পাংথাং…….অফবিট ডেস্টিনেশন

 

 

 

    এই লেখার বিষয় একটা সেমি অফবিট জায়গা. কিরকম সেটা। সেই বর্ননাতেই আসছি। জায়গাটাকে খুজে পাওয়া আমার একটা অসাধারন আবিষ্কার বলেই আমি মনে করি। এখানে একটু বিস্তারিত ভাবে শেয়ার করি… যদি কারো ভালো লাগে।

        জায়গাটার নাম পাংথাং। গ্যাঙ্গটকের থেকে বড়জোর দশ কিলোমিটার এগিয়ে। গ্যাঙ্গটকে যখন সবাই ঘামে, পাংথাঙে তখন হালকা চাদর লাগে. তাও ট্যুরিষ্ট স্পট হিসাবে খুব একটা পরিচিত নয়। কেউই আপনাকে ওখানে থাকার কথা বলবে না। তবে স্থানিয় লোকজন বা ড্রাইভারেরা চেনে। ড্রাইভারকে ওখানে থাকব বললে, সে কিছুক্ষন আপনাকে দেখে নিয়ে তারপর বলবে ব্যাঠিয়ে. উধার কাঁহা র‍্যাহ্না হ্যায়? সঙ্গত প্রশ্ন। কারন ওখানে হোটেল হোমষ্টে সেরকম নেই। তাই কোথায়, কিভাবে, কি ফিকিরে আপনি আস্তানা জুটিয়েছেন সেটা ড্রাইভারের মনে আসাটা স্বাভাবিক। তাকে উত্তরে বলতে হবে “সিকিম আর্মড ফোর্স ট্রেনিং সেন্টার কি বগোল মে জানা হ্যায়”. শুনেই সে জিজি বলে গাড়ি স্টার্ট করবে।

      সে নাহয় হল। কিন্তু পাংথাঙে আছে টা কি যার জন্য আপনি যাবেন? কি বলি বলুন তো? আচ্ছা উল্টো করে বলি। পাংথাঙে কি কি নেই সেই হিসাবটা আগে দি। পাংথাঙে হোটেল নেই, হোমষ্টে নেই, মার্কেটিং করার দোকান বাজার নেই, গাড়ি ঘোড়ার উৎপাত নেই, আদেখলে সেলফিতোলা ট্যুরিষ্ট নেই, থেকে থেকে কারেন্ট বা নেটওয়ার্কও নেই হয়ে যায়. এমন কি যে বাড়িটাতে আপনি থাকবেন সেখানেও কেউ নেই। তিনতলা বাড়ির তিননম্বর তলাতেই আপনার থাকার ব্যবস্থা। বাকি দুটো তলা খাদের ভেতর. বাড়ি মালিক গ্যাংটকে থাকে। বাগনানে তার আদি বাড়ি। আপনার জন্য তিনি একটা ডবল বেড রুম, একটা লিভিং রুম, এট্যাচ খাদে ঝোলা ব্যাল্কনি এবং লাগোয়া বাথরুম সহ একটা কমপ্লিট সেটাপ দিয়ে দেবেন মাত্রই দিনপ্রতি পাঁচশ টাকা হিসাবে। নিজে চাবি নিয়ে ঢুকবেন, চাবি দিয়ে বেরোবেন. আপনিই মালিক। সুতরাং ওখানে আপনাকে ঘাঁটানোরও কেউ নেই। দুপুরে আর রাত্রের খাবার মালিক পাঠিয়ে দেন. জলখাবার আর ব্রেকফাস্ট, চা পাশের আইচল গুরুং বাবুর বাড়িতে। গুরুং কাকিমা রান্নাও করেন হেব্বি। চাইলে দুপুর রাতের খাওয়াটা সেখানেও করা যায়। আর খুব গোপন একটা খবর এইবেলা দিয়ে রাখি। গুরুং বাবু সিকিমের SPর খাস লোক। তাই তিনি উইদাউট লাইসেন্সে একটা বার চালান এবং ওনার বেশিরভাগ কাষ্টমারই পুলিশ। সেই বারে RS ছেচল্লিশ টাকা পেগ!!

      তা পাংথাঙ্গের এই নেই রাজত্বের মধ্যে, থাকার মধ্যে আছে শুধু আকাশ জোড়া কাঞ্চনজংঘা, নানা সময় নানা রং তার. ঠান্ডা হাওয়া, সাথে নিবিড় নির্জনতা আর শান্তিই শান্তি। আজকাল প্রকৃতিকে দেখার সবচেয়ে বড় বাঁধা হচ্ছে তার. কেবল নেট ইলেকট্রিক, টেলিফোন থেকে এমনিই কিছু অকেজো তার সবসময় দৃষ্টিপথে বাধা দিচ্ছে। ফটো তোলার হান্ড্রেড এন্ড এইট। কিন্তু পাংথাঙে অবস্থান গত সুবিধা বা তারওয়ালাদের কাছে মারাত্মক অসুবিধার কারনে খাদের দিকে তারের কোনো বালাই নেই। তাই তারকাটার মত প্রকৃতি দেখতেও কোনো বাধা নেই।

 এছাড়া পাংথাঙে গাছে গাছে পাখি আছে নানা রকম। আমার মত কুঁড়ে লোকেদের জন্য জায়গাটা আদর্শ কারন ওখানে পাখি দেখতে গেলে হাঁটাহাটি করার দরকার নেই। বারান্দায় বসে বসেই দেখা যাবে। আপনি শুধু গোদা লেন্স খাটিয়ে বসে থাকুন। ফটাফট ছবি আসবে। প্রজাপতি আছে দলে দলে….বুনো ফুলের মেলার মধ্যে তারা ঘুরে ঘুরে পছন্দ মত মধু খায়। গাছ বুঝে ডিমও পাড়ে। ফটো তোলার নেশা থাকলে সেখানে আপনার সময় কোথা দিয়ে কেটে যাবে বুঝতেই পারবেন না… গ্যারান্টি। কপাল ভালো থাকলে যদি বজ্রবিদ্যুত সহ বৃষ্টি হয় খাদের দিকে, আপনি ওপর থেকে দেখবেন নিচে বিদ্যুত চমকাচ্ছে। সে দৃশ্যের ছবি বা তুলনা কোনটাই নেই। আমি তিনবার গিয়ে একবার মাত্র দেখেছি সে দৃশ্য।

      কি জায়গাটা চেক লিষ্টে নিয়ে নিলেন নাকি! যাবার প্ল্যান করে ফেলেছেন? সেরেচে!! একটু সবুর করুন। সবটা বা আসল কথাটাই তো এখনো বলা হয়নি। ওটা না শুনে আপনি পাংথাঙে গিয়ে হাজির হলে ফিরে এসে আমাকে আর আস্ত রাখবেন না। হ্যা জায়গাটার একটা জিনিষে একটু ইয়ে… মানে বদনাম আছে। ওইজন্যই কেষ্টমামা ওখানে ভাড়া পায় না। ভুল করে কেউ চলে গেলেও সে একটা রাত্তির কোনোরকমে হরি নাম জপতে জপতে কাটিয়ে, পরেরদিন গালাগাল দিতে দিতে ফিরে আসে। উহুঁ না, ভুতের কথা ভাববেন না। যাদের ব্যপারে বলছি, ক্ষেত্রবিশেষে ভুতের থেকেও ভয়ঙ্কর তারা…

      পাখি, প্রকৃতি ছাড়াও পাংথাং আরো একটা কারনে বিখ্যাত বা ব্যাক্তি বিশেষের কাছে কুখ্যাত। সেটা হল মথ আর পোকা। ধেড়ে বা কচি, মিহি বা গোদা, রোঁয়াযুক্ত কিম্বা ন্যাড়া, বিষাক্ত বা নির্বিষ, উপকারি অথবা অপকারি, নিরিহ বা ফেরোসাস ইত্যাদি যত রকম ভ্যারাইটির হতে পারে তার থেকেও কিছু বেশি প্রকারের মথ আর পোকা সেখানে বিদ্যমান এবং তারা সকলেই আপনার সামনে হাজির হওয়াকে নিজেদের প্রাথমিক এবং অবশ্য কর্তব্য বলে মনে করে. মথেরাই সাথে স্যাঙ্গাৎ হিসাবে নিয়ে আসে নানা কিসিমের পোকা। এই মথগুলো থেকে সেরকম বিপদ কিছু না হলেও তাদের সঙ্গী কিছু বেঁড়েপাকা পোকা বিষ দিয়ে আপনার জিনা হারাম করতেই পারে. বিষ যদি বা নাও দিল, অকারন গায়ে এসে বসে বিড়বিড়ানি দিয়েই আপনার ঘুম চটকাতে পারে। ঘুমের ঘোরে থাবা মারলে বা থেঁতলে দিলে গন্ধ দিয়ে আপনাকে প্রায় অজ্ঞান করে দিতে পারে। তার ওপর হাপানির টান থাকলেতো কথাই নেই। তাই সাধু সাবধান। পাংথাং যান, ঘুরে আসুন, থাকুন যা খুশি করুন, কিন্তু রাত হবার আগেই দরজা জানলা বন্ধ করুন। নাহলে সারা রাত নৃত্য করতে হবে। আমার ব্যাপারটা অন্য। আমি নিজেকে একটা বড়সড় পোকা বলেই মনে করি আর পোকার সান্নিধ্যে বেশ একটা স্বজন স্বজন অনুভুতি পাই। তাই পাংথাঙে আমার বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় নি। রাতে লাইট ট্রাপ লাগিয়ে বসে থাকতাম তাদের আগমনের আশায়। কিছু উদাহরন এখানে রাখলাম। দেখুন, আর তারপর বুঝে শুনে সিদ্ধান্ত নিন।পোকার কামড়ে নাকে মুখে আঁব গজালে বা চুলকুনিতে পাগোল হলে আমাকে কোন মতেই দায়ী করা চলবে না।

 

 

Submit a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Advertisement