযোগ নিয়ে পাতিয়ালার মহারাজার সাহায্যে ব্রিটিশরা দুর্দান্ত নেপালি গোর্খাদের পরাজিত করে। ভেট হিসাবে সিমলা শহর উপহার পান পাতিয়ালার রাজা। তবে উপহার দিয়েই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে, সিমলার আবহাওয়ার সাথে লন্ডনের অনেক মিল। এটাই তাদের দ্বিতীয় আবাস গড়ে তোলার উপযুক্ত জায়গা। সেই কারণেই, পরে নিজের প্রিয় শহরে নির্বাসিত হন পাতিয়ালার মহারাজ, ভাইসরয়ের মেয়ের সাথে প্রেমের অপরাধে। ১৮২২এ সিমলায় আসেন মেজর কেনেডি, আর তখন থেকে ১৮৪৭ এর মধ্যে সিমলাকে নিজেদের স্বপ্নের মত করে সাজায় ইংরেজরা। তাদের ভাষায় সিমলা হচ্ছে ‘জুয়েল অফ দ্যা ক্রাউন’। অবশ্য রেলপথ বসে আরো অনেক পরে। কিন্তু ততদিনে সিমলা নিজেকে মিনি লন্ডন হিসাবে সাজিয়ে নিয়েছে। সারা শহরময় ছড়িয়ে থাকা কলোনিয়াল বিল্ডিং আর ঢালু ছাদের লাল লাল বাড়িগুলো ঠিক যেন স্কটল্যান্ডের ছবি মনে করিয়ে দেয়।

ক্রাইস্ট চার্চ যেন সিমলা শহরের স্বাক্ষর। ভারতের দ্বিতীয় প্রাচীনতম চার্চ এটা। জানলায়, চূড়ায়, আর্কিটেকচারে সর্বত্র যেন অহংকার আর আভিজাত্যের জৌলুস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই সাদামাটা বাড়িটা। ভেতরে ঢোকার অবশ্য অনুমতি নেই। তবে তার পাশেই রাজ্য লাইব্রেরি। প্রতিটা বিল্ডিংই দেখার মত, দেখানোর মত। ভারতের আর কোনো শহরে এরকম পশ্চিমি আভিজাত্য চোখে পড়েনি। চার্চের সামনের রাস্তাটা অনেকটা চওড়া হয়ে প্রায় একটা মাঠের চেহারা নিয়েছে। অনেকে ঘোড়া চড়ছে, কেউ কেউ সুন্দর বেঞ্চগুলোতে বসে আছে, কেউ ছবি তুলছে, মোটকথা যে যার মত এনজয় করছে।

চার্চের আগেই ডানদিকে পড়বে গেটি থিয়েটার ও আর্ট গ্যালারি। যদিও ফ্রি এন্ট্রি, কিন্তু লোকজন ম্যাল নিয়ে এতটাই মশগুল যে এই গ্যালারিটা প্রায় খাঁ খাঁ করছে। অথচ রাস্তা থেকে সিঁড়ি দিয়ে কিছুটা নেমে গেলেই সেই আশ্চর্য সুন্দর আর সাজানো গ্যালারি। অসাধারণ ছবি আর ভাস্কর্য্যতে ঠাসা এতো সুন্দর গ্যালারি যে না এলে খুব বড় মিস হয়ে যেত। দুঃখের বিষয়, এখানে আমরা ছাড়া আর কেউ ছিলনা। এর পেছনে একশো আসনের থিয়েটার হল। শুনেছি এখানেই নাকি প্রথম মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতা হয়েছিল।

ম্যালে আস্তে আস্তে আলো জ্বলতে শুরু করেছে।এখন বিকেল পাঁচটা। কোথাও মৃদু গান হচ্ছে। সব মিলিয়ে এক অন্য দুনিয়া। ক্লান্তি নেই, ধুলো নেই, সবকিছু সাজানো, ঠিক যেরকম হওয়া উচিত সেরকম। একটুও বেশি নয়, একটু কমও নয়। পাথরের দেওয়াল দেওয়া বাড়িগুলো থেকে আভিজাত্য চুঁইয়ে পড়ছে। সিমলা যদি আসতে হয়, তাহলে এই ম্যালের কারণেই আরেকবার আসা যায়। ম্যালে একসময় নেটিভদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল, জায়গাটা ছিল শুধু ইংরেজদের জন্যে। ঠিক সেই জায়গাটায় ভারতের তেরঙ্গা পতাকাটা এখন পতপত করে উড়ছে। হিমাচল প্রদেশের স্থপতি ওয়াই এস পারমারের মূর্তি। আরেকদিকে লালা লাজপত রায়ের মূর্তি। ব্রিটিশদের প্রিয় সেই জায়গাটা এখন ভারতীয়দের অহংকার। কালীবাড়ি থেকে স্টেট ব্যাঙ্ক হয়ে ম্যাল অবধি এই রাস্তাটা এক নম্বর হেরিটেজ রাস্তা। আর দু’নম্বর হেরিটেজ রাস্তাটা জিপিওর পাশ দিয়ে উঠে গিয়ে কালীবাড়িতে শেষ হয়েছে। ওপথে পড়বে গ্রান্ড হোটেল, কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মচারীদের জন্যে হোটেল। তবে এখানে থাকতে গেলে অনেকটা পায়ে হাঁটা রাস্তা পেরোতে হবে।

ম্যাল এখন আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। হিমাচলী লোকজন খুব মিশুকে আর হাসিখুশি। একটা সুন্দর জিনিস দেখলাম, সিমলার কালীবাড়ি, মসজিদ, ক্রাইস্ট চার্চ আর দূরের ওই গুরুদ্বারা সবটাই এক সরলরেখায়। সব মিলিয়ে কেমন ছোটবেলার দিনগুলোর মত লাগছে। এখন যত ছোটবেলার দিনগুলোর দিকে তাকাই ততই রঙিন মনে হয়। সেখানে কোনো দুঃখের দিন নেই। ঠিক সেরকম রঙিন যেন এই শহরটা। যত রাত বাড়ছে ততই মায়াবী হয়ে উঠছে। ঝলমলে পোশাক, ঝকঝকে হাসি, মাদকতার মত পেয়ে বসছে। পা চলছে না। হেঁটে হেঁটে পা ক্লান্ত, কিন্তু হোটেলে ফিরতে মন চাইছে না। যেন বর্ষশেষের পার্ক স্ট্রিট এখানে সারা বছরই ঝকঝক করছে। এক রাতের জন্য হলেও এর রেশ অনেকদিন থাকবে।

রাট নটা। দোকানপাট থেকে লোক কমতে শুরু করেছে, এখন ফিরতি লোকজনের ভিড়।দুহাত ভর্তি ব্যাগে জিনিস, পেছনে ম্যালের রাস্তা আবার কালকের উৎসবের জন্য তৈরী হচ্ছে। রাতের ডিনার কালীবাড়িতেই করব। জ্বলজ্বল করছে ক্রাইস্ট চার্চ, উড়ছে ভারতের পতাকা। কাল যাব সিমলার আশেপাশে, কুফরী, নলদেহরা, মাশোবরা, অ্যাডভান্সড স্টাডিস, জাখু। তারপর রাতে আবার আসব ম্যালে। এই রাস্তাটার মায়া ছাড়ানো কি সহজ?

ফিরে গেলাম কালীবাড়ির অতিথিশালায়। সোয়াবিন আলুর তরকারি আর রুটি দিয়ে ডিনার সারা হল। ঘরের জানলা দিয়ে দেখলাম রাতের পাহাড়ে অজস্র আলো কেমন তারার মত জ্বলজ্বল করছে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে ম্যাল রোড, অন্নাডেল, চার্চ। কাল থেকে আসল ঘোরা শুরু হবে। কপালে থাকলে বরফও দেখা যেতে পারে। দেখা যাক কি হয়। বিছানায় পড়ার সাথে সাথেই চোখ টেনে ঘুম, কালকের জন্য এনার্জি সঞ্চয় করতে হবে তো?

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (পঞ্চম পর্ব)

৪ঠা মার্চ, ২০১৮। আজ সিমলার লোকাল সাইট সিইং করবার দিন।

– ক্যয়া হুয়া জি, পবন জি সে কন্ট্যাক্ট কর নেহি পা রাহা হুঁ। নেহি আয়েঙ্গে কেয়া? কল কর রাহা হুঁ, ফোন বিজি হ্যায়।

– কব সে ওয়েট কর রহে হ্যায়। আট বাজে নিকালনা থা, দশ বজ গয়া।

– দশ মিনিট অউর ওয়েট করেঙ্গে, আগর নেহি আতে হ্যায় তো হাম দুসরা ড্রাইভার দেখ লেঙ্গে।

মাথাটা গরম হয়ে গেছে। আরেকটু থাকলেই ধোঁয়া বেরোতো, তখন দমকল ডাকতে হত। যাই হোক যে ট্রাভেল এজেন্টকে যোগাযোগ করেছিলাম, সেই ভদ্রলোক খুবই বিনয়ী। উনি আমাকে বললেন এজি চক চলে যেতে, ওখানে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ড্রাইভার চলে আসবে। সকাল আটটায় আসার কথা, এখন প্রায় দশটা বাজে, আমার মাথা গরম হওয়ার দোষটা কোথায়?

আজ আমরা যাব কুফরী, নলদেহরা, মাসোবরা আর বাকি সিমলার সাইট সিয়িং। আমরা আছি সিমলা কালীবাড়িতে, সেখান থেকে এজি চক চলে এলাম ফটাফট। যদি দশ মিনিটে না আসে, তবে ঠিক অন্য ব্যবস্থা করব। দায়িত্বজ্ঞানহীন কোথাকার, এই ড্রাইভারের সাথে পাঁচ দিন ধরে ঘুরব? এখনই ভেবে ভয় করছে।

এজি চকে এসে দেখি, একটা চকচকে সুইফট ডিজায়ার দাঁড়িয়ে আছে, আর একজন অল্পবয়সী ড্রাইভার চিন্তিত মুখে জানলা দিয়ে ইতিউতি তাকাচ্ছে। নাম্বারটা তো মিলে যাচ্ছে ৪৯৩১। আচ্ছা, তবে তুমিই সেই আহাম্মক?

কাছে গিয়ে পরিচয় দিলাম, ফোনের কথাও বললাম। ড্রাইভার বিরস মুখে লক খুলে দিল, আমরা ভেতরে বসলাম। গাড়ি স্টার্ট দিয়েই সে বলল, সরি জি, মেরা ফোন কাম নেহি কর রহা থা।

– মানেটা কি? বিজি বলছে, আর তুমি বলছ কাজ করছে না?

– জি স্যার, আপনি একবার কল করুন। আমি সেই পৌনে আটটায় এজি চকে এসে দাঁড়িয়ে আছি।

কল করলাম, সত্যিই তাই, ড্যাশবোর্ডের ওপর ফোন রাখা, কিন্তু কোনো রিং হচ্ছে না, শুধু বলছে নাম্বর ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড ইজ কারেন্টলি বিজি, প্লিজ হোল্ড দ্যা লাইন…

– স্যার, আপনি একবার দেখুন না, হয়ত সেটিংসএ কিছু গোলমাল আছে।

– দিজিয়ে। হাতে নিলাম ফোনটা। বেশ বড়সড় স্মার্টফোন, সেটিংসও ঠিকই আছে। একবার অফ করে আবার ও করলাম, যদি কিছু হয়। আর একটা কলও করলাম, এবার রিং হল। ফোনটা ফেরত দিলাম পবনকে।

– থ্যাংক ইউ স্যার, অব তো লগতা হ্যায় ফোন আয়েগা ভি, জায়েগা ভি।

যাই হোক, আপাতত ওর কথা বিশ্বাস করে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। এদিকে দেখতে দেখতে আমরাও সিমলার মূল শহর ছাড়িয়ে কিছুটা দূরে এসে পড়েছি। সামনে একটা ওভারহেড বোর্ড, লেখা কুফরী তিন কিলোমিটার।

এই সেই কুফরী, যেখানে গুপী গাইন বাঘা বাইনের শুটিং হয়েছিল সেই কোনকালে। এক আকাশ নীল রং আর এক পাহাড় সবুজ কুফরীতে এসে মিশে গেছে। রাস্তার ধারে কাল রাতের বাসি বরফ পড়ে আছে, ঠিক যেন সাবানের ফেনা। তার ওপর ঘোড়ার মল পড়ে নোংরা হয়ে আছে।

কুফরী এসে কিছুটা নিরাশ হলাম, একে তো সেরকম বরফ নেই, তারওপর ঘোড়ায় চড়ে ওপরে না উঠলে তেমন কিছুই দেখার নেই। নিচে দু-একটা খাবার দোকান, আর অজস্র লোক ঘোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নিয়ে আপনাকে যাবেই, না গেলে দু-চারটে কথা শুনিয়ে দিতেও ছাড়ছে না। যাই হোক, ওপরে উঠলেও নিচের থেকে এমন কিছু ভাল দেখা যাচ্ছে না। শুধু ধৌলাধার শ্রেণীর বরফশৃঙ্গগুলো আরেকটু পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, এই যা। আরেকটা ব্যাপার হল, একে তো গাড়ি ওপরে যায় না, ঘোড়াই ভরসা। আর চাইলেও সে রাস্তায় হেঁটে যাওয়া যাবে না। পুরো রাস্তাটা ঘোড়ার মলে ভর্তি, কোথাও কোথাও হাঁটু অবধি ডুবে যাবে সেই নোংরায়।

যাই হোক, কুফরী দেখা হল। ভেবেছিলাম আরো কিছুটা উঠে ফাগু যাব, কিন্তু সবাই বলল কুফরী আর ফাগুর তেমন কোনো তফাৎ নেই। দেখা হল এই পর্যন্তই, মন ভরল না। রাস্তার ধরে একটু একটু বরফ দেখে কি মন ভরে? যাই হোক, পরের গন্তব্য মাসোবরা। একটু গেলেই ডানদিকে কয়েকটা হোটেল। পবন বলল এটাই মাসোবরা। দেখলাম, ঠিকই বলেছে, লেখাও আছে তাই। এরকম একটা গিজগিজে হোটেলওয়ালা জায়গা আর একটা পিকনিক স্পটের মত এই মাসোবরার এতো নাম?

এর পর নলদেহরা, এটা আশা করি ভাল হবে। কুফরী আর মাসোবরা বড্ড আশাহত করেছে। দুঃখী দুঃখী মনে সিমলা মানালীকে এন্তার শাপশাপান্ত করতে করতে চললুম নলদেহরার দিকে। কিন্তু এখানের অবস্থাও কুফরীর থেকে ভাল কিছু নয়, সেই ঘোড়া, নোংরা রাস্তা। ঘোড়ায় করে উঠলে ওপরে একটা গল্ফ খেলার মাঠ। আর কিছুই নেই।

ওভারহাইপড। ঠিক এই শব্দটাই মাথায় ঘুরছিল তখন। এতো কষ্ট করে, খরচ করে বেড়াতে এলাম এই দেখতে? সিমলা আসা পর্যন্ত বেশ ভালোই লাগছিল, কিন্তু সিমলার সাইট সিইং একরকম বেকার! মনটা খারাপ হয়ে গেল। হয়ত মানালি গিয়েও দেখব একই রকম, মোট কথা লোকে যা বলে তার এক পার্সেন্টও নয়। ফেরার সময় জাখু মন্দির পড়বে। অবশ্য সিমলার ম্যাল বা কালীবাড়ি থেকেই অনেক উঁচুতে একটা লাল রঙের হনুমান মূর্তি দেখা যাচ্ছিল, সেটাই জাখু। এখানেই নাকি সিমলার কালী দেবী শ্যামলার আদি নিবাস। যাই হোক, এবার ফেরার পালা। নেট থেকে দেখলাম, আরেকটা জায়গা আছে সিমলায় দেখবার। আইআইএএস, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ। চলতি নাম ভাইসরিগাল লজ। আর আরেকটা পরিচয় এটা একসময়ের ভাইসরয়ের বাড়ি, আর স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রপতির শীতকালীন আবাস। পবনকে জিজ্ঞেস করলাম, সে বলল চেনা তো দূরের কথা কখনো ওটার নামই শোনেনি।

ভাবলাম, কি হবে আর গিয়ে? কুফরী, মাসোবরা, নলদেহরা, জাখু কোনোটাই তেমন আহামরি লাগেনি। আহামরি কেন, মোটেও ভালো লাগেনি। ভাইসরিগাল লজও এরকমই কিছু একটা হবে। তাই আমি বললাম, থাকে, আর গিয়ে কাজ নেই।

পবনের হাবেভাবে বুঝছিলাম, কুফরী দেখে আমরা খুশি না হওয়াতে ও আমাদের চেয়েও বেশি দুঃখ পেয়েছে। কিছুটা গিয়েই সে বলল, আপকে পাস রাস্তা কে নিশান হ্যায় না?

রাস্তার ম্যাপ? আমি কি জীবন্ত অ্যাটলাস? নাকি আমি তুলোট কাগজের ম্যাপ নিয়ে গুপ্তধন খুঁজেতে বেড়িয়েছি?

– হ্যায় না? ফোনে তো সবারই ম্যাপ থাকে। আমারও আছে, আপনার কাছে নেই? জিপিএস।

– হ্যায় তো। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। জিপিএসে দেখলাম ভাইসরিগাল লজ অবসারভেটরি হিল বলে একটা পাহাড়ের মাথায়। কিন্তু পাহাড়ি রাস্তা জিপিএসে খুঁজে পাওয়া মুশকিলই নেহি নামুমকিন হ্যায়।

পবন দেখলাম হাল ছাড়ার পাত্র নয়, রাস্তার পুলিশকে জিজ্ঞেস করে লোকজনকে খুঁচিয়ে, আর কিছুটা ম্যাপ দেখে দেখে ঠিক একটা জায়গায় এসে পৌঁছলাম, অ্যারো দিয়ে লেখা আছে আইআইএএস ডানদিকে। কয়েকটা কলেজের ছেলেমেয়ে আসছিল, তারাও বলল একই কথা। শেষে একটা খাড়াই ভাঙা ভাঙা রাস্তা পেরিয়ে একটা বিরাট বড় চাতালে এলাম। সামনে লম্বা দোতলা কাঠের গেট, যেন কোনো রাজকীয় প্রাসাদে ঢুকছি। গেটের ওপরে পিতলের অক্ষরে ইংরাজীতে লেখা ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজ’। নিচে বেশ কিছু গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। পবন স্মার্টলি গাড়ি নিয়ে একদম ভেতরে ঢুকে গেল।

এটাও ওভারহাইপড একটা জায়গাই হবে, মনে মনে বলছিলাম আমি। কিন্তু পবন যে জায়গাটায় নামিয়ে দিয়ে গেল, সেখানে একটা আইল্যান্ড মত আছে। বাঁদিকে একটা টিকিট কাউন্টার। আর ডানদিকে পেল্লাই একটা রাজপ্রাসাদ।

টিকিট কাটা হল, এখানে দেশি লোকেদের থেকে বিদেশিদের ভিড় বেশি। এই ভবনটিতে এখন পোস্ট ডক্টরাল ফেলোশিপ পড়ানো হয়। অর্থাৎ এখানকার ন্যূনতম যোগ্যতা পিএইচডি। এমন একটা জায়গা দেখবার মতোই বই কি। সামনে বিরাট লন, মিহি করে ছাঁটা সবুজ ঘাসের গালিচা ঢাকা। আর তার সামনেই সিংহের মত দাঁড়িয়ে আছে ভাইসরয়ের বাড়ি। পাথরের দেওয়াল দেওয়া, দোতলা এই বাড়িটার প্রতিটা ইঁটে আভিজাত্য আর গৌরব। ব্রিটিশ আমলে ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের গ্রীষ্মকালীন আবাস হিসাবে তৈরী হলেও ১৯৪৭ থেকে ১৯৬৫ সাল অবধি রাষ্ট্রপতি এসে থাকতেন। দিল্লিতে মারাত্মক গরম হয় কিনা। তারপর ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন এই বাড়িটিকে শিক্ষার্থীদের জন্য উৎসর্গ করেন। তবে এখনো এখানে ত্রিশ টাকার টিকিট কেটে দেখে নেওয়া যায় এর বিশাল লাইব্রেরি, কনফারেন্স হল ও ডাইনিং রুম। এই বাড়িতেই নাকি পাকিস্তান ও পূর্ব-পাকিস্থান বিভাজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।

দেখতে ঠিক স্কটল্যান্ডের ক্যাসলগুলোর মত, পুরো বাড়িটার স্থাপত্যে এতটুকু খুঁত ধরবার জায়গা নেই। শুধু তাই নয়, বাড়ির সামনে থেকে পেছনের বাগান অবধি পুরোটাই ওয়েল-মেন্টইনড। কোথাও এতটুক ধুলো বা নোংরা নেই। কুফরী দেখা চোখ যেন এখানে এসে অনেকটা শান্তি পেল। এককথায় জায়গাটা সুন্দর, কিন্তু ঠিক কতটা সুন্দর সেটা বলে বোঝানো খুব মুশকিল। সবকিছু একদম ঠিক ঠিক, একটুও বেশি নয়, কম তো নয়ই। কি করে কম হবে; এই বাড়িতেই জওহরলাল নেহেরু থেকে আরম্ভ করে রাধাকৃষ্ণনের মত বরেণ্য রাষ্ট্রপতিরা থেকে গেছেন। আর কত বছর ধরে কত শত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এই ভবনের টেবিলে। সে সব নথি অবশ্য মিউজিয়ামে রাখারই মত। সেই বাড়ি দেখতে পাওয়া কি মুখের কথা? কিন্তু একটা জিনিস দেখে খুব অবাক লাগল, সাধারণ পর্যটকের ভিড় এখানে বেশ কম। বরং অনেক বেশি বিদেশি ঘুরছে আর এদিক ওদিক ছাত্রছাত্রীদের জটলা।

দেখতে দেখতে কোথা দিয়ে সময় কেটে গেল, বাইরে প্রচুর ফটো আর সেলফি তুললাম। যদিও ভিতরের ফটো তোলা বারণ। গাড়ি ছিল মেনগেটের বাইরে, আমরা হাঁটতে হাঁটতেই নিচে নেমে এলাম। এবার ফিরে যাব।

কিছুটা গিয়েই পবন বলল, অব কাঁহা যানা হ্যায়?

– হোটেল। আর কোথায় যাব?

– ম্যাল দেখবেন না স্যার?

– কাল দেখেছি, আজ সন্ধ্যের দিকে আরেকবার ম্যালে আসব। বরং ম্যালের কাছে ভাল খাবারের দোকান দেখে দাঁড় করিও।

– জি স্যার।

যাওয়ার পথে হিমাচল প্রদেশের বিধানসভা ভবনের সাথে দেখা হল। আকাশে একটু একটু মেঘ জমেছে। যাই হোক, ম্যালের ওপরে একটা পাঞ্জাবি হোটলে এসে লাঞ্চ করা হল। বাইরে টিপটিপ বৃষ্টি। খেতে খেতে গল্প চলছে টুকটাক। বাইরে বৃষ্টিও পড়ছে, তবে সেরকম গায়ে লাগার মত নয়। এখন দুপুরের শেষদিক, কিন্তু দূরের পাহাড়গুলো এখনই মেঘে ঢাকা। বৃষ্টি মাথায় করেই কালীবাড়ির দিকে চললাম।

এজি চক ছাড়িয়ে এসেছি, কালীবাড়ি আর মাত্র এক মিনিট। সিঁড়িতে ওঠার ঠিক মুখে বৃষ্টির সাথে দুটো পাথরের মত কি যেন পড়ল। সাথে সাথে আরো অনেক, শয়ে শয়ে, হাজারে হাজারে। ঠিক যেন শিলাবৃষ্টি, কিন্তু সবগুলো একই মাপের ছোট্ট ছোট্ট সাবুদানার মত। দেখতে দেখতে টিনের চালের ওপর যেন পিয়ানোর ধুন শুরু হয়ে গেল, রিমঝিম রিমঝিম। কয়েক মিনিটের মধ্যে পুরো চত্বর ছোট ছোট বরফের দানায় ভরে গেল। আমরা একটা ছাদের তলায় দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম।

একটু পরে বৃষ্টি থামল, তবে বরফের বৃষ্টি আমাদের মন ভরিয়ে দিয়েছে। বেশ কিছুক্ষন পর বরফগুলো গলতে শুরু করল। তার আগেই বাড়ির কার্নিশ, রাস্তা, ছাদ বরফে ঢেকে গেছে। তুষারপাত হয়ত এটা নয়, তবে বরফপাত তো বটেই। পুরো ঘটনাটা মেরেকেটে পনেরো মিনিটের, এরকমই বরফপাত কয়েকঘন্টা ধরে হলেই আমরা একটা তুষারশুভ্র সিমলা উপহার পেতাম।

এবার একটু বিশ্রাম নেওয়ার প্রয়োজন। সন্ধ্যে সাড়ে ছটা থেকে কালীবাড়িতে আরতি হয়। এটাও দেখার মত ব্যাপার। খুব বড় করে কিছু হয় না, কিন্তু মন্দিরের আর্তি যতই ছোট করে অনাড়ম্বরে হোক, সেটাই দেখতে ভাল লাগে।তবে সবচেয়ে নজর কাড়েন যিনি আরতির সময় কাঁসর বাজান আর আরতির শেষে জয়গীত করেন। যেমন উদাত্ত কণ্ঠস্বর তেমনি তাঁর হাতের ছন্দ। সবচেয়ে মজার ব্যাপার, ভদ্রলোক নিপাত পাগড়ি-পাঞ্জাবি-কড়া পরিহিত শিখধর্মের মানুষ। আরতির পর অঞ্জলি, পুজো দিয়ে মন্দির প্রদক্ষিণ করে আমরা ঘরে এলাম। তৈরী হয়ে শেষবারের মত ম্যালে যাব।

ম্যাল, কালকের দেখা ম্যাল আজও ঠিক তেমনই মায়াময়ী। আলো জ্বলে গেছে, হলদে চার্চটা বৃদ্ধ অভিজাত কর্তার মত ম্যালের একমাথায় দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেপুলের মত এপাশে ওপাশে গেইটি থিয়েটার, আলোজ্বলা আর্ট গ্যালারি। নাতি নাতনিদের মত অজস্র দোকান, ব্র্যান্ডেড গার্মেন্টস শপ। ম্যালে যেহেতু গাড়ি চলে না, তাই ওমাথায় একটা লিফটে চড়ে নিচে থেকে সোজা ওপরে ওঠা যায়। আমরা চার্চের নিচে দিয়ে লোয়ার বাজারে এলাম, কিছু কেনাকাটা করতে। সিমলার স্মারক আরকি। অদ্যই শেষ রজনী, কাল রওনা দেব মানালির উদ্দেশ্যে।

সন্ধ্যের পর থেকে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি। চারদিক ঝাপসা হয়ে গেছে। এই বৃষ্টিতে ধস পড়তে পারে। তা যদি নাও হয়, তাহলেও বৃষ্টির মধ্যে ঘুরতে কার ভালো লাগে? সিমলায় নাহয় আজকেই শেষ, কিন্তু মানালিতেও কি এরকমই বৃষ্টি হবে? ম্যাল থেকে হোটেলে ফিরেও একটাই চিন্তা। কুফরী, নলদেহরা, মাসোবরা এগুলোর এত নাম শুনেছিলাম, তাও মনে দাগ কাটতে পারলো কই। মানালিও কি সেরকম জায়গা? সেখানেও এরকম বৃষ্টি হচ্ছে না তো? সে জায়গাটাও কি এরকমই ওভারহাইপড। জানিনা, এত কষ্ট করে, খরচ করে এতদূর আসা, যদি মানালিও কুফরীর মত আশাহত করে। তার ওপরে আটটা থেকে মুষলধারে বৃষ্টি। নেহাত এখানে জল জমে না তাই, কলকাতা হলে দুঘন্টায় এরকম বৃষ্টিতে একহাঁটু জল জমে যেত। এই বৃষ্টি না থামলে আমাদের পুরো বেড়ানোটাই মাটি। কি হবে কি হবে ভাবতে ভাবতেই দুচোখ জুড়ে ঘুম এল।

মানালির গল্প কাল সকাল থেকে শুরু হবে, তবে সেই গল্প কি বৃষ্টিভেজা হবে নাকি কুফরীর মত হবে সেটাই এখন দেখার।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (ষষ্ঠ পর্ব)

৫ই মার্চ, ২০১৮। সিমলা থেকে মানালির পথে।

– গুড মর্নিং স্যার।

– গুড মর্নিং পবন।

আজ সক্কাল সক্কাল পবন এসে ঠিক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে।সাতটা বাজে, রেডি হয়ে তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়েছি। সিমলা থেকে মানালি নয় নয় করে আড়াইশো কিলোমিটারেরও বেশি হবে। তাই তাড়াতাড়িই বেরিয়ে পড়া ভালো।

ব্যাগগুলো ডিকিতে ঠাসতে গিয়ে দেখি একটা কম্বল আর একটা মাঝারি কিটস ব্যাগ আগে থেকেই ঢোকানো আছে। গাড়িতে ঢুকে পবনকে জিজ্ঞেস করলাম, ওগুলো কি তোমার? ও বলল, হ্যাঁ, বেশিরভাগ দিনই গাড়িতে গাড়িতে ট্যুর করাতে কেটে যায়, তাই ওগুলো সঙ্গেই থাকে। শুনে মনে হল কি সুন্দর জীবন, হিমালয়ের কোলে ঘুরে ঘুরে বেড়ানোটাই ওর কাজ। ও শুধু হাসল, কিছু বলল না।

গাড়ি চলছে, হালকা ভলিউমে গানও চলছে ‘ও তেনু সুট সুট করদা, ও নি তু লাগদি পাঞ্জাবন, লাগদি পাটোলা’। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে মাঝে মধ্যেই ওই গানটা চালাচ্ছে, বুঝলাম ওটা ওর বেশ প্রিয় গান। হিন্দি মিডিয়াম বলে ওই সিনেমাটা কিছুদিন আগেই বেরিয়েছে, গানটার মত সিনেমাটাও খুব মিষ্টি। এদিকে সিমলা শহর ছাড়িয়ে এসেছি, কিন্তু এখনো ম্যালের পতাকাটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। শুধু সিমলা যদি কখনো আসি তাহলে এই ম্যালের জন্যেই আসবো। আপাতত গুড বাই সিমলা!

কিছুটা গিয়ে পবন জিজ্ঞেস করল নাস্তা করবেন না? নাস্তা? হ্যাঁ, ব্রেকফাস্ট তো করিনি, শুধু এককাপ চা আর বিস্কুট খেয়ে বেরিয়েছি। নাস্তা না করলে পেটের মধ্যে যে করুন সুরে সেতার বাজছে, বেশ টের পাচ্ছি। বললাম একটা ভালো ধাবা দেখে দাঁড় করিও। সিমলা ছাড়িয়ে এখন জুঠঘ, ধরথ, ভুনা এইসব ছোট ছোট জনপদের মধ্যে দিয়ে চলেছি। এদিকে দূরে দুটো পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে একটা হিমশৈল দেখা যাচ্ছে। এমনকি তার গায়ের হিমবাহগুলোও পরিষ্কার হচ্ছে। পবন বলল ওটা মানালির কাছাকাছি। মানে ওই অত দূরে আমাদের যেতে হবে! এরই মধ্যে একটা জায়গায় গাড়িটা দাঁড় করিয়ে পবন বলল আপলোগ নাস্তা কর লিজিয়ে।

নামলাম। পাহাড়ের রাস্তায় এইসব ছোটোখাটো জায়গাগুলো খুব সুন্দর হয়। এটাও সেরকমই। আশেপাশে বাড়িঘর সেরকম নেই, শুধু পাশাপাশি দুটো ধাবা। তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী। দুজনেই ডাকাডাকি করছে বিস্তর। আমরা একটায় ঢুকলাম। এটার নাম কি জানিনা, পাশেরটার নাম শিবালিক বৈষ্ণ ধাবা। দোকানটার ভেতরে কিছু টেবিল চেয়ার, আর বাইরে কিছু। বাইরের একটা টেবিল দখল করে আমরা বসলাম। বলল আলুর পরোটা ছাড়া আর কিছু নেই।

যাই হোক, পেটের মিউজিক বন্ধ করতে গেলে আলুর পুরোটাই বা খারাপ কি? গরম গরম ধোঁয়া ওঠা আলুর পুর ভরা পরোটা, টকের হদ্দ একটা আচার, আর টক দই। কলকাতায় এই কম্বিনেশন মুখে তুললে অম্বল হওয়া আটকায় কে, কিন্তু ওখানে বেশ হজম হয়ে যায়। পরোটাগুলো এত মোটা যে রাত্তিরে লেপের বদলে গায়ে দিয়ে শোয়া যায়। তবে খেতে মন্দ নয়। এদিকে আরো কয়েকটা গাড়ি এসে দাঁড়াতে হোটেল মালিক নতুন কাস্টমারদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। আর কিছু লরি দাঁড়িয়ে আছে, তাদের ড্রাইভাররা পাশের ধাবায় বসেছে।

আমাদের নামিয়ে দিয়ে পবন রাস্তার উল্টোদিকে একটা কলে গিয়ে দাঁত মাজতে বসল। বেচারাকে এত সকালে ডাকা হয়েছে যে বাসি মুখেই বেরিয়ে পড়েছে। এদিকে আমাদের খাওয়া কমপ্লিট। পবন বলল সে এখন কিছু খাবে না, পরে চা খাবে। কি আর করা যাবে, খেয়ে দেয়ে আমরা গাড়িতে উঠলাম আবার।

এখন নটা। পবন বলল, একটু চা খেলে ভাল হত। চা আমরা আগেই খেয়েছি, কিন্তু জায়গাটার লোভ সামলাতে না পেরে দুদ্দাড়িয়ে গাড়ি থেকে নামলাম। দোকানির সঙ্গে পবনের বেশ ভাবসাব আছে মনে হল। তাড়িয়ে তাড়িয়ে চা খেয়ে আর একটু গল্প করে যখন ফিরে এল, ততক্ষনে আমরা অনেককটা ছবি আর সেলফি তুলে বাধ্য ছেলের মত গাড়িতে উঠে বসেছি। চা খেয়ে পবনেরও মেজাজ ফুরফুরে, নিজের থেকেই গল্প জুড়ে দিল।

পবনের বাড়ি বিলাসপুর। ছত্তিসগড়ের বিলাসপুর নয়, মানালির পথেই বিলাসপুর বলে একটা টাউন আছে, সেখানে। ফেব্রুয়ারিতে শেষবারের জন্য বাড়ি গেছে, এখন বেড়ানোর সিজন শুরু হয়ে যাবে, তাই সিমলায় ওর মেসেই এই কটা মাস থেকে আবার এপ্রিলে দু-তিনদিনের জন্য বাড়ি যাবে। আরো কিছু বলত হয়ত, কিন্তু পেছনের একটা লরি সমানে হর্ন দিয়ে দিয়ে মাথা খারাপ করে দিচ্ছিল। পবন বিরক্ত হয়ে লরিটাকে সাইড দিয়ে বলল, যা সিমরান যা। জি লে আপনা জিন্দেগী।

মাইলস্টোনে বরমানা বলে একটা জায়গা দেখাচ্ছিল। আমি প্রথমবার দেখেছিলাম বড়মামা। তারপর ভালো করে দেখলাম বরমানা। এদিকে রাস্তার রং পাল্টাচ্ছে, কেমন একটা ধূসর ধুলোময় পরিবেশ। একটু পরে ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। এখানে এসিসি সিমেন্টের একটা বিরাট প্লান্ট আছে, নাম গাগল সিমেন্ট ওয়ার্কস। দূর থেকে অবশ্য উঁচু উঁচু চিমনীগুলো চোখে পড়ছিল। সেই কারখানার সিমেন্টের ধুলো আর তার সাথে সারি সারি লরি এই রাস্তা দিয়ে সিমেন্ট নিয়ে যেতে যেতে গোটা জায়গাটারই এমন হাল করেছে। উল্টোদিকে কর্মচারীদের জন্য একটা টাউনশিপ, এসিসি কলোনি। বরমানার পরেই সুতলজ নদীর ব্রিজ পেরিয়ে এনটিপিসি র একটা বিদ্যুৎ প্রকল্প আছে।

সিমলা থেকে মানালি যাওয়ার রাস্তায় অনেক বাঁক আছে, কিন্তু তীব্র বাঁক, যাকে হেয়ার পিন বেন্ড বলে সেরকমটা কম। রাস্তার অবস্থাও খুবই ভাল। অনেক জায়গায় ডিভাইডার দেওয়া পরিষ্কার দুটো লেন। অনেকটা অংশ নতুন করে চওড়া হয়েছে, আরো কাজ চলছে। তেমনি রাস্তায় গাড়িও প্রচুর। বাস, লরি আর ছোট গাড়ী তো আছেই। তার সাথে আছে বাইকবাহিনী, গেরুয়া পতাকা লাগিয়ে মনিকরণ থেকে ফিরছে। জায়গায় জায়গায় গঞ্জ মত এলাকা, সেখানে পেট্রল পাম্প থেকে আরম্ভ করে মেকানিক, গাড়ির পার্টস, সবকিছুই পাওয়া যায়। আর সমস্ত রাস্তা জুড়ে আছে হিমালয়ের মনভোলানো সৌন্দর্য্য। মোট কথা কেউ যদি নিজের গাড়ি বা বাইকে করে এ রাস্তায় আসবেন মনে করেন তাহলে কোনো অসুবিধে হওয়ার কথা নয়।

সেই ছোটবেলায় পড়েছিলাম, হিমালয় পর্বতশ্রেণীকে তিনটে ভাগে ভাগ করা হয়েছে। মানে যেন ত্রিস্তরীয় নিরাপত্তা বলয়ে সে উত্তর ভারতকে ঘিরে রেখেছে। কোলের দিকে, অর্থাৎ ভারতের দিকে যে শ্রেণী, সেটার নাম শিবালিক। মাঝেরটার নাম মধ্য-হিমালয়। আর শেষেরটা, যেটা চীনের দিকে আছে, সেটা হিমাদ্রি বা হিমাচল। একটা শ্রেণী থেকে আরেকটা শ্রেণীর মাঝে রয়েছে বিস্তীর্ন সমভূমির মত জায়গা, যাকে উপত্যকা বলে। সিমলা শহরটা হল শিবালিক শ্রেণীতে, আর মানালি মধ্য-হিমালয়ে। তাদের মাঝের সেই উপত্যকা বা ভ্যালিই হচ্ছে বিখ্যাত কুলু ভ্যালি।

কুলু বলে একটা শহর আছে, কিন্তু কুলু ভ্যালি বেশ কিছুক্ষন আগেই শুরু হয়ে গেছে। অনেক দূরে পাহাড়, দুপাশে, সামনে-পেছনেও। মাঝের বিস্তীর্ন সমভূমির বুক চিরে মোলায়েম রাস্তা। আর রাস্তার দুপাশে চাষের জমি, ছোট ছোট ফার্মহাউস। অনেক জায়গায় রাস্তার ধার থেকে পাহাড়ের গা পর্যন্ত সর্ষেক্ষেত। কি অপূর্ব সে দৃশ্য। আগেকার কম্পিউটারে কার রেসিং গেমগুলোতে ঠিক যেরকম ভ্যালি দেখা যেত, এ যেন বাস্তবেই সেরকম। সুন্দর রাস্তা পেয়ে পবনবাবাজিও নিজের মত কার রেসিং শুরু করে দিয়েছে। অবশ্য মিথ্যে বলব না, আমরাও সেটা উপভোগ করছি।

কথায় কথায় পবনকে বললাম, রাস্তায় যে হানোগী মাতা মন্দির পড়বে সেটা দেখব। পবন কিছুটা অবাক হল, বলল আর কিছু দেখবেন না, শুধু হানোগী মাতা মন্দির? আমরা বললাম, আর কি আছে দেখার মত? পবন সাঁই করে গাড়ি ঘুরিয়ে একটা বাঁধের মত উঁচু রাস্তায় তুলে দিল।

জায়গাটার নাম সুন্দরনগর। আর জায়গাটাও ঠিক সেরকমই সুন্দর। এখানে যে লেকের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে আছি তার নাম সুন্দরনগর লেক। চারদিকে বাঁধানো পাড়, আর উত্তর দিকে সব বরফশৃঙ্গ, ছায়া পড়ছে লেকের জলে। এ যেন উত্তরাখণ্ডের দেওরিয়াতালের ম্যান মেড ভার্সন। আমাদের গাড়িটা দাঁড়াতে গিয়ে একটা কাদাজলওয়ালা গাড্ডায় পড়ে একগাদা জল ছেটাল। দুৰ্ভাগ্যবশতঃ সেটা গিয়ে লাগল মুখ পাউট করা এক সেলফি মামনির লাল রঙের আনারকলিতে। সেলফি মামনি রেগে কাঁই হয়ে তেড়ে আসবে, এরকম আশঙ্কা করে আমরা আগে থেকেই শোকপ্রস্তাব পাঠ করার জন্যে রেডি। কিন্তু পাহাড়ি মামনি তো, মেজাজ ঠান্ডা। পবনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে উল্টোদিকে চলে গেল।

পবনের হেব্বি আনন্দ। সেলফি মামনি তাকে দেখে মুচকি হেসেছে। গাড়ি চালাতে চালাতে নিজেই আপনমনে হাসছে। মাঝেমাঝে লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে চুল ঠিক করে নিচ্ছে। মোটকথা সে তখন অন্য জগতে ভাসছে। এদিকে আমাদের গাড়ি চলেছে মান্ডির দিকে। মান্ডি বেশ বড় শহর, এখান থেকে হিমাচলের বিভিন্ন জায়গায় বাস চলাচল করে। মান্ডি পর্যন্ত প্রায় সমতল রাস্তা, অর্থাৎ কুলু ভ্যালি এই মান্ডিতেই শেষ। এবার মধ্য-হিমালয়ে চড়বার পালা। এখানে গুরু গোবিন্দ সিংজির গুরুদ্বারা আছে। মান্ডি বাসস্ট্যান্ড ছাড়াতেই আমাদের বাঁদিকে একটা নদী পেলাম, এটা বিয়াস নদী। বাংলায় যাকে বলে বিপাশা। সিন্ধুর উপনদী, আমাদের সঙ্গে সঙ্গে সেই মানালি অবধি যাওয়ার কথা।

মান্ডির পরে পান্ডোয়া বলে একটা জায়গা আছে, এটা মূলত একটা ড্যামের জন্যেই বিখ্যাত। আমাদের আবদারে পবনকে আবার গাড়ি থামাতে হল, কিন্তু দুপিস বাঁদরের অত্যাচারে আমাদের আর সেখানে নামা হল না। গাড়ি থেকেই দেখলাম, দূরে নদীর জলকে অনেক কষ্টে মানুষ আটকেছে। কিন্তু পাহাড়ি নদী, সরু হলে কি হবে, তার তেজ তো কম নয়। ওই আচমকা বাধা পেয়ে সে হুলুস্থুলু বাধিয়েছে। মনে হচ্ছে সাদা ফেনাজল যেন আছাড় খেয়ে বাঁধের বাইরে বেরিয়ে আসবে যে কোন মুহূর্তে।

পান্ডোয়ায় বিয়াস নদীকে একবার পেরোতে হয়, আর তারপরেই এ নদীর আকার আয়তন যেন তিনগুন বেড়ে যায়। এবার বিয়াসকে ডানদিকে রেখে আবার নির্ভেজাল পাহাড়ি রাস্তা শুরু। একটু যেতেই পবন বলল, লো জি, আপকা হানোগী আ গয়া। দেখলাম, কয়েকটা চায়ের দোকানের পেছনে ঝুলছে একটা ঝুলন্ত ব্রিজ। সে ব্রিজ যেকোনো দিন খুলে পড়তে পারে। খুবই দায়সারা গোছের কতগুলো দড়ি দিয়ে কে বা কারা বেঁধে রেখেছে, আর সে ব্রিজ হাওয়ায় উদ্দাম দুলছে। এ ব্রিজ যে খুলে পড়ছে না এই আশ্চর্য্য, তবে তার ওপর দিয়েই মানুজন চলছে। এমনকি পিঠে মাল নিয়ে গাধাও চলেছে। গাধা বলেই অত ভারী ভারী বস্তা নিয়ে চলছে, মানুষ হলে কবেই হার্টফেল করত। এই ব্রিজের ও মাথায় একটা হোটেল আছে, তবে ভগবান করুন আমার পরম শত্রুকেও যেন এই ব্রিজ পেরিয়ে কখনো ওই হোটেলে যেতে না হয়। নিচে উত্তাল বিয়াস নদী, তার ওপরে ভাঙা কাঠের পাটাতনের ব্রিজ। দড়ি ছেঁড়া, মরচে ধরা রেলিং। আমরা ব্রিজ ধরে কিছুটা এগোলাম, তারপর হাওয়ার তাড়ায় দুদ্দুর করে দৌড়ে গাড়িতে এসে বসলাম। এর খানিক পরেই হানোগী মাতার মন্দির। একদম রাস্তার ওপরে সাদা রঙের ছোটোখাটো মন্দির। ভেতরে বৈষ্ণদেবী অধিষ্ঠিতা। আমাদের গাড়িটা উল্টোদিকে দাঁড়িয়েছিল। দরজা খুলে বেরোতেই গাড়ির মাথায় টুকটুক করে কয়েকটা পাথরের টুকরো পড়ল। একজন মোটাসোটা পুলিশ এসে হাসিহাসি মুখ করে বলল, গাড়িটা একটু এগিয়ে রাখলে ভালো হয়। এখানে পাহাড় থেকে একটু পাথর পড়ে তো… ওর কথা শেষ হতে না হতেই আমরা লাফিয়ে ত্রিশ হাত দূরে ল্যান্ড করলাম। ওদের কাছে পাথর পড়াও যেন বৃষ্টি পড়ার মতোই সাধারণ ঘটনা। যাই হোক, হানোগী মাতা মন্দির থেকে খানিক দূরে এ পথের সবচেয়ে বড় জলপ্রপাত। পরে জেনেছিলাম ওর নাম ম্যাক ফলস। এখন শীতের শেষ বলে তেমন জল নেই, কিন্তু বর্ষায় যে কি রূপ হয় সে ওর আশপাশের পাথরগুলোর গায়ের কালসিটে দেখেই বোঝা যায়।

অনেক্ষন ধরেই মাইলস্টোনের গায়ে একটা জায়গার নাম চোখে পড়ছিল ‘ঔট’। হানোগী মাতা মন্দির থেকে কিছুক্ষন গিয়েই দেখলাম সেই ঔট, যেখানে একটা দুর্দান্ত সুড়ঙ্গপথের সাক্ষী হব আমরা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই টানেলের বিরাট হাঁ মুখের মধ্যে আমাদের গাড়িটা ঢুকে গেল। দিনের বেলাতেও ঘোরঘুট্টি অন্ধকার, তবে সে রাস্তায় মাঝে মাঝে বাল্ব লাগানো আছে। চওড়া দুই লেনের দুদিক দিয়েই হু হু করে গাড়ি ছুটছে। ঔট টানেল ভারতের দ্বিতীয় দীর্ঘতম সড়ক সুড়ঙ্গ, এবং ভারতের সবচেয়ে দুর্ঘটনাপ্রবণ টানেল। অথচ সিমলা বা চন্ডিগড়ের সঙ্গে মানালি হয়ে লে-লাদাখ পর্যন্ত সংযোগ রক্ষা করে। প্রায় তিন কিলোমিটার লম্বা, কিন্তু শেষ হতে যেন একযুগ কেটে যায়। মাঝেমাঝেই বাঁক, আর তাই গাড়ির মুহুর্মুহু হর্ন প্রতিধ্বনিত হয়ে ভৌতিক এক আর্তনাদ তৈরী করে। টানেলের মাঝে যদি কেউ আটকে পড়ে, তবে বেরিয়ে আসা কঠিন। আর তারচেয়েও কঠিন ওই বদ্ধ সুড়ঙ্গে নিঃশ্বাস নেওয়া।

টানেল থেকে বেরিয়ে একটা হাঁফ ছাড়লাম। কাঁচখোলা চলন্ত গাড়িতেও যে ক্লস্ট্রোফোবিয়া হতে পারে, সেটা ঔট টানেলের ভেতরে না ঢুকলে কোনোদিন বুঝতে পারতাম না। ঔটের পরে উল্লেখযোগ্য জায়গা বলতে ভুন্টার। মাঝে একটা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র আছে অবশ্য। ভুন্টার একটা ছোট্ট এয়ারপোর্ট, নাম কুলু-মানালি এয়ারপোর্ট। তবে স্থানীয় মানুষদের কাছে ওটা ভুন্টার হাওয়াই আড্ডা। রাস্তার পাশে গেট দেওয়া ছোট্ট মাঠের মধ্যে একটাই রানওয়ে এই এয়ারপোর্টে। এমনকি কোনো প্লেন দাঁড়িয়ে থাকতেও দেখলাম না। ভুন্টারে গুরু নানকদেবের এক ঐতিহাসিক গুরুদ্বারা রয়েছে। বরফের পাহাড়গুলো অনেক্ষন ধরেই কাছে আসছে, কিন্তু ভুন্টার ছাড়াতেই যেন মনে হল গাড়িটা ঠিক ওই বরফের পাহাড়গুলোর নিচে দিয়েই যাচ্ছে, একটু হাত বাড়ালেই ওদের ছুঁতে পারব। পাহাড়ের গায়ের গাছগুলোও পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। পবন বলল, কিতনা খুবসুরত হ্যায়। আমরা তখন ভেবেছিলাম ও পাহাড়ের কথা বলছে, কিন্তু পরে বুঝলাম ওর মনে তখন সেলফি মামনির চিন্তা চলছে।

দুপুর তিনটে এখন। দূরে মানালি শহরটা দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু তার সাথে দেখতে পাচ্ছি মানালি শহরের ওপরে একরাশ ঘন কালো মেঘ চেপে বসে আছে। এমনকি এখানেও তার জোলো হাওয়া মালুম হচ্ছে। পবন নিজে থেকেই বলল, আপনাদের কপাল খারাপ। মানালিতে এই অসময়েও বারিষ হবে। মেঘ দেখে মনে হচ্ছে খুব বারিষ আসতে চলছে, তার সাথে ঝড়ও।

যত সময় যাচ্ছে মেঘের রং ততই কালো হচ্ছে। কাল রাতে সিমলায় বৃষ্টি হয়েছে খুব। আবার আজ সকাল থেকে আকাশ একদম ঝকঝকে।এখন মানালিতে বৃষ্টি আসছে। আমরা কি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে চলছি? এবারের মানালি বেড়ানোটা হোটেলে বসেই কাটবে।

মানালি আর কুড়ি কিলোমিটার। অন্তত মাইলফলক তো তাই বলছে। এই জায়গাটার নাম নগগর, মানালি থেকে একদিন এখানে আসা ইচ্ছে আছে। কিন্তু আকাশের যা হাল দেখছি তাতে মনে তো হচ্ছেনা যে একদিনও হোটেল থেকে বেরোতে পারবো বলে। পবনের কথামত সত্যিই এটা যদি ক্লাউড বার্স্ট বা মেঘ ভাঙা বৃষ্টির লক্ষণ হয়, তাহলে তো বাড়ি ফেরাও অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে। মেঘ আরো ঘন আর কালো হচ্ছে, যেন কোনও ভয়ানক তান্ডবের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সকালের আলুর পরোটা পেট ভরিয়ে রেখেছে বলে আমরা দুপুরের লাঞ্চটা স্কিপ করেছি। পবন তো সকালে তেমন কিছু খায়নি, মানালি ঢোকার আগে আমরা একরকম জোর করেই ওকে খেতে বসালাম। যে জায়গায় ও গাড়িটা রেখেছে, তার পাশে একটা বড় বাগান। অনেকগুলো একই রকম গাছ, আর তাতে কোনো ফুল-ফল-পাতা কিছু নেই, একদম ন্যাড়া। স্থানীয় একটা দর্জির দোকানে জিজ্ঞেস করে জানলাম ওগুলো আপেল গাছ। রাস্তার ধারে, বাড়ির বাগানে, এখানে ওখানে যত্নে-অযত্নে কত যে আপেল গাছ গজিয়ে উঠেছে সে গুনে শেষ করা যাবে না। দুর্ভাগ্য, এখানে আমরা একটা আপেল গাছেও ফল পাইনি।

কোনোরকমে নাকে-মুখে গুঁজে পবন গাড়িতে ফিরে এল, বলল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মানালি পৌঁছতে হবে। রাস্তার ঝড় শুরু হলে গাড়ি চালানো যাবে না। তীরবেগে গাড়ি এগিয়ে চলল মানালির দিকে। মেঘ আরো ঘন হচ্ছে, হওয়ার বেগও বেড়েছে। হোটেলে ফোন করে বলে দিলাম আমরা আর আধঘন্টার মধ্যেই পৌঁছচ্ছি।

সাড়ে চারটে। শেষবারের মত বিয়াসনদীকে ক্রস করে আমাদের গাড়িটা মানালি ম্যাল রোডের চকে এসে দাঁড়ালো। আমাদের যে হোটেলে কথা বলা ছিল, তিনি লোক পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ঠিক নিজের বাড়ির অতিথির মত সে আমাদের নিয়ে গেল। হোটেলের পজিশনটাও দুর্দান্ত, ম্যালের ঠিক মাঝখানে, রাস্তার ওপরেই ঘর, তিনতলায়। চওড়া বারান্দা ম্যালের দিকে ফেসিং। যাক, কোথাও ঘুরতে না পেলেও হোটেলের ব্যালকনি থেকে ম্যালরোড দেখেই তিন দিন কাটিয়ে দেব।

হোটেলের নিচে রেস্টুরেন্ট, নাম সত্যম রেস্টুরেন্ট। ওখানেই জলখাবারের অর্ডার দিয়ে যখন ঘরে ঢুকলাম তখন বাইরে শোঁ শোঁ শব্দে হাওয়া দিচ্ছে। মেঘ ভাঙা বৃষ্টি নাকি ক্লাউড বার্স্ট, যাই হোক সে তান্ডব শুরু হলো বলে।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (সপ্তম পর্ব)

৫ই মার্চ, ২০১৮। মানালি ম্যাল।

-অ্যাই ছেলে।

পেছন ফিরে দেখি কালকা মেলের সেই দাদু। একসঙ্গে ট্রেনে এসেছি, তারপর কোথায় যে হারিয়ে গেলেন সিমলায় আর ওনাদের দেখাই পাইনি। এই মানালিতে আবার মোলাকাত।

কাছে গেলাম, বললেন, কোথায় উঠেছ?

আমি বললাম, ওই তো ম্যালের ওপরেই একটা হোটেলে। বলে আঙ্গুল দিয়ে হোটেলের ঘরটা দেখালাম।

দাদু বললেন, বাহ্, খাসা তো। একদম ম্যালের রাস্তার ওপরে। বারান্দায় গামছা মেললেও তো তার জল রাস্তার লোকের গায়ে পড়বে।

আমি বললাম, হ্যাঁ সেই জন্যেই তো বারান্দায় জামা কাপড় মেলা বারন। তবে ব্যালকনি থেকে বসে বসে ম্যাল দেখা যায়, নিচে না নামলেও হয়।

দাদু ভুরু কুঁচকে আমায় বললেন, ধুস তাই কখনো হয়? বেড়াতে এসে যদি হোটেলেই থাকব তাহলে আর বেড়াতে আসা কেন?

সে তো বটেই। আমি প্রসঙ্গ পাল্টানোর চেষ্টা করে বললাম, কোথায় চললেন?

দাদু একটা খয়েরি রঙের সোয়েটারের ওপরে ছাইরঙা চাদর নিয়েছেন। মনে হল তার নিচে আরেকটা হাতকাটা সোয়েটার আছে। পরনে ধুতি, আর হাঁটু অবধি সাদা মোজা। পায়ে পাম্পশু। গ্লাভস পড়া হাতটা একটুখানি বের করে দাড়ি চুলকে বললেন, বেজায় ঠান্ডা। তোমার ঠান্ডা লাগছে না?

বুঝলাম, আমার আগের প্রশ্নটা দাদু শুনতে পাননি। যাই হোক, দাদুর সঙ্গে কথা বলার পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে জানি ওনাকে একবার চালু করে দিলে থামানো মুশকিল। বললাম, হ্যাঁ লাগছে বই কি।

দাদু বললেন, একাই বেরিয়েছ?

আমি বললাম, না না বাকিরা ওই বেঞ্চিতে বসে আছে। আমি একটু হাঁটছি।

দাদু বললেন, আমিও তাই। ছেলে, বৌমা, নাতনি ওইদিকে কি সব কিনছে। চলো না, ওদিকে ওই মন্দিরটায় যাই।

আমি বললাম, ওদিক থেকেই তো এলাম। এখন উল্টোদিকে যাচ্ছি। বলেই দাদুর মুখ দেখে বুঝলাম ওনার খুব ইচ্ছে হয়েছে ওই দুর্গা মন্দিরটা দেখার, তাই বললাম, আপনার যেতে ইচ্ছে করছে?

দাদু ঢকঢক করে মাথা নাড়লেন। আমি বললাম চলুন তবে।

মানালি আসার সময় যে কালো করে আসা মেঘ দেখেছিলাম, সেটা আধঘন্টার মধ্যেই কেটে গিয়ে আকাশ ঝকঝকে হয়ে গেছে। তাই দেখে আমরাও মনের আনন্দে ম্যাল ঘুরতে বেরিয়ে পড়েছি। এখন বিকেল সাড়ে পাঁচটা। দোকানপাট সব খুলে গেছে। আর সমস্ত উপত্যকা আলোয় ঝলমল করতে শুরু করেছে। দাদু মন্দিরটা দেখিয়ে বললেন, ওটা দক্ষিণ দিক না?

আমি হিসেবে করে বললাম হ্যাঁ, মানালির ম্যালটা উত্তর দক্ষিণে বিস্তৃত। উত্তর প্রান্তে গাড়ি দাঁড়ায়, আর দক্ষিণ প্রান্তে ওই মন্দিরের পরেই বাসস্ট্যান্ড। এমনিতে সিমলার থেকে অনেক ছোট।

দাদু আমার দিকে তাকিয়ে সিরিয়াস মুখে বললেন, সিমলার ছোট ভাই?

আমি হাসলাম।

মন্দির এমন আহামরি কিছু নয়, কিন্তু রাস্তার ওপর ছোট্ট মন্দিরটা বেশ মন ভালো করা। দাদু অনেক্ষন ধরে প্রণাম করলেন, পাঞ্জাবির বুকপকেট থেকে তিন-চারটে খুচরো কয়েন বের করে তার থেকে একটা দু-টাকার কয়েন প্রণামী বাক্সে ফেলেও দিলেন। বললেন মন্দিরটা কাঠের দেখো, আর কিরকম ঝুমকোর মত নকশা করা। হাওয়ায় দুলছে কেমন। আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি দিলাম।

তারপর পুরোহিতের কাছে গিয়ে হাত পেতে বললেন, চরণামৃত হ্যায়?

পুরোহিত হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

দাদু আবার বললেন, চরণামৃত, লেগ ওয়াটার। হ্যায়?

পুরোহিত মাথামুন্ডু কিছু উদ্ধার করতে না পেরে নিজের কাজে মন দিলেন। চরণামৃতের ঠিক কি হিন্দি হতে পারে সেটা আমারও জানা ছিলনা বলে দাদুকে কোনো সাহায্য করতে পারলাম না।

দাদু নেমে এসে জুতো পড়লেন। পড়েই বললেন আচ্ছা চরণামৃতের ইংরেজি বোধহয় ফুট-ওয়াটার হবে, তাইনা? তাই লেগ-ওয়াটার বলাতে বুঝল না। হ্যাঁ, ঠাকুরের পা তো আর হাঁটু থেকে ধোয়ায় না, শুধু পায়ের পাতাটুকু। ইস, ফুট-ওয়াটারই হত, পুরুতটা বুঝল না।

আমাদের কথাবার্তা আরো চলতে থাকত, কিন্তু একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোককে দেখে দাদু কেমন গুটিয়ে গেলেন। তাড়াহুড়ো করে আমায় বললেন তাহলে এখন আসি, কেমন?

ওই ভদ্রলোককেও আগে ট্রেনেই দেখেছি। দাদুর ছেলে। তিনি আমার অস্তিত্বকেই একেবারে ইগনোর করে দাদুকে ধমক দিয়ে বললেন, তুমি কাউকে কিছু না বলে কোন আক্কেলে এতদূর চলে এসেছ? আমরা ওদিকে খুঁজে খুঁজে হয়রান।

দাদুর মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়ে গেছে। মিনমিন করে বললেন, আসলে এই ছেলেটা খুব ধরল দাদু আমাকে একটু মন্দিরটা ঘুরিয়ে আনবে? তাই এলাম।

আমি তো হাঁ! দাদুর ছেলেও যে খুব একটা কনভিন্সড তা মনে হল না। একটা ইয়ং ছেলে যে আসি বছরের বৃদ্ধ মানুষের কাছে ‘মন্দির যাব, মন্দির যাব’ করে পীড়াপীড়ি করতে পারে, তা যে কোন লোকই বিশ্বাস করবে না সেটাই স্বাভাবিক। দাদুর ছেলে বললেন, তবে আর কি, ঘোরো। আমরা ওইদিকে আছি। নিজের দায়িত্বে ফিরে এসো, তাহলেই হবে।

শেষ দুটো কথা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে হনহন করে চলে গেলেন ভদ্রলোক। যাকগে, এই বয়স্ক মানুষটার জন্য এটুকু অপমান হজম করাই যায়।

দাদু বললেন চলো চলো, ওই দোকানগুলো দেখি।

আমার একটু নিজের মত ঘোরার ইচ্ছে ছিল, সেটা আপাতত বিসর্জন দিয়ে দাদুর সঙ্গী হয়ে গেলাম।

একটু গিয়েই দাদু কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন, কি সুন্দর বরফ দেখো। তারপর আমাকে রীতিমত ধমকে বললেন, অ্যাই, ওই ক্যামেরা রেখে আগে ভাল করে চোখ দিয়ে দেখো তো।

দেখলাম। যেটা দেখছি সেটা ক্যামেরাকে আর দেখানো হল না। সামনের পাহাড়ের গায়ে সাদা বরফ। চূড়া থেকে মাঝখান অবধি টানা বরফের চাদর, নিচের দিকে একটু ছেঁড়া ছেঁড়া। সূর্যের শেষ আলো পড়ে সোনালী রং নিয়েছে। যেখানে আলো পড়ছে না, সেই জায়গাটা নীলচে রং। দুপাশে দুটো পাহাড়, দুটোতেই এক অবস্থা, তবে পশ্চিমের পাহাড়ে এই রঙের খেলাটা চলছে। আমি একটু সাইড হয়ে গিয়ে টুক করে একটা ফটো তুলে নিলাম।

হাঁটতে হাঁটতে দাদু বললেন, ওগুলো কি করছে গো?

দেখলাম, ম্যালের ওপর ছোট ছোট দোকানে কাঠের নেমপ্লেট লেখা হচ্ছে। বললাম, ওগুলো নেমপ্লেটের দোকান। ওরা কাঠের প্লেটের ওপর নাম ঠিকানা লিখে দেয়, সেই ফলক আপনি বাড়ির সদর দরজায় বা গেটে লাগাতে পারেন। দাদু তো কাছে গিয়ে দেখে খুব খুশি। দোকানিকে একটা খালি প্লেট দেখিয়ে বললেন, লিখতে পারবে নিখিল কুমার মিত্র? নীল কালি দিয়ে লিখবে। লোকটা দাদুর নাম বা রং নিয়ে মোটেও আগ্রহী নয়, শুধু বলল দেড়শ রুপিয়া।

দাদু একবার চশমার ওপর দিয়ে লোকটাকে দেখে নিয়ে বললেন, ওরেব্বাবা, আর দু-বছরের জন্য দেড়শ টাকার ফলক কি হবে? আমি ভেবেছিলাম দশ-বিশ টাকা হবে। চলো চলো, অন্য দোকানগুলো দেখি।

দু-বছরের গল্পটা বুঝলাম না। একটু পরে নিজেই বললেন, আমার কুষ্ঠিতে আছে আর দু’বছর বাঁচব। তারপর তো বাড়ির মালিকের নাম চেঞ্জ করতেই হবে, তাই না?

আমি বললাম, না না আপনি আরো অনেকদিন বাঁচবেন।

দাদু বললেন, কি করে বাঁচব? কুষ্ঠিতে আছে। অবশ্য আমার স্ত্রীর কুষ্ঠিতে ছিল অতিদীর্ঘায়ু হবে। সে তো একান্ন বছরেই চলে গেল।

আমি চুপ করে রইলাম। দাদু বললেন, আচ্ছা ওর কুষ্ঠিতে কি ভেজাল ছিল, কুষ্ঠিতেও কি ভেজাল মেশায় আজকাল? হবে হয়ত।

হাঁটতে হাঁটতে কথা হচ্ছে টুকটাক, সবটাই একতরফা। দাদু বলছেন, আমি শুনছি। একটু আধটু ছবিও তুলছি। বৃষ্টি নেই, এমনকি আকাশে মেঘের ছিটেফোঁটাও নেই। দেখছি আমাদের হোটেলের ঠিক সামনের পাহাড়গুলোয় মিহি পাউডারের মত নীল বরফ পড়েছে সদ্য আজই। এ সেই কালো মেঘেরই দান। সেই মেঘ এখন নেই, পরিষ্কার আকাশে হালকা হাওয়া দিচ্ছে কেবল। এখন টেম্পারেচার বলছে মাইনাস ছয় ডিগ্রি। তবু অসহ্য ঠান্ডা কিছু নয়। এদিক ওদিক বরফ দেখে দাদু তো বাচ্চাদের মত খুশি হলেন। বললেন, কালকে ওরা সোলাং ভ্যালি যাবে।

-আপনি যাবেন না?

দাদু কিছুক্ষন থেমে থেকে বললেন, না, কি দরকার? ঠান্ডা লেগে যদি শরীর খারাপ হয়। শুধু শুধু ওদের বিব্রত করা। দেখো দেখো, ওই হোটেলটার নাম ইয়াক হোটেল। আচ্ছা আমাদের জলদাপাড়ায় কি গন্ডার হোটেল আছে? বলে নিজেই কিছুক্ষন খুকখুক করে হাসলেন।

রাস্তার ওপারে দাদুর ছেলে, বৌমা আর নাতনি ঢাউস ঢাউস ব্যাগে কিসব কেনাকাটা করেছে। দাদুর ছেলে নেমপ্লেটের দোকানে গিয়ে দরদাম করে একটায় কি সব লেখাচ্ছে যেন।

এখানে তো ম্যালে গাড়ি চলে না, তাই লোকেরা রাস্তার মাঝখান দিয়েও হাঁটতে হাঁটতে চলেছে। সবাই ফুর্তিতে আছে, কেউ কেউ কালকের জন্য গাড়ি বুক করছে। ম্যালের ওপর অনেক দোকান। মার্কেটের ভেতরে আরও অনেক দোকান, একটা বাঙালি হোটেলও আছে, আশাপুরি ভোজনালায়। এমনকি অনেকগুলো বিউটি পার্লার পর্যন্ত আছে। ম্যালের ওপর স্ট্রিটল্যাম্পগুলো কি সুন্দর কারুকাজ করা। আর মজার ব্যাপার হল, ওগুলো সব কাঠের। রাস্তার মাঝের বুলেভার্ডে সুন্দর সুন্দর কেয়ারি করা ফুলগাছ। নিচে যে বিয়াস নদী তীরবেগে বইছে, মাঝে মাঝে ঠান্ডা হাওয়ায় সেকথা জানান দিচ্ছে। সব দোকানেই লোকের ভিড়, এই ছোট্ট শহরে এতো যদি পর্যটক থাকে কোথায় কে জানে? দোকানের আলোগুলো আরো আকর্ষণীয়, একেবারে যেন অষ্টমীর রাতের ম্যাডক্স স্কোয়ার।

দাদু সব দোকানেই বাইরে থেকে উঁকি মেরে চলে আসছেন। আর ফুটপাথের দোকানগুলোতে উবু হয়ে বসে জিনিস দেখছেন। এমনকি রাস্তায় ছোট ছোট কুলের সাইজের গরম গুলাবজামুন তৈরী করছিল। তার সামনেও একটু দাঁড়িয়ে এলেন। তারপর গুলাবজামুনওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলেন, আইস কাঁহা হ্যায় ভাই?

– ক্যা জি?

আমি একটু বেটার হিন্দিতে বুঝিয়ে বললাম, পুছ রাহা হ্যায় কি বরফ কাঁহা মিলেগা? সে বলল, আপলোগ বহত আচ্ছে টাইম পর আ গয়ে হো।

– কিউঁ?

– আজ আপার মানালির দিকে প্রচুর স্নো ফল হয়েছে। সোলাং ভ্যালি পর্যন্ত একেবারে বরফে ঢেকে গেছে।

– রাস্তা খোলা আছে তো?

– হ্যাঁ, সে আছে। বরফ দেখতে কাল অবধি লোককে গুলাবা অবধি যেতে হয়েছে, তাও সে অল্প অল্প বরফ। আজ শুনছি সোলাং থেকেই হাঁটু অবধি বরফে ঢাকা।

দাদু দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, সে তো ওরা আমায় নিয়ে যাবে না। একটু জিজ্ঞেস করো না, ম্যালে কোথায় বরফ পাওয়া যাবে?

জানতাম এটা একটা হাস্যকর প্রশ্ন, তবু জিজ্ঞেস করেই ফেললাম। লোকটা বেলচার মত হলুদ দাঁত বের করে বলল, ইসি টাইম মে ও তো আপকো আইসক্রিমকা দুকান মে হি মিলেগা। ম্যাল মে বরফ কে লিয়ে ডিসেম্বর জানুয়ারি মে আনা পড়েগা।

ওদিক থেকে দাদুর বৌমা নাতনিকে নিয়ে আর তিনটে ঢাউস ব্যাগ টানতে টানতে এলেন। দাদু তাকে দেখেও, ঘাবড়ে গিয়ে মিনমিন করে কিছু একটা বললেন, সে শোনা গেল না। বৌমা বলল, হলো আপনার ঘোরা? কাল তো আমাদের বেরোতে হবে নাকি? হোটেলে চলুন। এখানে শশা কিনেছি, রাত্তিরে শশা মুড়ি খাবেন।

দাদু বললেন, বৌমা কালকে আমরা সোলাং ভ্যালি যাব তো?

হ্যাঁ, তবে আপনি নন। আপনাকে তো সেই কবে থেকে বলে এনেছি, সোলাংএ গিয়ে শরীর খারাপ হলে কে কি করবে। আপনার এই বায়নার জন্য না কোথাও নিয়ে যাই না। কে যে নতুন করে মাথায় ঢোকাচ্ছে কে জানে?

শেষ বাক্যটা যে আমার উদ্দেশ্যে বলা, সে বেশ বোঝা গেল। হোক গে। নাতনির হাতে একটা নেমপ্লেট, তাতে লেখা প্রকাশ কুমার মিত্র। বুঝলাম দাদুর ছেলের নাম। ছেলের দূরদর্শিতা দেখে মুগ্ধ হলাম।

দাদু তাঁর পরিবারের সাথে চলে গেলেন। সাথে গেলেন বলা ভুল হবে, ওরা তিনজন আগে আগে চলছে। দাদু ওদের গতির সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে পেছনে পেছনে একরকম দৌড়োচ্ছেন।

দাদুর সঙ্গে এই শেষ দেখা, আর দেখা হয়নি। ওনারা কালকে সোলাং ভ্যালি যাবেন। আর আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী কালকে আমরা সাইট সিইং করে পরশু সোলাং ভ্যালি যাব।

হোটেলের ব্যালকনি থেকে অনেকদূর অবধি দেখা যায়। এমনকি সামনের পাহাড়ের গায়ে যে ছাদে বরফপড়া বাড়িগুলো আছে সেগুলোকেও পরিষ্কার দেখা যায়। একি, একটা চাইরঙের চাদর আর সাদা ধুতি পড়ে একজন বয়স্ক লোক ওই বরফের রাস্তা ধরে হাঁটছে মনে হচ্ছে। হ্যাঁ, তাই তো। দাদু নাকি?

ধুর, আমার এই ভুলভাল দেখার অভ্যেস যে কবে যাবে কে জানে!

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (অষ্টম পর্ব)

৬ই মার্চ, ২০১৮। মানালির আশপাশ।

স্টিয়ারিংয়ের ওপর টুকটুক করে তবলা বাজিয়ে পবন বলল আ গয়ে আপকা পহেলা ডেস্টিনেশন, হাডিম্বা মন্দির।

হাডিম্বা আবার কি কথা রে বাবা, ছোট থেকে শুনেছে হিড়িম্বা, আর এ বলছে হাডিম্বা। এ তো সেই মহাভারতের হিড়িম্ব আর হিড়িম্বা দুই রাক্ষস ভাই বোনের গল্প। হিড়িম্ব ভীমের কাছে বেদম মার খেয়ে মরে যাওয়ার পর ভীম অনাথা হিড়িম্বাকে বিয়ে করে। তাদের ছেলে ঘটোৎকচ কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে খুব লড়েছিল। যাই হোক, এ সেই হিড়িম্বার মন্দির। ভারতে সম্ভবত কোনো রাক্ষসের মন্দির এই একটিই আছে। মন্দিরটা বেশ গা-ছমছমে। জঙ্গলের মধ্যে, লম্বা লম্বা পাইন গাছের নিচে একটা পেল্লাই চালাঘর মত মন্দির। এখানে অনেক ইয়াক চড়ে বেড়াচ্ছে। মন্দিরটার ছাদটা ছাতার মত, শঙ্কু আকৃতির। আর তার নিচটা অ্যাসবেস্টসের চালের মত, যাতে বরফ বা জল সহজেই গড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু পুরোটাই কাঠের তৈরী। দেয়ালগুলো পুরু পাথরের ব্লক সাজিয়ে করা। আরো অদ্ভুত ব্যাপার, মন্দিরের গায়ে কত শত বছরের পুরোনো শিকার করা হরিণ আর বাইসনের মাথার খুলি সাজানো। এরকমটা তো অন্য মন্দিরে দেখা যায় না, আর সেটাই এর বিশেষত্ব। সেই কবে, ১৫৫৩ সালে রাজা বাহাদুর সিংএর তৈরী এই মন্দির এখন ন্যাশনাল হেরিটেজ। সমস্ত দেশ যখন নবরাত্রি পালন করে দেবী দুর্গাকে নিয়ে, মানালি তখন এই হিড়িম্বার পুজো করে। মন্দিরের সামনে দুটো বড় বড় পাথর, যেন কোনো পাহাড়ের মাথা কেটে বসানো। হিড়িম্বার মন্দিরের ভেতরে একটা স্বর্ণালী মুখাবয়ব, আর তার পাশে একটা পাথরের ওপর এবড়োখেবড়ো পায়ের ছাপ। এই পায়ের ছাপেই হিড়িম্বার পুজো হয়। মাথা নিচু করে কষ্ট করে গর্ভগৃহে ঢুকে হামাগুড়ি দিয়ে একটা পাথরের নিচে বিগ্রহ স্পর্শ করা যায়। এই মন্দিরের পেছনেই পুত্র ঘটোৎকচের মন্দির।

বেরিয়ে এলাম। কয়েকজন হিমাচলী মহিলা কোলে ইয়াব্বড় খরগোশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কোলে দিলেই কুড়ি টাকা। ফটো তোলার জন্যে। কয়েকজনের কাছে দুধসাদা ভেড়ার ছানা। তারাও ফটো তোলার জন্য রেডি। আর অনেকে আবার হিমাচলী ড্রেস ‘ডোঙ্গরি’ ভাড়া দিচ্ছেন ফটো তুলতে। কিন্তু ফটো তুলেই তো আর পেট ভরবে না। ব্রেকফাস্ট করে বেরোইনি বলে খিদে পেয়েছে খুব। পাহাড়ি জায়গার জাতীয় খাদ্য হল ম্যাগি। সেই ম্যাগি উদরস্থ করে দু-একটা কাঠের জিনিস কিনে আবার গাড়িতে চড়ে বসলাম। মানালি ম্যাল থেকে হিড়িম্বা মন্দির বেশি দূর নয়, চাইলে হেঁটেও আসা যায়। এবার আমাদের গন্তব্য ক্লাব হাউস।

ক্লাব হাউস আসলে এইচপিটিডিসির তত্বাবধানে থাকা একটা প্রমোদ ভবন। যেমনটা ব্রিটিশ আমলে হত, সাহেবসুবোদের জন্য টেনিস কোর্ট, বিলিয়ার্ড, টেনিস খেলার একটা জায়গা। চড়া দামে মেম্বারশিপ নিয়ে সন্ধ্যেবেলা লাটসাহেবরা একটু আনন্দ করতেন। সঙ্গে পান ভোজনও। কিন্তু এখন এই ক্লাবে টিকিট কেটে যে কোন পর্যটক ঢুকতে পারেন, টেনিস বিলিয়ার্ডের সঙ্গে বিয়াস নদী আর ধৌলাধারের সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে কিছু খাওয়া পিনা চলতেই পারে। তবে সব পর্যটকের অত সময় কোথায়? তাই তারা ভেতরের থেকে বাইরেই বেশি ভিড় করে। বাইরে বিয়াস নদীর ধারে বসে সৌন্দর্য্য দেখছে। অনেকে আবার দড়িতে চড়ে নদীও পেরোচ্ছে। তবে ওই খরস্রোতা নদী পেরোতে যে সাহস আর উৎসাহ থাকতে হয়, তার কোনোটাই আমার নেই বলে আবার গাড়িতে এসে চেপে বসলাম।

পবন গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, এবার কোথায়?

উত্তর তৈরিই ছিল, বললাম মনু মন্দির।

গাড়িটা যেখানে নামিয়ে দিল, সেখান থেকে একটু গলিরাস্তা ধরে এগিয়ে গেলেই মনু মন্দির। পুরাণে মনুর কথা পড়েছি। এই মনুর বাড়ি বা ‘আলয়’ থেকেই মনুআলয় বা মানালি। নামের উৎপত্তি জানা গেল। অনেক অনেক পুরোনো মন্দির নিজের জায়গাতেই নতুন করে তৈরী হয়েছে। বেশ ছিমছাম আর পরিস্কার মন্দির। লোকজন বলতে একটা বাঙালি পরিবার বাইরে বসে আছে, আর কেউ নেই। ভেতরে বেশ প্রশস্ত দালানের মাঝে গর্ভগৃহের গভীরে মনুঋষির কষ্টিপাথরের মূর্তি। চারপাশে আরও মূর্তি। আর এই মন্দিরের বারান্দা থেকে বরফের পাহাড় যেন হাতের কাছে ছোঁয়া যায়। সামনে উপত্যকায় ভর্তি আপেল গাছ। পাহাড়ের পাদদেশ অবধি বরফে ঢাকা, আর সেই বরফ দেখেই বোঝা যাচ্ছে বেশি পুরোনো নয়, কাল পরশুই এখানে বরফ পড়েছে। মন্দিরের বাইরে জুতো পড়তে গিয়ে দেখি একটা পেল্লাই পাহাড়ি কুকুর খুব যত্ন করে আমার জুতোজোড়া জড়িয়ে ধরে ঘুমোচ্ছে। একটু তাড়া দিতে কুকুর ওপাশ ফিরে শুল। কি আর করি, দেখি কুকুরের ওপরের দেওয়ালে বেশ বড় করে মন্দিরের পৌরাণিক আখ্যান লেখা আছে। সেটাই পড়তে লাগলাম।

দেওয়ালের লেখাটা খুব বড়, কিন্তু তার সারমর্ম হল এই যে, পুরাণ মতে ওই মনু ছিলেন বলেই আমরা আছি। এই মনু কোনো একজনের নাম নয়, এটা একটা উপাধি। কালে কালে অনেক মনু এসেছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন বিবস্বত নামের এক মনু। সাধারণভাবে এঁনাকেই মনু বলা হয়। প্রলয়কালে যখন গোটা পৃথিবী জলে ডুবে গেল, তখন বিবস্বত মনু পৃথিবীর সমস্ত প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব বাঁচাতে তাদের সবার একটি করে বীজ নিয়ে একটি নৌকায় পাড়ি দেন। কিন্তু মাঝপথে ঝঞ্ঝায় সে তরী ডোবার উপক্রম হলে বিষ্ণুর মৎস্য অবতার আর বাসুকি নাগের সাহায্যে মনু হিমালয়ের এই জায়গায় পৌঁছন। এখানে জল ওঠেনি, তাই সমস্ত প্রাণিকুল রক্ষা পায়। পুরাণের কথা যাই হোক, একথা কিন্তু ঠিক প্রাচীন ভারতের সমাজ-অর্থনীতি-রাজনীতি নিয়ে মনুর সেই বিখ্যাত বিতর্কিত গ্রন্থ মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা কিন্তু আজকের দিনেও সমান প্রাসঙ্গিক। এখানে কাছেই একটা জায়গায় একজন মহিলা গোবর খুঁড়তে গিয়ে অজান্তে এক মূর্তির গায়ে আঘাত করে ফেলে দেখেন সে মূর্তির আঘাত দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। মহিমা বুঝে সেই মূর্তিকে মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরে ১৯৯১ সালে মন্দিরের আমূল সংস্কার হলেও মূল গর্ভগৃহটি বহু প্রাচীন। লেখাটা পড়ে যেই দেখি কুকুরটা আড়মোড়া ছাড়ার জন্য একটু এপাশ ফিরেছে, অমনি আমার জুতোটা টুক করে তুলে পায়ে গলিয়ে নিলাম।

মনু মন্দিরে যাওয়ার পথে দুজন শালওয়ালা খুব ধরেছিল। ফেরার পথেও তারা তক্কে তক্কে ছিল, ঠিক ধরেছে। আমরা তাদেরকে নিরস্ত করে নিচের একটা দোকান থেকে হজমোলা কিনলাম। দোকানদার এক বয়স্কা হিমাচলী মহিলা, আমাদের সঙ্গে খুব গল্প করলেন কলকাতা নিয়ে। পাহাড়ি হিমাচলী ভাষা বুঝতে অসুবিধে হলেও বোঝা যাচ্ছিল।

মনু মন্দির থেকে বেরিয়ে গাড়ি চলছে সরু রাস্তায়। দুপাশে ছোটোখাটো দোকান, আর একপাশে খাদের ধারে চওড়া গভীর নর্দমা। চলতে চলতে হঠাৎ বিকট শব্দ, সামনে থেকে আসা একটা টাটা সুমোকে পাশ দিয়ে গিয়ে আমাদের গাড়িটা একটা কালভার্ট ভেঙে একপাশের দুটো চাকা একদম গভীর নর্দমায় ঝুলে গেছে। আমরা হুড়মুড় করে একে অন্যের ঘরে পড়লাম, আর ডানদিকের দুটো চাকা মাটি থেকে অন্ত দু’ফুট ওপরে উঠে শুন্যে বনবন করে ঘুরতে লাগল।

পবন স্টিয়ারিং থেকে ছিটকে পড়েছে। আমরা কোনোরকমে সামলে ওঠবার আগেই মড়মড় করে বাকি কালভার্ট টুকুও গেল। এবার গাড়ির দুটো চাকা খাদে আর বাকি দুটো চাকা আরো খানিকটা শুন্যে উঠে গেছে। আরেকটু ওজনের এদিক ওদিক হলেই গাড়ি সমেত আমরা সটান নিচে চলে যাব। স্থানীয় লোকজন ছুটে এসেছে, কোনোরকমে পেছনের দরজা খুলে আমরা বেরোতে পারলেও পবনের দিকের দরজা খোলা যাচ্ছে না। আর পাশের দরজা দিয়ে নামলে তো খাদে। যাই হোক, প্রায় আধ ঘন্টার চেষ্টায়, স্থানীয় লোকজনের তৎপরতায় আর পবনের উপস্থিত বুদ্ধিতে একটা বড়সড় গাছের গুঁড়ি দিয়ে ঠেলে ঠেলে গাড়িটা ওঠানো হল।

গাড়ির সামনের দিকটা বেশ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। চাকার হাল এখনো বোঝা যাচ্ছে না। সৌভাগ্য এই যে লোকজনের কোনো ক্ষতি হয়নি। পবনের চিন্তা, ট্যাঙ্কি লিক না হো যায়ে। আরো একটা চিন্তা, আমরা এই অক্সিডেন্টটা ট্রাভেল এজেন্টকে রিপোর্ট না করে বসি। আসলে পবনের কোনো দোষ ছিল না, কিন্তু কপাল খারাপ ছিল, কি আর করা যাবে।

পরের গন্তব্য বশিষ্ঠ। জায়গাটার নাম বশিষ্ঠ, কারণ ওখানে বশিষ্ঠদেবের একটা মন্দির আছে। গাড়ি থেকে নেমে বেশ কিছুটা চড়াই উঠে মন্দির। রাস্তায় কিছু টোটকা আয়র্বেদিক ওষুধের দোকান আর কাজু-আখরোটের পসরা। যেতে যেতে একজায়গায় সুইটকর্ন খাওয়া হল। একটা ভুট্টাকে পুড়িয়ে ওরা খবরের কাগজে মুড়ে মট করে ভেঙে দু’আধখানা করে হাতে ধরিয়ে দিল।

জুতো রেখে মন্দির চত্বরে ঢুকে দেখি ছোট্ট একটা দালানের ওপরে বশিষ্ঠদেবের মন্দির। আশেপাশে আরো কয়েকটা মন্দির। আর পাশে একটা পাথরের দেওয়ালে একটা পাথুরে বেসিনে পিতলের কল। সেই কল দিয়ে সর্বক্ষণ গরম জল পড়ছে। পাশের একটু আড়ালে একটা ছেলেদের আরেকটা মেয়েদের স্নান করার ‘কুন্ড’। বশিষ্ঠ আসলে একটা উষ্ণ প্রস্রবণ, জলে সালফার আছে খুব। পর্দার পেছনে বেশ বাঁধানো ছোটোখাটো একটা পুকুরের মত প্রস্রবণ, অনেকটা সেই ইতিহাস বইয়ে পড়া হরপ্পা সভ্যতার পাবলিক স্নানঘর গুলোর মত দেখতে। মন্দিরের একজন মহিলা বললেন, আপনারা যাকে স্নানঘর বলেন, ইংরেজিতে বলেন বাথরুম, তীর্থক্ষেত্রে তাকেই আমরা কুন্ড বলি। কুন্ড থেকে ওপরে কিছুটা উঁচু জায়গায় রামের মন্দির। কারণ এই বশিষ্ঠ রঘুবংশের কুলগুরু ছিলেন।

এখানেও একটা বিস্তারিত ইতিহাস লেখা। সারমর্ম হল এই যে, একবার লক্ষণ গুরুদেব বশিষ্ঠের সাথে দেখা করতে এসে দেখেন এখানকার জল খুব ঠান্ডা। গুরুর এই ঠান্ডা জলে কষ্ট হয় ভেবে তিনি তাঁর অগ্নিবাণ দিয়ে পাথরে গর্ত করে গরম জলের চিরস্থায়ী ব্যবস্থা করে দেন। কিন্তু বশিষ্ঠ ঋষি মানুষ, গরম জল তাঁর কাছে বিলাসিতা। তবে লক্ষণের গুরুভক্তি দেখে তিনি আশীর্বাদ করেন যে এই জল চিরকাল এরকমই গরম থাকবে, ও এই জলে একবার স্নান, রোগ, বিশেষ করে সর্বপ্রকার চর্মরোগ হরণ করবে।

বশিষ্ঠ থেকে বেরিয়ে আমরা চললাম আজকের শেষ গন্তব্য আর প্রধান আকর্ষণ নগগর ক্যাসেলের দিকে। মানালি থেকে প্রায় বাইশ কিলোমিটার, নগগর একটা ছোট জনপদ। সেখান থেকে পাহাড়ের পাকদন্ডী বেয়ে বেশ কিছুটা উঠে গেলেই পড়বে নগগর দুর্গ।

দুর্গ বলতে আমরা যা বুঝি নগগর কিন্তু সেরকম কিছু নয়। আসলে এটা কুলুর রাজার রাজপ্রাসাদ। স্বাভাবিক ভাবেই কাঠের তৈরী প্রাসাদ, তবে একটা অংশে এখন হিমাচল ট্যুরিজম হোটেল হিসাবে ভাড়া দেয়। বিস্তৃত উঠোনে রট আয়রনের চেয়ার টেবিল পাতা। দোতলাতেও খাবার জায়গা। বেশ ছিমছাম। একটা ঘরে রাজপরিবারের ব্যবহৃত চেয়ার টেবিল, পিয়ানো। তবে সবটাই কাঠের তৈরী। কাঠের ওপরে সে যে কি অপূর্ব ভাস্কর্য আর কি দুর্দান্ত সব মিনিয়েচার আর্ট ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সর্বত্র। দরজার চৌকাঠ থেকে পিলার, জানলা থেকে সিঁড়ির রেলিং সর্বত্র অতি সাবধানে আর নিখুঁত হাতের কাজে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে লতাপাতা, মোরগফুল, দেবদেবী আর প্রকৃতির প্রতিকৃতি। একজন বলেছিলেন, এই হোটেলে একরাত থাকলেও নাকি বয়সকে কয়েক বছর পিছিয়ে দেওয়া যায়। সেটা খুব সত্যি কথা। তবে পকেটের জোর থাকা জরুরি। ইতিহাস বলছে, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে ১৪৬০ সালে রাজা সিধ সিংএর বানানো এই রাজপ্রাসাদ কুলুর গৌরব আর অহংকারের রাজটিকা। কুলুর রাজাদের ইতিহাসও নেহাত নতুন নয়। প্রায় ১৪০০ বছরের পুরোনো এই রাজত্বের রাজধানী ছিল নাগগর। পরে রাজা জগৎ সিং রাজধানী কুলুতে স্থানান্তরিত করেন। এই রাজপ্রাসাদ তৈরী করতে নাকি ভূমিকম্প প্রতিরোধী প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছিল। তাই ১৯০৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে যে কুলু উপত্যকার একটা বাড়িও বাঁচেনি, সেখানে নগগর দুর্গের একটুও ক্ষতি হয়নি। এই নগগরেই নিকোলাস রোয়ারিখ নামে এক রাশিয়ান শিল্পী নিজেকে মেলে ধরেছিলেন, তাঁর নামে একটা আর্ট গ্যালারিও আছে, রোয়ারিখ আর্ট গ্যালারি। তিনি আবার রবীন্দ্রনাথের পরিবারের এক কন্যার সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হন।

নগগর ক্যাসেলের নিচে একটা মিউজিয়াম আছে, কিন্তু সেটা নেহাত অবহেলায় আর ধুলোয় ঢাকা। কুলু সংস্কৃতির কিছু নিদর্শন আছে এই ঘরে। সেসব ছাড়িয়ে সবচেয়ে দেখার মত জিনিস হল এর দোতলার বারান্দা থেকে সমস্ত ধৌলাধার পর্বতশ্রেণীর ভিউ। এই বারান্দায় যেন একটা জীবন কাটালেও কম হয়ে যাবে। প্রকৃতির মিউজিয়ামের কাছে মানুষের বানানো মিউজিয়াম তো তুচ্ছ। তবে নগগর ক্যাসেলের গঠনশৈলী অবাক করা। পরে জেনেছিলাম কাঠ আর পাথর দিয়ে বাড়ি বানানোর এই ‘কাঠকুনি’ টেকনিক একান্তই কুলুর নিজস্ব। দুর্গের মূল দরজাদুটি আগাগোড়া কাঠের তৈরী, এমনকি কবজা আর ছিটকিনিগুলোও। দালানে একটা ছোট মন্দির, নাম জগতি পট্ট মন্দির। আসলে এটা কুলুরাজ্যের বিচারসভা। ভেতরে কোনো নির্দিষ্ট মূর্তি নেই, একটা বড় বেদীতে লাল ফুল আর লাল চেলি বিছানো।

নগগর ক্যাসেলের কাছেই আরো কয়েকটা ছোট ছোট প্রাচীন মন্দির আছে। ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির ছাড়াও পাশেই একটা শিব মন্দির আছে। কাছেই জগৎসুখ। রাজা জগৎসিংয়ের নামে নামাঙ্কিত এই জায়গাটা প্রাকৃতিক নৈসর্গের জন্য বিখ্যাত।

এবার মানালি ফেরার পালা। পথে যেতে যেতে গল্প করছিলাম, মানালিতে একটা মনাস্ট্রি আছে, সেটা দেখা হল না। পবনের কানে যেতেই সে বলে, চলুন তবে মনাস্ট্রি। তবে সে চেনে না, কিন্তু জিপিএস দেখে ঠিক চলে যেতে পারবে। আমরা বললাম, এখন বিকেল হতে চলল, হোটেলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া করে আবার বেরোনো যাবে। তবু পবন বারবার বলতে লাগল এখনই যেতে। পবনের মত ড্রাইভার পাওয়া সত্যিই ভাগ্যের ব্যাপার। কোনো জায়গা দেখে আমরা খুশি হলে ও যেন আমাদের দ্বিগুন খুশি হয়।

হোটেলে ফিরে মোবাইলে দেখলাম মনাস্ট্রিটা ম্যালের ঠিক পিছনেই। গাড়িতে না গেলেও চলবে। যেমনি ভাবা তেমনি কাজ। খাওয়া দাওয়া সেরে ম্যাল ধরে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম ইয়াক হোটেলের পেছনের সেই টিবেটিয়ান মনাস্ট্রিতে। ভেতরটা ছোট, অনেক পুঁথিপত্রে ঠাসা। শান্ত ধ্যানী বুদ্ধের সোনালী মূর্তিটা এত বড় যে দোতলায় না উঠলে তার মুখ দেখা যায় না। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে মেডিটেশন সেন্টার। মনাস্ট্রির চারদিকে অসংখ্য ধর্মচক্র, লোকেরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পরিক্রমা করছে। এখানে কড়া নির্দেশ, ধর্মচক্রগুলির ঘড়ির কাঁটার দিকে ঘোরালে কয়েক লক্ষ বার বৌদ্ধ মূলমন্ত্র ‘ওম মনি পদ্মে হুম’ জপ করার সমান ফল লাভ হয়। আর উল্টোদিকে ঘোরালে ততটাই পাপ হয়। মনাস্ট্রির সামনের মাঠে একটা ‘চোর্তেন’ অর্থাৎ কোনো এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর সমাধি। দেখতে অনেকটা উল্টানো সাদা ঘন্টার মত।

মনাস্ট্রি থেকে বেরিয়ে রাস্তার ওপারেই ‘বন বিহার’। একটা পার্ক, যার ভেতরে লম্বা লম্বা পাইন গাছ আর ফুলের বাগান। টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকে একটু জিরিয়ে নেওয়া যায়। বাইরে একটা আপেল গাছে হালকা গোলাপি রঙের ফুল ফুটেছে।

কাঁটায় কাঁটায় ছটা বাজে এখন। ঠিক কালকের মতোই ম্যালের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে, দোকানে দোকানে ভিড়ভাট্টা, কেনাকাটি। আজ আমরাও একটু কেনাকাটি করব। আমন্ড আর কাজু কিনতে হবে। গরম গুলাবজামুন চেখে দেখতে হবে।কত্ত কাজ। দোকানে ঘুরে ঘুরে হাঁটু থেকে গোড়ালি অবধি ব্যাথা হয়ে গেছে। শেষে দেখা গেল ঢাউস ঢাউস শপিং ব্যাগ আমাদের আসল লাগেজগুলোকেও ঢেকে দিয়েছে। দেখেই তো ভয় লাগছে, কলকাতায় নিয়ে যাবো কি করে?

রাতে তন্দুরি রুটি আর ডাল ফ্রাই খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিতে হবে। কাল সোলাং ডে। বরফ বরফ আর বরফ, যার জন্য এতদূর আসা।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (নবম পর্ব)

৭ই মার্চ, ২০১৮। সোলাং ভ্যালি।

সকালে ঘুম ঘুম চোখে মোবাইল হাতে নিতেই দেখি পবন ফোন করেছে। বলছে আজ সোলাং ভ্যালি যাওয়ার কথা না? কখন বেরোবেন?

ঘুম চোখে ফোন ধরার এই এক সমস্যা, প্রথম কয়েক সেকেন্ড কেটে যায় কোথায় আছি, সকাল না রাত্রি এইসব বুঝতে বুঝতে। তারপর কিছুক্ষন কাটে এরকম অতর্কিত প্রশ্নের উত্তর মনে করতে। যাই হোক, প্রায় তিরিশ সেকেন্ড অপেক্ষা করানোর পর বললাম, দশটা নাগাদ গাড়ি নিয়ে আসতে।

ন’টা পঞ্চান্নয় পবন আর আমরা মিট করলাম মানালি ম্যালের কার পার্কিংয়ে। কাল অ্যাক্সিডেন্টের পরে পবন গাড়িটাকে ভালো করে ধুয়ে মুছে চকচকে করে ফেলেছে। ছোট ছোট দুটো ধূপকাঠি জ্বলছে গাড়ির ড্যাশবোর্ডে, সকাল সকাল স্নিগ্ধ গন্ধটা বেশ ভাল লাগছে। গাড়ি চলতে শুরু করলো।

মার্চ মাসে সিমলা মানালি এলে রোটাং পাস খোলা পাওয়া যায় না। রোটাং খোলে আরো মাসখানেক পর থেকে। কিন্তু গরমকালে, বিশেষতঃ এখন গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে পাহাড়ি এলাকায় আজকাল যেরকম আবহাওয়া পরিবর্তিত হচ্ছে, তাতে ভরা গরমে রোটাং পাসে বরফ নাও পাওয়া যেতে পারে। অন্তত গত দু-বছরের রেকর্ড তাই বলছে। তবে এটাও ঠিক যে, রোটাংএ বরফ সারা বছরই কম-বেশি থাকে, কিন্তু সিজন শুরু হয়ে গেলে যেই গাড়ির আনাগোনা শুরু হয়, তখন থেকে বরফ খুব দ্রুত গলতে থাকে। মূলতঃ পেট্রল ডিজেলের ধোঁয়ায় রোটাংয়ের বরফ তখন হাতের নাগালের বাইরে চলে যায়।

মানালি থেকে রোটাং প্রায় একান্ন কিলোমিটার দূর। পুরোটাই মানালি-লেহ ন্যাশনাল হাইওয়ে ধরে যেতে হয়। এই পথে মানালি থেকে মাত্র বারো কিলোমিটার দূরে সোলাং ভ্যালি। শীতের শেষে, অর্থাৎ মার্চ মাসে সোলাং ভ্যালি বরফে ঢাকা থাকে। এমনকি কিছু বরফ রাস্তার ধারে, গাছের নিচে, বাড়ির বারান্দায় বা চালেও পড়ে থাকে।

মানালি থেকে বেরিয়ে কিছুটা এসেই পবন গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলল ড্রেস ভাড়া করে নিতে। একটা টিনের চালের একচিলতে দোকান, এক সদাহাস্য হিমাচলী দম্পতির মালিকানায় চলছে। সোলাংএ অতিরিক্ত ঠান্ডার কারণে বিশেষ ধরণের ওয়াটারপ্রুফ কাপড়ের পোশাক পড়ে যেতে হয়। তবে পরে দেখছিলাম, নিজেদের পর্যাপ্ত গরম জামাকাপড় থাকলে ভাড়ার ড্রেস না নিলেও চলে। তবে যেটা অবশ্যই লাগবে সেটা হল জুতো। হ্যাঁ, সোলাংয়ের বরফে রবারের বড় বড় গামবুট না পড়ে চলা যাবে না।

যাই হোক, একটা হ্যাঙ্গারে অনেকগুলো রং বেরঙের পোশাক ঝোলানো আছে। সাইজ দেখে ওরাই বেছে দিচ্ছে, শুধু রং পছন্দ করে নিতে হবে। পিঠের ব্যাগটা খুলে পাশে রেখে ট্রায়াল দিলাম। জামা আর প্যান্ট পুরোটাই একসাথে, সামনে একটা চেন লাগানো। পা দুটো ঢুকিয়ে দিয়ে এক বিশেষ কায়দায় পিঠ দিয়ে ঘুরিয়ে একসাথে দুটো হাত গলিয়ে চেন টেনে দিলেই হল। সঙ্গে টুপি ফ্রি। পাতলা রেনকোটের দুটো কাপড়ের মাঝে মোটা করে তুলো ঠাসা। ওরা এই জামা-জুতোর সেটটাকে বলে ‘ডোঙ্গরি সেট’।

যাই হোক, ডোঙ্গরি ড্রেস আর কালো রবারের জুতো পরে আমাদের অনেকটা অ্যাস্ট্রোনটের মত লাগছিল, যেন গাড়িতে করে চাঁদে চলেছি। আরো কিছুটা যাওয়ার পর বাঁদিকে খাদের নিচে বিস্তীর্ন আপেল বাগানের পাশ দিয়ে আমাদের গাড়িটা সাঁই সাঁই করে কতকগুলো হেয়ার পিন বাঁক ঘুরে একটা লোহার ব্রিজের ওপর উঠল। এই ব্রিজের ডানদিকের মেন রাস্তাটা লেহ-লাদাখ চলে যাচ্ছে, আর বাঁদিকে একটু এগোলেই সোলাং ভ্যালি।

এখানে এক জায়গায় কিছু হোটেল আছে, কাজেই কিছু দোকানও আছে। প্রায় সব হোটেল বা দোকানের বারান্দায়, সানশেডে, উঠোনে, খোলা সিঁড়িতে সাবানের ফেনার মত বরফ পড়ে আছে। হ্যাঁ, আনকোরা চোখে ঠিক সাবানের ফেনার মতোই লাগছে। যেন একটু আগে এখানে কেউ কাচাকাচি করে সার্ফের জলটা উল্টে দিয়ে গেছে। ফোলা ফোলা সাবানের ফেনার মত বরফে রোদের মিঠে আলো পড়ে ঝকঝক করছে।

আরেকটু এগোতেই একটা জঙ্গল। ভালোকরে দেখলে বোঝা যাবে, আসলে ওটাও একটা আপেলের বাগান। সেই বাগানের মাটিতে, গাছের ডালে, সাদা সাদা তাজা বরফ। কাল-পরশুই পড়েছে। বুঝলাম মানালিতে যে শুনেছিলাম, সোলাংয়ে বরফ পড়েছে, সেটা একেবারে ঠিক। বরফ পুরোনো হয়ে গেলে নোংরা হয়ে যায়, তখন আর হাতে নিয়ে খেলা করা যায় না।

জঙ্গলটা পেরিয়ে একটা উপত্যকা মত জায়গা, এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে এলাকা। গোটা চত্বর জুড়েই ছোট-বড় অনেক গাড়ি পার্ক করা আছে। আর দুঃখের ঘটনা হল, এখানে ত্রিসীমানায় এককণাও বরফের নামগন্ধ নেই। হ্যাঁ, দূরের বরফশৃঙ্গগুলো অনেক কাছে এসেছে। পাহাড় তো সবসময়েই কাছে বলে মনে হয়, তাই তাকে বিশ্বাস না করাই ভাল। তাই বলে সোলাং ভ্যালিতে একফোঁটাও বরফ পাব না? এর চাইতে রাস্তার ওই হোটেলগুলোর বারান্দায় গেলে কাজে দিত, অন্তত একটু হাতে ছোঁয়া তো যেত।

গাড়ি থেকে নামতে গিয়েই মাথাটা ঘুরে গেল। আমার ব্যাগ নেই! গাড়ির সিটে, ডিকিতে সর্বত্র খোঁজা হল, কিন্তু ব্যাগ পাওয়া গেলো না। ওতে আমাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, অফিসের আই-কার্ড থেকে শুরু করে টাকা-পয়সা সব আছে। এতদিন এত জায়গায় গেছি, যে ব্যাগকে কোনোদিন কাছছাড়া করিনি বলে অনেক টিপ্পনিও শুনতে হয়েছে, সেই ব্যাগ হারালাম কোথায়?

মনে পড়ল, নিশ্চয়ই ড্রেসের দোকানে পিঠ থেকে ব্যাগ নামিয়েছিলাম, আর নিইনি। পবনকে বললাম, ওর কাছে ড্রেসের দোকানের স্লিপটা ছিল। তাতে দেওয়া ফোন নম্বরে ফোন করে ধরা হল।

আমার তখন কথা বলার মতো অবস্থা নেই। তবু যতটা গুছিয়ে বলা যায় তাকে বললাম। সে বলল, দেখছি। কয়েক সেকেন্ড পরে সে বলল, ক্যায়সা ব্যাগ?

আমি বললাম, কালো রঙের পিঠে নেওয়া ল্যাপটপ ব্যাগ, ওপরে নীল রঙের ডিজাইন করা।

সে বলল, হ্যায় তো।

আমি ধড়ে প্রাণ ফিরে পেলাম। সে নিজেই বলল, কোনো চিন্তা নেই। ব্যাগ আমাদের কাছে থাকল। ফেরার পথে নিয়ে যাবেন।

পবনও একই কথা বলল। এও বলল, ওদের জান যাবে তবু কখনো বেইমানি করবে না।

ব্যাগের চিন্তা মাথা থেকে গেলেও, খচখচানিটা থেকেই গেল। এদিকে আবার সোলাং ভ্যালিতে বরফ নেই। পবনকে সেকথা বলাতে সে বলল, এখানে গাড়ি রাখা হয় বলে সব বরফ গলে গেছে। আসল বরফ আরো ওপরে।

এই জায়গাটাতে ঘোড়া আর ঘোড়ার সহিস গিজগিজ করছে। তার সঙ্গে আছে স্নো স্কুটার। স্নো স্কুটারে দু’জন বসতে পারে, আর একজন চালায়। আর ঘোড়ায় একজন করে। এত কাছে এসে বরফ না দেখে চলে যাওয়ার তো কোনো মানেই হয় না। তাই ঠিক করলাম ঘোড়াতেই যাব। একজন সহিসকে পাকড়াও করলাম। বলল, ঘোড়া পিছু দু-হাজার টাকা।

আমরা তিনজন, মানে ছ’হাজার টাকা? পাগল, না পেট খারাপ? শুরু হল দরদাম, নিউমার্কেটিয় স্টাইলে কাজ না হওয়াতে দেশীয় হাতিবাগানী পদ্ধতি অ্যাপ্লাই করলাম। শেষে দেড়-হাজার টাকায় তিনটে ঘোড়া পাওয়া গেল, তাও যাওয়া আসা মিলিয়ে। অর্থাৎ সেভেন্টি ফাইভ পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট!

ঘোড়া ও ঘোড়ার মালিক, দুজনেই রোগা পটকা। ঘোড়াগুলোর ওপরে চড়ে বসাতে প্রায় নড়তে পারছে না। তিনটে ঘোড়া একজন সহিসেই চালাচ্ছে। আমি চলছি পেছনের ঘোড়ায়, আমারটা আবার রোগা হলেও বেশ তেজি। নেতা নেতা ভাব। তাই সহিসের কাছে ধমকও খাচ্ছে বেশি। সহিসের শিস শুনে কখনো পাশে কখনো সোজা চলেছে তিনজনেই। আমাদের পাশে আরেকটি বাঙালি পরিবার ঘোড়ায় চেপে চলেছে। তাদের মধ্যে একজন মাঝবয়সী মহিলাকে বলতে শুনলাম, আরে ও সহিসভাই, তুমহারা ঘোড়া ইতনা ছটপট কিঁউ করতা হ্যায়?

ঘোড়ায় চলা ব্যাপারটা বেশ আরামদায়ক, কিন্তু রাস্তার অবস্থা খুবই শোচনীয়। আসলে এখানে কোনো রাস্তাই নেই। পাহাড়ের গা দিয়ে ঘোড়া, মানুষ আর স্নো-স্কুটার চলতে চলতে একটু সমতল হয়ে গেছে মাত্র, সেটাকেই তারা রাস্তা বলে এগোচ্ছে। আমাদের ঘোড়া ও তার সহিস আবার একটু অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। তিনি সাধারণ রাস্তা দিয়ে না গিয়ে কোথায় ঝর্ণার তলা দিয়ে, কোন পাথরের গা দিয়ে এগোচ্ছে। পাশ দিয়ে বিকট ঘড়ঘড় শব্দে স্নো-স্কুটারগুলো উঠছে নামছে।

প্রায় আধঘন্টা যাওয়ার পর নামতে হল। এখানেও কিছু লোকজন আছে, তবে কম। একটা প্লাস্টিকের টেবিলের ওপর স্টোভে চা আর ম্যাগি হচ্ছে, তাই দিয়ে খিদে মিটিয়ে এগোলাম। একটা ছোট ঝর্ণা হেঁটে পেরোতে হবে, কিন্তু দেখে যত নিরীহ লাগে স্রোত ততটাই মারাত্মক। একবার পা পিছোলোলেই ইনিংস শেষ হয়ে যাবে। কিছু ইয়াক চড়ে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। কয়েকজন স্থানীয় মহিলা হিমাচলী পোশাক আর সাদা লোমশ খরগোশ ভাড়া দিচ্ছেন।

সব কিছুই দেখছি, কিন্তু চোখ আটকে যাচ্ছে মাটিতে। মাটি কোথায়, যতদূর চোখ যায় সাদা ঝকঝকে বরফ। কোথাও এতটুকু পাথর বা মাটি দেখা যাচ্ছে না। গভীরতা পরীক্ষা করতে পা দিয়ে কিছুটা গর্ত করলাম, যত নিচেই যাচ্ছি, সেই বরফ। কিছু গাছের ডালপালা এদিক ওদিক বেরিয়ে আছে, তাদের গোড়ায় শক্ত বরফ।

কিছুটা বরফ দলা পাকিয়ে হাতে নিলাম, প্রথমবারের জন্য। দূর থেকে দেখা হিমালয়ের বরফশৃঙ্গের বরফ এখন আমার হাতে!

হাতে নিলেই কিছুক্ষন পর গলে যাচ্ছে, আঙুলের ফাঁক দিয়ে জলের ধারা। আবার সঙ্গে সঙ্গে সে জল শুকিয়েও যাচ্ছে। ওপরের দিকের ঝুরো বরফ হাতে নিলেই জমাট গোল হয়ে যাচ্ছে। একজন মহিলার বোধহয় মানালির ঠান্ডায় সর্দি হয়েছিল, তাঁর নাকের নিচে গুঁড়ো বরফ। কিছুক্ষন নিচে কাটিয়ে একটু সমতল দেখে বরফের রাস্তা ধরে আরও ওপরে উঠতে লাগলাম। সোলাং ভ্যালির একদম টপে একটা হোটেল আর একটা শিব মন্দির আছে। সেখানে গান বাজছে। ওর পাশেই ছোট ছোট ইগলুর মত বরফের ঘর বানানো,অনেক কাপল সেখানে ছবি তুলছে। এখানকার বরফ এতটাই পরিষ্কার যে নীলচে আভা লেগে আছে এদিক-ওদিক। গুগল বলেছে টেম্পারেচার এখন মাইনাস ৬ ডিগ্ৰী, কিন্তু তেমন অসহ্য ঠান্ডা মোটেও লাগছে না।

দুপুর বারোটা। রোদ পড়ে চিকচিক করছে চারদিক। বরফের ওপর বসে থাকতে তাই বেশ ভাল লাগছে। দূরে পাহাড়ের ওপরে কোনো অসমসাহসী প্যারাগ্লাইডিং করছে। দুজন লোক দেখি সার্ফিং বোর্ড নিয়ে হাজির, আইসসার্ফ করবে বলে। অনেকে আবার স্কেটিং বুট পড়ে ঘোরাঘুরির চেষ্টা করছে।

এখানে আসার অনেক আগে থেকেই, যখনই মানালি বলে ইন্টারনেটে সার্চ করেছি, এই সোলাং ভ্যালির ছবিই সবার আগে দেখিয়েছে। ঠিক যেমন কলকাতা বললে ভিকটোরিয়া বা হাওড়া ব্রিজ বোঝায়, তেমনি। কিন্তু ছবিতে যেমন লাগে আসলে জায়গাটা তার চেয়েও অনেকগুন সুন্দর। সাদা ধবধবে বরফ আর দু-পা দূরেই পাহাড়ের খাড়া দেওয়াল। ছোট ছোট গ্লেসিয়ারও দেখা যাচ্ছে নাগালের মধ্যেই। ভাবলাম, ভাগ্যিস ওই নিচ থেকে ফিরে যাইনি। এতো দূর থেকে আসা, সে তো এই বরফ দেখার জন্য, ছোঁয়ার জন্যই। বাড়িতে ভিডিও কল করে দেখানো হল। আশ্চর্য ব্যাপার, এই দুর্গম জায়গাতেও মোবাইলের সিগন্যাল কিন্তু ভালোই আছে।

দুপুর হতেই বরফের ওপর একটু একটু জল দেখা দিল। খুব আস্তে আস্তে হলেও বরফ গলছে। আর সেই গলা বরফে লোকজন মুহুর্মুহু আছাড় খাচ্ছে। আমরাও একবার খেলাম অবশ্য। অনেকে ঢালু রাস্তা বেয়ে বসে বসে নামছে, কারণ বরফের রাস্তায় ওঠা সহজ, নাম বেশ কঠিন। নামার সময় পায়ের পাতাদুটোকে আড়াআড়ি ভাবে রেখে ছোট ছোট স্টেপ ফেলে নামলে পিছলে যাওয়ার ভয় থাকে না।

ঘোড়াওয়ালা আমাদের ফোন নম্বর নিয়ে গেছিল, আমরাও ওর ফোন নম্বর নিয়ে নিয়েছিলাম। নাম দেবেন্দ্র। আমরা ফেরার সময় ওকে ফোন করে ডাকলাম, সে তো তখন নিচে গেছে অন্য পর্যটক আনতে। সেই সুযোগে আমরা আরো একটু ঘুরে নিলাম। শেষে নামতে তো হবেই। সেই তিনটে ঘোড়া আর তার একজন সহিস বেশ যত্ন করেই আমাদের নিচে নামিয়ে দিয়ে গেল।

নিচে নেমে ব্যাগ হারানোর ভয়টা একবার চাগাড় দিয়ে উঠল। তাই একটা দোকানে বসে চা খেয়ে গাড়িতে উঠে বসলাম। ফেরার পথে পবন বলল, নেহেরু কুন্ড দেখে নেমে যাব।

নেহেরু কুন্ড আসলে একটা ছোট্ট ঝর্ণা যার জল জওহরলাল নেহেরু পান করতেন। আসল নাম রামকুন্ড, ছোট একটা মন্দির আছে পাশেই। স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস এই জল খুব পরিষ্কার আর রোগ প্রতিরোধী। পবন নিজেও বলল সেকথা। আর সে একবোতল জল ভরেও নিল কুন্ড থেকে। আমরাও কুন্ডে নেমে একটু জল মুখে দিলাম শুধু, কারণ অনভ্যাসের পাহাড়ি জল থেকে হিল ডায়রিয়া পর্যন্ত হতে পারে। যাই হোক, মন্দিরের একজন পুরোহিত নিজের থেকেই প্রসাদ দিয়ে গেলেন, টুকটাক গল্প করলেন। জায়গাটা খুব নিরিবিলি, একজন লোক শুধু ছোট্ট ছোট্ট কাঁচের কৌটোতে করে কেশর বিক্রি করছে। এর কাছেই একটা মন্দির কাম ফানপার্ক মত আছে, আমরা আর ঢুকিনি তাতে।

ফেরার পথে ড্রেস ফেরত দিলাম। ব্যাগটা দেখি একটা পেরেকে ঝুলছে, সেটা নিলাম। হিমাচলের সম্পদ হয়ত প্রকৃতি, আর হিমাচলী মানুষদের সম্পদ তাদের সততা আর সারল্য। ব্যাগের একটা জিনিসও এদিক ওদিক হয়নি।

আজ শেষ দিন এই মানালিতে। সন্ধ্যেয় ম্যাল থেকে আরেকবার ঘুরে এসে ব্যাগপত্তর গুছিয়ে নেওয়া হল। কাল রওনা দেব চন্ডিগড়ের উদ্দেশ্যে। চন্ডিগড়ে আবার নতুন সমতলের গল্প।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (দশম পর্ব)

৮ই মার্চ, ২০১৮। মানালি থেকে চন্ডিগড়ের দিকে।

আবার গাড়ি, আবার পবন। সেই পাহাড়ি রাস্তা। কিন্তু মনটা আজকে একটুও ভাল নেই। আজ মানালি ছাড়তে হবে।

সকাল সকাল না বেরোলে প্রায় তিনশো কুড়ি কিলোমিটার রাস্তা যেতে যেতে রাত হয়ে যাবে। তাই আমরা আটটার মধ্যেই বেরিয়ে পড়েছি। ম্যাল থেকে গাড়ি নেমে যখন বিয়াস নদীর ব্রিজটা পেরোলো তখন খুব খারাপ লাগছিল। সিমলা ছাড়তেও এতটা কষ্ট হয়নি। আমাদের মূল ট্যুর শেষের দিকে, বাকি শুধু চন্ডিগড়।

আবার সেই রাস্তা। ঔট টানেলের মধ্যে দিয়ে আরেকবার এবং শেষবারের মত যাওয়া। হানোগী মাতা মন্দিরের কাছে দড়ির ব্রিজ ধরে আরেকবার যাওয়া। সেই দোকান, সেই ম্যাগি। সুন্দরনগর ঢুকে পবনকে বললাম আরেকবার লেকের কাছে দাঁড় করাতে। এখানেই পবন তার সেলফি মামনির দেখা পেয়েছিল, তাই এককথায় রাজি হয়ে গেল। লেকের ওপারে শেষবারের মত দেখে নিলাম ধৌলাধার আর মধ্য-হিমালয়ের বরফশৃঙ্গ।

সিমলা থেকে মানালি আর মানালি থেকে চণ্ডিগড়ের রাস্তার প্রায় ষাট শতাংশই এক। বরমানার এসিসি সিমেন্টের কারখানা পেরিয়ে আমরা ব্রহ্মপোখরি বলে একটা জায়গায় এলাম। এখান থেকেই একটা রাস্তা চলে গেছে সিমলার দিকে, আরেকটা রাস্তা চন্ডিগড়ের দিকে নেমে গেছে।

অনেকক্ষন ধরে গুগল ম্যাপে আমাদের আসার রাস্তাটা ট্র্যাক করতে করতে চলেছি। ব্রহ্মপোখরি পেরিয়ে বাঁদিকে যে রাস্তায় সিমলা যাওয়ার কথা, সে রাস্তায় না গিয়ে পবন গাড়ি ঘোরাল একটা সরু ভাঙা ভাঙা রাস্তায়। গুগল ম্যাপ থেকে অন্য রাস্তায় গাড়ি ঘোরতেই আমি জিজ্ঞেস করলাম। বলল, এই পথে নাকি কুড়ি কিলোমিটার রাস্তা কম হয়।

কিন্তু এ কি? গুগল বলছে কিছুটা গিয়েই এ রাস্তা শেষ হয়ে যাবে। আর সবচেয়ে বড় কথা রাস্তাটা চূড়ান্ত ভাঙাচোরা আর তেমনি সরু। আমাদের গাড়ি ছাড়া আর একটাও গাড়ি নেই। উল্টোদিক থেকে যদি কোনো গাড়ি আসলে কি হবে তাই ভাবছি। এদিকে পবনকে জোর দিয়ে বলতেও পারছি না যে তুমি ভুল দিকে নিয়ে যাচ্ছ। আর সে রাস্তার ত্রিসীমানায় একটাও বাড়ি বা কোনো মানুষের চিহ্নও চোখে পড়ছে না। এ কোন জায়গায় পবন আমাদের নিয়ে চলেছে। কিছুটা যাওয়ার পর পবনকে বললাম যে তুমি তো মনে হয় বাপু ভুল রাস্তা ধরেছ।

পবন নিশ্চুপ। হ্যাঁ ও নয়, নাও নয়। আরে কি হল, কিছু তো বলো। পবন বলল, আপনাদের চণ্ডীগড় পৌঁছে দিলেই তো হল। এ তো আরো মুশকিল। এদিকে আধঘন্টার ওপর হয়ে গেল একটা গাড়ির কি মানুষের দেখা নেই। খালি এদিক ওদিক ধুমসো ধুমসো পাহাড়ি হনুমান আর নানা নাম না জানা পাখির ডাক। রাস্তার একপাশে খাদ, অন্যদিকে পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে ঘন জঙ্গল। গুগল বলছে এই জায়গাটার নাম ‘জঙ্গল দরবার’।

যাব চন্ডিগড়, আর পবন এনে ফেলল জঙ্গল দরবারে? ম্যাপে দেখছি আর কিছুদূর গিয়েই রাস্তা শেষ। তাহলে আমরা যাচ্ছি কোথায়? এই নির্জন জায়গায়, ঘন জঙ্গলের মধ্যে গাড়ি চালাচ্ছে কেন? তবে রাস্তা যাই হোক, দুপাশের সৌন্দর্য্য কিন্তু দু’চোখ ভরে দেখছি। এ তো মূল রাস্তা ধরে চললে কোনোদিন দেখতে পেতাম না। সেখানে তো দু’পা অন্তর অন্তর দোকান, হোটেল আর বাড়ি। ব্যাস, সামনে থেকে আর রাস্তা নেই, অন্তত ম্যাপে তাই বলছে। এদিকে মোবাইলের সিগন্যালও চলে গেল। অথচ একটা সরু রাস্তা এখনো চলছে, তবে আগের থেকে আরও সরু আর ভাঙাচোরা। গাড়ি নাচতে নাচতে চলল। আমরা নিচে নামছি। মাঝে একটা ছোট ঝর্ণা দেখে পবন নেমে গেল জল ভরতে।

গাড়ি থেকে নামতেই গাড়িটা আস্তে আস্তে গড়াতে শুরু করল। আমরা চিৎকার করতে যাব, তার আগেই গাড়ি থেমে গেল। এতো ঝামেলা গাড়িরও পছন্দ নয়। বিপদের ওপর আবার বিপদ। উল্টোদিক থেকে একটা পেল্লাই লরি এসে প্যাঁ প্যাঁ করে চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। পবন গাড়ি নিয়ে একটু করে পিছোয়, লরি এগোয়। পবন আরো পিছোয়, লরি আরো এগোয়। এমনি করে করে একসময় লরিটাও পাশ কাটিয়ে গেল, আর যাওয়ার সময় পবনকে বিস্তর গাল দিয়ে গেল।

গাড়ি চলছে ভাঙা রাস্তা দিয়ে। মনে হচ্ছে কেউ যেন দড়ি বেঁধে ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে নিয়ে চলেছে। এদিকে ফোনে একটু একটু করে সিগন্যালও ফিরে আসতে শুরু করেছে। জঙ্গল দরবারের জঙ্গলও শেষের দিকে। দূরে অন্য একটা রাস্তায় গাড়ির আনাগোনা দেখা যাচ্ছে। কিছুটা দূর গিয়ে এই ভাঙা ও সরু রাস্তাটা একটা চওড়া রাস্তায় মিশে গেল। এই বড় রাস্তাটাই মানালি থেকে চন্ডিগড় যাওয়ার ভদ্রস্থ রাস্তা। জায়গাটার নাম জামলি।

জামলি এসে পবন বলল, রাস্তা ভুল করনা মেরে সে না হো পায়েগা, মেরা নাম পবন।

মনে মনে ভাবলাম, তুমি পবন না পবনপুত্র হনুমান একটা।

জামলিতে লাঞ্চ সেরে আবার গাড়ি চললো। পাঞ্জাব ঢোকার আগেই পারমিট নিতে হল। এরপরের রাস্তাটা প্রায় সমতল। তবে খুবই সাজানো গোছানো আর মাখনের মত মসৃন রাস্তা। চন্ডিগড় ঢোকার আগে কতকগুলো চওড়া খালের ওপর ব্রিজ পেরোল। এই খালগুলোকে ওরা বলে ‘নাহার’ বা নার। এগুলোর জল চাষের কাজে লাগে। রাস্তার পাশে ছোট-বড় গুরুদ্বারা। পবনকে বললাম একটা বড় গুরুদ্বারা দেখে গাড়ি দাঁড় করাতে।

খুব সুন্দর একটা গুরুদ্বারা। দোতলায় উপাসনালয়। পুরুষ-মহিলা নির্বিশেষে মাথা ঢেকে ঢুকতে হয়। বেশ নিরিবিলি, আর হাইওয়ের ওপরে বলে লোকজনও কম কম।দোতলা থেকে দিগন্তবিস্তৃত জমির ওপারে দূরের নীল পাহাড়ও দেখা যায়। একটু পরে রোপার আইআইটি পেরিয়ে এলাম। বিকেল প্রায় পাঁচটা নাগাদ চন্ডিগড় ঢুকলাম। প্রথমে নিউ চন্ডিগড়ের আইটি হাব, নতুন নতুন হাইরাইজ পেরিয়ে এলাম বিখ্যাত চন্ডিগড় পিজিআই। এখন নাম নেহেরু হসপিটাল। সেখান থেকে সোজা যেতে যেতে একটা মোড়ের ডানদিকে ঘুরলেই আমাদের হোটেল।

পবনকে টাকাপয়সা মিটিয়ে দিলাম। কিন্তু এতদিন আমাদের সঙ্গে থেকে ও যেন আমাদের ট্যুরের একটা অংশ হয়ে গেছে। আমাদের গুড বাই করে সে চলে গেল। কাল থেকে তার ট্যুর পার্টি নিয়ে নতুন ঘুমচক্কর শুরু হয়ে যাবে। আর আমরা কাল ঘুরবো চন্ডিগড়ের আনাচে কানাচে।

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (একাদশ এবং প্রাক-অন্তিম পর্ব)

৯ই মার্চ, ২০১৮। চন্ডিগড়।

সিমলা শেষ। মানালিও শেষ। ফেরার ট্রেন ধরার আগে আরও একটা দিন আছে। এই একটা দিন খেয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে গায়ের ব্যথা কমানো যাবে, এরকম প্ল্যান ছিল। কিন্তু বাধ সাধল আমার ফোনটা।

হ্যাঁ, মোবাইল খোঁচাতে গিয়ে দেখলাম চন্ডিগড়েও নাকি দুর্দান্ত সব দেখার আর ঘোরার জায়গা আছে। কি আর করা, বাঁধা গরু একবার ছাড়া পেলে কি আর চট করে ঘরে ফেরে? আগের রাতে ভালো করে খেয়ে দেয়ে প্ল্যান করা হল, সকাল সকাল বেরিয়ে বিকেলের মধ্যে ঘুরে আসা যাবে। কিন্তু পবন তো চলে গেছে, তাকে তো আর পাওয়া যাবে না। তাহলে কি হবে?

তাহলে আর কি, ডাকলো ওলা, চলল ভোলা। কাল সন্ধ্যেবেলা চিকেন পকোড়া খোঁজার নাম করে স্টেশনের আশপাশটা ঘুরে এসেছি। এখন বাকি চন্ডিগড়টা দেখতে যাচ্ছি। সক্কাল বেলা ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া আর সদ্য ওঠা সূর্যের আলো উপভোগ করতে করতে আমরা চললাম শুকনা লেকের দিকে। আমাদের হোটেলটা স্টেশনের একদম কাছে দরিয়া বলে একটা জায়গায়, আর শুকনা লেক এখান থেকে প্রায় আধঘন্টার দূরত্ব। মাঝে রাস্তায় পড়ল চন্ডিগড় গল্ফ ক্লাব, গভর্নর হাউস। শুকনা লেকে নামতেই আমাদের স্বাগত জানালো একরাশ ঠান্ডা শুদ্ধ হাওয়া।

শুকনা লেকে পৌঁছে দেখি অনেক লোক এসে দৌড়োদৌড়ি করছে। না না, আগুনও লাগেনি, বাঘও বেরোয়নি। আসলে ওই জায়গাটা চন্ডিগড়বাসীদের মর্নিং ওয়াকের সবচেয়ে খাসা জায়গা। আমাদের যেমন ভিকটোরিয়া বা মিলেনিয়াম পার্ক। তবে আরো সুন্দর করে মেন্টেন করা হয়েছে বলে চেহারা খুলেছে বেশি করে। মাপ করে ছাঁটা গাছ, রং-বেরঙের গোলাপ। ঝকঝকে জগিং ট্র্যাক। সব দেখেশুনে মনে হচ্ছিল এরকম একটা জায়গা কেন আমার বাড়ির কাছে নেই। অনেকে জগিং করছে, মিউজিক মেডিটেশন করছে। কেউ ক্লান্ত হয়ে বসেই পড়েছে। বড় বড় গাছের ছায়ায় বেঞ্চ পাতা। সামনে দিগন্তবিস্তৃত শুকনা লেক। তার ওপারে নীলচে পাহাড়ের সারি। সব মিলিয়ে দুর্দান্ত একটা জায়গা।

শুকনা লেকে বসে বসেই সময় কেটে যেত, কিন্তু তাহলে এরকম আরও জায়গা বাদ পরে যাবে। শুকনা লেকে বোটিং করা যায়। ওপাশে একটা সাজানো গোছানো ফুড কোর্ট। একপাশে চন্ডিগড়ের সিম্বল ‘ওপেন হ্যান্ড মনুমেন্ট’-এর একটা ছোট সংস্করণ। শুকনা লেকে একটা ফলকে লেখা আছে, চন্ডিগড় শহরের প্রধান ফরাসি আর্কিটেক্ট লে করবুসিয়ের এই স্বপ্নের প্রজেক্টের কথা। চন্ডিগড়বাসীকে এই লেক আর ড্যাম উৎসর্গ করা হল যাতে তাঁরা প্রকৃতি আর নৈঃশব্দের মাঝে মানবতাকে উপলব্ধি করতে পারেন।

শুকনা লেক থেকে বেরিয়ে রাস্তা পেরিয়ে একটা অটো নিয়ে চলে এলাম রক গার্ডেনে। ভদ্রলোকের নাম নেকচাঁদ, কলকাতার মানুষের কাছে অনেকটাই অচেনা নাম। সেই মানুষটা চন্ডিগড়ে যে কি নিঃশব্দ বিপ্লব ঘটিয়েছেন সে তাঁর সৃষ্টি রক গার্ডেন না দেখলে ধারণা করা যাবে না। টিকিট কেটে ছোট্ট আর নিচু গেট দিয়ে ঢুকেই দেখা পেলাম পাথরের সব মূর্তির। এবড়ো-খেবড়ো পাথুরে স্ট্রাকচারের ওপর রাজ্যের যত ভাঙা পোর্সেলিন বা চিনামাটির জিনিসের টুকরো জুড়ে জুড়ে তাতে অবয়ব দেওয়া হয়েছে। এই ইঞ্জিনিয়ার মানুষটি ২০১৫য় মৃত্যুর আগে অবধি হাজার হাজার ভাঙা বেসিন, কমোড, কাপ-প্লেট, টাইলসের টুকরো দিয়ে বানিয়েছেন আস্ত একটা সভ্যতা। সেখানে রাজা-রানী-রাজবাড়ী আছে, গ্রাম-শহর আছে, দুর্গ আছে, পাহাড় আছে, জলপ্রপাত আছে, গুহা আছে, নদী আছে, নদীর ওপর ব্রিজ আছে। ওপেন এয়ার অডিটোরিয়াম, গ্যালারি আরও কত কি। একজন মানুষের সৃষ্টি যে একসাথে কতরকম হতে পারে, নেকচাঁদকে জানলে তার কিছুটা আন্দাজ হতে পারে। একদিকে সিমেন্টের ভরা বস্তা জমিয়ে আস্ত একটা পার্ক গড়ে তুলেছেন। রেললাইনের পাথর দিয়ে গড়া দেওয়াল, তাছাড়া মাছের ঘর, আয়নার ঘর, বাগান কি নেই। আরেকদিকে কাঁচের চুড়ি দিয়ে গড়া পুতুলের রাজ্য। সঙ্গে আছে ডলস মিউজিয়াম। দর্জির দোকানের বাড়তি কাপড় কিনে নিয়ে বানিয়ে ফেলেছেন রাগা পুতুলের সংগ্রহ। সেখানে গ্রামের দৃশ্য, পাঠশালা, বিয়ের শোভাযাত্রা, সাধুদের আখড়া, শাড়ির দোকান, মুদিখানা, রাজপরিবার সব ফুটে উঠেছে একের পর এক ট্যাবলোয়। একই ধরণের শয়ে শয়ে পুতুল দিয়ে গড়ে তুলেছেন আস্ত একটা মিউজিয়াম।

রক গার্ডেনে একটা বিরাট বড় প্যাভিলিয়নে নেকচাঁদের পুরস্কারের ডালি। দেশ-বিদেশের কত মানুষ, কত সংস্থা কুর্নিশ করেছে এই শিল্পীর সৃষ্টিকে। এক জায়ান্ট স্ক্রিনে তাঁর জীবন আর রক গার্ডেনের ইতিহাস নিয়ে ডকুমেন্টারি দেখানো হচ্ছে। গোটা জায়গাটাকে তিনটে ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ এখন সম্পূর্ণ। তৃতীয় অংশে এখনও কাজ চলছে। বিরাট বড় এলাকা, তাই ভালো করে ঘুরে দেখতে একটা গোটা দিন লাগে। উঁচু নিচু পাহাড়ি রাস্তার মত পথে একবার ঢুকলে পুরোটা না দেখে বেরোনোর উপায় নেই, এমনভাবেই বানানো।

রক গার্ডেনের পরে মিউজিয়াম। চন্ডিগড়ে একজায়গায় তিন-তিনটে মিউজিয়াম। প্রথম মিউজিয়ামে ঐতিহাসিক সামগ্রী আর শিল্পকলার অজস্র নিদর্শন রাখা আছে। আর দোতলায় আছে আর্ট গ্যালারি। আছে শিখ বিদ্রোহে ব্যবহৃত কামান। একতলা থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ির বদলে ঢালু রাম্পের একপাশে আছে অজন্তার ফ্রেসকো। একটু দূরেই ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামে পৃথিবীর বিবর্তনের নানা পর্যায় দেখানো হয়েছে ছবি আর মডেলের সাহায্যে। আছে আদিম মানুষের জীবাশ্ম। সবচেয়ে বড় ব্যাপার হল, এই জীবাশ্মগুলোকে দৰ্শক হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে পারেন। ডাইনোসরের পায়ের পাতা, ডিমের অংশ, হাড্ডিগুড্ডি নিয়ে এক এলাহি কান্ড। তবে আকারে ছোট। আরেকটা মিউজিয়াম আছে, আর্কিটেকচার মিউজিয়াম। চন্ডিগড়ের যত নামকরা বিল্ডিং, তাদের স্কেলে মাপা মিনিয়েচার এডিশন কাঁচের বাক্সে রাখা আছে। গভর্নর হাউস, সেক্রেটারিয়েট ভবন, আরো কত বিল্ডিঙের পুতুল। আর আছে চন্ডিগড় সৃষ্টিকালের অরিজিনাল ম্যাপ বা ব্লু-প্রিন্ট। তবে পর্যটকের সংখ্যার দিক দিয়ে এই তিন মিউজিয়ামই খুব ব্রাত্য।

মিউজিয়াম কমপ্লেক্সের বাইরে একটা আইফেল টাওয়ারের প্রতিকৃতি। রাস্তার ওপারে রোজ গার্ডেন। রং বেরঙের কত গোলাপ ফুটে আছে বাগানের গাছে। এদিকে দুপুর গড়িয়ে গেছে। পেটের ছুঁচোরা খোল-করতাল বাজিয়ে কীর্তন শুরু করে দিয়েছে। মিউজিয়ামে জিজ্ঞেস করলাম লোকাল খাবার আর মার্কেট কোথায় আছে। ভদ্রমহিলা টেবিলে আঙ্গুল দিয়ে ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দিলেন কিভাবে যেতে হবে। দুটো মার্কেট আছে এখানে, সেক্টর ২২তে শপিং মল আর ব্র্যান্ডেড জিনিসের দোকান। আর সেক্টর ১৭য় লোকাল জিনিস আর জামাকাপড়ের ছোটোখাটো অনেক দোকান। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে খাবারের দোকানও। উনি বললেন, সেক্টর ১৭এ কিরণ সিনেমার পিছনে শাস্ত্রী মার্কেট সবচেয়ে ভালো হবে লোকাল খাবার আর জিনিসের জন্য।

আবারও সেই ডাকলো ওলা, চলল ভোলা। কিছুদূরে যেতেই চোখে পড়ল কিরণ সিনেমা। তার পেছনে একটা রাস্তা, যেখানে গাড়ি চলে না। তার দুপাশে দোকান আর দোকান। এই ভরা দুপুরেও সেখানে মানুষের ভিড়। ঠিক যেন কলকাতার নিউ মার্কেট। মার্কেটের শুরুতেই অথেন্টিক পাঞ্জাবি রেস্তোরাঁ। ঢুকতেই তড়কার কড়া গন্ধ। অর্ডার দেওয়া হল, চিকেন কালিমির্চ আর পাঞ্জাবি রাইস। সে চিকেন এলো সত্যিকারের একটা কড়াইয়ে করে। তুলতুলে মাংসে ঘি-মেথির সুবাস। সঙ্গে সুগন্ধি ভাত।

ঢেঁকুর তুলতে তুলতে এগোলাম মেন মার্কেটে। জামা-কাপড়, কসমেটিক জুয়েলারি, ঘরের জিনিস, আগডুম-বাগডুম হাজারো জিনিসের জমজমাটি বাজার। কিছু বড় বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, তারা মাছি তাড়াচ্ছে। তার সামনে ছোট দোকান, যারা ডাকাডাকি করছে বিস্তর। তার সামনে খাটিয়া পেতে ফুটপাথের দোকান, তারা তো রীতিমত হাত ধরে টানাটানি করছে। এই ত্রিস্তরীয় অভিবাদন পেরিয়ে আমরা একটা দোকানে ঢুকলাম যার মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত স্তুপ করা আছে চানাচুর, পেঠা, হজমি, পাঁপড়, কাজু, কিসমিস, ওয়ালনাট, টুটি-ফ্রুটি আরো কত জিনিস। প্রতিটি আইটেমের ভ্যারাইটিও চোখে পড়ার মত। শাস্ত্রী মার্কেটের ব্যাপ্তি আর কালেকশন সত্যিই দেখার মত।

এবার ফেরার পালা। চন্ডিগড়ে অটোর খুব রমরমা, এমনকি গভীর রাত্রেও পাওয়া যায়। একটা অটো বুক করে ফিরে এলাম হোটেলে। সঙ্গে ছোট-বড়-মেজ-সেজ-ন’-রাঙা সব ব্যাগের পাহাড়।

শেষ, বেড়ানো শেষ। সিমলা হল, মানালি হল, চন্ডিগড়ও হল। কাল ঘরে ফেরার পালা। কাল সক্কাল সক্কাল বেরিয়ে পরশু সকালে বাড়ি পৌঁছে যাব। আজ রাত্তিরে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে নিতে হবে। তার আগে এই এত্ত জিনিস প্যাক করতে হবে। কি যে হবে কি জানে?

‘হিমাচলের কয়েকদিন’ (দ্বাদশ এবং অন্তিম পর্ব)

১০ ও ১১ই মার্চ, ২০১৮। ঘরে ফেরার গল্প।

চার মাস আগে টিকিট কেটেছিলাম। তারও প্রায় এক-দেড় মাস আগে থেকে প্ল্যান প্রোগ্রাম চলছে। আজ সেই সব প্ল্যান প্রোগ্রামের শেষ দিন। যত্ত রাজ্যের ক্লান্তি আর পরিশ্রম যেন চেপে ধরেছে। পা চলছে না। তাকে যদি বা টেনেটুনে চালানো যায় তো হাতদুটো বিদ্রোহ করে বসে। আসলে মন চাইছে আর দুটো দিন থেকে যাই, কিন্তু বাড়ি-অফিস-মিটিং-দায়িত্ব সব কলকাতা থেকে ডাকছে ‘আয় আয়’। আর মনটা সেই নার্সারি স্কুলের বাচ্চার মত যেতে চাইছে না। কোনোরকমে তাকে টেনে টেনে ওলায় তুলে চন্ডিগড় স্টেশনে নিয়ে আসা। তখন ভোর পাঁচটা কুড়ি। সাড়ে ছটা নাগাদ ট্রেন। স্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে বসে ঘুমন্ত প্ল্যাটফর্ম আর আমাদেরই মত কিছু ঘরে ফিরতে অনিচ্ছুক লোকজনকে দেখতে পাচ্ছি।

এই দশ দিন সময় তো হুহু করে কেটে গেছে, আর এই একটা ঘন্টা যেন এক বছর। দু-একটা ট্রেন আসছে, একটু দাঁড়াচ্ছে, আবার চলেও যাচ্ছে। ওদিকে পূর্বের আকাশে হালকা নীলচে হলুদ আভা ছড়িয়ে সূর্য উঠছে। সেই আলোয় দেখতে পেলাম একটা নীল ট্রেন কালকার দিক থেকে এসে স্টেশনে ঢুকলো।

কালকা-নয়াদিল্লি শতাব্দী এক্সপ্রেসে আমাদের সিট খুঁজে বসলাম। চন্ডিগড়ের আগে প্রায় পুরো ট্রেনটাই খালি ছিল, এখনও বেশ কয়েকটা সিট খালি। রেলের লোকজন ব্রেকফাস্ট দিয়ে যাচ্ছে, খবরের কাগজ, জল দিয়ে যাচ্ছে। বাইরের দৃশ্য নিজের মত পাল্টে যাচ্ছে। মন কিন্তু আবার চলছে সিমলা হয়ে মানালি হয়ে কত কত জায়গায়।

পেরিয়ে যাচ্ছি অম্বালা, কুরুক্ষেত্র, পাহাড় থেকে সমতলের দিকে। একসময় ট্রেন দাঁড়ালো নিউদিল্লি স্টেশনে। নামতেই হত, তাই নামলাম। বিকেলে শিয়ালদহ রাজধানী এক্সপ্রেসে আমার ঘরের রাজধানীতে ফিরব। মন খারাপ করে লাভ কি? বরং এই তিন-চার ঘন্টা দিল্লি স্টেশনের আশপাশটাই একটু ঘুরে নিই। যতটুকু সম্ভব।

যেমন ভাবা তেমন কাজ। একনম্বর প্ল্যাটফর্ম দিয়ে বেরিয়ে চললাম কনট প্লেসের দিকে। ডানদিকে সাদা রঙের শ্রীলংকান বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের একটি অফিস। বাঁদিকে রেলের অফিস ও কোয়ার্টার। কনট প্লেসের প্রায় কাছাকাছি অবধি গিয়ে আবার হাঁটতে হাঁটতে ফিরে এলাম স্টেশনে। তবু তো কিছু দেখা হল। এবার স্টেশনের বাইরের একটা দোকান থেকে রুটি আর ডালফ্রাই দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ।

তেরো নম্বর প্ল্যাটফর্মে একটা লাল ট্রেন দাঁড়িয়ে আছে। রাজধানীর সেই পেটেন্ট রং। আরো একটি প্রবাসী বাঙালি পরিবার আমাদের সঙ্গে একই কিউবিকলে। তাদের সঙ্গে গল্পে গল্পে পেরিয়ে এলাম যমুনা নদী, দূরে অক্ষরধাম মন্দির, আনন্দবিহার স্টেশন, বাঁয়ে পিডব্লিউডির হেড-কোয়ার্টার। সন্ধ্যেয় স্যুপ, ফ্রুটি আরো কিছু চটপটা খাবার। আর রাতে ভাত-রুটি, তরকারি, চিকেন কারী আর টকদই। রাতে শোয়ার আগে আইসক্রিম।

ভোর হল আর পাঁচটা দিনের মতই। কালকের মত আজ আর মন খারাপ নেই। এখন ঘরে ফেরার টান। সিটে সিটে চায়ের কাপ রেখে যেতে উঠে বসে দেখি বাংলায় লেখা স্টেশনের নাম। আসানসোল, দুর্গাপুর, বর্ধমান। তারপর আরও কাছে, দক্ষিনেশ্বর, বরাহনগর, দমদম, বিধাননগর আর সব শেষে শিয়ালদহ।

শেষ হল আরও একটা বেড়ানো। অনেক অভিজ্ঞতা হল, অনেক কিছু জানা গেল। যখনই মন খারাপ হবে তখন মন ভালো করে দেওয়ার মত কয়েকটা স্মৃতি বাড়ল। এরপর আবার কোনো প্ল্যানের অপেক্ষায়।

2 Comments

  1. Darun laglo ..
    Kub sundor…

    Reply

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement